আমার প্রিয় পোস্ট

টিপাইমুখ বাঁধ লাভের চেয়ে ক্ষতিই বয়ে আনবেঃ ওয়াশিংটন সেমিনারে বিষেজ্ঞদের অভিমত

২৬ শে মে, ২০০৯ রাত ৯:২৬

শেয়ারঃ
0 0 0

২৬ মে, মঙ্গলবার (আরিটএনএন)- আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি’র মেরিয়েট হোটেলে গত মঙ্গলবার (মে ১৯, ২০০৯) লং লিভ বাংলাদেশের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হল Environmental and Political Crises Looming in Bangladesh শীর্ষক সেমিনার। জনাব সৈয়দ মুক্তাদিরের উপস্থাপনায় উক্ত সেমিনারে বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন প্রকৌশলী এবং পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। বক্তাদের অভিমত , সিলেটের জাকিগঞ্জ থেকে মাত্র এক কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত বরাক নদীতে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ভারতীয় সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য চরম বিপর্যয় বয়ে আনবে।টিপাইমুখ বাঁধ ছাড়াও বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের বিগত একশ’ দিনের পারফরমেন্স এবং বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিয়েও আলোচনা হয়।


কি নোট স্পিকার ইঞ্জিনিয়ার মাহমুদ এম হোসেন টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের উপর সুদূর প্রসারী পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে আলোকপাত করেন। ইঞ্জিনিয়ার হোসেন বাংলাদেশের WAPDA’র একজন প্রধান বন্যা নিয়ন্ত্রণ কনসালট্যান্ট হিসাবে বহুদিন কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি আমেরিকার ভার্জিনিয়া প্রদেশে ভার্জিনিয়া ডিপার্টমেন্ট অফ ট্রান্সপোর্টেশনের একজন পদস্থ কর্মকর্তা। তিনি ভারত, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, এবং আমেরিকা সহ বিশ্বের অনেক দেশে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নির্মাণ (Construction) প্রজেক্টে প্রায় চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন।


ঐতিহাসিক পথ-পরিক্রমার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ার হোসেন বলেনঃ “১৯৫৪ সালে প্রথম এই বাঁধ নির্মানের বিষয় নিয়ে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয়, কিন্তু মিজরাম সরকার এবং জনগণ এ সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করে… পরবর্তীতে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার মিজোরাম সরকার এবং জনগণকে নানা কায়দা-কানুন করে রাজী করাতে সক্ষম হয়।স্থানীয় সরকার এবং জনগণকে বোঝানো হয় যে এই বাঁধ নির্মাণের ফলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুত উতপাদন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ অনেক সুফল আসবে।বলাবাহুল্য মিজোরাম ভারতের একটা অন্যতম অনুন্নত এলাকা।মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এ বাঁধ নির্মাণকে বিরোধীতা করে এসেছেন। ২০০২ সালে ভারতীয় সরকার সকল জল্পনা- কল্পনা পেরিয়ে বাঁধ নির্মাণের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।ইঞ্জিনিয়ার হোসেন বলেন, কর্মসংস্থা এবং বিদ্যুত উতপাদন সহ কিছু সুফল এলেও পরিবেশের বিপর্যয় এবং আর্থিক দুর্দশাসহ অনেক চড়া মূল্য স্থানীয় জনগনকে দিতে হবে।


কাজেই বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কি বিষয় আছে? ইঞ্জিনিয়ার হোসেনের মতে, শীতকালে এই বাঁধ দ্বারা পানি সংগ্রহ করে তা কৃষিকাজে এবং বিদ্যুত উতপাদন ব্যবহার করা হবে। ভারত স্বাভাবিক পানি প্রবাহের উপর আর আমরা নীচের দিকে। ভারত যখন স্বাভাবিক পানি প্রবাহে বাঁধা সৃষ্টি করবে এবং নিজেদের কাজে পানি ব্যবহার করবে, বাংলাদেশের জন্য পানি প্রাপ্তির পরিমাণ অনেক কমে যাবে। এর ফলে সিলেট বিভাগসহ পার্শবর্তী অনেক জেলা প্রচন্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। নদীগুলো শুকিয়ে যাবে, মাছসহ অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদকুলের সংকোচন ও ধবংস সাধন হবে। কাজেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহের নায্য হিস্যা থেকে নিশ্চিত বঞ্চিত হবে।মৎস ও কৃষিকাজের জন্য বোরাক থেকে আসা পানির উপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ। এই বাঁধ সুরমা, কুশিয়ারা নদীসহ সংলগ্ন অনেক খাল বিলকে মেরে ফেলবে। শীতকালে কৃষিকাজে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করবে, এবং প্রানী জগতের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।


