
প্রিয় অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি'র একটা কথা দিয়ে শুরু করি। তিনি তার জীবনের প্রায় শেষ দিকে এসে বলেছিলেন, "আমার জীবনে কোন উচ্চাশা নেই, উচ্চাশা থাকে লোভী মানুষের। আমি লোভী নই। আমি আনন্দে ছিলাম, আনন্দে থাকতে চাই।"
জীবনের একটা বড় অংশ কাটিয়ে দেওয়ার পর মানুষের মনে যে বোধটা তৈরি হয় তার মূল্য অবশ্যই অনেক বেশি। সাধারণত তাঁর বলা কথা ও কাজের প্রতি আমার একটা অগাধ অথচ নীরব ভাললাগা-ভালবাসা সবসময়ই কাজ করে। যথারীতি তাঁর কথাটা আমার কাছে বিশেষ মূল্যবান মনে হয়েছে। কারণ হচ্ছে, লোভের কারণেই মানুষ বেশি অপমানিত হয়েছে, হয়। কথায় বলে "লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু"। এই মৃত্যুটা যে দৈহিক মৃত্যু, তা কিন্তু নয়। এটা আত্মার মৃত্যু; বড় অর্থে মৃত্যু বলতে শাস্তি বুঝানো হয়েছে।
কিন্তু আমরা অনেক কিছুই করি যা লোভের মত দেখায়, তার পরিচয়টা কি? পরিচয় ঘাটতে গেলে অনেকক্ষেত্রে বিপত্তি ঘটে। কেন বললাম সেটাও বলছি। আমরা অনেক কিছুই করি যার আদতে কাজের ইচ্ছার অস্তিত্বে কোন প্রকার লোভের ছিটেফোঁটাও ছিল না অথচ খালি চোখে মনে হয় এটা আমরা লোভের বশে করছি। আবার এমন কিছু কাজ আমরা করে থাকি নিজ স্বার্থের জন্য তথা লোভে পড়ে কিন্তু লোভটা প্রকাশ পায় না। অর্থাৎ খালি চোখের বিচারে কতই না ভুল হয়! লোভের এপাড়-ওপাড় ভাবছি সত্য কিন্তু মানুষের প্রয়োজনটা ভাবছি কি? গুটিকয়েক লোভীর জন্য নির্লোভ ব্যক্তির প্রয়োজনটাও কিন্তু আমাদের কাছে গুরুত্ব হারায়। খুবই বিচিত্র এই জীবন। খুবই বিচিত্র এই জগৎসংসার। খুবই বিচিত্র এই সমাজ নামের বস্তুটা। আরো বেশি বিচিত্র এই সমাজের মানুষ নামের জীবশ্রেণি।
একজন সময়ের কাছে অসহায়। একজন ক্রীতদাস তার মনিবের সামনে যেমন দীন-হীন চলাফেরায় অভ্যস্ত, তেমনি একদলকে দেখা যায় সময়ের কাছে জড়সড়ভাবে বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত আর মানসিক যন্ত্রণায় জীবনযাপন করতে। আবার কিছু লোভী রাজার হালে হর-হামেশা মাটি কাঁপিয়ে পদব্রজে বের হয়। অন্যভাবে ভাবলে, এই দীনতা-হীনতা কিংবা রাজকীয় চাকচিক্যময় জীবনের যে রূপ তা কিন্তু সবসময় অর্থের দন্ডে বিচার্য নয়। এই হিশাব সামাজিক মর্যাদায়, জ্ঞানের পরিধিতে, গায়ের রঙে, বিদ্যালয়ের পরীক্ষার খাতায়, পুঁথিগত বিদ্যায়, গলার জোরে, কারুকার্যের পারদর্শিতায়, পদ-পদবীতে, রাজনৈতিক দল-বিদলে, অর্থের ঝনঝনানিতে, রোযা-পূজা পালনকারীর ধর্মের নবীর কিংবা ভগবানের সংখ্যার আধিক্যে সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য দেখা যাচ্ছে।
আমি আমার অবস্থানে বসে বুঝতেই চাই না যে, আমার দেয়া দায়িত্বটা সে পালন করার ক্ষমতা রাখে কি-না, তার সীমাবদ্ধতা আছে কি-না। আমি একবার চিন্তা করি না যে, আমি পদাধিকারবলে তার উপর বড়ত্বের অধিকার খাটিয়ে বেশি করে ফেলছি কি-না। আবার উলটো একটা বিষয়ও ঘটে। কোন বড় ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিত্ব আমাদের কাছে সহজলভ্য হলে আমরা কার কতখানি কদর করি- তা বিবেচনা করি না। আবার একই ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিত্বকে কাছে পেতে কঠিন হলে আমরাই ব্যাকুল হই।
পাঠক হয়ত ভাবছেন, কেনই হঠাৎ এমন প্রসঙ্গের অবতারণা করলাম? কারণ আছে। আমরা প্রতিনিয়ত এমন কিছু কাজ করে যাই যার দর্শক শ্রেণি আমাদেরকে নিরুৎসাহিত করে। কথা বলে করে না, বাঁকানো দৃষ্টিতে ওরা এটা করতে পারে। এমনভাবে তাকায় যেন আমি কাজ করছি না; চুরি করছি।
ব্রাজিলীয় লেখক পাওলো কোয়েলহো তার ইলেভেন মিনিটস গ্রন্থে লিখেছিলেন- "আমি তাকে ধন্যবাদ দিলাম কিন্তু মুখে কোন কথা বললাম না। সেও দিল প্রতি-ধন্যবাদ কিন্তু আওয়াজ হলো না। শুধু চোখই সক্রিয় ছিল।" ঠিক তেমনি চোখের ব্যবহারে পারদর্শী লোকদের কাছেই আমরা নিরুৎসাহিত হই। প্রসঙ্গের অবতারণা এজন্যই। একগালে না হেসে, বাকা চোখে না তাকিয়ে দেখুন ভাবুন আমরা স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকেই কাজ করি।
সত্যিই জীবন বিচিত্র, পৃথিবী বিচিত্র, সমাজ বস্তটা বিচিত্র আর বিচিত্র মনুষ্য জীব। অনেক বিষয় বুঝতে পারি, আর অনেকটা পারি না। অনেকটা না পারাই মনুষ্যত্বের ছাপ। যার সীমাবদ্ধতা নাই সে মানুষ না। কিন্তু আমরা সীমাবদ্ধতা কতটুকু বুঝি আর কতটুকু ছাড় দিতে পারছি, পারি?
জীবনটা বড় অদ্ভূত। আর ইচ্ছেগুলিও। জীবনের প্রতিটি মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে একটা গল্প। অনেকটা উপরে উঠলেই কেবল জীবনের সবটা দেখা যায়। অনেকটা ঈগলের মত। প্রতিটা বিষয়ের প্রতিটা গল্প খুব জানতে প্রয়োজন ঈগলের চোখ। আমার ঈগলের চোখ পেতে খুব ইচ্ছা করে। কিন্তু ঈগল হওয়ার ইচ্ছেটা সবার পূরণ হয় কি?
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ বিকাল ৪:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



