somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যত দূরে যাই

৩০ শে জুন, ২০১৮ বিকাল ৪:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এক
জনাকীর্ণ রাস্তায় হনহন করে হাঁটছে রাশেদ।
হাতে কালো একটা ব্যাগ। দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে ছুটে চলেছে সে। বিকেল চারটার মধ্যেই এই ব্যাগ পৌঁছে দেবার কথা ছিল। এখন বাজছে চারটা কুড়ি। গন্তব্যে পৌঁছতে পৌঁছতে ঘড়ির কাঁটা পাঁচটা ছুঁই ছুঁই।

একটু ভয় ভয় করছিল রাশেদের।
বড় ভাই সময়ের ব্যাপারে হেলাফেলা পছন্দ করে না। এই ব্যাপারে অবহেলা কোনোভাবেই বরদাস্ত করতে পারেন না তিনি। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়েই নাকি আজ তার এই অবস্থান। তাই সময়কে তিনি কিছুতেই নিজের চেয়ে এগিয়ে থাকতে দিতে চান না।

রাশেদ নিজেও অবশ্য সময় নিয়ে নয়ছয় করে না কখনো। সময়ের কাজ সময়ে করার সুনাম আছে তার। আজই প্রথম এর ব্যত্যয় ঘটলো।
আসলে আজ বাসা থেকে বের হতেই দেরিটা হয়েছিল। মেজাজটা খিঁচড়ে আছে তখন থেকেই।
নীলাটা কী মনে করে নিজেকে? গোয়েন্দা পুলিশ?

ঘরটাতে ঢোকার আগে চট করে একবার আশেপাশে দেখে নিল। তারপর সুড়ুৎ করে মাথাটা গলিয়ে দিলো পর্দা ঢাকা দরজার ওপারে।
বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা ছাপড়া মতো একটা ঘর। স্যাঁতস্যাঁতে গুমোট অন্ধকার ভেতরে। ঘরে ঢুকলেই তীব্র বোঁটকা একটা কটু গন্ধে ভেতরটা কেমন যেন ঘুলিয়ে আসে।
আজ অনেকদিন যাবত এই কাজে আছে রাশেদ। এই ঘরটিতে তার প্রায়ই আসা যাওয়া হয়। তবু এখনো কেন যেন এই গন্ধ আর পরিবেশটার সাথে অভ্যস্ত হয়ে পারেনি সে। ভেতরে কোথায় যেন আজো বাঁধো বাঁধো ঠেকে।

ঘরটাতে জানালা নেই কোনো। বেশ ওপরে সিলিং এর কাছাকাছি একটা জায়গায় বেড়া কেটে বানানো ছোট একটা ঘুলঘুলি। খুব সামান্যই আলো আসছে তা দিয়ে। সবসময়ই আলো আঁধারির একটা রহস্যময় আবহ ঘিরে থাকে এই ঘরে।
ঘরে ছোট বড় চারটি চৌকি পেতে রাখা। পাশে একটা চেয়ারে স্তুপ করে রাখা জামাকাপড়। সেগুলো যে অপরিষ্কার আর ব্যবহৃত তা দেখলেই বোঝা যায়। কাছে গিয়ে গন্ধ শুঁকে দেখার প্রয়োজন পড়ে না।

চেয়ারের পাশেই মেঝেতে বসে কয়েকটা ছেলে তাস খেলছে। হাই ভলিউমে চলছে টিভি। চটকদার হিন্দি গানের সুরে উদ্দাম শরীরী নৃত্য। সিগারেটের ঘন ধোঁয়া ভেসে বেড়াচ্ছে ঘরময়। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
রাশেদকে ঢুকতে দেখে দুটো ছেলে খেলা ছেড়ে এগিয়ে এলো।
বড়ভাই এর খাস লোক রাশেদ।
তাই এদের কাছে তার ভালোই পরিচিতি আছে। তবুও কখনোই খুব বেশী কথা বিনিময় হয় না। রাশেদের আপাত ভদ্রস্থ ভাবটা হয়ত এদের বিশেষ পছন্দ নয়। তাই নিজেদের গোত্রের বলে ভাবতে পারে না তাকে।

