somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

আদিল ইবনে সোলায়মান
নিজের সম্পর্কে লেখার মত এমন স্পেশাল কিছু এখনও অর্জন করতে পারি নি। ভালো থাকুন সবাই,আর ভালো রাখুন চারপাশের সবাইকে।

আদালতের হুকুমে হত্যা করা হয়েছিল যে নির্দোষ প্রাণগুলো!

২১ শে অক্টোবর, ২০১৮ ভোর ৬:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মানুষ আইন তৈরি করেছে সমাজের ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে সীমারেখা টানতে। কোনো মানুষের ক্ষতি করে এমন কোনো কাজ যাতে কেউ না করে তার জন্য তৈরি হয়েছে বিচার ব্যবস্থা। কিন্তু ইতিহাসের এমন অসংখ্য ঘটনা আছে যেখানে বিচার ব্যবস্থা পুতুলের ন্যয় অত্যাচারী শাসকের আঙুলের ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। আবার কখনও আদালত বিচার করবার সময় পালন করেছে দুর্বল ভূমিকা, আশ্রয় নিয়ে দুর্বল যুক্তির। যত যুক্তিই থাকুক না কেন, আদালতের বিচারের মাধ্যমে যদি একজন নিরপরাধ মানুষও সাজা পায় তবে সেটা আইনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়।

যীশু খ্রিস্ট, সক্রেটিসের মত ইতিহাসে এমন জানা-অজানা অনেক মানুষ নির্দোষ হওয়া স্বত্বেও বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডের শিকার হয়েছেন। কখনও পরবর্তীতে তাদেরকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়েছে, কখনও বা সেই স্বীকারোক্তিও মিলে নি। ইতিহাস ও আইনের বিচারের পাঠ্যে উল্লেখযোগ্য এমন কিছু ঘটনা আজ তুলে ধরা হল যেখানে বিচারের মাধ্যমে সাজা দেয়া হয়েছে নিরপরাধ মানুষকে।


১: সেইন্ট কসমস ও সেইন্ট ডেমিয়ান




সেইন্ট কসমস ও সেইন্ট ডেমিয়ান

কসমস ও ডেমিয়ান নামের জমজ ভাইদ্বয়ের জন্ম হয়েছিল তৎকালীন ইজিতে, বর্তমান তুরস্কের ইয়ামুরতাইলাকে, ইংরেজি তৃতীয় শতকের কোন এক সময়ে। দুই ভাই ছিলেন ডাক্তার, শৈল্যচিকিৎসা অর্থ্যাৎ সার্জারিতে তারা সে সময় খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ইজি’র বন্দর ও উপসাগরীয় অঞ্চলে তারা কাজ করতেন। সে সময় তাদের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল কারণ তারা চিকিৎসার বিনিময়ে কোন অর্থ নিতেন নিতেন না। সালাদিনো ডাসকোলি নামক ১৫ শতকের একজন চিকিৎসকের লেখা থেকে জানা যায়, অপোপিরা নামক মধ্যযুগীয় এক ওষুধ যেটা পক্ষাঘাত সহ আরও অনেক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হত, সেটার আবিস্কারক ছিলেন কসমস ও ডেমিয়ান।



