somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশে সংবাদপত্রের মালিকানা ও সাংবাদিকদের ভূমিকা

২৯ শে এপ্রিল, ২০২১ ভোর ৪:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


শুধু বাংলাদেশে না, পৃথিবীর প্রতিটা দেশেই সংবাদপত্রের প্রাথমিক যুগ থেকে পরবর্তী বহু বছর পর্যন্ত পত্রিকার মালিক ছিলেন সম্পাদক নিজেই। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র ‘বেঙ্গলি গেজেট'-এর মালিক ও সম্পাদক ছিলো জেমস অগাস্টাস হিকি নামে এক আইরিশ অভিবাসী। ১৭৭২ সালে সালে সে ভাগ্যের অন্বেষণে ভারতে আসে। ১৭৮০ সালের ২১শে জুন কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় এ অঞ্চলের প্রথম পত্রিকা। এরপর থেকে পরবর্তী কয়েক বছর যতগুলি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে তার সবগুলির মালিক ও সম্পাদক ছিলেন একই ব্যক্তি।

এ্যামেরিকার প্রথম সংবাদপত্র পাবলিক অকারেন্স এর -এর মালিক ও প্রকাশক ছিলেন বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন নিজেই।

ভারত ও বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সম্পাদকদের মধ্যে রামমোহন রায়, সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও মওলানা আকরাম খা'র নাম বিশেষভাবে উল্লেযোগ্য। এই ব্যক্তিরা সংবাদপত্রের মাধ্যমে নিজেদের দেশের স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার আদায়ের কথা বলেছিলেন। এজন্য তাদের অনেককেই বহু নীপিড়ণ নির্যাতন এমনকি কারাভোগও করতে হয়েছিলো।

ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনকাল থেকে শুরু করে পাকিস্তানী আমল এমনকি বাংলাদেশেও দীর্ঘ সামরিক স্বৈরাচারী ও গণতান্ত্রিক নামধারী স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে সংবাদপত্রের মালিক সম্পাদকদের উজ্জ্বল ভূমিকা আছে। এদেশের বহু পরিচিত পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে মালিক সম্পাদকদের অধীনে। এগুলির মধ্যে বিখ্যাত হচ্ছে দৈনিক আযাদ, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, সাপ্তাহিক সাংবাদিক- ইত্যাদি পত্রিকা।

বাংলাদেশে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সম্পাদকদের অধিকাংশই ছিলেন পত্রিকার মালিক নিজে। কিন্তু ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ শে ফেব্রুয়ারী বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি'র বিজয় অর্জন করার মধ্যে দিয়ে এদেশে শুরু হয় এক নতুন ধরণের স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা। গণতন্ত্রের নামে সর্বস্তরে ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সন্ত্রাস, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিরোধী মত ও সংবাদপত্রগুলিকে দমনের নীতি চালু হয়।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে আন্দোলন করা এই দেশে একের পর এক স্থাপিত হতে থাকে ইংরেজী মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভারত বিরোধীতার দাবীকারী বিএনপি সরকার দেশে চালু করে ডিশ এ্যান্টেনার, যার মাধমে প্রদর্শিত অনুষ্ঠানের ৯০% ভাগই অশ্লীল হিন্দী নাচ-গান, নাটক ও চলচ্চিত্র। এভাবে এদেশের শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের নৈতিক চরিত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বাংলাদেশকে পরিণত করা হয় ভারতীয় পণ্যের বাজারে।

পরবর্তী সরকারের আমলেও এই ধারা অব্যহত থাকে। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের এই ধ্বংসাত্বক পরিবর্তনের সাথে সাথে সংবাদপত্রের মালিকানার ক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক এক পরিবর্তন সাধিত হয়। পেশাদার ও ত্যাগী সাংবাদিকদের পরিবর্তে পত্রিকার মালিকের স্থান দখল করতে শুরু করে দুর্নীতিবাজ, দুর্বৃত্ত ও কালো টাকার মালিক ব্যবসায়ী চক্র। এদের মধ্যে কেউ কয়েল কোম্পানীর মালিক (জনকণ্ঠ), কেউ বাতি তৈরীকারী (প্রথম আলো), কেউ ভূমিদস্যু ও মদের ব্যবসায়ী (যুগান্তর,বাংলাদেশ প্রতিদিন) আবার কোনো কোনো পত্রিকা দেশী-বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা অথবা বিদেশী স্বাধীনতাকামীদের টাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে শোনা যায়।

দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ীরা নিজেদের অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ-সম্পদ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য পুলিশ, আইনজীবি ও মাস্তান পোষার মতোই পত্রিকার প্রকাশক হয় এবং প্রতি মাসে মোটা টাকা বেতন দিয়ে এসব পত্রিকায় সম্পাদক ও সাংবাদিক নামধারী ভাড়াটে কলম সন্ত্রাসী পুষতে থাকে। এর উদ্দেশ্য জনগণের সামনে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলের প্রচেষ্টা, চুরি, প্রতারণা, মিথ্যাচার ভূমিদখল, কর ফাকি, শেয়ার বাজার লুট এমনকি মানুষ হত্যাসহ বড় বড় অপরাধের অভিযোগ অন্যান্য পত্রিকায় প্রকাশিত হলে এবং মামলা হলে নিজেদের পক্ষে মিথ্যার মহাকাব্য তৈরি করা।

এছাড়া প্রতিদ্বন্দী ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন পত্রিকায় তাদের বিরুদ্ধে কোন সংবাদ প্রকাশিত হলে ভাড়াটে সাংবাদিকদের দিয়ে নিজেদের পক্ষে সংবাদ লেখার জন্য একটা মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবেই তারা পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেয়।

এইসব পত্রিকার সম্পাদক নামধারী ব্যক্তিরা টাকার বিনিময়ে মালিকদের নির্দেশ অনুযায়ী তাদের ভৃত্যের মতোই কাজ করে। তাদের নিজস্ব ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা স্বাধীন মতামত বলে কিছু থাকেনা। তাদের ভূমিকা হয় ‘জী-হুজুরের'। এই জাতীয় ভাড়াটেরা দেশের প্রতিটা প্রধান পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে চাকরী করেছেন


ভাড়াটে সম্পাদক ছাড়াও এসব পত্রিকায় কর্মরত থাকে সাংবাদিক নামধারী একশ্রেণীর ব্যক্তি যারা সম্পাদকদের চেয়েও পত্রিকার মালিকের বেশী ঘনিষ্ট। এদের একমাত্র কাজ দৈনিক মদ, টাকা ও অন্যান্য লোভনীয় সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে মালিকদের বিরুদ্ধে অন্যান্য পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের এবং সরকার কর্তৃক তার মালিক প্রভুর বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার বা অন্যকোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলে পত্রিকার পাতায় বিশাল প্রতিবেদন লেখা। কোন পত্রিকার মালিকের মদের কারখানা সরকার বন্ধ করে দিলে লেখার মাধ্যমে জনগণকে বোঝানোর টেষ্টা করা যে , ভাত, ফল, কোমলপানীয় সহ প্রায় সবধরনের খাদ্যদ্রব্যের মধ্যেই কিছুটা এ্যালকোহল আছে। তাই সামান্য এ্যালকোহলযুক্ত পানীয় বিয়ার উৎপাদনের কারখানা বন্ধ করে দেয়া সরকারের খুবই অন্যায়।

অবৈধভাবে নির্মাণের অভিযোগে কোনো দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ী পত্রিকা মালিকের ভবন বা বিপনী-বিতান রাজউক ভেঙ্গে দিলে সাংবাদিক নামধারী এইসব অর্থলোভীরা পত্রিকার প্রথম পাতার শিরোনামে লেখে, ‘রাজউক ঢাকার ৫০০০ অবৈধ ভবনের একটিও ভাঙ্গতে না পারলেও আক্রোশের বশবর্তী হয়ে শুধুমাত্র এই (আমার প্রভুর) ভবনটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।'

শেয়ার কেলেংকারী, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল, চোরাকারবার, এমনকি বসুন্ধরা গ্রুপের নিজস্ব রংমহলে ব্যবসায়িক অংশীদার প্রকৌশলী সাব্বিরকে ২০০৬ সালে হত্যার অভিযোগে সেই ব্যবসায়ী পত্রিকা মালিক বা তার ছেলেদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও এইসব সাংবাদিকরা তাদের মহান দেশ-দরদী উল্লেখ করে পত্রিকায় নিবন্ধ লেখে।

প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার যে, শুধুমাত্র সংবাদপত্রই না, এদেশের প্রায় প্রতিটা বেসরকারী টিভি চ্যানেলেরও মালিকও কোনো না কোনো দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক নেতা অথবা দুর্বৃত্ত-কালো টাকার মালিক। কারণ একটা টিভি চ্যানেল বা দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয় সেটা কোনো সৎ ব্যক্তির পক্ষে ব্যয় করা অসম্ভব। এই সুযোগে এবং অসৎদের প্রতি সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার কারণে দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরা এদেশের গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রক সেজে বসেছে।