ছেলেদুটো এগিয়ে আসতেই রাশেদ এগিয়ে দিলো ব্যাগটা।
ব্যাগের ভেতরের জিনিসগুলো গম্ভীরমুখে পরীক্ষা করে দেখলো তারা। চেহারার ভাব দেখেই বোঝা গেল, সবকিছু ঠিকঠাক আছে।
বেরিয়ে আসার মুখে রাশেদ শুনতে পেল,
‘আপনের না চারটায় আওনের কথা ছিল? বস আপনার জন্য ওয়েট কইরা একটু আগে উইঠা গ্যাছে। টাইমে গ্যাঞ্জাম করবেন না। নেক্সটে সময়মত আইবেন।’

বাইরে বেরিয়ে এলো রাশেদ।
ছেলেগুলোর বলার ভঙ্গিতে মেজাজটা আরো তেঁতিয়ে উঠলো। বড়ভাই বসে ছিল শুনেও ভয়ে জান শুকিয়ে গেল। এটা নিয়ে আর ঝামেলা না হলেই হয়!
আজ নীলাটাকে দেখে নেবে সে। কেবল ওর মাথার মধ্যেই যেন রাজ্যের হাজার প্রশ্ন কিলবিল করে। আজ জেরার চোটে জেরবার হতে হয়েছে রাশেদকে।

ভেতরে ভেতরে সতর্ক হয় রাশেদ। অনেক কষ্টে অর্জন করা এই অবস্থান তার। এটাকে কিছুতেই হেলায় হারাতে দিতে পারে না সে।
এই জীবন তো তার স্বইচ্ছায় বেছে নেওয়া নয়! সে তো সাধারণ একটা জীবনই চেয়েছিল। যে জীবন মানুষের...কোনো শেয়াল কুকুরের নয়।
কিন্তু বিধাতার ইচ্ছে ছিল অন্যরকম। বিধিলিপি...যাকে কখনোই খন্ডানো যায় না।



দুই

চব্বিশ-পঁচিশ বছরের টগবগে যুবক রাশেদ।
বাবা-মা আর পাঁচ বছরের ছোট বোন নীলাকে নিয়ে মোটামুটি সুখী এক মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠেছে সে।
বাবা অধ্যাপনা করতেন এই ছোট মফস্বল শহরের একটা সরকারী কলেজে । এখানকার আলো হাওয়া পানিতে সে জীবনের রসদ খুঁজে নিয়েছে। স্বপ্ন দেখেছে উজ্বল স্বচ্ছল আগামীর।
পড়াশুনায় মেধাবী না হলেও মোটামুটি ভালো ছাত্রই ছিল রাশেদ। ভার্সিটির কোচিং করার জন্য ওরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ঢাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল। ইচ্ছে ছিল, কোনো একটা মেসে গিয়ে ঊঠবে। তারপর জান প্রাণ দিয়ে ভার্সিটির কোচিং টা করবে। কোনোমতে একবার টিকে যেতে পারলেই হলো!

খুব বেশি তো আর বাড়াবাড়ি কোনো আকাঙ্ক্ষা ছিল না!
মধ্যবিত্ত জীবন এর চেয়ে বড় কোনো স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়। যদি শেষমেষ না জোটে...! একটা ‘যদি’ সবসময়ই কীভাবে কীভাবে যেন পা হড়কিয়ে দেয়।

পড়াশুনার প্রতি ভালোবাসাটা ছিল সেই ছোটবেলা থেকেই । বীজটা কীভাবে যেন ছোটবেলাতেই বোনা হয়ে গিয়েছিল ভেতরে।

সব কিছুই চলছিল ঠিকঠাক। কোন কোচিং সেন্টারে ভর্তি হওয়া যায় খোঁজখবর নিচ্ছিল ওরা।
হঠাৎ করেই ঝড় উঠলো। প্রচণ্ড ঝড়। কালবৈশাখীর চেয়েও প্রকট তার ভয়াবহতা। ওলোটপালোট হয়ে গেল সবকিছু। এতদিনের সাজানো স...ব...কিছু!