শিল্পী ফ্রা এঞ্জেলিকোর কল্পনায়, সেইন্ট কসমস ও সেইন্ট ডেমিয়ানের মৃত্যুদণ্ড



অর্থ বিনিময় ছাড়াই চিকিৎসা দেয়ার কারণে সে সময় এটা রটে গিয়েছিল যে, খ্রিস্টধর্মে লোকজনকে আকৃষ্ট করার জন্যই এই দুই ভাই মানুষের রোগ সারাতেন। অত্যাচারী সম্রাট ডায়োক্লেটিয়ান এর আমলে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের নির্দেশ দেয়া হয় চিকিৎসা থেকে বিরত থাকা ও খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করার জন্য। কসমস ও ডেমিয়ান তাদের মনোবলে অটুট থাকলেন। তারা আদেশ মানলেন না। নির্যাতন চলতে লাগল দুই ভাইয়ের উপর। ধর্মবিশ্বাস ও মানবসেবার মহৎ চিন্তা থেকে টলাতে না পেরে এক সময় আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে। তাদের ক্রুশবিদ্ধ করা হয়। এরপর পাথর ও তীর ছুঁড়ে তাদের দেহ ক্ষতবিক্ষত করে দেয়া হয়। এরপর শিরশ্ছেদ করে হত্যা করা হয় দুই ভাইকে। আনুমানিক ২৮৭ সালে এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাস ও ত্যাগের কারণে কসমস ও ডেমিয়ানকে সেইন্ট উপাধি দেয়া হয়েছে এবং আজকের পৃথিবীতে চিকিৎসকদের জন্য তারা এক মহান অনুপ্রেরণার নাম।



২: উইলিয়াম জ্যাকসন ম্যারিয়ন


১৮৭২ সালে দুই বন্ধু উইলিয়াম জ্যাকসন ম্যারিয়ন ও জন ক্যামেরন নেব্রাস্কার লিবার্টি থেকে কাজের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। কিছুদিন পর ম্যারিয়ন লিবার্টির কাছাকাছি তার শাশুড়ির বাসায় আসে, সাথে ছিল ক্যামেরনের ঘোড়াগুলো। ম্যারিওনের শাশুড়ি সন্দেহ করে সে তার বন্ধুকে মেরে ঘোড়াগুলো হাতিয়ে নিয়েছে। এরপর ম্যারিয়ন নেব্রাস্কা ছেড়ে যায়। পরের বছর নেব্রাস্কাতে একটা কঙ্কাল পাওয়া যায় যার গায়ে জড়ানো পোশাক দেখে কেউ কেউ সাক্ষ্য দেয় সেটা ক্যামেরনের লাশ বলে। ম্যারিয়নকে সন্দেহভাজন ঘোষণা করে খুঁজতে থাকে পুলিশ।



উইলিয়াম জ্যাকসন ম্যারিয়ন, মৃত্যুদণ্ডের আগের রাতে তোলা ছবি
নয় বছর পর পুলিশ খুঁজে পায় ম্যারিয়ন আছে ক্যানসাসের একটি জেলে যেখানে সে চুরির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিল। সেখান থেকে ম্যারিয়নকে নিয়ে যাওয়া হয় নেব্রাস্কাতে এবং ক্যামেরনকে হত্যার দায়ে তার বিচার শুরু হয়। দুই মাস বিচারকাজের পর একজন বিচারক তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আপিল করে ম্যারিয়ন। সে বারবার বলে ঘোড়াগুলো ক্যামেরন তার কাছে বিক্রি করে চলে গিয়েছিল এবং সে বন্ধুকে খুন করে নি। কিন্তু আপিলের পর জুরির বিচারকেরা ম্যারিয়নকে খুনি সাব্যস্ত করে আবার মৃত্যুদণ্ডই বহাল রাখে। ১৮৮৭ সালে নেব্রাস্কাতে ম্যারিয়নের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সে বছর ওমাহা ডেইলি বি নামক পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, “ম্যারিয়ন যে অপরাধী সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই এবং সেখানকার ইন্ডিয়ান এলাকাগুলোর খুনের জন্যও সে-ই দায়ী।”



ফাঁসির মঞ্চে উইলিয়াম ম্যারিয়ন

ম্যারিয়নের মৃত্যুর চার বছর পর ১৮৯১ সালে নেব্রাস্কাতে হাজির হয় জন ক্যামেরন। ফিরে আসার পর সে জানায়, তার ‘মৃতদেহ’ উদ্ধারের সময় থেকে এই প্রায় বিশ বছরে সে ঘুরে বেড়িয়েছে মেক্সিকো, আলাস্কা ও কলোরাডোতে। বিশ বছর আগে তার কোনো এক প্রেমিকার বাচ্চার পিতা হবার ‘দায়’ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে পালিয়ে গিয়েছিল। যাবার আগে ম্যারিয়নের কাছে সে তার ঘোড়াগুলো বিক্রি করে দেয় এবং ম্যারিয়নের দেয়া নোটগুলোর একটি এই বিশ বছর ধরে সে রেখে দিয়েছিল স্মৃতি হিসেবে।

