somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চুপকথা : উপন্যাসের খসড়া (পর্ব ২১)

২১ শে জুলাই, ২০০৭ সকাল ১০:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১৪

মাঠে ক্রিকেট চলছে। বাংলাদেশ টেস্ট খেলছে তিন বছর ধরে, তাতে প্রথম জয়ের মুখ এখনো দেখা হয়নি। দশটি টেস্ট ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের মধ্যে কনিষ্ঠতম এবং শক্তিতে সবার চেয়ে দুর্বল। তা হোক, তবু তা আমার দল, হারতে হারতেই একদিন ঠিক উঠে দাঁড়াবে।

আমার দেশটি হয়তো খেলছে পার্থ অথবা মুলতান, কিংবা ব্রিজটাউনে। খেলা যেখানেই হোক, একটি দলের প্রত্যেকটি খেলোয়াড় বাংলা ভাষায় কথা বলে, ভাবতেও কী অহংকার! আগে তো কখনো ছিলো না! গায়ে কাঁটা দেয়। এবারে খেলাটি বাংলাদেশেই, ভারতের সঙ্গে। এই টেস্টে প্রতিপক্ষেরও একজন, অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি, বাংলাভাষী। একটি ক্রিকেট ম্যাচে বাইশজন খেলোয়াড়ের বারোজনই বাংলাভাষী। ভাবা যায়! ক্রিকেটের ইতিহাসে এই ঘটনা অভিনব। ক্রিকেটের পরিসংখ্যান বইয়ে অবশ্য এই তথ্য জায়গা পায়নি। পাওয়া উচিত নয়?

খেলা চট্টগ্রামে। দেশে থাকলে চট্টগ্রাম গিয়ে মাঠে বসে চাক্ষুষ দেখা অসম্ভব হতো না। এখানে আর কী করে দেখবো? এ দেশে ক্রিকেট খেলা দূরে থাক, জিনিসটা কী তা-ই কেউ জানে না। এরা ক্রিকেট বলতে ওই নামের পোকাটিকেই বোঝে। এখানে টিভির স্পোর্টস চ্যানেলগুলো জগতের যাবতীয় খেলা দেখায়, এমনকী গলফের জন্যে আলাদা চ্যানেল। অথচ ক্রিকেট নেই। দর্শক নেই বলে বাজার নেই, সুতরাং বাণিজ্যের সম্ভাবনাও শূন্য। পুঁজির মালিকরা বাণিজ্য চায়। স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলিতে ক্রিকেট দেখা যায় খেলাপ্রতি টাকা দিয়ে। এ দেশে বসবাস করা উৎসাহী ভারতীয় ও পাকিস্তানীরা চাঁদা তুলে দলবদ্ধ হয়ে খেলা দেখে, কিন্তু বাঙালি নিজেদের ক্রিকেট নিয়ে তেমন উৎসাহী নয়। বাংলাদেশের ক্রিকেট রাত জেগে দেখার মতো প্রেম এখনো কারো জন্মায়নি। হবে কোনো একদিন। কবে?

ভাবতে লজ্জা করে, বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ ক্রিকেটে পাকিস্তানের সমর্থক। দেশে কী অবস্থা আমার সঠিক জানা নেই, কিন্তু এ দেশে এরকমই দেখি। এমনকি, ৯৯ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের এক ম্যাচে পাকিস্তান বাংলাদেশের কাছে পরাজিত হলে অনেককে বলতে শুনেছি, পাকিস্তান ইচ্ছে করে হেরেছে। কেউ বলেছে, বাংলাদেশকে টেস্ট ক্রিকেটে অন্তর্ভুক্ত করানোর জন্যে পাকিস্তান ম্যাচটি ইচ্ছে করে ছেড়ে দিয়েছে। কী আশ্চর্য! ক্রিকেটে হোক আমাদের সামর্থ্য অল্প, কিন্তু পাকিস্তানকে এক-আধবার হারানোর সামর্থ্য আমাদের যে আছে, তা-ও মানতে পারবো না? নির্লজ্জ আত্ম-অবমাননার এর চেয়ে বড়ো উদাহরণ আর কী হয়!

আমার স্যাটেলাইট টিভির সংযোগ নেই। একা মানুষ আামি, ঘরে থাকাই কম হয়, টিভি দেখাও বড়ো একটা হয় না। আমার ভরসা ইন্টারনেট। গোটা তিনেক ক্রিকেট ওয়েবসাইট খুঁজে পেয়েছি, সেখানে ধারাভাষ্য পাওয়া যায় না, কিন্তু সচল স্কোরবোর্ড আছে। মিনিটে মিনিটে আপডেট, একটিতে প্রতি বলের আপডেটও পাওয়া যায়।