সেদিন দুপুরবেলা অন্য দিনের চেয়ে একটু তাড়াতাড়িই বাসায় ফিরলেন রাশেদের বাবা।
ওর মা সবে রান্নাবান্না শেষ করে গোসলে ঢুকতে যাচ্ছেন। রাশেদের বাবাকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
‘কী ব্যাপার, তুমি হঠাৎ এই সময়ে?’
‘বুকটা কেমন যেন ব্যথা করছে। কলেজে থাকতে পারলাম না। এসিডিটি হতে পারে। কিছুক্ষণ রেস্ট নিলেই কমে যাবে।’

কিন্তু কমলো না ব্যথাটা।
বিকেলের মধ্যে প্রচন্ড ব্যথায় রাশেদের বাবা অস্থির হয়ে উঠলেন। ব্যথার তীব্রতায় কুঁকড়ে যেতে লাগলো শরীর। তাড়াতাড়ি একটা সিএনজি ভাড়া করে কাছেরই একটা নার্সিং হোমে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। কিন্তু তেমন কিছু আর করা গেল না!
সিভিয়ার হার্টএটাক। প্রেসার একেবারে লো হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তারের পক্ষে আর বেশি কিছু করারও ছিল না। রাত ন’টার একটু আগেই কাউকে কিছু বুঝতে দেওয়ার আগেই রাশেদের বাবা চলে গেলেন, না ফেরার দেশে।

প্রবল হতাশার আঁধারে ঢেকে গেল ওদের জীবন।
কুড়ি বছরের জীবনটাতে দায়িত্ববোধ শব্দটার সাথে তখনো পরিচয় হয়ে ওঠেনি রাশেদের। বাবার মৃত্যু তাকে সেই শব্দটার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।
ছোট বোন নীলা তখনো স্কুলের গণ্ডী পার হয়নি। রাশেদের অংশ নেওয়া হয়ে ওঠেনি কোনো ভর্তি পরীক্ষায়। পুঞ্জীভূত স্বপ্নগুলো দিয়ে একটু একটু করে সাজানো তাসের দালানটা এক ঝটকায় একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল নীচে... ভেঙ্গে গেল এক নিমেষেই।

শোকের প্রাবল্য কাটিয়ে ওঠার পরপরই বাস্তবতা নামের কঠিন সত্যটা এসে সামনে দাঁড়ালো।
রাশেদের মা ভেঙ্গে পড়লেন আগাগোড়া। বাবার সঞ্চয় বলতে ব্যাংকে জমানো সামান্য কিছু টাকা। স্বস্তি বলতে ছিল শুধু এটুকুই, বাসাটা তাদের নিজের। বাবা তার সারাজীবনের উপার্জিত অর্থ দিয়ে বাড়ির কাজে হাত দিয়েছিলেন। আজ এই চরম দুর্দিনে তাদের মাথা গোঁজার এই ঠাঁইটুকু একটা ভরসার জায়গা হয়ে উঠলো।

সংসার খরচ... নীলার পড়াশুনা...ওর নিজের একটা অবস্থান তৈরী...।
রাশেদ অন্ধকার দেখতে লাগলো চোখেমুখে। সংসারের শক্ত জোয়ালটা এসে পড়লো তার অনভ্যস্ত দূর্বল কাঁধে। কূলকিনারা খুঁজে পেল না রাশেদ।
এদিকে তার বন্ধুদের ঢাকায় যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসতে থাকে।
যাওয়ার আগের দিন দেখা করতে আসে সবাই। রাশেদের অসহায় দৃষ্টির সামনে অবশ্য বেশীক্ষণ দাঁড়াতে পারে না কেউই। পালিয়ে আসে কোনোরকমে।