১৯৮৭ সালের মার্চে ম্যারিয়নের মৃত্যুর একশ বছর পর নেব্রাস্কা স্টেট এর পক্ষ থেকে উইলিয়াম ম্যারিয়নকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। আইনের ইতিহাসে নির্দোষ মানুষের অন্যায় বিচারের ঘটনা হিসেবে ম্যারিয়নের মৃত্যুদণ্ড কুখ্যাত হয়ে আছে।



৩: জোয়ান অব আর্ক



শিল্পী জুলস ইউজিন ল্যানেভুঁ’র কল্পনায়, জোয়ান অব আর্ক

জোয়ান অব আর্ক ছিলেন ইতিহাসের এক অবিসংবাদিত যোদ্ধা। ১৮০৩ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট জোয়ান অব আর্ককে ফ্রান্সের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ঘোষণা করেন। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে ১০৬ বছর ধরে যে ‘শত বছরের যুদ্ধ’ চলেছিল, তারই একটা সময়ে জোয়ান অব আর্ক যুদ্ধ করেছিলেন ফ্রান্সের হয়ে।

জানা যায়, সেইন্ট ও অ্যাঞ্জেলদের স্বপ্নে দেখার কথা বলেছিলেন জোয়ান, যারা তাকে ষষ্ঠ চার্লসকে যুদ্ধে সহায়তা করে ইংল্যান্ডের অধীনস্ততা থেকে ফ্রান্সকে মুক্ত করতে বলেছিলেন। পুরুষের বেশ ধরে যুদ্ধে যান জোয়ান। চার্লস তাকে পাঠান অরলিন্স এ। টানা দেড় বছর ধরে ইংরেজরা যেখানে জিতে চলছিল, সেখানে জোয়ানের আগমনের মাত্র নয় দিনের মাথায় পরাজিত হয় তারা। এরপরে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে সাহসের সাথে লড়াই করে জয় নিয়ে আসেন জোয়ান। জোয়ানের খণ্ডযুদ্ধগুলো জয়ের ঘটনা প্রবল উদ্যম ছড়িয়ে দেয় ফ্রেঞ্চ বাহিনীর মধ্যে।

১৪৩০ সালের মে মাসে ইংরেজদের সহায়তাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যান জোয়ান। ইংরেজদের কাছে তাকে হস্তান্তরের পর তারা তার বিচার শুরু করে। পিয়েরে কশন নামের এক বিশপ ছিল আদালতের বিচারক। কশন জোয়ানের বিরুদ্ধে অনেকগুলো অভিযোগ আনে যার মধ্যে বড় একটি অভিযোগ ছিল জোয়ানের নারী-পুরুষ উভয়ের পোশাক পড়া! বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয় জোয়ানের। ১৪৩১ সালে জোয়ানকে যখন পুড়িয়ে মারা হয় তখন তার বয়স ছিল ১৯ বছর।



শিল্পী হারম্যান স্টাইক এর আঁকা, জোয়ান অব আর্ক এর মৃত্যুদণ্ড

১৪৫৬ সালে পোপ তৃতীয় ক্যালিক্সটাস এর নেতৃত্বে গঠিত একটি আদালতে জোয়ানকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়।



