somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মামাবাড়ী, ইশকুল ... ১২

১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১১ সকাল ১১:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আগের পর্ব -
Click This Link

চা বাগানের বুক চিরে

শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে নেমে ফুলছড়া চাবাগানের ভেতরের এক চা স্টল পর্যন্ত রিকশায় গেলাম। রাস্তাটি তখনো পাকা ছিলো। রেল লাইন পার হয়ে, যতদূর মনে আছে, ইস্পাহানী জেরিন চা বাগান আর ফিনলের একটা বাগানের মাঝখান দিয়ে সে রাস্তা শুরু। সমতল আর ছোট টিলার সারা শরীর, যতদূর চোখ যায়, শুধু চা আর চা গাছের সবুজে ছাওয়া। যেদিন প্রথম যাই তার দু'একদিন আগে বোধ হয় বৃষ্টি হয়েছিলো। পরিচ্ছন্ন পাতার সবুজের দ্যুতি চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিলো। বিকেল চারটার দিকে রওয়ানা হলাম। জ্যৈষ্ঠের বিকেলের সোনালী-কমলা রোদ। জীবনে প্রথম চা বাগান দেখছি বলে মজাই আলাদা।

(এরকম আরেকটা মজা পেয়েছি ২০০৩ সালে হবিগঞ্জের নোয়াপাড়া চা বাগানে ঢুকে। আমি কর্মসূত্রে সেখানে ( মাধবপুর, হবিগঞ্জ) এসেছি। পরিবারের সবার সাথে গৃহকর্মী মহিলাটিও ছিলো। চা বাগান ঢোকার পর ও বললো চা বাগান কোথায়। বলা হলো, এটাই চা বাগান। অবাক হয়ে জানতে চাইলো, চা কই ? সব তো গাছের পাতা ! ওর ধারণা ছিলো ধানের ছড়ার মতো কালো কালো চায়ের দানা গাছে ধরে ! )

দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম ফুলছড়া চা স্টলের কাছে। নামার পর দোকানের সামনে কাঠের বেঞ্চিতে বসলাম। বেঞ্চি মানে মাটিতে পুঁতে রাখা গাছের গুঁড়ির সাথে কাঠের তক্তা পেরেক মেরে আটকানো। আরো দু'এক জন ছিলো। সবাই বসে আছে। কারো যেন কোথাও যাবার তাড়া নেই। বেশ কিছু সময় পর আরো দুটি রিকশা এলো। নামলেন ছ'সাত জন। হেঁটে এসে যোগ দিলেন কয়েক জন। এরপর তাদের কেউ কেউ চা খেলেন, কেউ বিড়ি। তারপর সবার সাথে দল বেঁধে রওয়ানা হলাম চা বাগানের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা মেঠো পথে। একটু পর পর পাহাড়ী ছড়া পড়ছে। অল্প পানি, কিন্তু অবিশ্বাস্য রকমের স্বচ্ছ। একটা সুঁচ পড়লেও তুলে অঅনা যাবে। পানিতে পা দিয়েই চমকে উঠলাম- ঠাণ্ডা !!!!!!!!!!!!!!

সবাই নানা রকম গল্প করতে করতে চলছেন। কয়েকজন বাঁকে বয়ে ( ওখানে বলে ভার। বাঁশের বাঁকের দু'প্রান্তে সিকার মতো দড়ির তৈরী খোলের ভেতর দুটি বাঁশের চাঙাড়ীর মতো জিনিস। তার ভেতর বয়ে নেয়া হয় নানা জিনিস। কেউ বয়ে নেন আনারস- ২৫টি করে দুই চাঙাড়ীতে ৫০টি। কেউ বয়ে নেন লেবু-৫০০ করে ১০০০টি। কেউ বয়ে নেন কলার ছড়া (সেটা অবশ্য ভারের দুই প্রান্তে দড়িতে ঝুলিয়ে), কেউ কাঁঠাল। বয়ে নেবার জন্য যে টাকা পান তা দিয়েই ঘরের জন্য দরকারী জিনিসপত্র কিনে এনেছেন শ্রীমঙ্গল হাট থেকে। সপ্তাহে দুটি হাট বসে। সে দুদিনই এইভাবে সবাই হাটে জান। কার আনারস কত বিক্রি হলো, লেবু বা কাঁঠাল বা কলা কতো বেচা হলো তার বৃত্তান্ত শুনতে শুনতে চললাম। কেউ কেউ ছিলেন, বন থেকে কেটে আনা কাঠের খড়ি বিক্রি করে এসেছেন।