দিন কিন্তু বসে থাকে না! সে ঠিকই সামনে এগিয়ে চলে তার আপন গতিতে।
কয়েকটা টিউশনী জুটিয়ে উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে থাকে রাশেদ। দিনরাতের ব্যবধানটুকুও মুছে যায় একসময়।
কিন্তু তবুও পেরে ওঠে না। ক'টা টাকাই বা আসে এসবে!
প্রবল এই দুঃসময়ে হঠাৎই একদিন দেখা হয়ে যায় সুমনের সাথে। রাশেদদের পাড়াতেই ওদের বাসা। স্কুলে একসময় সহপাঠী ছিল রাশেদের ।

ইঁচড়ে পাকা টাইপের ছেলে ছিল। পড়াশুনা করতো না। পাড়ার বখাটেদের সাথে মিশে উচ্ছন্নে গিয়েছিল একেবারে। রাশেদের সাথে যোগাযোগ ছিল না অনেকদিন।
থাকার কথাও নয়। দূর থেকে দেখা হয়ে যেত মাঝে মধ্যে।
তখন কি ওরা জানতো... ভাগ্য এভাবে আবার ওদের পথটাকে মিলিয়ে দেবে!

সুমন যেন এক পলকেই বুঝে ফেলে রাশেদের অবস্থা। আত্মবিশ্বাসী গলায় বলে,
‘চল আমার সাথে।’
রাশেদ জানে না কোথায় যেতে বলছে সুমন তাকে। তবু চুপচাপ তাকে অনুসরণ করে।

অজানা এক জগতের সন্ধান দেয় সুমন।
রাশেদের মনোবল আর আত্মবিশ্বাস তখন শুন্যের কোঠায়। তবু অনেক গভীরে প্রোত্থিত নৈতিকতা নামক বস্তুটার তখনো সমাধি ঘটেনি।
কিন্তু তার অবস্থা তখন ঝড়ের কবলে পড়া চারাগাছের মতো। সুমনের কথার মারপ্যাঁচ আর যুক্তির তোড়ে বেশীক্ষণ টিকে থাকতে পারে না রাশেদ। একসময় ধবসে পড়ে ওর নুয়ে পড়া ব্যক্তিত্ব।

সুমনই ওকে পরিচয় করিয়ে দেয় বড়ভাইয়ের সাথে।
ওদের মফস্বল শহরের প্রভাবশালী এক ঘেরাটোপের বাসিন্দা। কোনো এক রাজনৈতিক দলের সক্রিয় অঙ্গসংগঠনের সাথে জড়িত। ওদের ছোট শহরটিতে তার ব্যাপক প্রভাব প্রতিপত্তি। নানারকম ব্যবসা আর রাজনৈতিক সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ।

রাশেদ তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে খুব অল্পসময়েই নিজের অবস্থান তৈরি করে নেয়। একসময় সে বড় ভাইয়ের ডান হাতে পরিণত হয়।
প্রথম দিকে রাশেদকে ছোটখাট কাজ দেওয়া হতো।
এসব কাজের মধ্য দিয়ে বড়ভাই তার পারঙ্গমতা যাচাই করে নেয়। অন্যরা যা করতে নানারকম ভুলত্রুটি করতো, রাশেদ তা খুব সহজেই কোনোরকম ত্রুটি বিচ্যুতি ছাড়াই করে ফেলে।
দিনে দিনে গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। বড় বড় কাজ আসতে থাকে... বড় পার্টিকে ম্যানেজ করতে বিভিন্ন জায়গায় তাকে পাঠানো হয়। একই সাথে চড়তে থাকে তার পারিশ্রমিকের অঙ্ক।

লক্ষ্যনীয় পরিবর্তন আসে রাশেদের জীবনধারায়।
দামী শার্ট প্যান্ট...স্টাইলিশ জুতো সানগ্লাস। প্রতি মাসে মায়ের হাতে গুঁজে দেয় মোটা অঙ্কের টাকা।
রাশেদের সহজ সরল মা এই হঠাৎ উত্থানের কারণ বুঝতে পারে না। রাশেদ তাকে সত্যি মিথ্যা মিলিয়ে অনেক গল্প শোনায়। জানায় সে ঠিকাদারি করছে। ভালো কিছু কন্ট্যাক্ট পেয়েছে। এখন থেকে সংসারের খরচের ব্যাপারে চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নেই।