৪: ক্যামেরন টড উইলিংহাম



গ্রেফতারের পর ক্যামেরন টড উইলিংহাম

ক্যামেরন উইলিংহাম এর মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাটি আধুনিক আইনী বিচারের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত রায়গুলোর একটি। ১৯৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া ক্যামেরন উইলিংহামকে ১৯৯১ সালে টেক্সাসে নিজের বাসায় আগুন লাগিয়ে নিজের তিন কন্যাকে হত্যা করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। ১৩ বছর পর ২০০৪ সালে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

২০০৪ সালে আদালত যে তথ্য-প্রমাণের উপর ভিত্তি করে এই রায় দেন তার পক্ষে বিপক্ষে এখনও চলছে বিতর্ক। যদিও, একরকম নিশ্চিত হওয়া গেছে যে উইলিংহামের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণের জন্য যে সাক্ষ্য ও যুক্তি প্রদান করা হয়েছে, তা অত্যন্ত দুর্বল ছিল, তবুও এখন পর্যন্ত আদালতে তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে কোনো বক্তব্য দেয়া হয় নি।

শিকাগো ট্রিবিউন এর একটি নিবন্ধে ২০০৪ সালে আদালতের রায়ের সমালোচনা করে বিশ্লেষণ হাজির করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আদালতের বর্ণিত যুক্তিগুলোর পাল্টা যুক্তি হাজির করে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা।

উইলিংহামের খুনের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রধানতম যুক্তি ছিল, যে আগুন লাগানো হয়েছিল তা এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তার উত্তাপ এত বেশি ছিল যে, কোনো দাহ্য পদার্থ দিয়ে সে আগুনকে উসকে না দিলে এমন ঘটনা ঘটার কথা নয়। অর্থ্যাৎ উইলিংহাম কোনো তরল জ্বালানী ব্যবহার করে আগুনের তেজ বাড়িয়ে দিয়েছিল। আর এ মামলায় প্রধান সাক্ষী ছিল জন ওয়েব নামক একজন। ওয়েব নিজেও অন্য একটি অভিযোগে সে সময় জেলে ছিল। সে সাক্ষ্য দেয় এই বলে, উইলিংহাম তার কাছে তার মেয়েদেরকে হত্যার কথা স্বীকার করেছিল জেলে বসে। পরবর্তীতে দ্য নিউয়র্কার পত্রিকার নিকট এক সাক্ষাৎকারে জন ওয়েব বলে, মামলা চলাকালীন তাকে অনেক ওষুধ খেতে হত, এ কারণে সে ভুলও শুনতে পারে।

আদালতের রায়ের পর দশ বছর ধরে অনেক বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানী জানান, সে সময় যেভাবে আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল তার জন্য কাউকে জ্বালানী ব্যবহার করতে হবে তেমন কোনো কথা নেই, জ্বালানী ছাড়াই সেভাবে আগুন ছড়াতে পারে। অর্থ্যাৎ বিচার চলাকালীন যে বিশেষজ্ঞের মতামত অনুসারে উইলিংহাম আগুন ধরিয়েছিল বলা হয়েছে সে বিশেষজ্ঞের কথা ভুলও হতে পারে। আবার সাক্ষী জন ওয়েব মামলার প্রসিকিউটর জন জ্যাকসনের সাথে এমন একটি চুক্তি করেছিল যে উইলিংহাম এর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে তার দণ্ডাদেশ কমিয়ে দেয়া হবে, এমন একটি তথ্য অনুসন্ধান করে বের করে ‘ইনোসেন্ট প্রজেক্ট’ নামক একটি মানবাধিকার সংস্থা। অবাক করা ব্যাপার হল, মামলা চলাকালীন জেমস গ্রিগসন নামক একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ উইলিংহামকে ‘তীব্র মাত্রার সাইকোপ্যাথ’ ঘোষণা করেন কারণ তার রুমে বিখ্যাত মেটাল ব্যান্ড আয়রন মেইডেন ও লেড জ্যাপেলিন এর পোস্টার লাগানো ছিল! এমন হাস্যকর কারণে তাহলে বিশ্বের লাখ লাখ মেটাল গানের ভক্তকে এই উপাধি দেয়া যায়।

