somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চুপকথা : উপন্যাসের খসড়া (পর্ব ২২)

২২ শে জুলাই, ২০০৭ সকাল ১০:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১৫

জীবনের অর্ধেকের বেশিকাল যে দেশে অতিবাহিত হলো, তা আমার দেশ নয়। হবে না কোনোদিন। নিশ্চিত জানি বলে হয়তো এই বিষয়ে আমি কিছু বেশি অনুভূতিপ্রবণ। প্রতিদিনই কোনো না কোনো একটি অনুষঙ্গ পেয়ে যাই যখন অনিবার্যভাবে মনে পড়ে যাবে, আমি এখানকার কেউ নই। অনেকদিন আগে একবার আমাদের অফিসে সিকিউরিটি অ্যালার্ম বসানোর জন্যে লোকজন এসেছে। দলনেতা লোকটি আমার টেবিলে বসে, কথায় কথায় একসময় বলে, তুমি দেখছি বেশ ভালো ইংরেজি বলো!

তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে, তাই তো, আমার কি ইংরেজি বলার কথা! কী অসম্ভব ব্যাপার! এখানকার কেউ তো নই আমি!

লোকটি হয়তো কিছু ভেবে বলেনি, তার মন্তব্যটিকে প্রশংসাসূচকভাবে নেওয়ারও সুযোগ ছিলো, হয়তো তাই সে বোঝাতে চেয়েছে। অথচ আমার মনে হয়েছিলো, কথাটির গূঢ় অর্থ আসলে এইরকম : তোমার এখানে কী চাই বাবা, কী করে কোত্থেকে এসে জুটলে তুমি, বলো তো? হিন্দি অনুবাদে মেরে আঙ্গনে মে তুমহারা কেয়া কাম হ্যায়!

এ দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্যে মানুষের আকুতির শেষ নেই। শুধু বাংলাদেশের নয়, পৃথিবীর সকল দেশের মানুষ যারা এখানে আসে, মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করাকে তারা পরম সৌভাগ্য ও মোক্ষ জ্ঞান করে থাকে। দোষের কিছু আছে বলে মনে করি না, যারা পারে তারা পারে। আমি পারিনি, নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করে পেরে উঠবো এমন ভরসা নেই। আসলে বোঝাপড়াটি করতেই অনিচ্ছুক আমি। আইনসম্মতভাবে এখানে থাকার জন্যে যতোটুকু না হলে নয়, তার বেশি কিছু আমার দরকারি মনে হয়নি। গাঢ় নীল রঙের মার্কিন পাসপোর্ট না হলে আমার কী আসে যায়? পরের দেশে আমার ভোটাধিকার দিয়ে আমি কী করবো? নাগরিকত্ব নিতে গেলে এ দেশের জন্যে নিঃশর্ত আনুগত্যের শপথ করতে হয়। তা কী করে সম্ভব বুঝতে পারি না। আমার সবুজ পাসপোর্টটি, যদিও আমার কোথাও যাওয়ার কথা নেই এবং এই পাসপোর্ট পৃথিবীর অনেক জায়গায়ই আজকাল দুর্ভোগের কারণ হচ্ছে শুনতে পাই, তবু সময়মতো আজও নবায়ন করিয়ে আনি।

চিলির কন্যা ইসাবেল আলেন্দে আমেরিকায় বসে উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকা মিলিয়ে কল্পনায় একটি দেশ বানিয়ে তাকে ইনভেনটেড কান্ট্রি নাম দিয়েছেন। আমার হয়নি। হবে না।

স্কুলে ছোটো ক্লাসে পড়ার সময় কোনো উর্দু ছবির একটি সংলাপ মানুষের মুখে খুব শুনতাম - আফসোস, ম্যায় আমরিকা মে পয়দা নেহি হুয়া! তখন ভালো করে বোঝার বয়স হয়নি, পরে ভাবলে মনে হতো, ঠাট্টার ছলেও কি এ কথা বলা চলে! একজন পাকিস্তানি আমেরিকায় জন্মায়নি বলে আক্ষেপ করলে তার দাস্য মনোবৃত্তিটিই প্রকাশ পায়। অথচ উল্টোদিকে প্রায় একই সময়ে ভারতীয় হিন্দি ছবির একটি জনপ্রিয় গান ছিলো, মেরা জুতা হ্যায় জাপানি, ইয়ে পাৎলুন ইংলিস্তানি, শ্যরপে লাল টোপি রুশি, ফিরভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি...। জাপানের পাদুকা, বৃটিশ পরিধেয়, রুশ টুপি হলে কী হয়, আমার হৃদয়টি কিন্তু ভারতীয়। হৃদয়টিকে শুদ্ধ ও একাগ্র রাখাই জরুরি।

এ দেশে আমি বাস করি দীর্ঘকাল ধরে অথচ তার জন্যে আমার কোনো টান নেই, তার ভালোমন্দে আমার কিছু এসে যায় না - এ-ও হয়তো এক ধরনের প্রবঞ্চনা। একটু কঠিনভাবে বললে, ভণ্ডামি। কিন্তু কোথায় যাবো আমি?

সোভিয়েট ইউনিয়ন ষাটের দশকের শেষভাগে চেকোশ্লাভাকিয়া দখল করে নিলে কমিউনিস্টবিরোধী চেকরা দলে দলে দেশান্তরী হতে শুরু করে। দেশত্যাগে ইচ্ছুক এইরকম একজন গেছেন সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে, যেখানে আবেদনকারীদের পছন্দের দেশে ভিসার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। আবেদনকারীকে সরকারি অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোন দেশে যেতে চান?

উত্তরে আবেদনকারী বললেন, তা তো জানি না। তবে এমন কোথাও যেতে চাই যেখানে একটু শান্তি ও স্বস্তি নিয়ে বাস করতে পারি।

সরকারি অফিসার একটি গ্লোব ধরিয়ে দিলেন আবেদনকারীর হাতে। বললেন, দেখেশুনে একটা দেশ ঠিক করে নিন।

আবেদনকারী অনেকক্ষণ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে গ্লোবটি দেখলেন। তারপর সেটি ফিরিয়ে দিয়ে সরকারি কর্মচারিটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার কাছে আর কোনো গ্লোব আছে?
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×