পড়াশুনার সাথে রাশেদের সম্পর্ক চুকেবুকে গেলেও নীলার পড়াশুনায় কোনো ছেদ পড়লো না।
মেধাবী ছাত্রী নীলা বেশ সাফল্যের সাথেই এইচ,এস,সি পাশ করে। কিন্তু ভাইয়ের এই হঠাৎ পেয়ে যাওয়া অর্থযোগে সে ঠিকই রহস্যের গন্ধ খুঁজে পায়।
অজস্র প্রশ্ন দেখা দেয় তার মনে। প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে তোলে ভাইকে।
‘কিসের ঠিকাদারী করছিস? লাইসেন্স কোথায় পেলি? এত তাড়াতাড়ি এত কন্ট্যাক্ট পেলি কিভাবে?’ প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন।

অসহায় বোধ করতে থাকে রাশেদ। জবাব জড়িয়ে যায়। সামান্য সত্যের গায়ে মিশিয়ে রাখা ভয়ংকর মিথ্যাগুলো নির্লজ্জভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ে।
আস্তে আস্তে সে ধরা পড়ে যেতে থাকে নীলার কাছে।

নীলাকে একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি করে দিয়েছিল রাশেদ। ঢাকায় পাঠাতে চেয়েছিল, নীলা রাজি হয়নি। মাকে ছেড়ে যেতে সে রাজী নয়। জোর করেনি রাশেদ।
প্রত্যেকের জীবনেই তার নিজস্ব কিছু মতামত থাকে। সেগুলোকে বেশি ঘাঁটাতে নেই।
সেও যেমন নীলার শত অনুরোধেও আর পড়াশুনার পথে পা বাড়ায়নি। নাঃ! ঐ কাজ আর হবে না তাকে দিয়ে! যে জীবন সে বেছে নিয়েছে সেখানে পড়াশুনা শব্দটা কেমন যেন বেমানান ঠেকে।

এক বিকেলের কথা।
বাসায় ফেরার পথে রাশেদের চোখে পড়লো নীলা কোচিং থেকে ফিরছে। উঠতি মাস্তান গোছের কিছু ছেলে বসে আছে মোড়ের কাছে। নতমুখে তাদের পাশ কাটিয়ে যায় নীলা।
নীলাকে দেখে ছেলেগুলো চটুল হাসি ঠাট্টায় মেতে ঊঠে। রাশেদকে দেখতে পায় নি তারা ।
ছেলেগুলোকে অচেনা লাগে রাশেদের কাছে। নূতন দেখছে পাড়ায়। হয়তো এই পাড়ার নয়। অন্য কোনো পাড়া থেকে এখানে আড্ডা মারতে এসেছে।
এক পাড়ার রসদ ফুরিয়ে গেলে অনেকসময় অন্য পাড়ায় হানা দিতে হয় এদের।

সামনে এগিয়ে যায় রাশেদ।
ছেলেগুলোর অবশ্য কোনো ভাবান্তর হয় না তাকে দেখে।
রাশেদকে দেখে নীলা থমকে দাঁড়িয়েছিল। মনে ভয় হচ্ছিলো, ভাইয়া কোনো গ্যাঞ্জাম বাঁধিয়ে বসবে না তো এদের সাথে!
রাশেদ নীলাকে বলে, ‘তুই বাড়ি যা...আমি আসছি।’ তারপর ছেলেগুলোর দিকে ঘুরে বলে,
‘কোন পাড়ার তোমরা? আগে তো দেখিনি এখানে!’

ছেলেগুলো কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলছিল। পাশের দোকানে বসে থাকা দুটি ছেলে এগিয়ে এসে তাদের কানে কানে কিছু বলতেই থেমে যায় তারা।
কাঁচুমাচু মুখে একটিও কথা না বলে সটকে পড়ে সেখান থেকে। যাওয়ার সময়ে একটা সেলাম ঠুকতেও ভুল করে না।


একটু দূরে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখে নীলা।
তার আর বুঝতে বাকি থাকে না, পিঠাপিঠি বেড়ে ওঠা অনেক চেনা ভাইটা আর আগের মতো নেই। বদলে গেছে।
শুধু কতটা বদলেছে...এটাই জানতে হবে!