ক্যামেরন উইলিংহাম তার গ্রেফতার হবার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বারবার বলে গেছে সে নির্দোষ। দোষ স্বীকার করলে শাস্তি লঘু করা হবে, এমন প্রস্তাব দেয়ার পরেও সে স্বীকার করে নি। দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, উইলিংহাম এর মৃত্যুদণ্ড দেয়ার মত যথেষ্ট যুক্তি-প্রমাণ ছিল না। তবুও আদালত তার উপরে অর্পিত প্রাণহরণের ক্ষমতা ব্যবহার করেছে একজন নির্দোষ মানুষের উপর।



৫: সালেম শহরের ‘ডাইনি’রা



‘ডাইনি’ মেরি ওয়ালকটের বিচার চলছে

১৫ থেকে ১৮ শতকে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল ও এর উপনিবেশগুলোতে জাদুবিদ্যা ব্যবহারের কথিত অভিযোগে আদালতের বিচারের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে অনেক মানুষকে। এই সময়েরই কুখ্যাত এক বিচার ছিল ‘সালেম উইচ ট্রায়াল’ নামে পরিচিত সালেম শহরের জাদুকরদের মারার জন্য গঠিত আদালতের বিচার। সতের শতকের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনাধীন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের সালেম শহরে ২০ জন মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় যাদের অপরাধ ছিল কথিত ‘জাদুবিদ্যা’ প্রয়োগ করা। ১৬৯২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬৯৩ এর মে পর্যন্ত ১৬ মাসে আদালত যে ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড দেয় তাদের মধ্যে ছিল ১৪ জন নারী যাদের ডাইনী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল। অভিযুক্ত অবস্থাতেই আরও পাঁচজন কারাগারে মারা যায় যাদের মধ্যে দুজন ছিল দুগ্ধপোষ্য শিশু।



মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রথম ‘ডাইনি’ ব্রিজেট বিশপকে ফাঁসি দেয়া হচ্ছে

হিস্টেরিয়া আক্রান্ত হলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে নানা রকম উদ্ভট আচরণ করতে থাকে, অনেক সময় এটা গণ হিস্টেরিয়া আকারেও দেখা দিতে পারে। তেমন ঘটনাই ঘটেছিল শুরুতে। হিস্টেরিয়া আক্রান্ত দুই শিশুর আচরণের কারণ ধরতে না পেরে দোষী সাব্যস্ত করা হয় তিন নারীকে এই অভিযোগে যে, তারা ঐ শিশুদের জাদু করেছে। সেখান থেকেই শুরু। একে একে এমন অসুস্থতার জন্য যাদের বিরুদ্ধে জাদু করার অভিযোগ হল তাদেরকে বিচারের আওতায় আনতে লাগল বিশেষ আদালত। জাদুবিদ্যার ব্যাপারে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়ি তো ছিলই, সাথে সালেম শহরের অধিবাসীদের নিজেদের মধ্যকার বিরোধও এখানে ভূমিকা নেয় জাদুকরদের ধরার জন্য। শহরের অধিবাসীরা নিজেদের মধ্যে যাদের সাথে বিরোধ রয়েছে তাদেরকে জাদুকর আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করছিল।

সে সময়কার একজন মন্ত্রী কটন ম্যাথার এবং তার বাবা হার্ভার্ড কলেজের প্রেসিডেন্ট ইনক্রিস ম্যাথার এই বিচারের বিরোধিতা করেন। এক সময় দেখা গেল, এই আদালত অত্যন্ত নির্দয় আচার শুরু করেছে তখন এর প্রতি জনতার সমর্থন ধীরে ধীরে কমতে লাগল। জনসমর্থন কমতে শুরু করায় ১৬৯৩ সালে গভর্নর ফিপস এই বিশেষ আদালত বন্ধ করে দেন এবং বন্দি বাকি অভিযুক্তদের মুক্তি দেন। সালেম শহরের বিচারগুলো উপনিবেশাধীন আমেরিকার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ কারণ পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে এর প্রভাব ছিল। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, সমাজের উপর চার্চের যে উগ্র ধর্মীয় প্রভাব ও নিষ্ঠুর শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল সেটা ভেঙে যাওয়া শুরু হয়েছিল এই বিচারের পরবর্তী জনতার উপলব্ধি থেকে।