মানুষের ভোগান্তির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ার হোসেন বলেন, “এই বাঁধের ফলে ১৫ কোটি জনসংখ্যার ৬-৭ ভাগ ব্যাপক বিপর্যয়ের শিকার হবে এবং তার ধারাবাহিক প্রভাব পড়বে পুরো দেশের উপর। বাজারে কৃষি এবং শিল্পের উতপাদন বিনষ্ট হবে ও জিনিষপত্রের দাম বেড়ে যাবে এবং তা সকলকে সমস্যা ফেলবে।’’ এর ফলে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যকার সম্পর্কে র্টানপোড়ন এবং ফাটল সৃষ্টি হবে। ইতি মধ্যে উত্তরাঞ্চলে প্রতিবাদ এবং মানববন্ধন শুরু হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, এই বাঁধ শুধু যে বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে তা নয়, মিজোরাম এবং মনিপুরের অনেক জনগণও চরম ক্ষতির শিকার হবে। “বাঁধ নির্মাণ কাজ চলাকালে মিজোরামের ২৭৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা ব্যবহৃত এবং ক্ষতিগ্রস্থ হবে। ২৭৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা পানিতে নিমজ্জিত থাকবে।কাজেই ভারতের মধ্যেও জনগণ চরম ক্ষতির শিকার হবে।’’


উইলিয়াম এন্ড মেরি বিশবিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সমাজ ও পরিবেশ বিজ্ঞানী ডঃ মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম টিপাইমুখ বাঁধের সম্ভাব্য সামাজিক ও পরিবেশিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন। চরম পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয় আলোচনা করতে গিয়ে ডঃ ইসলাম বলেন, এই বাঁধের ফলে সুরমা, কুশিয়ারা এবং মেঘনা সহ অনেক নদীর পর্যায়ক্রমিক মৃত্যু ঘটবে; ঠান্ডাময় আরামদায়ক আবহাওয়া পরিবর্তিত হয়ে অসহ্যকর ভ্যাপসা গরমে রূপান্তরিত হবে; নদীগুলো স্রোত না থাকায় ভরাট হবে; বর্ষার সময় ভয়াবহ বন্যা হবে, এরপর সাগরের পানি নদীতে ঢুকে লবনাক্ততা সৃষ্টি করবে। ডঃ ইসলাম বলেন, “এই বাঁধের ফলে শীতকালে সুরমা এবং কুশিয়ারা নদী শুকিয়ে যাবে; দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাণ চঞ্চল সবুজ কৃষিক্ষেত্র রূপান্তরিত হবে শুষ্কময় মরা জমিতে। এই বাঁধ ধানচাষ, অন্যান্য কৃষিকর্ম, খাবার পানি সরবরাহ এবং নাব্যতা সহ অনেক কিছুতে চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে।’’ সিলেট বিভাগ এবং ঢাকা বিভাগের কিছু অংশে অনেক হাওড়-বাওড় ও নীচু এলাকা শুকিয়ে যাবে এবং মৎস ও অন্যান্য প্রাণীকুলের ধবংস সাধিত হবে। এই বাঁধের ফলে সামাজিক প্রভাব হবে ব্যাপক।ডঃ ইসলামের মতে, “এই বাঁধ চরম বেকারত্ব, মাইগ্রেশন, এবং বস্তি জীবনের সূত্রপাত হবে।বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মূখীন হবে।’’ তিনি আরো বলেন যে, ভারত এই বাঁধকে বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রনের জন্য ‘রাজনৈতিক হাতিয়ার’ হিসাবে ব্যবহার করবে।