তিন

পরদিন সকালে রাশেদ বেরিয়ে যাওয়ার পর নীলা এসে তার ঘরে ঢোকে।
ভাই এর ঘর গোছগাছ করতে প্রতিদিনই এই ঘরে ঢুকতে হয় তাকে। কিন্তু আজ এসেছে অন্য উদ্দেশ্যে। কারো উপস্থিতিতে এই কাজ করা সম্ভব নয়।
বিছানা বালিশ তোশক আলমারি... সব তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকে নীলা।
কী খুঁজছে সে জানে না। মনের একটা অংশ বলছে, কিছু একটা সে পাবেই। আরেকটা অংশ বলছে, কিছুই যেন না থাকে এই ঘরে।

সেই ছোটবেলা থেকে পিঠাপিঠি বেড়ে ওঠা দুই ভাই-বোন ওরা।
সুখ-দুঃখ হাসি-কান্না সব একসাথে ভাগাভাগি করে নেওয়া। তারপর...বাবার মৃত্যু...ভাইয়ের কাঁধে ভর করে উঠে দাঁড়ানো...নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখা।
অথচ ভাইয়ের পরিবর্তিত চালচলন, অকস্যাৎ অনেক অর্থপ্রাপ্তি...না চাইলেও অনেক প্রশ্নের উদ্রেক করেছে নীলার মনে।
নীলা জানে... এটুকু বোঝার তার দিব্যি বয়স হয়েছে যে এই অর্থপ্রাপ্তি খুব সরলপথে ঘটতে পারে না। এর পেছনের গল্পটা নিশ্চয়ই অন্যরকম।


ভারী তোশকটা একটু উঁচু করতেই ভেতরে একটা কালো পলিথিনের ব্যাগ চোখে পড়ে। সেই ব্যাগের মধ্যে ছোট ছোট কিছু প্লাস্টিকের প্যাকেট।
প্যাকেটগুলো নেড়ে চেড়ে গন্ধ শুঁকে নীলা। তীব্র ঝাঁঝালো নেশা ধরানো গন্ধ। শরীরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে নীলার। ড্রাগস নয় তো?
এই তাহলে ভাইয়ার ঠিকাদারী ব্যবসা!

প্যাকেটগুলো জায়গামতো রেখে দিয়ে ঝিম মেরে বসে থাকে নীলা। চিন্তাগুলো অগোছালো হয়ে আসে। জট পাকিয়ে যায় অনবরত।
কী করবে...কী করা উচিত...কাকে বলবে...কিচ্ছু বুঝতে পারে না সে।
মধ্যবিত্ত সুকুমার আদর্শের লালিত্যে বেড়ে ওঠা জীবন ওদের। জীবনের কঠোর প্রতিকূলতার কামড় কতটা কদর্য হতে পারে...জানা ছিল না কখনো।
তবু অবুঝ প্রশ্নটা ক্রমাগত বিদ্ধ করতে থাকে নীলাকে।
আর কি কোনোই রাস্তা খোলা ছিল না ভাইয়ার!
হয়তো ছিল...হয়তো ছিল না। আর কীই বা যায় আসে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়ে?




চার

পরদিন রাতে সুমনের কাছ থেকে জরুরি খবর পায় রাশেদ।
বড়ভাই তলব করেছে তাকে। এখুনি যেতে বলেছে।
ছুটে যায় রাশেদ। বড়ভাই সচরাচর নিজে ডেকে পাঠায় না। খুব বেশি দরকারেও অন্য কারো মারফত জানিয়ে দেয়। আজ হঠাৎ কী এমন প্রয়োজন পড়লো!