এখানে উল্লেখ করা যায় যে বিগত বিএনপি সরকারের আমলে অনুমতি লাভ করা টিভি চ্যানেলগুলির প্রতিটার মালিক ছিলো বিএনপির'ই কোনো না কোনো নেতা অথবা ব্যবসায়ী। এনটিভি ও আরটিভি'র মালিক ছিলো ফালু, চ্যানেল ওয়ানের মালিক ছিলো তারেক রহমান ও তার দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ী বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুন, বাংলাভিশনের সাদেক খোকা, বৈশাখী টিভির মির্জা আব্বাস, ফাল্গুনী টিভির নাজমুল হুদা। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে, দলীয় ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ টিভি চ্যানেলের মালিক হতে পারেনি।

১/১/২০০৭ এ ক্ষমতা গ্রহণ করা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একমাত্র সাদেক ছাড়া এদের প্রত্যেককেই দুর্নীতির দায়ে জেলে যেতে হয়েছিলো। তখন এই টিভি চ্যানেলগুলি তাদের দুর্নীতিবাজ মালিকদের পক্ষে ক্রমাগত সংবাদ প্রচার করছিলো। এইসব দুর্নীতিবাজ অপরাধীদের দুর্নীতিবাজ স্ত্রী ও সন্তানরাও নিজস্ব টিভি চ্যানেলগুলিতে তাদের স্বামী ও পিতা নির্দোষ এবং ষড়যন্ত্রের শিকার বলে দাবী করতো। শুধু টিভি চ্যানেলই না, বিএনপি'র আমলে চালু হওয়া ‘দৈনিক আমার দেশ' পত্রিকার মালিকও ছিলো দুর্নীতিবাজ ফালু। বর্তমান সরকারের আমলেও দেখা যাচ্ছে অনুমতি লাভ করা টিভি চ্যানেলগুলির প্রতিটার মালিক কেোন না কোনো না কোনো আওয়ামী লীগ নেতা বা ব্যবসায়ী।

দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করা ও চালু রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটা কাজ। কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যাবসায় ছাড়া কোনো সম্পাদকের পক্ষেই বর্তমান সময়ে একটা দৈনিক পত্রিকা পরিচালনার ব্যয়ভার বহণ করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সরকারও কোনো সহযোগিতা করে না। এসব কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে অধিক প্রচারসংখ্যার প্রতিটা দৈনিক পত্রিকার মালিক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী।সম্পাদকদের নিজস্ব মালিকানায় প্রকাশিত একটা পত্রিকাও প্রচার সংখ্যার দিকে শীর্ষে নাই। এ স্থান দখল করেছে ব্যবসায়ী মালিকানাধীন পত্রিকার কর্মী ও সম্পাদকদের পরিচালিত পত্রিকা। ভবিষ্যতেও এ অবস্থার পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

এসব পত্রিকাগুলিতে এমন ধরণের খবর প্রথম পাতায় ছাপা হয় যা পত্রিকার শেষ পাতাতেও ছাপার যোগ্য না। যেমন পত্রিকার দুর্বৃত্ত ও দুর্নীতিবাজ মালিকের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার বা কারাদণ্ড হওয়ার খবর, তার বিদেশ গমন বা কোনো অনুষ্ঠান উদ্বোধনের খবর, তার ছেলে-মেয়ের বিয়ে বা মৃত্যুর খবর, অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সম্পর্কিত খবর এমনকি চার্লস-ডায়নার ছেলের বিয়ের খবর।

এ ধরনের অর্থহীন খবর এসব পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয় কিন্তু কোনো সাধারণ ব্যক্তির সৎ পথে জীবিকা অর্জনের প্রচেষ্টা বা কোনো ব্যাক্তির দেশপ্রেম, নৈতিকতা বা সমাজে আইন ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার কথা জানা থাকলেও ছাপানো হয় না। দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীদের লেখা মানহীন ছড়া, কবিতা ও প্রবন্ধ পত্রিকার প্রথম পাতায় গুরুত্বের সাথে ছাপানো হয়। কিন্তু বিভিন্ন বিষয়ে তরুণ লেখকদের লেখা গবেষণামূলক লেখা ছাপাতেও এইসব পত্রিকার ভাড়াটে সম্পাদকরা আগ্রহ বোধ করেন না। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে, শুধু চাকরী রক্ষার জন্যই তারা ‘জ্বী-হুজুর' নীতির অনুসারী না, তাদের কারো মধ্যেই নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শ বলেও কিছু নাই।

পত্রিকার সম্পাদকদের দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে পত্রিকায় আসা প্রতিটা লেখা মূল্যায়ন করে ব্যক্তিগত বা পেশাগত পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে ভালো লেখাটা ছাপানো। কিন্তু প্রায় কোনো পত্রিকার সম্পাদকই এই দায়িত্ব পালন করেন না।