পরিবেশিক প্রকৌশলী এবং বুয়েট এলুমনাই এসোসিয়েশনের অফিসার ইঞ্জিনিয়ার এ. এন. এস. এম আহসান কবীর টিপাইমুখ বাঁধের ফলে নদী-নালা, খাল-বিল, মাটি, আবহাওয়া এবং মানবদেহের উপর সম্ভাব্য চরম ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন।তার মতে প্রভাবিত নদীগুলো ক্রমান্বয়ে কানমিয়াম ও আর্সেনিকের মতো মারাত্নক ভারী পদার্থ বহন করবে।এগুলোর ফলে উক্ত এলাকায় ক্যান্সার রোগ চরম আকার ধারণ করবে।


এ সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে ইঞ্জিনিয়ার হোসেন বলেন, “বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অতি জরুরী, যাতে-উভয়ের স্বার্থ রক্ষিত হয়।” অন্য বক্তারাও এর উপরে গুরুত্বারোপ করেন এবং বাংলাদেশ সরকারকে আরো তৎপর, দেশপ্রেমিক এবং দ্বায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহবান জানান।অন্যান্য পন্থার মধ্যে দেশে-বিদেশে জনমত গঠন, মানববন্ধন, পরিবেশগত সচেতনতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন পরিবেশ সংক্রান্ত ফোরামকে মবিলাইজ করা, সিয়েরা ক্লাব, গ্রীনপীচ সহ বিভিন্ন এনজিওতে লেখালেখি করা, ভারতকে রাজনৈতিক চাপে রাখা এবং সর্বশেষ আন্তর্জাতিক আদালতে কেস দেয়া।


বাংলাদেশ ওয়াচ, আমেরিকার মহাপরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ রহমান বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর এক অডিট রিপোর্ট, সমকালীন রাজনৈতিক সংকট ও বর্তমান সরকারের একশ’ দিনের পারফমেন্স নিয়ে আলোচনা করেন। ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ বলেনঃ “ বারাক ওবামা পরিবর্তনের (change) শ্লোগান নিয়ে নির্বাচিত হন এবং একশ’ দিনের পূর্বেই আমেরিকাকে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন উপহার দেন। বর্তমান বাংলাদেশ সরকারও পরিবর্তন বা দিন বদলের সনদের কথা বলে ক্ষমতায় আসে। আমরা গত একশ’ দিনে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি, কিন্তু অধিকাংশই নেতিবাচক। মনে হচ্ছে নির্বাচনে হারা মানে বেঁচে থাকার অধিকার টুকুও হারিয়ে ফেলা।” তিনি বাংলাদেশ সরকারকে যেসব বিষয় নিয়ে সমালোচনা ও নিন্দা করেন তাহলোঃ নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস এবং বন্ধ ঘোষনা, সাংবাদিক এবং প্রেসকে হয়রানী, বিচার বহির্ভূত হত্যা, এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম কানুন লঙ্ঘন।

তিনি বলেন, যদিও একটা নির্বাচিত সরকারের জন্য তিন মাস তেমন বড় সময় নয়, তারপরও যে হারে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে তাতে আমরা বড়ই উদ্বিগ্ন। কারণ সকাল দেখলেই পুরো দিন কেমন যাবে বুঝা যায় ( Morning shows the day)। আলোচনা শেষে থাকে প্রশ্নোত্তর পর্ব। সর্বশেষে Long Live Bangladesh এর মহাপরিচালক ডঃ আব্দুল মুনীম ধন্যবাদ জানিয়ে সেমিনারের ইতি টানেন।

লিংক এখানে

 

বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ২৬ শে মে, ২০০৯ রাত ১০:০৪
রাহিদুল সামান্না রকি বলেছেন: দলমত ভুল জেগে উঠ বাঙ্গালী অস্তিত রক্ষার দাবীতে
৬. ২৭ শে মে, ২০০৯ সকাল ১০:৫৭
আরাফাত রহমান বলেছেন: সরকার একটি তদন্ত কমিটি করবে, যারা খতিয়ে দেখবেন টিপাইমুখ বাধ আসলেই বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর কিনা। (#@$#$)
গালি দিতে ইচ্ছে করছিল।
টিপাইমুখ বাধ আমাদের দেশের জন্য কতটা ক্ষতিকর বর্তমান সরকারের তা বুঝতে তদন্ত কমিটি লাগবে।

 

মোট সময় লেগেছে ১.০৮৭৪ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
খবর পড়ুন, খবর জানুন
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই