somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ ভুল, অনুতাপ ও ভালোবাসা

১০ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আজকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরবা? আমি রান্নাঘর থেকে মাথা বের করে আনিসকে বললাম। সে জুতোর ফিতা বাঁধতে বাঁধতেই ছোট্ট করে উত্তর দিল,
- চেষ্টা করব। আমি হেসে বললাম,
- তোমার এই চেষ্টা করব কথাটার মানে তো আমি জানি ঠিক‌ই তুমি দেরি করবে।
আনিস হেসে ফেলল তারপর অফিস ব্যাগটা কাঁধে তুলে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
- সোহা স্কুল থেকে ফিরলে হোমওয়ার্কটা দেখে দিয়ো। তানহাকে আবার বেশি মোবাইল দিয়ো না। আমি মাথা নাড়লাম।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা শোনার পর আবার রান্নাঘরে ফিরে এলাম, এইই ছিল আমাদের সংসার। খুব আহামরি কিছু না তবু যেন এক ফোঁটা স্বর্গ উদ্যান। দুই মেয়ে, দুজনের চাকরি মাস শেষে হিসাব, মাঝেমধ্যে বাইরে খাওয়া, ঈদের আগে শপিং করা, বছরে একবার কোথাও বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা এসব নিয়েই ছিল আমাদের জীবন।
আমার কখনও মনে হয়নি, এই ছকে কোথাও কোনো ফাঁক আছে। কিন্তু মানুষ বোধহয় সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা তখনই খায়, যখন সে বিশ্বাস করে সব ঠিক আছে।

ইদানীং আনিসকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছিল, আগে অফিস থেকে ফিরেই সোহাকে কোলে তুলে নিত, তানহার আঁকা ছবি দেখে বাহবা দিত। এখন দরজা খুলেই সোজা বাথরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে, খাওয়ার টেবিলে বসে ফোনটা উল্টো করে রাখে। রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কার সঙ্গে যেন কথা বলে। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম,
- কার সাথে এত কথা বলো?‌ সে ভ্রু কুঁচকে বলেছিল,
- আশ্চর্য অফিসের কাজ থাকতে পারে না? আমি আর কিছু বলিনি তবু সন্দেহ জিনিসটা বড় অদ্ভুত, একবার মনে ঢুকলে আর সহজে বের হতে চায় না, সেদিন শুক্রবার ছিল।
দুপুরে সবাই মিলে খেতে বসার প্রস্তুতি চলছে। সোহা আর তানহা টেবিলে বসে ছিল, আমি মাছ ভাজছিলাম। হঠাৎ আনিস পেছন থেকে এসে বলল,
- তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে। আমি হেসে বললাম,
- কি কথা সিরিয়াস কিছু? সে হাসল না। কেমন যেন স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
- আমি আরেকটা বিয়ে করেছি।
মুহূর্তের জন্য মনে হলো, আমি হয়তো ঠিক শুনিনি, হয়তো সে মজা করছে, হয়তো বলবে আরে বোকা বিশ্বাস করে ফেলেছ এই চেনো আমাকে, কিন্তু সে কিছুই বললো না। আমি চুলার আগুনটা বন্ধ করলাম। ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালাম আমার পায়ের তলার মাটি সরে গেছে যেন, চোখে জলে ভরে গেছে, আমি কাঁপছি থরথর করে। সে আবার বলল,
- ওর নাম নীনা, আমার অফিসে কাজ করে।
আমি কিছু বলতে পারলাম না। সে নিজেই বলে চলল,
- ও ডিভোর্সড, এখন আমার সন্তানসম্ভবা। ওর পাশে দাঁড়ানোটা আমার দায়িত্ব হয়ে গিয়েছিল।
দায়িত্ব!? শব্দটা মাথার ভেতর কয়েকবার ঘুরে ফিরে বাজল আমি শুধু ভাবছিলাম, তাহলে আমি? সোহা? তানহা? আমরা কি কখনও তার দায়িত্ব ছিলাম? আমি কিছু বললাম না, চিৎকারও করলাম না। শুধু দেখলাম, সোহা চুপচাপ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, তানহা কিছুই বুঝতে না পেরে ভাত মাখছে।