এর মূল কারণ খুজতে গেলে দেখা যাবে, এই পত্রিকাগুলির ব্যবসায়ী মালিকরা যেমন চুরি, দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কর ফাকি, ভূমিদস্যুতা, প্রতারণা, জালিয়াতি ও মানুষ হত্যার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে, একইভাবে এসব পত্রিকাগুলির সম্পাদকরাও কেউ ধোয়া তুলসী পাতা না। এদের প্রত্যেকেই কোনো না বড় ধরণের অপকর্মের পূর্ব ইতিহাস আছে। এদের প্রত্যেকেই অতীতে কোনো একটা পত্রিকার সামান্য বেতনের কর্মচারী ছিলো। কিন্তু একটা বিষয়ে তাদের সবার মধ্যেই মিল আছে। সেটা হচ্ছে সীমাহীন অর্থলোভ। এদিক দিয়ে দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ীদের সাথে তাদের চরিত্রগত কোনো পার্থক্য নাই।

নিজেদের চেষ্টা, শ্রম ও অধ্যাবসায় ও সদিচ্ছা থাকলে তারা নিজেরাই দৈনিক পত্রিকার মালিক হতে পারতো। কিন্তু দ্রুত ধনী হওয়ার লোভেই তারা নীতি-আদর্শ বিক্রি করে দুর্বৃত্তদের ‘জ্বী হুজুরে' পরিণত হয়েছে। এর ফলাফল যে খুব ভালো হয়েছে তাও না। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে কোনো কারণে দুর্বৃত্ত পত্রিকা মালিকদের স্বার্থে আঘাত লাগলে সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকা সম্পাদককে বরখাস্ত করা বা পদত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। এদেশের দুর্বৃত্ত পত্রিকা মালিকদের একনিষ্ঠ দুই সেবক গোলাম সারোয়ার ও আবেদ খান কয়েকবার তাদের মালিকদের দ্বারা পত্রিকার সম্পাদক পদ থেতকে বরখাস্ত হয়েছেন।

ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাগুলিকে বলা হয় জাতীয় দৈনিক। কারণ এ দৈনিকগুলিতে জাতীয় সকল সমস্যা, দেশের প্রতিটা অঞ্চলের খবর এবং জাতির আশা আকাংখার কথা লেখা হয়। ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাগুলির মালিকরা ব্যবসায়ী হলেও এগুলির সম্পাদক ও সাংবাদিকরা একত্রিত হয়ে স্বাধীনভাবে একটা নীতিমালা তৈরি করতে পারতেন।

তারা মালিকপক্ষকে বলতে পারতেন যে, পত্রিকাগুলির নীতি পেশাদার সম্পাদক এবং সাংবাদিকরাই ঠিক করবে। অর্থাৎ পত্রিকাগুলিকে কোনোভাবেই দুর্বৃত্ত মালিকদের স্বার্থরক্ষার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবেনা। পত্রিকায় কোন খবর ছাপা হবে বা হবে না, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার সম্পূর্ণ অধিকার থাকবে সম্পাদক ও সাংবাদিকদের। কোনো খবর যদি মালিকের বিরুদ্ধেও যায়, তাহলে সে খবরও মন্তব্য ছাড়া পত্রিকায় ছাপতে দিতে হবে।

শেয়ার কেলেঙ্কারী, প্রতারণা, জালিয়াতি, ভূমি দখল, রংমহল তৈরি বা মানুষ হত্যার সাথে কোনো পত্রিকা মালিক বা তার ছেলেরা জড়িত বলে প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ করা যাবে। পত্রিকা মালিকরা কোনোভাবেই তাদের পত্রিকা ও সাংবাদিকদের তার ভাড়াটে কলমবাজ সন্ত্রাসী হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। অর্থাৎ সে নিজে কোনো আইনগত সমস্যায় পড়লে বা তার কোনোন অপকর্মের খবর অন্যান্য পত্রিকায় প্রকাশিত হলে কোনোসাংবাদিককে দিয়ে তার পক্ষে মিথ্যা প্রতিবেদন লেখানো যাবে না।

মালিক যেহেতু পত্রিকার অর্থ লগ্নীকারী তাই তারা শুধু পত্রিকার লাভ-ক্ষতির দিকটাই দেখবে। ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময় দিয়ে সেই পত্রিকায় বিনিয়োগ বন্ধ করে দিতে পারবে। কিন্তু পত্রিকার সংবাদ সংক্রান্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