রাত জেগে স্কোর দেখছিলাম। আগের টেস্টে গো-হারা হেরেছিলো বাংলাদেশ - এক ইনিংস ও ১৪০ রানে। এই ম্যাচটিও হারবে মনে হচ্ছে। প্রথম ইনিংসে দ্রাবিড় আর গম্ভীরের সেঞ্চুরিসহ ভারত ৫৪০ রানের পাহাড় বানিয়ে রেখেছে। একেবারে অলৌকিক কিছু না হলে এই ম্যাচ বাঁচানো একরকম অসম্ভব। বাংলাদেশের ব্যাটিং সামর্থ্য নিয়ে খুব ভরসা করা চলে না। আজ তৃতীয় দিনের পুরোটা আগলে রাখতে পারলে ড্র করার একটা সম্ভাবনা অবশ্য তৈরি হয়। হবে কি? না হোক, হারলে হারবে, ভারতের মতো অভিজ্ঞ ও ভালো টীমের কাছে পরাজয়ে লজ্জা কিছু নেই। কিন্তু আমার দলটি অন্তত লড়াই করে হারুক, এইটুকুই আমার চাওয়া।

খেলা শুরু হতে হতে রাত এগারোটা। সকালে অফিসে যাওয়ার তাড়া আছে, দেরি হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে লড়াই করার চিহ্নগুলো দেখতে পাচ্ছি, জেগে বসে থাকি সেটি দেখার আশায়। ৫৪০-এর জবাবে বাংলাদেশের আগের দিন শেষ হয়েছিলো তিন উইকেটে ৫৪ করে। শুরুটি ভালো হয়নি, কিন্তু আজ সকাল থেকেই আশরাফুল ছেলেটি বুঝিয়ে দিচ্ছে লড়াই সে করবে।

বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত টেস্ট জেতেনি, কিন্তু এই ছেলেটি তিন বছর আগে ক্রিকেট রেকর্ডবুকে জায়গা করে নিয়েছে কনিষ্ঠতম সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে, জীবনের প্রথম টেস্টে। তখন তার বয়স ১৭। আশরাফুল নামটি একটু অদল-বদল করে তার নাম দেওয়া হয়েছিলো আশার ফুল! আঃ, তাই যেন হয়। আজ সে আবার আশার ফুল হয়ে ফোটার লক্ষণ দেখাচ্ছে। সাত সকালেই সে জাহির খানের দ্রুতগামী বলে একটি ছক্কা মেরে বসে। চোখে দেখা হচ্ছে না, ধারাভাষ্যও শোনার উপায় নেই, কিন্তু মনে মনে ধারাভাষ্যকারকে বলতে শুনি, আ টাওয়ারিং সিক্স! বাশারের সঙ্গে জুটি বেঁধে সে তোলে ৭০ রান। বাশারের প্রস্থানের পরে তার সঙ্গী আফতাব, আরেক তরুণ-তুর্কী। সে আর আশরাফুল ১৫৬ বলে যোগ করে আরো ১১৫। সাবাশ! এই তো চাই!

লাঞ্চের বিরতি হলো, তখন আশরাফুলের নিজস্ব সংগ্রহ ৬২। আবার খেলা শুরু হলে তার ব্যাট আগুন ঝরায়। বলা যায়, আশার ফুলগুলি ফুটে উঠতে থাকে। ১৮টি বল পরে তার রান ৭৬। উত্তেজনায় আমার স্নায়ু টান টান হয়ে থাকে, সেঞ্চুরি পাবে কি সে? পেয়ে যায় সে স্বপ্নের সেঞ্চুরি - পরম দুঃসাহসে উদ্ধত বালক ৭টি মাত্র বল খেলে ২৪ রান যোগ করে নেয়। ইরফান পাঠানকে পরপর তিনটি বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ৮৮। ৯২-এ পৌঁছে হরভজন সিংকে চার। ঠিক তার পরের বলেই আরেকটি। স্বপ্নসম্ভবের শতরান। ধারাভাষ্যকার তখন নিশ্চয়ই বলছেন, ব্রিলিয়ান্ট! ম্যাগনিফিসেন্ট!

আঃ, এই সাহস আর বীরত্বও ধরে বাঙালি!

হয়তো কিছুই নয়, তবু গর্ব হয়, কোন চোরা আনন্দে চোখের কোল ভিজে ওঠে। আমার অপ্রাপ্তির দেশের জন্যে এই তো কতো বড়ো পাওয়া! কিছু না থাক, অহংকার করার মতো ছিটেফোঁটা একটি-দুটি লড়াইয়ের সামর্থ্য দেখতে চাই। আপাতত এর চেয়ে বেশি আর কিছু চাওয়ার নেই।

রাত সাড়ে তিনটা। ঘুমাতে যাওয়া দরকার। বিছানায় শুয়েও টের পাই, শরীরের সমস্ত তন্ত্রী তখনো গর্বে ও উত্তেজনায় সজাগ। জয়ের গৌরব এই টেস্টে হবে না, জানা কথা। না হোক, আমার অহংকারে কোনো ঘাটতি তাতে হবে না। আমার দেশ মাথা তুলতে শুরু করেছে, লড়াই করতে শিখছে। এইভাবে একদিন বুক ফুলিয়ে বলার মতো কিছু একটা তারা ঘটিয়ে ফেলবে। অপেক্ষায় থাকবো। ততোদিন এইসব ছোটো ছোটো গৌরবগাথা আমার ভেতরে সঞ্চিত হতে থাক, আমি লুকিয়ে রাখবো পরম যত্নেœ ও নিঃশর্ত মমতায়।
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×