সেদিন রাতে আমাদের আর কোন কথা হয়নি। আনিস গিয়ে পাশের রুমে শুয়ে পড়লো। আমি দুই মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে অনেকক্ষণ তাদের পাশে বসে রইলাম। সোহা ঘুমের মধ্যেও আমার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে, তানহা পাশ ফিরে শুয়ে ছোট ছোট নিঃশ্বাস ফেলছে।
আমি ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, মানুষ কিভাবে এত স্বার্থপর হয়ে যায় সব আদর যত্ন ভালোবাসা মায়া মমতা সব ভুলে যায় বদলে যায়?

রাত অনেক হয়ে গেলে ঘর থেকে বের হলাম পাশের ঘরে আনিস তখনও জেগে আছে মোবাইলটা হাতে। হয়তো তার নতুন স্ত্রীকে বলছে বাসায় জানানোর কথা, হয়তো তাদের ভবিষ্যতের নানা প্ল্যান প্রোগ্রাম করছে, আমাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত অন্ধকার করে দিয়ে। আমি ধীরে ধীরে সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
- একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
সে মাথা তুলল।
- করো।
- তুমি কি অনেক দিন ধরে ওকে ভালোবাসো? অনেক দিনের সম্পর্ক তোমাদের! বিয়ে কি অনেক আগে করেছো? কত বছর ধরে আমাকে মেয়েদেরকে ভেতরে ভেতরে ঠকাচ্ছিলে বলতো দেখি? সে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল,
- ব্যাপারটা তুমি যা ভাবছো তা না। আমি হালকা হেসে ফেললাম।
অদ্ভুত ব্যাপার, মানুষ যখন উত্তর দিতে চায় না, তখন প্রায় সবাই একই কথা বলে। আনিস দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
- অফিসে একসঙ্গে কাজ করতে করতে, ও অনেক সমস্যায় ছিল ডিভোর্সের পর একা হয়ে গিয়েছিল। আমি শুধু সাহায্য করতে চেয়েছিলাম।
আমি চুপ করে শুনছি, রুমের সাদা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে। সে আবার বলল,
- তারপর, কিছু বুঝে ওঠার আগেই কিভাবে যে এত জড়িয়ে গিয়েছি! সবকিছু অন্যরকম হয়ে গেছে। আমি ধীরে ধীরে সোফার এক কোণায় বসলাম।
- আর আমি? আমাদের দুই মেয়ে? সে কোনো উত্তর দিল না।

ঘরের ভেতর অসহ্য অস্বস্তি নিয়ে নীরবতা নেমে এল, মনে হচ্ছিল ঘড়ির কাঁটার শব্দও খুব জোরে শোনা যাচ্ছে। অনেকক্ষণ পরে আমি‌ বললাম,
- তুমি কি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?‌ সে মাথা নাড়লো,
- বললো না, তোমাদের দায়িত্ব আমি অস্বীকার করব না। আমি আবারও হেসে ফেললাম। হাসিটা নিজের কাছেই অচেনা লাগছিল। দায়িত্ব!! ভালোবাসা হারিয়ে গেলে মানুষ বোধহয় দায়িত্ব শব্দটার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে।

পরদিন সকালে আমি যথারীতি অফিসে গেলাম বাসে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম সবকিছু আগের মতোই, রাস্তার জ্যাম হকারের হাঁকডাক স্কুলের ইউনিফর্ম পরা বাচ্চারা। শুধু আমার পৃথিবীটাই যেন আর আগের মতো নেই। অফিসে পৌঁছেই নাসরিন আপা বললেন,
- আলেয়া, শরীর খারাপ নাকি? আমি চমকে তাকালাম।
- কেন?
- মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে। আমি ছোট্ট করে বললাম,
- ঘুম হয়নি। তিনি আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। মানুষের একটা ভালো গুণ আছে, কিছু মানুষ বুঝে যায়, কোন সময় কোন প্রশ্ন না করা জরুরি।

