somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জন্মদিনের সেকাল-একাল

২৩ শে মার্চ, ২০১৩ বিকাল ৫:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাঙালী মুসলমান পরিবারে জন্ম হওয়ার সুবাদে- ঈদ, বিবাহ, খৎনা, আকিকা, কুলখানি, চল্লিশা, শবে মেরাজ, শবে বরাত, শবে কদর-সহ বিশেষ বিশেষ কিছু অনুষ্ঠান ছাড়া আমাদের আর কোন উৎসব পালনের রেওয়াজ ছিল না। আমাদের পরিবার প্রথাগত ধার্মিক হওয়ার কারণে- পহেলা বৈশাখ, নিউ ইয়ার, কেক কেটে জন্মদিন পালনকে বিধর্মীর অনুকরণ বলে, এইসব পালন করা থেকে আমাদের নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করা হত।

ছোটবেলা দেখতাম- স্থানীয় মসজিদের ইমাম-মোয়াজ্জিনকে দাওয়াত দিতে এনে কোরআন খতম, মিলাদ মাহফিল, শিরনী বিতরণ করা হত। সে উপলক্ষে কাছের, দূরের আত্মীয়দের বিপুল সমাগম হত। এই ছিল আমাদের জন্মদিন পালন। এই নিয়ম বেশিদিন স্থায়ী হয় নি। কয়েকবছর পর আমি ছাড়া আর কারো মনেই রইলো না- কবে আমার জন্মদিন, কবে আমি জন্মেছিলাম!

একটু বড় হবার পর আমি আম্মুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে কেক, মোমবাতি, বেলুন কিনতাম। তারপর চাচাতো-ফুফাতো ভাই-বোনদের নিয়ে লুকিয়ে কেক কেটে জন্মদিন পালন করতাম।
কয়েকবছর পর ফুফুরা বাসা পরিবর্তন করে দূরে চলে গেল। ভাই-বন্ধুরা চলে যাওয়ার ফলে আমি একা হয়ে পড়লাম। একা একা জন্মদিন পালন করা যায়? জন্মদিন এখন অন্তর্জালে শুধুমাত্র শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাঝে সীমাবদ্ধ।

এরপর সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। "মাছ-মাংস খাই না" এই অজুহাতে বিবাহ, খৎনা, আকিকা, কুলখানি, চল্লিশাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। এখনও যাই না। (না যাওয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। স্থান ও সময়ের অভাবে পরে লিখব।)
পরিবারের আর সবার মতো হয়ত আমিও দিনটি ভুলে যেতাম। কিন্তু ভুলতে পারিনি।

তখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়তাম। আম্মু বললেন- আজ স্কুলে যেতে হবে না। হাজাম আসবে, তোমাদের (আমি আর চাচাতো-ফুফাতো দুই ভাই) মুসলমানি (খৎনা) করা হবে।
আমি আগেই ধারণা পেয়েছিলাম মুসলমানি (খৎনা) হচ্ছে লিঙ্গের অগ্রভাগের চামড়ার বাড়তি অংশ কেটে ফেলা। আম্মুকে জিজ্ঞেস করলাম- মুসলমানি করা হবে কেন? আমি কি হিন্দু নাকি?
আম্মু বললেন- মুসলমানি হচ্ছে মুসলমানদের পরিচয়। মুসলমানি করলে হিন্দু এবং মুসলমানের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি হয়। তাই করতে হবে।
আমি বললাম- সবাই বলে আমাদের স্কুলের বাদল স্যার হিন্দু, আশরাফ স্যার মুসলমান। কিন্তু আমি তো তাদের মাঝে কোন অমিল বা পার্থক্য খুঁজে পাই না। তাদের মাঝে পার্থক্য দেখার জন্য কি বলব- স্যার আপনার প্যান্ট খুলুন, আপনি হিন্দু না মুসলমান দেখবো!
আম্মু বললেন- তোমাকে এতো বেশি বুঝতে হবে না। যাও, গোসল করে লুঙ্গী পড়ে বসে থাকো।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে বাধ্য ছেলের মতো গোসল করে লুঙ্গী পড়ে চাচাতো-ফুফাতো ভাইদের কাছে গেলাম। ওরা আমার কয়েক বছরের বড়। ওদের কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারছিলাম ওরা ভয় পাচ্ছে। কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছিলাম না, তবে অস্থির ছিলাম। প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ায় আমার মাঝে সংশয় কাজ করছিল।
চিন্তা করছিলাম- আমাদের পরিচয় যদি হয় আমরা মানুষ। তারপর ধর্ম অনুযায়ী কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান। নাম শুনেও হিন্দু-মুসলমান চেনা যায় না। তবে কেন আমাদের মাঝে এতো পার্থক্য? কাপড়ের নিচে থাকা লিঙ্গ কিভাবে আমাদের পরিচয় হবে?

হাজাম বিকেলে আসলো। সবার ছোট হওয়ার কারণে আগে আমার মুসলমানি করা হল। আমি ঐ বিষয়ে চিন্তিত থাকায়, সামান্য জ্বলুনি ছাড়া কিছু টের পাইনি। কিন্তু চাচাতো-ফুফাতো দুই ভাইয়ের চিৎকার শুনে মনে হচ্ছিল- বাড়তি চামড়ার অংশ নয়, তাদের লিঙ্গই কেটে ফেলা হয়েছে।
দিনটি ছিল ২৩শে মার্চ (সে বার জন্মদিন পালন করা হয়নি)। এইদিনটি আমাকে পরবর্তীতে প্রথাবিরোধী হতে শিখিয়েছে।

অন্তর্জালের কল্যাণে অনেকের সাথে পরিচয় হয়েছে। জাতি-গোত্র-বর্ণ ভিন্ন হলেও, কেউ ভাই, কেউ বোন, কেউ বা বন্ধুরূপে... তাদের কারণেই এই লেখা।

সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি- ২৩শে মার্চ দিনটি মনে রাখার জন্য; মনে রাখানোর জন্য।
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×