somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শেষরাত্রি আর শেষ সিগারেট

০৩ রা জানুয়ারি, ২০১১ ভোর ৫:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১.
জানি না কেনো,
শেষ সিগারেটটা পুড়িয়ে বালিশে মাথা দেয়ামাত্রই হঠাৎ করে ফিরে গেলাম পনেরো বছর পেছনে...


কোন এক অদৃশ্য হাত যেনো টেনে নিয়ে গেলো কাশিমপুর গ্রামে। মগজের কোণগুলো থেকে একের পর এক উঠে আসতে শুরু করল সেইসব ধূসর ছবি দারুণ রঙিন হয়ে। আমগাছের ডালে বসা শালিকের ঠোঁট, মহানন্দার তীর, সেই বটগাছ, ধূলোভর্তি কাঁচারাস্তা আর ভাঙ্গা মোষের শিং, শ্যাওলা ধরা কলপাড়, ফাটলধরা মন্দিরের দেয়াল আর বাঁশপাতার নৌকা। মনে পড়ছে, মাগরিবের নামাজ পড়ে মাতামহ বসতেন আঙিনাতে পাতা দড়ির খাটে, কখনও তাঁর মুখে তিনপুরুষ পুরনো গল্প আর জর্দার গন্ধ মিশে যেত চোখের তারায়। হেঁশেল থেকে আওয়াজ আসতো, নানী ফুঁ দিয়ে যাচ্ছে বাঁশের চোঙাটাতে অনবরত চুলোর আগুনে; দুপুরের আগুন জিইয়ে রাখতো চুলোর ভেতরের ছাই।

সেজোমামা কান টেনে ধরে উঠিয়ে পড়তে বসালে অসহায় হয়ে যেতাম। মনে পড়ে, বেড়ালের ইংরেজি নামটা মনে করবার সে কি প্রাণান্ত চেষ্টাই না ছিল! 'সি এ টি' ক্যাট নাকি 'সি ই টি' এটা দুরুদুরু বুকে আন্দাজ করবার চেষ্টা চলতো। তখন উদ্ধার পাবার একমাত্র আশা ছিল সায়রা খালা। অস্থির চোখে খুঁজতাম খালাকে।

দেখতাম, ছোটোখালার লম্বা কালো চুল জড়িয়ে যেনো আঁধার ধার চাইতো রাত। তখন আমি প্রবল আত্মবিশ্বাসে 'সি ই টি' ক্যাট বানান করে মামার দিকে ভীত চোখে তাকাতাম। মামা খুব হতাশ হত, আমার মাথায় পর্যাপ্ত একটা গাঁট্টা বসানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবার আগমুহুর্তে খালা আঁচলে ভাজা মাছের ঘ্রাণ জড়িয়ে চলে আসতো। তখন আমরা বুদ্ধিমানের মতো মামাকে ভেংচিয়ে আর 'কাইলা ভুত' ডেকে খেতে বসার জন্য দিতাম দৌড়। শাক খেতে বরাবরই ভীষণ আপত্তি ছিল, নানী চামচ নেড়ে নেড়ে ভয় দেখাতো, "ভিটামিন আছে, খা খা! নাইলে কানা হয়া যাবি..."।

খাওয়াদাওয়ার আধাঘণ্টার মধ্যে দু-চোখ ঢুলুঢুলু হয়ে আসতো, তখন আমার চেহারা দেখে খালা হেসে দিত, "...ক্যামনে করে টুবায়, দেখো!" তারপর ঘুম...