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে দেখি সোহা পড়ছে তানহা রঙ পেন্সিল নিয়ে মেঝেতে ছবি আঁকছে। আমাকে দেখেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল।
- মা, দেখো আমি ফুল এঁকেছি। আমি ছবিটার দিকে তাকালাম বাঁকা একটা ফুল। তার পাশেই চারজন মানুষের ছবি। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
- এরা কারা? তানহা আঙুল দিয়ে দেখাতে লাগল।
- এইটা তুমি, এইটা বাবা, এইটা আমি, আর এইটা আপু। আমার বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড় দিয়ে উঠল। ছোট ছোট মানুষগুলো এখনও বিশ্বাস করে, তাদের ছবিতে সবাই একসঙ্গে থাকে। বড়রা বাস্তবের দেয়াল তুলে দেয়। পরদিন একজন আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করার জন্য ফোন করলাম, জানি সামনের এই পথ সহজ হবে না।

আইনজীবীর চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসার সময় বিকেলের আলোটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। আমি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিলাম
হাতে কয়েকটা ডিভোর্সের কাগজ। কাগজগুলো খুব ভারী ছিল না, কিন্তু অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, যেন পুরো ব্যর্থ একটা জীবন হাতে নিয়ে হাঁটছি।

বাসায় ফিরে দেখি আনিস এসেছে ড্রয়িংরুমে বসে সোহার গণিত দেখিয়ে দিচ্ছে, আমাকে দেখে দুজনেই তাকাল। সোহা হাসিমুখে বলল,
- মা, বাবা আজকে আগে এসেছে। আমি হাসলাম।
- ভালো।
আনিস আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছিল, আমি কোথায় গিয়েছিলাম। আমি ভেতরে ভেতরে তখনো আশায় বুক বেঁধে আছি,
কিন্তু সে বললো সে একেবারে চলে যাচ্ছে আজ, নীনার সাথে থাকবে, দুটো বড় লাগেজ তখনি চোখে পড়লো, আমি নিজেই তখন ডিভোর্সের কাগজ টা এগিয়ে দিলাম তার হাতে বললাম,
- একজন আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করে এলাম।
সে কাগজ হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
- এখনি এত দূর যাওয়ার দরকার ছিল? আমি শান্ত গলায় উত্তর দিলাম,
- এত দূর তো তুমি আগে গিয়েছ। আমি শুধু পথটা বুঝে নিলাম। কথাটা শুনে সে আর কিছু বলল না।

দিনগুলো ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল। আগে অফিস থেকে ফিরে আমি শুধু সংসারের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম, এখন নিজের জন্যও সময় বের করতে শুরু করলাম একটা চটপটে মেয়েকে রেখেছি বাচ্চাদের সাথে সব সময় থাকার জন্য। অফিসের নতুন প্রজেক্টে নাম লিখিয়েছি, রাতে সোহার পড়া দেখাই তানহাকে গল্প শোনাই, মাঝেমধ্যে সবাই মিলে ছাদে গিয়ে বসে থাকি। তানহা আকাশের দিকে তাকিয়ে একদিন জিজ্ঞেস করল,
- মা, মানুষ কষ্ট পেলে কী তারা হয়ে যায়? আমি হেসে বললাম,
- না মা।
- তাহলে?
- কষ্ট পেলে মানুষ আরও শক্ত হয়ে যায়, পাথরের মত। সোহা পাশে বসে চুপচাপ শুনছিল হঠাৎ সে আমার হাত ধরে বলল,
- মা তুমি কষ্ট পাচ্ছ?
আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। কিছু কিছু কষ্ট থাকেই। তবে সেটা নিয়ে সারাজীবন বসে থাকলে তো চলবে না।

এদিকে আনিসের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ প্রয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেল। একদিন রাতে সে ফোন করে বলল,
- নীনার শরীরটা ভালো না।‌ আমি শুধু বললাম,
- ডাক্তার দেখাও। এর বেশি কিছু বলার ছিল না, তার জীবনের দায়িত্ব সে নিজেই বেছে নিয়েছে।

