somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্পঃ শব্দখেলুড়ে ও রাস্তা কিংবা আরেকটি শহুরে গল্প

২৬ শে নভেম্বর, ২০১০ বিকাল ৪:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"কেন?"
প্রশ্নটা করেই সশব্দে চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখল আমার বন্ধুটি। আমি খানিক থতমত খেয়ে গেলাম। এতক্ষণ ধরে কিছু একটা বকে যাচ্ছিল সে। আমি একটা শব্দও খেয়াল করি নি। সামলে ওঠার প্রয়াস নিচ্ছি, সে সুযোগটা না দিয়েই ও আবার বলে বসল,
"তোর দ্বিমতটা কোথায়?"

এবার সত্যি বিপদে পড়ে যাই। আমরা এই মুহূর্তে বসে আছি একটা পুরনো চায়ের দোকানে। ঠিক পুরনো নয়, বলা যায় প্রাচীন। ফুটো হয়ে যাওয়া জং ধরা টিনের চালে বছরের পর বছর ধরে তপ্ত ধোঁয়ার কালো দাগ কিংবা শতবর্ষ পুরনো এই ঘুণধরা কাঠের টেবিলের তলা থেকে ফ্যাকাশে হলুদ গুঁড়োগুলো আমার কালো রংয়ের জিন্সের উপর পড়তে দেখে সেইরকমই মনে হয়। রাস্তার পাশের ব্রিটিশ আমলের প্লাষ্টারবিহীন দালানটায় জমে থাকা শ্যাওলার সোঁদা গন্ধে যখন তখন ডুব দেয়াটা বেশ সহজ মনে হলে, পাশের সিটি কর্পোরেশনের চওড়া নর্দমার সুবাস ঢেকে দিতে পোড়া তামাকের নিয়মিত উৎকট গন্ধটাও ক্যানো জানি স্বস্তিদায়ক হয়ে ওঠে।

"আরেকটা দুধ চা......চিনি কম দিয়েন।" দোকানদারের দিকে ইশারা করি হাত তুলে। আমার চশমা আঁটা বন্ধুটির দিকে তাকাই এরপর,
"কি যেন বলছিলি?" প্রশ্নটা শুনেই সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমি খানিক সংকুচিত হয়েই সিগারেটের প্যাকেটটা টেনে নিলাম। পকেট থেকে লাইটার বের করে আমার দিকে ঠেলে দিতে দিতে শুরু করল সে,
"আইডিয়াটা পছন্দ হয় নাই?"
"কোনটা?" হাঁটুর উপর থেকে কাঠের গুঁড়ো ঝাড়তে ঝাড়তে বলি আমি।
"ঐ যে শহরটা পুরোটা একটা মাকড়সার জালের মত......আর মানুষজন সবগুলো পোকামাকড়ের মত!"
"বলিস কি রে! জালের সুতাগুলোন কি তাহলে সব রাস্তাঘাট?" খুব দ্রুত ধৈর্য হারায় বন্ধুটি আমার। চশমাটা নাকের উপর আরো খানিক ঠেলে দিয়ে ভুরু কুঁচকে বলে উঠল,
"না তো কি! আর দালাকোঠাগুলো দেখিস না? ওইগুলো একেকটা মরণফাঁদ।" তাই হবে, আমার কোন দ্বিমত নেই এই ব্যাপারে। লন্ঠনের আলোয় পোকামাকড়েরা ঠিক যেভাবে আছড়ে পড়ে আলোর উৎসের ওপর, অনেকটা ওভাবেই প্রতিনিয়ত জড়ো হচ্ছে সবাই ঐ শহরটাতে। 'কেন?', প্রশ্নটা করা যায় খুব সহজেই কিন্তু প্রাসঙ্গিক একটা উত্তর দেবার দায় কেউ নেয় না। নিতান্ত অনিচ্ছায় ফিরে যেতে দেখছি চারপাশে পরিচিত মুখগুলোকে। ব্যাপারটা চিন্তা করতেই মুখের ভেতরটা তেতো হয়ে ওঠে।

সীসের গন্ধ আর ধোয়াঁটে আকাশ এই দুটো জিনিশের প্রভাবে এই পিঁপড়েদের ডানা খুব শিগগিরই গজিয়ে যায়। আমি বলি,
"ওখানে মানুষ বাস করে না, কোনমতে বেঁচে থাকে।" কথাটা শুনে ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ল সে।
"উঁহু! টিকে থাকে......কোনোমতে টিকে থাকে।" এবারও দ্বিমত করবার সুযোগ পেলাম না আমি। কিন্তু হুট করে একটা জিনিশ খেলে গ্যালো মাথায়।
"আচ্ছা, জাল আছে যখন; মাকড়সাটা কোথায় বল দেখি?" মুচকি হেসে প্রশ্নটা করি। ও মাথা দোলায়, চোখে খুশির ঝিলিক।
"That jungle of concrete is an illusive mistress, U won't find it there...!"
শব্দ করে হেসে উঠি আমরা দুজনেই। কারণ মাকড়সাটা কোথায় সেটা আমরা ঠিকঠিক জানি। জালটা বুনে পালায় নি সে।

"এই নেন আপনার চা।" দোকানদার কাপটা এগিয়ে দিয়ে খালি কাপ দুটো সরিয়ে নিয়ে গেল। আলাপচারিতায় হঠাৎ ছেদ পড়ায় আমরা দুজনেই খানিক নড়েচড়ে বসি। ষ্টলের এককোণে বসে থাকা শশ্রুমণ্ডিত এক প্রবীণকে খেয়াল করছিলাম কিছুক্ষণ ধরেই। আসরের ওয়াক্তের পর থেকেই বসে আছেন এই চায়ের দোকানে আমাদের মতই। কিছু একটা বলতে চাচ্ছিলেন মনে হচ্ছিল, আমাদের আলোচনায় এই ছোট্ট বিরতির সুযোগটা নিয়ে ফেললেন সহসাই।

"কতোখানি চেন এই শহর তোমরা?" আমরা ঘাড় ঘোরাই।
"হ্যাঁ, তোমাদেরকেই বলতেছি...। এইসব আবোলতাবোল যে বকে যাচ্ছো, তা কতটুকু চেনা আছে এই জায়গাটা?" বর্ষীয়ানের কন্ঠে টের পেলাম অভিযোগের সুর। বুদ্ধিমানের মত উত্তর না দিয়ে বসে থাকি চুপচাপ। আমি মনে মনে বলি "এটা নয়, অন্য একটা শহর; একেবার আলাদা একটা শহর!"
"এই যে দেখতেছো এই শালগাছটা, এইটা ত্রিশ বছর আগে আমি লাগায়েছিলাম নিজ হাতে; সেইটা তাও খুব বেশি আগের কথা নয়।" বৃদ্ধ আঙুল তুলে দেখান। এরপর আঙুল ফেরান আমাদের দিকে,
"কত বয়স তোমাদের?" প্রশ্নটা শুনে ফিক করে হেসে দিল আমার বন্ধুটি, আর আমি ওর নির্বুদ্ধিতায় ঘাবড়ে গিয়ে আমি বিপুল মনযোগে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলাম দোকানের বিপরীতে ল্যাম্পপোষ্ট দুটোর মাঝখানে কোনমতে ঝুলে থাকা ট্র্যান্সফর্মারটারকে। যা ভেবেছিলাম, তিক্তকন্ঠে খেঁকিয়ে উঠলেন তিনি,
"হাসতেছো না! হাসো...
তোমার গালের ঐ দাড়ি গজায়ে শক্ত হইতে যতদিন লাগছে তার চেয়ে বেশি সময় লাগছে এই গাছটার মাথা উঁচা করে দাঁড়াইতে।"
আমরা ঘাড় তুলে তাকাই, বৃদ্ধের শ্লেষের কারণ স্পষ্ট হল এবার। ডালপালা বেশি ছড়িয়ে পড়েছিল বলে মনে হয়, কে বা কারা ছেঁটেছুটে প্রায় ন্যাড়া বানিয়ে ফেলেছে। স্বরের তীব্রতা কমে আসে,"কেউ একবারও জিজ্ঞেস করল না এই গাছটা কে লাগাইছিল।" শেষ মুহুর্তে গলার স্বর প্রায় মিলিয়ে গেল তার। "শহর হইল এইরকম, বুঝলা? কেউ কাউরে পাত্তা দ্যায় না, সবাই নিজের মতনই রইছে। কোন মাকড়সার জালে কেউ আটকায়ে নাই..."
মাগরিবের আজান শোনা গেল। উঠে পড়লেন বৃদ্ধ চেয়ার ছেড়ে। আরো কিছু বলবার ছিল সম্ভবত, অথবা আমরা আর শুনতে পেলাম না। কিন্তু অতটা সময় আর নেই। আমরা দুজনে একরাশ অস্বস্তি নিয়ে বসে থাকি ষ্টলে, পাশের নর্দমার পঁচা গন্ধটা তীব্রতর হয়ে উঠলে আরেকটা সিগারেট ধরাই।

