ভাইরোলোজি ল্যাবে আপন মনে কাজ করছেন বিশিষ্ট বিজ্ঞাণী ড. আদিব চৌধুরী। ল্যাব সহকারী লিন্ডা তাকে ডাক দিল, ’’স্যার. .. ...” আদিব কোন কথা না বলে শুধু লিন্ডার দিকে তাকাল। জীবণরক্ষাকারী বিশেষ অ্যাপ্রোনের আড়ালে আদিবের পুরো মুখ-মন্ডল ঢাকা পড়েছে; তবু স্বচ্ছ গ্লাসের পেছনে খোঁচা খোঁচা দাড়ি ব্যাতীত যেটা খুব বেশি নজরে পড়ে তা হচ্ছে আদিবের বড় বড় কুচকুচে কালো দুটি চোখ। তাকালেই মনে কহয় যেন জ্বল জ্বল করে জ্বলছে! এই দৃষ্টির সামনে লিন্ডা কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে যায়। ”স্যার, মানে আপনি ল্যাবে একটানা অনেক্ষণ কাজ করছেন, এবং এই সময়ে কোন খাবার গ্রহণ করেননি!”আদিব হাতের টেস্ট টিউবটা সেন্ট্রিফিউজিং মেসিনে প্রবেশ করিয়ে সুইচের দিকে হাত বাড়াতেই লিন্ডা আবার বলে উঠল, ”স্যার আপনার বন্ধু সুজয় এসেছেন।” এবার আদিব ভ্রু কুচকে লিন্ডার দিকে তাকাল, তারপর টেস্ট টিউবটা সেন্ট্রি ফিউজ মেসিন থেকে বের করে ল্যাব থেকে বের হয়ে এল। গেস্ট রুমে পৌছাতেই সুজয় বলে ইঠল, নিজের একি হাল বানিয়েছিস? তোকে তো পুরো বুড়ো লাগছে!” আদিব হেসে বলল, ”আরে সেব করলেই আবার উয়াং, তখন মেয়েরা আর কতোর দিকে তাকাবেনা। তা কিখবর বল?” সুজয় আদিব কলেজক ফ্রেন্ড এক সময় রুম মেট ছিল। তাই সম্পর্কটা তুই তুকারির। সুজয় সফ্টওয়ার ইন্জিনিয়ার বর্তমানে বায়োব্যাংক এর চিফ সিকিউরিটি অফিসারের দ্বায়িত্ব পালন করছে। আদিবের ভাইরোলোজি ল্যাবটা বায়োব্যাংক এর আন্ডারে, তাই ওদের প্রায়ই দেখা হয়। কিন্তু বিগত কয় দিন আদিবের কোণ খোজ না পেয়ে সুজয় ভাইরোলোজি ল্যাবে চলে এসেছে। ” এইতো তোর দেখা না পেয়ে বুঝলাম বড় বড় সব বিজ্ঞানীদের মাথা আবারো হ্যাং করতে চলেছিস! তা কি খবর তোর?” আদিব মুচকি হেসে বলল, ”ক্যান্টিনে চল খেতে খেতে বলব।” ”তার মানে আমার সন্দেহ ঠিক, কি আবিষ্কার করছিস এবার?” ”এবার HIV নিয়ে গবেষণা করছি। বুঝলি এটি মহামারি কারণ এর রিভার্সট্রান্সক্রিপটেজ, যার ফলে এই ভাইরাস দ্রুত তার জীন পরিবর্তন করতে পারে। এর মিউটাজেনিক ক্ষমতাও অনেক বেশি!” ”আমি ওসব বুঝিনা, রিসার্চটা কি নিয়ে? ঐওঠ এর টিকা?” ”হ্যাঁ ঠিক ধরেছিস, দেখি হয় কি না!”