মাস কয়েক পর অফিসে বার্ষিক মূল্যায়নের ফল প্রকাশ হলো।
বস আমাকে নিজের কক্ষে ডেকে বললেন,
- কনগ্র্যাচুলেশন, আলেয়া। আপনার প্রমোশন হয়েছে।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
বাসায় ফেরার পথে সোহা আর তানহার জন্য একটা ছোট কেক কিনলাম, সেদিন কোনো বিশেষ দিন ছিল না। তবু উদযাপন করতে ইচ্ছে করছিল। রাতে কেক কাটার সময় সোহা অবাক হয়ে বলল,
- আজ কী? আমি হেসে বললাম,
- আজ তোমাদের মা অফিসে প্রোমোশন পেয়েছে, তানহা হাততালি দিয়ে উঠল।
- ইয়েই!
সেই ছোট্ট হাততালির শব্দে আমার অনেক দিনের ক্লান্তি একটু কমে গেল। আমি বুঝলাম, জীবন কখনও পুরোপুরি থেমে থাকে না। একটা দরজা বন্ধ হলে, আরেকটা দরজা খুলবেই, শুধু সাহস করে সামনে হাঁটতে হয়।

পদোন্নতির পর আমাদের জীবনটা ধীরে ধীরে অন্য ছন্দে ঢুকে গেল, আগে মাসের শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে কতবার যে দুশ্চিন্তা হতো!
এখনও হিসাব করি, তবে সেই ভয়টা আর নেই। সোহাকে শহরের একটি ভালো স্কুলে ভর্তি করালাম।
তানহাও নতুন স্কুলে যেতে শুরু করল। প্রথম দিন স্কুল থেকে ফিরে তানহা দৌড়ে এসে বলল,
- মা, আমার একটা নতুন বন্ধু হয়েছে। আমি ব্যাগটা নামিয়ে রেখে হেসে বললাম,
- নাম কী?
- ওপস নাম তো মনে নেই, কাল জেনে নেব। আমি ওর গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলাম।‌ শিশুদের জীবন বড্ড সহজ।

এক সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেল, বাড়ির সামনে নেমেই দেখি সোহা আর তানহা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে, দুজনের মুখেই হাসি। আমাকে দেখেই দৌড়ে এল।
- মা, আমরা তোমার দেরি দেখে ভাবছিলাম তুমি আবার অফিসেই থেকে গেলে নাকি! আমি হেসে দুজনকে জড়িয়ে ধরলাম।
- তোমাদের রেখে আমি কি দূরে থাকতে পারি?
সোহা মাথা নাড়ল।
- কখনো না। ওর কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে গেল।

আনিস এখন আগের চেয়ে অনেক কম যোগাযোগ করে, মাসে একবার এসে মেয়েদের সঙ্গে বসে তাদের পড়ার খবর নেয় তারপর চুপচাপ চলে যায়। একদিন সোহা আমাকে জিজ্ঞেস করল,
- মা, বাবা এখন আর আমাদের সঙ্গে থাকে না কেন?
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।‌ এই প্রশ্নটার জন্য নিজেকে অনেক দিন ধরেই প্রস্তুত করছিলাম। আমি বললাম,
- সব মানুষ সব সময় একসঙ্গে থাকতে পারে না মা। কিন্তু বাবা তোমাদের বাবা হয়েই থাকবে। সোহা মাথা নিচু করে বসে রইল।‌ তারপর ধীরে ধীরে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।