ঘরে ঢুকতেই কেমন ভড়কে যায় রাশেদ। ওর এ’কদিনের অভিজ্ঞতাই বলে দিচ্ছে, পরিস্থিতি খুব বেশি স্বাভাবিক নয়। ঘরের পরিবেশ অন্যরকম থমথমে।
রাশেদ ভয়ে ভয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
বড়ভাই চোখ তুলে একবার আপদমস্তক তাকে দেখে নিয়ে বলে,
‘তর বোন কেমনে আমাগো সব খবর পাইলো?’

ঘরের মধ্যে যেন বজ্রপাত হয়!
এখানে আসা অব্দি অনেক কথা উঁকি দিচ্ছিলো রাশেদের মনে। কিন্তু এই প্রশ্নের জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। উদ্রান্ত চোখে তাকিয়ে তাকে রাশেদ।
বড়ভাইয়ের বজ্র কঠিন আওয়াজ ধাক্কা মেরে আবার ফিরিয়ে আনে তাকে।

‘তর বোন তো থানায় গেছিলো! একটু আগে ওসি সাব ফোন দিয়া জানাইলো!’
বড়ভাই বলতে থাকে থেমে থেমে,
‘দেখ। তরে আমি আলাদা নজরে দেখি। হেইডা তর অজানা না! তর পরিবারের কিছু হোক এইডা আমার ইচ্ছা না। কিন্তু তাই বইলা আমার ব্যবসারে ত লাটে উঠাইবার পারি না!’

কিছুক্ষণ শুনশান নীরবতা।
রাশেদ অপেক্ষা করে অমোঘ কোনো নির্দেশের জন্য।
‘কাল ভোর হওনের আগেই এই শহর ছাড়বি তুই। পুলিশের কিচ্ছা আমি দেখুম। ঢাকায় চইলা যা। আমার লোকজনরে কওয়ন থাকবো। বাসে তর লগে আমার লোক যাইবো। কোনো সমস্যা হইবো না। কিন্তু এইহানে তর থাকা আমার আর আমার ব্যবসার লাইগা নিরাপদ না। বুঝছিস?’

রাশেদ মাথা নাড়ে। বুঝেছে সে। শুধু কোনোমতে একবার বলে,
‘আমার মা-বোন...মানে তাদের কী হবে?’
‘তারা থাকুক এইহানে, সমস্যা কী? তয় তর বোনরে একটু সাবধান কইরা যাবি। বেশি ফাল পাড়লে কইলাম বিপদ আছে!’
শেষের বাক্যটা চিবিয়ে চিবিয়ে বলে বড়ভাই।

বাসায় ফিরে আসে রাশেদ।
রাতে খাওয়ার টেবিলে অনেকদিন পর মা আর নীলার সাথে অনেক গল্প হয় তার। সেই আগের মতো।
নীলা অবশ্য একটু চুপচাপ। কেন যেন সোজা চোখে তাকাতে পারছে না ভাইয়ের দিকে।
রাশেদ সহজ করতে চায় নীলাকে। ভেতরে অনেক না বলা কষ্ট জমে ছিল রাশেদের। ইচ্ছে করে এক ঝটকায় সব কষ্টগুলোকে মুক্তি দিতে।
মা খুব খুশী হয়... কতদিন পর ছেলেটা স্বাভাবিক ভাবে কথা বলছে! নীলা অবাক হয়। কোথায় যেন গড়মিল লাগে!

পরদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই রাশেদ বেরিয়ে পড়ে বাসা থেকে।
ওর টেবিলে পড়ে থাকে একটা চিঠি......নীলাকে লেখা।



পাঁচ

নীলা,
অনেকদিন থেকেই ভাবছিলাম...সব খুলে বলবো তোকে।
সঙ্কোচ এসে পথ আটকে দাঁড়াচ্ছিল বারবার।
এ একদিক দিয়ে ভালোই হলো... তুই নিজেই সব জেনে গেছিস। বড় ভাই হয়ে তোকে এই কথাগুলো বলা খুব সহজ ছিল না আমার জন্য।