২০০১ সালে ম্যাসচুসেটসের আইন সভায় সালেম শহরের বিচারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের নির্দোষ ঘোষণা করে আইন পাস করা হয়।

পূর্বের কিছু পর্ব-
খুন ও তার পেছনের গল্প

টেড বান্ডিঃ ‘দ্য লেডি কিলার’ খ্যাত এক সিরিয়াল কিলার!!!

বেনেডিক্ট আর্নল্ড: রাজনায়ক থেকে বিশ্বাসঘাতক

বিঃদ্রঃ ছবি লেখার উৎস ইন্টারনেট।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে অক্টোবর, ২০১৮ ভোর ৬:৪২
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

¡Vamos Argentina!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:০৭

⚽ হ্যালো আর্জেন্টিনা-বিদ্বেষী গাইস!
কেমন আছেন?
আপনাদের আজাইরা তত্ত্ব- সব কি প্রস্তুত?

আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে যত ভবিষ্যদ্বাণী, যত বাজি, যাদু-টোনা, কালো যাদু, আন্ধা জ্যোতিষ বিশ্লেষণ, প্রতিটি ম্যাচের আগে স্বঘোষিত ফুটবল বিশেষজ্ঞদের ঐশী বাণী- "আজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফুটবল বিশ্ব কাপে : তারুন্যের জয় হোক !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২০ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ২:০৫


ফুটবল বিশ্ব কাপে : তারুন্যের জয় হোক !



গর্জনে ভরা গ্যালারি ওই, হঠাৎ যেন শান্ত হয়,
তারুন্যর চোখে চোখ পড়িলে, থমকে দাঁড়ায় বিশ্বময়।
সোনার ট্রফির পিছে ছুটুক, জগৎ জুড়িয়া যত লোক,
আমার জীবনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বকাপ ২০২৬ চ্যাম্পিয়ান স্পেন কে অভিনন্দন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ২০ শে জুলাই, ২০২৬ ভোর ৪:১৯


এই পুরো বিশ্বকাপের আজকের ফাইনাল ম্যাচটিই আমি শুরু থেকে দেখলাম। যোগ্য ও ভালো খেলেই স্পেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান হয়েছে। তাদেরকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। পুরো খেলাতেই স্পেন তার আধিপত্য বজায় রেখে সুন্দর... ...বাকিটুকু পড়ুন

খুশু: নামাজের প্রাণ

লিখেছেন নতুন নকিব, ২০ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:১৮

খুশু: নামাজের প্রাণ

ভূমিকা

নামাজ ইসলামের দ্বিতীয় রুকন এবং মুমিনের জীবনে আল্লাহর সাথে সরাসরি সংযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ একজন মুসলিমকে বারবার আল্লাহর সামনে দাঁড় করায়, তাকে দুনিয়ার ব্যস্ততা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বকাপ ২০২৬ঃ গোল্ডেন বল মেসিকে না দেওয়া অন্যায়, অযাচিত ও ভুল সিদ্ধান্ত

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২০ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:২০



ইদানিং, বিশ্ব ফুটবলের ক্যালকুলেশনগুলো কিছুই বুঝতেছি না। উয়েফারও না, ফিফারও।

২০২৪ ইউরোতে টুর্নামেন্টের সেরা পারফরমার ছিল লামিন ইয়ামাল। সবাই ভেবেছিল, সেই ওই টুর্নামেন্টে 'সেরা খেলোয়াড়'-এর পুরষ্কার জিতবে। কিন্তু অবাক করার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×