কয়েক মাস পর একদিন আনিস নিজেই ফোন করল।
- আলেয়া, একটু দেখা করা যাবে? আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম,
- কী ব্যাপার?
- কিছু কথা ছিল।
আমরা একটা ছোট ক্যাফেতে দেখা করলাম। অনেক বছর আগে একবার এখানে এসেছিলাম। তখন আমরা স্বামী-স্ত্রী ছিলাম। আনিস কফির কাপের দিকে তাকিয়ে বলল,
- আমি ভালো নেই। আমি শান্ত গলায় বললাম,
- কেন? সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
- নীনার সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া হয়। সংসারটা ঠিক চলছে না।
আমি জানালার বাইরে তাকালাম, বৃষ্টির ছোট ছোট ফোঁটা কাঁচে পড়ছে। অদ্ভুতভাবে আমার ভেতরে কোনো আনন্দও হলো না, প্রতিশোধের অনুভূতিও না। শুধু মনে হলো, প্রত্যেক মানুষই নিজের কর্মের ফল একদিন না একদিন পায়। আনিস ধীরে ধীরে বলল,
- আমি অনেক ভুল করেছি তোমাদের সাথে অনেক অন্যায় করেছি আমাকে কি ক্ষমা করা যায় না? আমি তার দিকে তাকালাম।
চোখদুটো আগের মতোই আছে শুধু আত্মবিশ্বাসটা নেই। আমি মৃদু স্বরে বললাম,
- ভুল সবাই করে। কিন্তু সব ভুলের পর আগের জায়গায় ফেরা যায় না। সে মাথা নিচু করে রইল আর কিছু বলল না, আমিও পেছনে না ফিরে চলে এলাম।

সেদিন বাসায় ফিরে দেখি সোহা আর তানহা ড্রয়িংরুমে বসে হাসতে হাসতে একটা পুরোনো অ্যালবাম দেখছে।
আমাকে দেখেই সোহা বলল,
- মা, এই ছবিটা দেখো।
আমি ছবিটা হাতে নিলাম। অনেক বছরের পুরোনো ছবি। আমি, আনিস আর কোলে ছোট্ট সোহা ছবিটার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলাম। তারপর অ্যালবামটা আলতো করে বন্ধ করে দিলাম। তানহা অবাক হয়ে বলল,
- কী হলো?
আমি কিছু বললাম না। দুই মেয়ে আমার দুই পাশে এসে বসল, আমি ওদের দুজনকে জড়িয়ে ধরলাম, বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে, জানালার ফাঁক দিয়ে নরম বাতাস ঘরে ঢুকছে, হঠাৎ মনে হলো, শান্তি আসলে কারও কাছে চেয়ে পাওয়া যায় না, নিজের ভাঙা জীবন থেকে একটু একটু করে গড়ে তুলতে হয়। আর একদিন, না বুঝতেই সেই শান্তি এসে চুপচাপ বসে থাকে নিজের ঘরেই।

জীবন আবার নিজের মতো করেই চলতে লাগল। সকালে মেয়েদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, অফিস, সন্ধ্যায় বাসায় ফেরা, রাতের পড়া, সপ্তাহান্তে বাজার করা। বাইরে থেকে দেখলে আমাদের সংসারে কোনো অপূর্ণতা নেই। অথচ আমি জানি, একসময় কতটা শূন্যতা আমাকে প্রতিদিন তাড়া করতো,
একদিন অফিসে বসে ফাইল দেখছিলাম। ফোনটা কেঁপে উঠলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠল আনিসের নাম, আমি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কলটা ধরলাম।
- হ্যালো।
ওপাশে আনিসের গলা।
- ব্যস্ত আছো?
- অফিসে আছি। বলো।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
- আজকে সোহার জন্মদিন। সন্ধ্যায় যদি আসি ওদের সঙ্গে একটু সময় কাটাতে পারি? আমি শান্ত গলায় বললাম,
- তুমি ওদের বাবা। দেখা করতে চাইলে অবশ্যই আসতে পারো।
-ধন্যবাদ। আমি ফোনটা কেটে দিলাম, কেমন যেন লাগছিল। রাগ নয়, অভিমানও নয়।