আমাদের চার কামরার এই বাসাটাকে একখণ্ড স্বর্গ মনে হতো আমার কাছে। বাবা-মা আমি তুই...আর আমাদের ছোট ছোট স্বপ্নগুলো।
সেই স্বপ্নগুলোকে খুব দূরের কিছু মনে হতো না কখনো। হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারবো এতটাই কাছাকাছি ছিল ওরা।
অথচ দেখ... কত দূরে চলে গেল সবকিছু! আর কোনোদিনই ধরা যাবে না রে! সুতো কাটা ঘুড়ির মতো পালিয়ে গেছে সবাই!
কিংবা কে জানে! হয়তো স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার মতো মনের জোরটুকুই কখনো ছিল না আমার।

কিন্তু তুই হেরে যাস না আমার মতো। আগুনটাকে পুষে রাখিস...নিভতে দিস না কখনও।
মাকে দেখিস। ভালো থাকিস সবসময়।
ইতি
তোর পরাজিত ভাই



ছয়

পরদিন সকালে বেশক’টি বাস রাশেদদের ছোট শহরটি থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেল।
কিন্তু কোনও বাসেই 'রাশেদ' নামের কোনো যাত্রী ঊঠলো না।

সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুন, ২০১৮ বিকাল ৪:৩৬
১১টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দু'টি ছোট গল্প বলতে চাই

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ১:২৫



১। গ্রামের নাম রসুলপুর।
একেবারে সুন্দরবনের কাছে। অন্যসব গ্রামের মতোই একটি সহজ সরল সুন্দর গ্রাম। এই রসুলপুর গ্রামই আমাকে শিখিয়েছে কি করে পৃথিবীকে ভালোবাসতে হয়। মানুষকে ভালোবাসতে হয়। এই গ্রামের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেলফোর রোড টু কাশ্মীর ! : সভ্যতার ব্লাকহোলে সত্য, বিবেক, মানবতা!

লিখেছেন বিদ্রোহী ভৃগু, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ১:৪০

ফিলিস্তিন আর কাশ্মীর! যেন আয়নার একই পিঠ!
একটার ভাগ্য নিধ্যারিত হয়েছিল একশ বছর আগে ১৯১৭ সালে; আর অন্যটি অতি সম্প্রতি ২০১৯ এ!
বর্তমানকে বুঝতেই তাই অতীতের সিড়িঘরে উঁকি দেয়া। পুরানো পত্রিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

চামড়ার মূল্য- মানুষ ভার্সেস গরু

লিখেছেন কাওসার চৌধুরী, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ বিকাল ৩:৪৪


২০১০ সালের কথা; তখন পূর্ব লন্ডনের ক্যানরি ওয়ার্ফ (Canory Wharf) এর একটি বাসায় ক্লাস নাইনে পড়া একটি ছাত্রীকে ম্যাথমেটিকস্ পড়াতাম। মেয়েটির আঙ্কেল সময়-সুযোগ পেলে আমার সাথে গল্পগুজব করতেন। একদিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দাদীজান ও হ্যাজাক লাইট

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:০০



সময় ১৯৮০ এর দশক, প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসের শেষ শুক্রবার আমার দাদাজানের মৃত্যুবার্ষিকী’তে বড় চাচা, আব্বা বেশ খরচ করে গ্রামবাসী ও আত্মীয় পরিজনদের খাবারের একটা ব্যাবস্থা করতেন, বড় চাচা আর আব্বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গত কিছু সময়ে সামুতে যা যা হয়েছে, ব্লগারদের ওপর দিয়ে যা গিয়েছে, সেসকল কিছু স্টেজ বাই স্টেজ বর্ণনা!

লিখেছেন সামু পাগলা০০৭, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ৮:১৪



কনফিউশন: ধুর! কি হলো! ব্লগে কেন ঢুকতে পারছিনা? কোন সমস্যা হয়েছে মনে হয়, পরের বেলায় চেক করে যাব। বেলার পর বেলা পার হলো, সামুতে ঢোকা যাচ্ছে না! কি সমস্যা!... ...বাকিটুকু পড়ুন

×