২.
এক দীর্ঘাঙ্গী সাঁওতাল রমণীর কথা মনে পড়ে, নামটা মনে নেই কিংবা কখনই জানা হয় নি। সবাই ডাকতো 'ময়ার মা' বলে। সবসময় শাদা শাড়ি পরে থাকতো সে। আমাদের পাড়ায় আসতো সে মাঝেসাঝেই, সবাই মুড়ি বানিয়ে নিত তার কাছ থেকেই। উঠানের একধারে কুয়োর পাড়ে বসে গুল মাজতো দাঁতে আর আমাকে দেখলে হেসে দিয়ে বলতো,
"আইসো আজকে বৈকাল বেলায় তোমার আপুকে লিয়ে কেমন? ঘুরে য্যাবা হাঁরঘে পাড়া।"

সেই ময়ার মাকে একবার জ্বীনে ধরল, খবর শুনে আমরা ছোটরা লুকিয়ে লুকিয়ে গেলাম তার বাড়ি। প্রচন্ড ভীড়, বিলাপ আর হৈচৈ এর মধ্যে দেখতে পেলাম উদভ্রান্ত ময়ার মাকে। দু-কাঁধ শক্ত করে ধরে রেখেছে লোকে, সামনে টাকমাথার কবিরাজ খুলছে তেলের শিশি। এত ভীড়ের মধ্যেও মিন্টু মামা আমাদের দেখতে পেয়ে ধমকে উঠলে আমরা দিয়েছিলাম ভোঁ দৌড়। এখন আর বাকিটুকু মনে নেই, মনে নেই ময়ার মার জ্বীন তাড়ানো হয়েছিল কিনা। শুধু মনে পড়ে তারপর থেকে আমাদের পাড়ায় আর কখনো দেখি তাকে।

৩.
প্রাইমারী স্কুলটা ছিল আধা মাইল দূরে। হেঁটেই যাওয়া হত, তবে কপাল ভালো থাকলে সারওয়ার মামার সাইকেলে চড়ে যাবার সুযোগ মিলতো কখনও। হাইস্কুলের সাথে একই সীমানাতে ছিল আমাদের স্কুল। ওই স্কুলে ছিল বেঞ্চ আর টেবিল চেয়ার। আমরা বসতাম চটের মাদুরে, ক্লাস ক্যাপ্টেন আর দুইজন অফিস থেকে বই এনে বিলাতো সবার মাঝে। আমাদের ছুটির সময় ছিল হাইস্কুলের টিফিন টাইম। ইউনিফর্ম পরা ছেলেমেয়েদের দেখতাম আর আফসোস করতাম, কবে যে বড় হই!

"বিরাট বেয়াদ্দপ" ছিলাম; কোন একবার, গরমের সময়ই হবে, স্কুল ছুটি পর বাড়ি ফেরার সময় পোলাপাইন মিলে একটা চমৎকার জিনিস আবিষ্কার করলাম। রাস্তায় ধুলো উড়াতে দারুণ আনন্দ। ব্যস, পথের শুরু থেকে পরের আধা মাইল চলল আমাদের ধুলো ওড়ানো কার্যক্রম। ধরাটা খেলাম একেবারে পথের শেষে এসে, বেয়াকুবের মত তখনও মনে আনন্দে ধুলো ওড়ানো চলছে। হুট করে সামনে তাকায়ে দেখি ছোট খালার অগ্নিমুর্তি! খানকয়েক চাঁটি খেলাম মাথায়, বইপত্রশুদ্ধ আমাকে কান টেনে নিয়ে যাওয়া হল কলপাড়ে, চোখেল জল মিশে গেলো টিউবওয়েলের জলের ধারায়।

নাহ্‌, খালাকে বেশিই ভালোবাসি। উনার বিষয়ে কোন কথা বলতে বললেই যেটা বলব...
"আমার ছোটখালা পৃথিবীর সেরা পাটিসাপটা বানায়।"

৪.
বহুকিছু মাথায় আসছে এখন। মনে পড়ছে নতুন লাটিমে আলের দাগ, দুর্গাপুজার সময়, সুলতানগঞ্জের মেলা কিংবা সেই গাঙের কথা। স্মৃতিকাতর হয়ে পড়তে খারাপ লাগে না, তবে এতকিছুর কথা লিখব কিভাবে?

তবে এইমাত্র খেয়াল করলাম বাইরে ফজরের আজানের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে আর প্যাকেটে আরেকটা সিগারেট আছে। এইবার আসলেই সময় হল ডুব দেবার...


৩৫টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×