কিছুক্ষন গল্প করে আদিব তার নিজের ল্যাবে ফিরে এল। তারপর আবার সেন্ট্রিফিউজ মেসিনে টেস্ট টিউবটি প্রবেশ করিয়ে, ব্লাড থেকে লিম্ফসাইট (স্বেতরক্ত কণিকা) আলাদা করতে লাগল। এভাবে বার বার সেন্ট্রিফিউজের মাধ্যমে বেশ কিন্তু টি-লিম্ফসাইট আলাদা করে ফেলল। এমন সময় লিন্ডা আবার ল্যাবে প্রবেশ করল, ”স্যার আমার রিপোর্ট তৈরী।” আদিব খুব আগ্রহে হাত বাড়ালো, ”কৈ দেখি. .. ” কিন্তু রিপোর্ট দেখে পুরোটাই দমে গেল, ফাইনাল রিপোর্ট আবারো ৪% , ”ধ্যাৎ আবারো ৪%” ”স্যার মনে হয় এর চেয়ে আর কম হবে না।” দুনিয়ার সব ক্লান্তি আদিবকে ভখর করল, ”ঠিক আছে এখানে আমি টি-লিম্ফসাইস আলাদা করেছি। এখান থেকে সিডি ফোর (এক ধরনের লিম্ফসাইট যা ঐওঠ দ্বারা কম আক্রান্ত হয়) আলাদা করে রিভার্সট্রান্সক্রিপটেজ-এর পি.সি.আর (পলিমার চেইন রি-অ্যাকসান) করে রাখ, আমি ডর্মিটরিতে ব্যাক যাচ্ছি। আমার রেস্ট দরকার।”
আদিব রুমে এসে পুরো প্রজেক্টটা নিয়ে আবার ভাবতে শুরু করল। আর মাত্র এক সপ্তাহ সময় আছে, ফাইনাল রিপোর্ট জমা দেবার, কিন্তু কাজ কিছুতেই এগুচ্ছেনা। এখনও প্রায় ৪% টি-লিম্ফসাইট ঐওঠ দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। তবে লাস্ট যে এনজাইমটা ও ব্যাবহার করেছে তা টি-লিম্ফসাইটে এক ধরনের এন্টিবডি প্রস্তুত করে, ফলে HIV এর আক্রমন কমে গিয়ে ৪% হয়েগেছে। কিন্তু নতুন এনজাইমটা ব্যাবহারের ফলে HIV এর ডি.এন.এ নবম ক্রমোজোমের ৩২ তম ব্যান্ডে আক্রমন করছে। এর ঠিক দুই ব্যান্ড উপরে মানে ৩৪তম ব্যান্ডে এ.বি.ও ব্লাড গ্রুপ নিয়ন্ত্রণকারী জীনের অবস্থান। আদিব প্রটিন ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে এই নতুন ধরনের এনজাইমটা তৈরী করেছে, এটি মুলত রিভার্সট্রান্সক্রিপটেজকে ভাইরাল আর.এন.এ থেকে ডি.এন.এ তৈর তে বাধা দেয়। এনজাইমের আরেক অংশ ভাইরাল ডি.এন.এ কে ম্যামাল ডি.এন.এ এর সাথে বাইন্ডিং করতে বাধা দেয়। লাস্ট রিপোর্ট টা নিয়ে আদিব খুব আশাবাদি ছিল, কিন্তু আবারো ৪% হওয়ায় কিছুটা মন খারাপ। কাল ল্যাবে গিয়ে রিভার্সট্রান্সক্রিপটেজ এর ফাইনাল পি.সি.আর রিপোর্টটা দেখবে। এখন তার চোখে রাজ্যের ঘুম।
খ.