এসব নীতিমালা গ্রহণ করা হলে শুধু যে সাংবাদিকরাই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারতেন তাই না, সম্পাদকরাও জ্বী-হুজুরের অপবাদ থেকে মুক্ত হয়ে মর্যাদা পেতেন। এর ফলে দেশ থেকেও দুর্নীতি, প্রতারণা, ভূমিদস্যুতা, জালিয়াতিসহ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলির ঘটানো অনেক অপরাধেরই অবসান হতো। কারণ দুর্বৃত্ত ও অপরাধী এইসব ব্যবসায়ীরা যদি দেখতো যে, তাদের নিজেদের পত্রিকাগুলিতেই তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে লেখা হচ্ছে তখন তারা হয় অপকর্ম ছেড়ে দিতো অথবা পত্রিকা ব্যবসা বন্ধ করে দিতো।

আর ব্যবসায়ীরা পত্রিকায় অর্থ বিনিয়োগ করা বন্ধ করলে বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকাগুলি আবারো প্রকৃত সাংবাদিকদের পরিচালনায় প্রকাশিত হতো এবং এদেশের দৈনিক পত্রিকাগুলি আবার ফিরে যেতো ১৯৫০-'৯০ সাল পর্যন্ত গৌরবের যুগে। ফলে স্বাধীন সাংবাদিকদের নিরপেক্ষ ও সচেতনতামূলক লেখা পড়ে দেশের যুবসমাজ উদ্বুদ্ধ হতো।

'৫২, '৬২, '৬৯, '৭১, এবং '৯০-এর আন্দোলনের মতো ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষা, স্বাধীনতা ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মতো গৌরবের ঘটনাগুলি আবারো ঘটতো। দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধঃপতন রোধ করা যেতো।

কিন্তু দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ী পত্রিকা মালিক এবং অর্থলোভী সম্পাদক-সাংবাদিকদের কারণে এসবের কিছুই ঘটছে না। বরং তাদের রক্ষা করার নীতি নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে এদেশের প্রতিটা প্রধান দৈনিক।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে এপ্রিল, ২০২১ ভোর ৪:২৬
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সময় নির্দেশের ক্ষেত্রে AM ও PM ব্যবহার করার রহস্য

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ দুপুর ১২:৪২

ছবি, Click This Link হতে সংগৃহীত।

সময় নির্দেশের ক্ষেত্রে AM ও PM ব্যবহার করার রহস্য

সময় নির্দেশের ক্ষেত্রে AM ও PM কেন ব্যবহার করা হয়, এর কারণটা জেনে রাখা ভালো। আমমরা অনেকেই বিষয়টি... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বপ্নের যাত্রা শুরু হলো :: পাঠাগারে বই দিয়ে সহযোগিতা করুন

লিখেছেন হাসান ইকবাল, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ বিকাল ৩:৪২

নেত্রকোণা জেলার আটপাড়া উপজেলাধীন শুনই গ্রামে আমাদের স্বপ্নযাত্রা শুরু হলো। ২৬ শে সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হলো ভবনের নির্মাণ কাজ। আশা করছি ডিসেম্বরর ২০২১ এর মধ্যে শেষ হবে আমাদের গ্রাম পাঠাগারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

গাছ-গাছালি; লতা-পাতা - ০৭

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:৫০

প্রকৃতির প্রতি আলাদা একটা টান রয়েছে আমার। ভিন্ন সময় বিভিন্ন যায়গায় বেড়াতে গিয়ে নানান হাবিজাবি ছবি আমি তুলি। তাদের মধ্যে থেকে ৫টি গাছ-গাছালি লতা-পাতার ছবি রইলো এখানে।


পানের বরজ


অন্যান্য ও আঞ্চলিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

জার্মান নির্বাচন: মার্কলের দল জয়ী হয়নি।

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:১০



গতকাল (৯/২৬/২১ ) জার্মানীর ফেডারেল সরকারের পার্লামেন্ট, 'বুন্ডেসটাগ'এর নির্বাচন হয়ে গেছে; ইহাতে বর্তমান চ্যান্সেলর মার্কেলের দল ২য় স্হান পেয়েছে। বুন্ডেসটাগ'এর সদস্য সংখ্যা ৫৯৮ জন; কিন্তু এবারের নির্বাচনের ফলাফলের... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুরুষ মানুষ সহজে কাঁদে না.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ রাত ১০:০২

"পুরুষ মানুষ সহজে কাঁদে না"... কারণ পুরুষের চোখে জল মানায় না... জন্মের পর তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হয় যতো কষ্টই হোক তোমার চোখে জল আনা যাবে না!

নারীরা হুটহাট কেঁদে উঠতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×