সন্ধ্যায় ছোট্ট করে জন্মদিনের আয়োজন করেছিলাম। বাড়িটা বেলুন দিয়ে সাজিয়েছে তানহা আর রুমা ওদের দেখাশোনার জন্য নিয়োজিত মেয়েটা, সোহা নিজেই কেকের ওপর মোমবাতি বসিয়েছে। ডোরবেল বেজে উঠতেই তানহা দৌড়ে গেল।
- বাবা এসেছে!
আনিস হাতে কয়েকটা উপহারের প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে, মেয়েদের দেখে ওর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল, দুজনকে জড়িয়ে ধরল, অনেকক্ষণ।
আমি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।

কেক কাটা শেষ হওয়ার পর সোহা বলল,
- মা, তুমি আর বাবা একসঙ্গে একটা ছবি তোলো না? পুরো ঘরটা হঠাৎ করেই চুপ হয়ে গেল।
আনিস আমার দিকে তাকালো আমিও ওর দিকে। তিন বছর আগেও এই অনুরোধে আমরা হেসে দাঁড়াতাম। আজ পারলাম না। আমি মৃদু হেসে বললাম,
- আজ তোমরা তিনজন ছবি তোলো। সোহা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর মাথা নাড়ল। রাত হয়ে গেলে আনিস চলে যাওয়ার জন্য উঠল। দরজার কাছে এসে থেমে গেল। পেছন ফিরে বলল,
- আলেয়া।
- হ্যাঁ?
- তোমাকে একটা কথা বলব?
- বলো। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
- ধন্যবাদ।
- কিসের জন্য?
-এত কিছুর পরও আমাকে মেয়েদের থেকে দূরে সরিয়ে দাওনি বলে, আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। তারপর ধীরে বললাম,
- ওরা আমার সন্তান, আমি চাই না, আমার কষ্টের বোঝা ওদের কাঁধে চাপিয়ে দিই। আনিস মাথা নিচু করল তারপর খুব ধীরে বলল,
- নীনা আর আমার সঙ্গে নেই।‌ আমি তাকিয়ে রইলাম। সে নিজেই বলতে শুরু করল,
- প্রায় এক বছর আগে ও আমার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করেছে, আদালতে গিয়েছে আমাকে জেলে ঢুকিয়েছে তারপর ছেলেকে নিয়ে বিদেশে চলে গেছে। এখন কোথায় আছে, সেটাও ঠিকমতো জানি না।‌ কথাগুলো বলতে বলতে তার গলাটা কেঁপে উঠল। আমি একা হয়ে গেছি, আলেয়া একেবারে একা।

আমি কোনো উত্তর দিলাম না।‌ সে আবার বলল,
-আমি বুঝিনি, একটা ভুল সিদ্ধান্ত পুরো জীবনটাকে এভাবে বদলে দেবে।
আমি শান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। অনেক বছর আগে এই মানুষটার জন্য আমার কত উদ্বেগ ছিল! যতক্ষণ পর্যন্ত বাড়ি না ফিরত কতবার যে দরজা খুলে দাড়াতাম ঘড়ি দেখতাম।

সে ভাঙা গলায় বলল,
- তুমি কি আমাকে খুব ঘৃণা করো? আমি ধীরে ধীরে মাথা নাড়লাম।
-না।
সে অবাক হয়ে তাকাল। আমি বললাম,
-ঘৃণা করার সময় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।
- তাহলে?

আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে বললাম,
- তোমার জন্য আমার এখন শুধু একটা অনুভূতি হয়।
- কী অনুভূতি?
- মায়া। আনিস মাথা নিচু করে ফেলল।

আমি ধীরে ধীরে বললাম,
- যেদিন তুমি অন্য একটা সংসার গড়তে গিয়ে নিজের সংসার ভেঙেছিলে, সেদিন তুমি ভেবেছিলে জিতেছ। আজ বুঝতে পারছ, আসলে সেদিনই সব হারিয়েছিলে!?
তার চোখ বেয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়ল তারপর কাঁপা গলায় বলল,
- আর একবার, সবকিছু কি নতুন করে শুরু করা যায় না?
আমি কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তারপর খুব শান্ত গলায় বললাম,
- ভাঙা কাঁচ জোড়া লাগানো যায়, কিন্তু আগের প্রতিবিম্ব আর ফিরে আসে না। আনিস দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। আমি অনেকক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর দরজাটা আস্তে করে বন্ধ করে দিলাম।

