কাবার পাশে মসজিদুল হারামে সেদিন মানুষ আর মানুষ। ভিড় ঠেলে অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত এক বাঙালী মহিলা জায়গা খুঁজছিলেন বসার জন্য। পেয়ে গেলেন, ঝকমকা চেহারার একজন কিশোরীর পাশে একটু খানি ফাঁকা জায়গা। জায়গা প্রার্থনা করতেই স্বত:স্ফূর্ত কিশোরী একটু সরে জায়গা করে দিল। স্বাভাবিক ভদ্রতা থেকেই একটু পরের অবসরে আলাপে উদ্যোগী হলেন মহিলা।
'হুইচ কান্ট্রি আর য়ু ফ্রম?'
'বাংলাদেশ'।
'আরে বাংলাদেশ? আমিও তো বাংলাদেশ থেকে!'
উজ্জ্বল মুখে অসম বয়সী দু'জন বাঙালী, স্বদেশের মাটি থেকে অনেক দূরে, হাজার মানুষের ভিড়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে বাংলায় আলাপ জুড়ে দিলেন। তের বছরের মেয়েটা হজ্জ্বে এসেছে বৃদ্ধ নানা নানীর সাথে। বাবা মাসহ কুষ্টিয়া শহরে থাকে মেয়েটা।
অল্প কথাতেই বুঝা গেল মেয়েটা আর দশটা মেয়ের চেয়ে একটু বেশিই চটপটে, তীক্ষ্ম ধারালো বুদ্ধিমতী, স্মার্ট এবং সহজ। পট পটি মেয়েটা সাথে যখন মোটামোটি ভালই ভাব বিনিময় হয়ে গেল তখনই পিছনে বসা নানার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল মেয়েটা। মহিলা ঘুরে বসে বৃদ্ধের সাথে পরিচিত হয়ে একটু কথা বলার পরেই হঠাৎ বুড়োর চোখে পানি টলমল। বললেন হজ্জ্বে আসার বৃত্তান্ত।
পাশের চমৎকার, সুন্দর, সহজ মেয়েটা আসলে আর সবার মত সুস্থ, স্বাভাবিক না। এমনি দেখে বুঝার উপায় নেই, কিন্তু ডান পায়ের নার্ভে জন্মগত একটা সমস্যা থাকার জন্য উচ্ছ্বল মেয়েটা হাঁটতে পারে না আর সবার মত। ধরে উঠাতে হয়। অল্প কিছুক্ষন ধরে হাঁটিয়ে দিয়ে ধাতস্থ করলেই তবে ধীরে ধীরে হাঁটতে পারে সে। চাকুরিজীবি বাবা মা নিজেদের সবটুকু সম্বল দিয়ে উদ্ভ্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য মেয়েকে নিয়ে ছুটে গিয়েছেন ভারতে, ব্যাংককে, পৃথিবীর এ মাথা থেকে সে মাথা। সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মানসিক ভাবে পরিপূর্ণ মেয়েটা ভয়ংকর শারিরীক ত্রুটি নিয়ে তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে চারিদিকের জীবন্ত, চলন্ত মানুষদের।
মাস খানেক আগে এক রাতে খুব অদ্ভূত স্বপ্ন দেখেছিল ও। ও কাবা শরীফের গেলাফ ধরে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছে পা ভালো করে দিতে। আশ্চর্য, এরপরেই ও বন্ধুদের মত প্রানবন্ত হয়ে হাঁটছে, দৌড়াচ্ছে, চিৎকার করে বলছে, পৃথিবীটা আমার! আমার!!!
বাবা মাকে বলতেই বুক ফেঁটে গিয়েছে ওদের, কষ্টের টাকা জড়ো করে মেয়েকে হজ্জ্বে পাঠিয়েছেন নানা নানীর সাথে। কাবার গেলাফ ধরে একটু প্রার্থনা করার জন্য।
বলতে বলতে বৃদ্ধের গলা বুঁজে আসল। ডুকরে কেঁদে উঠে বুড়ো ক্ষনিকের পরিচয়ের মানুষটার হাত জড়িয়ে বলে, 'মা গো, ওকে আমি সাথে করে নিয়ে কাবার গেলাফ ছুঁইয়েছি। মা গো, ও ধরেছে, দোআ করেছে। সত্যিই করেছে মা।'
লোকে বলে ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়। স্বপ্ন সত্যি হলে কেমন লাগে আমি জানি না, কারণ আজ অব্দি আমার কোন স্বপ্ন সত্যি হয় নি। আমার ঘুমের স্বপ্নগুলো পরীক্ষার হলে পড়া ভুলে যাওয়া, পরিচিত মানুষদের সাথে টুকটাক কথোপকোথনে সীমাবদ্ধ। তাই এমন বিশ্বাস নিজের মধ্যে হওয়ার সুযোগ হয় নি, যে স্বপ্ন সত্যি হতে পারে। তবু, মায়ের থেকে ঘটনা শোনার পর খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে, স্বপ্নগুলো সত্যি হয়। আসলেই হয়। হর হামেশা হয়। এবারও যেন হয়, যেন হয়। আমার আন্তরিক প্রার্থনা।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ৩:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