"আইডিয়াটা চমৎকার দোস্ত!" নীরবতা ভেঙ্গে বলে উঠি।
"কোনটা?"
"এই যে শহর, মাকড়সা...এইসব। লিখে ফ্যাল একটা কিছু।"
"নাহ, ওইসব বাদ দিয়েছি। এখন ঘাড় শক্ত হয়ে গেছে।" নিস্পৃহ গলায় বলে সে।
"কেন? জবান!......তোর জবান কতটুকু স্বাধীন এখন?" খানিক বিরক্ত হয়েই বলি। কিন্তু সে হাসে আমার প্রশ্নে এবার, মাথা দুলিয়ে হাসে। বলে,
"একটু ভেবে দ্যাখ, কোনটা জরুরী।"

আবার নীরবতা নেমে আসে চায়ের ষ্টলে।

খানিক পর,
বন্ধুকে বিদায় জানিয়ে উঠে পড়ি আমি। মাগরিবের আজান দিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগে, আঁধার নেমে এসেছে। বাসায় ফেরার তাড়া অনুভব করছি। দু নম্বর সেক্টরের মাঝখান দিয়ে হাঁটা শুরু করি। জালের মত পিচের রাস্তাগুলো বিছিয়ে আছে এই শত শত একর জমিনের উপরে, আর সেই জালের চৌকোনা সব ফুটোর মাঝে আবাসগুলো। নিজের ঠিকানার কাছাকাছি এসে মোড় নিতে গিয়ে থমকে দাঁড়াই। প্রায় আধা কিলোমিটার লম্বা এই রাস্তা সম্প্রতি আমার খুব প্রিয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংস্কার শেষে একদম ফিটফাট পরিষ্কার পিচের ফালিটুকু কেন জানি আমাকে প্রায়ই আটকে ফ্যালে। সারবাঁধা হলদে ল্যাম্পপোষ্টগুলোর আলোতে হুট করে মনে হল, কতগুলো শব্দখেলুড়ের জন্ম দিয়েছে এই রাস্তাটা?

অথচ আমি জানি সংস্কার প্রকল্পে যে অল্প কটা টাকা অনুদান দিয়েছিলাম তাতে ওর শরীরের কয়েক বর্গইঞ্চির বেশি দাবী আমার নেই। কিংবা নেই ঐ শব্দখেলুড়েদের দিকে অভিযোগ ছুঁড়ে দেবার অধিকার। অক্ষরেরা ওদের একমাত্র কাজটা করতে ব্যর্থ হলে হাতের মুঠোয় কেবলমাত্র নিজের মাথার চুলই উঠে আসে। সম্ভবত এজন্যেই, রাস্তাটার এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে নাগরিক হলুদ আলোতে ভিজে যেতে যেতে হঠাৎ করে টের পেলাম...
আমার ঐ বন্ধুটির লিখতে না চাওয়ার কারণটা,
অদ্ভুতরকম সঠিক!

(শেষ)
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে নভেম্বর, ২০১০ বিকাল ৫:৪৬
৩১টি মন্তব্য ৩১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×