কয়েক মাস পর একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সোহা আর তানহা রাস্তার পাশে একটি পার্কের বেঞ্চে বসে থাকা একজন মানুষকে দেখে থমকে দাঁড়াল। এলোমেলো চুল, মলিন পোশাক, চোখে ক্লান্তির ছাপ। কাছে গিয়েই দুজন একসঙ্গে বলে উঠল,
- বাবা
আনিস মাথা তুলে তাকাল। লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল। নীনার করা মামলায় জড়িয়ে চাকরি, সংসার, সব হারিয়ে আজ সে একজন উদ্বাস্তু মানুষ।
তানহা বাবার হাত ধরে বলল,
- চলো বাবা, বাড়ি চল।
দুই মেয়ে বাবাকে নিয়ে বাড়ি ফিরল। আলেয়া দরজায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে সরে দাঁড়িয়ে বলল,
- ভেতরে আসো।
সেদিন থেকে আনিস নতুন করে জীবন শুরু করল। নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে সংসারের প্রতিটি দায়িত্ব নীরবে পালন করতে লাগল আলেয়া অতীত ভুলে যায়নি, কিন্তু ক্ষমা করেছিল আনিসকে, আসলে দুর্বল মানুষের উপরে রাগ রেখে লাভ কি, সোহা ও তানহা তাদের ভালোবাসা দিয়ে ভাঙা পরিবারটাকে আবার এক সুতোয় গেঁথে ফেললো।

বহু ঝড় ঝাপটার পর তাদের বাড়িটা আবার হাসিতে ভরে উঠল। এবার সেই সুখের ভিত্তি ছিল ভালোবাসা, ছিল অনুতাপ, ক্ষমা, বিশ্বাস আর নতুন করে একে অপরকে আগলে রাখার প্রতিশ্রুতি।

(সমাপ্ত)

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:১৩
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হিসাব বিষয়ক ভাবনা

লিখেছেন করুণাধারা, ০৯ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৩



সংখ্যাওয়ালা কোনো লেখা দেখলে হিসাব ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করা আমার অভ্যাস। ইদানিং বিভিন্ন রকম সংখ্যাওয়ালা কিছু বিজ্ঞাপন সামনে আসছে, এগুলো ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপন। এসব বিজ্ঞাপনে যেসব সংখ্যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুনাফেকি নাকি Diplomatic situationship?

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ০৯ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১০


গত শনিবার (৪ জুলাই) জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় উদযাপিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক অংশীদারিত্ব আরো জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আরেকটা পদ্মা সেতু না বানিয়ে দেশ উন্নয়নের নিনজা টেকনিক!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:৪৫




আগে জানতাম উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ লাগে, চাহিদা অনুযায়ী শিল্প গড়ে ওঠে, কর্মসংস্থান তৈরি হয় - তারপর দেশের উন্নতি হয়।

কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীনতা ২.০-এ এসে উন্নয়নের সংজ্ঞাই পাল্টে গেছে।

এখন উন্নয়নের নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

৭১-কখনোই ৫০/৫৫বছরের পুরোনো কোনো ঘটনা নয় ।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:০১




৭১-হলো আমাদের বাংলাদেশের বাঙালি জাতির প্রতিদিনের এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা । ৭১ আমাদের অস্তিত্ব,একাত্তর আমাদের আত্মপরিচয়ের ইতিহাস । একাত্তর যদি মলিন বা বিলীন হয়,তখন আমি আর আমি,আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ ভুল, অনুতাপ ও ভালোবাসা

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮


আজকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরবা? আমি রান্নাঘর থেকে মাথা বের করে আনিসকে বললাম। সে জুতোর ফিতা বাঁধতে বাঁধতেই ছোট্ট করে উত্তর দিল,
- চেষ্টা করব। আমি হেসে বললাম,
- তোমার এই চেষ্টা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×