কর্কশ শব্দে টেলিফোনটা বেজে উঠল। আদিব ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল, ”হ্যালো. .. ...” অপর প্রান্তে লিন্ডার উচ্ছাস ভরা কণ্ঠ,”স্যার, রিভার্সট্রান্সক্রিপে জের পি.সিক.আর করা হয়ে গেছে, রিপোর্ট এসেছে ২২% এরপর আপনার অনুমতি না নিয়েই আর.এ টেস্ট (র্যান্ডম এটিজেন টেস্ট, ভাইরাসের উপস্থিতি নির্ণয় করার জন্য এই টেস্ট করা হয়) করে ফেলেছি। রিপোর্ট পজেটিভ!” আদিবের ঘুম পুরোপুরি চলে গেল, প্রায় চিৎকার করে বলল, ”ফাইনাল রিপর্ট কত?” ”স্যার ০.৭৩%” আদিব ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল, অনেক বেলা হয়ে গেছে ও টের পায়নি। তাই ফ্রেশ না হয়েই ল্যাবে ছুটল। দ্রুত হাতে আবার আর. এ টেস্ট করল, লিন্ডার প্রাপ্ত রেজাল্টের সাথে মিলে যাচ্ছে। এবার আদিবের মুখে এক চিলতে হাসি দেখা গেল।
বায়ো ব্যাংকে জরুরী মিটিং বসেছে। বায়ো ব্যাংকের চেয়ারম্যান বললেন, ”আমাদের ভাইরোলোজি ল্যাবের তরুন বিজ্ঞানী ড. আদিব চৌধুরী প্রায় অসম্ভব একটি কাজ খুব অল্প সময়ে করে দেখিয়েছেন। আজ আমরা এখানে উপস্থিত হয়েছি তার রিসার্চ রিপোর্ট দেখার জন্য। . .. ... মি. আদিব. .. ...” ”ধন্যবাদ। ভাইরোলোজি ল্যাবের সাথে জড়িত প্রায় সকল বিজ্ঞানী জানেন আমি HIV এর রিপ্রডাকশান নিয়ে গবেষণা করছিলাম। আমি বিভিন্ন হরমনের উপস্খিতিতে তাদের গ্রোথ কার্ভ অবাজার্ভ করে আমি নতুন এক ধরনের এনজাইম তৈরী করেছি, যা সি.ডি. ফোর এ বিশেষ ধরনের এন্টিবডি তৈরিতে সাহায্য করে। এই এন্টিবডির উপস্থিতিতে HIV এর রিপ্রডাকশান রেট পাওয়া গেছ ০.৭৩%. .. ...” মিটিং কক্ষে যেন একটা ভ্রমর উড়ে গেল। মিটিং শেষ করে আদিব তার ল্যাবে ফিরে গেল। রিপোর্ট ০.৭৩% হয়েছে বটে, কিন্তু হোস্ট সেলের ডি.এন.এ সিকোয়েন্সটা দেখা হয় নি। ডি.এন.এ সিকোয়েন্স বের করতে দিয়ে আদিব তার রুমে ফিরে গেল, ডি.এন.এ সিকোয়েন্স বের হতে বেশ সময় লাগবে। এই সময়টা ও রেস্ট করতে চায়। বিগত কয়েকদিন বেশ ধকল গেছে ওর ওপর।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ল্যাবে গেল আদিব। ডি.এন.এ সিকোয়েন্সের ব্যাকআপ নেয়া শেষ হয়েছে এমন সময় বায়োব্যাংক এর চেয়ারম্যানের ফোন এল, ”মি. আদিব শুনলাম আপনি এ কয় দিন নাকি বেশ পরিশ্রম করেছেন। রাতেও নাকি ল্যাবে ছিলেন।” ”জ্বি স্যার, ফাইনাল রিপোর্টটা নিয়ে খুব আশা বাদি ছিলামতো তাই।” ”না না না এটা ঠিক না। আপনি কাজটাতো গুছিয়ে ফেলেছেন, তো কয়েকদিনের ছুটিতে যাচ্ছেন না কেন?” আদিবও মনেমনে ছুটির কথা ভাবছিল। ”স্যার আমিও ছুটির কথা ভাবছিলাম, হোস্ট সেলের ডি.এন.এ সিকোয়েন্স বের করে কাজের ফাইনাল রিপোর্ট জমা দিয়ে আপনাকে জানাতাম।” ”বলেন কি আপনার ফাইনাল রিপোর্ট কমপ্লিট হয়নি! আমিতো কাল থেকে আপনাকে ছুটিতে পাঠিয়ে দিয়েছি।” ”কাল থেকে! কিন্তু আজকের মাঝেতো রিপোর্ট কমপ্লিট হবে না।” ”ঠিক আছে, আপনি ছুটিতে চলে যা, আপনার রিপোর্টটা লিন্ডা তৈরী করে দিবে।” আদিব বেশ অবাক হল, চেয়ারম্যান কখনও কাজ বাকি রাখতে চান না, আর এমন একটা আবিষ্কারের দ্বার প্রান্তে এসে চিফ সায়েন্টিস্টকে ছুটিতে পাঠয়ে দিলেন!!!!!!!!
২য় পর্ব
শেষ পর্ব
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে নভেম্বর, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