চলতে চলতে ছোট মামাকে বললাম, আমরা দোকানে এসে বসে থাকলাম কেন ? ( ছোটমামা আমাদেরকে স্টেশনে রিসিভ করেছেন) মামা বললেন, এই পথে বাগান থেকে বাঘসহ নানা হিংস্র প্রাণীর উপদ্রব আছে। সে জন্য সবাই একত্র হয়ে দল বেঁধে চলি। তখন বললাম, বাঘের সামনে পড়ে গেলে সবাই কি করে ? তখন মামা এক কাহিনী বললেন-

''এক বার মামাসহ এক দল এই পথে যাচ্ছিলেন। মোড় ঢ়ুরতেই দেখেন একটা বড়ো বাঘ বসে আছে। সেই বাঘকে এখানে বলা হয় খান্দরা বাঘ। তখন আমরা হাতে থাকা খালি টিন, ডালি এই সব শব্দ করে বাজাতে শুরু করলাম আর জোরে চিৎকার করতে লাগলাম। তখন বাঘটি কিছুক্ষণ আমাদের দিকে ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে উঠে চলে গেলো।''

গল্প শুনে তো ভয় পেয়ে গেলাম। যদি বাঘের সামনে পড়ে যাই ! ভাগ্যিস ভালোয় ভালোয় পৌঁছে গেলাম।

একটা ছড়ার পারে মামাবাড়ী। সামনে চওড়া রাস্তা। বালি আর মাটির তৈরী। সেই পথে ট্রাক আর ট্রাক্টর চলে। একটু দূরে একটা চা বাগান- নাম খুব সম্ভব এম আর খান। গ্রামটির নাম মোহাজেরাবাদ আর ইউনিয়নের নাম আশিদোন। গ্রামের সবাই পাহাড়ে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। খাবারতো যোগাড় হয়। কিন্তু মূল সমস্যা ছিলো লেখাপড়ার আর স্বাস্থ্য সুবিধা বঞ্চিত। বাগানের টিলাবাবু নৃপেন্দ্র নাথ বিশ্বাসের একটা দোকান ছিলো বাগানের এক প্রান্তে। সেটাই সে গ্রামের একমাত্র ''সুপার স্টোর''। এখানে কিছু না পেলে যেতে হতো শ্রীমঙ্গল। নানা যে এই গহীন পাহাড়ে কেন ঢুকলেন !

তবে বাড়ীটি ছিলো খুব সুন্দর করে সাজানো। সামনের ঘরটি মাটির দেয়াল আর টিনের চাল। ভেতরে আরো দুটি ঘর টিনের। ভিটি কাঁচা। মাঝে বিশাল উঠান। বাড়ীতে ঢোকার পথটি খুব সুন্দর পাতাবাহারের গাছ সার করে লাগানো। খুব সুন্দর করে কেটে সাইজ করা। একপাশে ছোট একটা পুকুর অন্যপাশে ধানক্ষেত। সামনের মাটির ঘরের উঠানটিও পাতাবাহারের দেয়াল ঘেরা। ভাগ ভাগ করে নানা রকমের ফুলের বাগান। বাগানবিলাস আর অপরাজিতার লতা উঠে আছে সে ঘরের চালে। বাড়ীর পেছনে বিশাল এক পাহাড়। আনারস, কাঁঠাল, কলা আর লেবুর বাগান তাতে। বাড়ীর পেছন দিকে ইন্দারা। সেটাই ছিলো পাণীয় জলের উৎস। এক কথায় ছবির মতো। অনেক পাহাড়ী বাড়ীর ছবি যেমন আমরা দেখি ইন্টারনেটে আর পোস্টারে সেই রকম অনেকটা।

পরে অবশ্য সে গ্রামে পরে অনেক মজার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। তার কথা বলবো পরের পর্বে।

(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১১ দুপুর ১:৩৮
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মানবতা, সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে জাতীয় কবি নজরুলের চিরন্তন আহ্বান

লিখেছেন মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:০৪

বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি একই সঙ্গে কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংগীতজ্ঞ, দার্শনিক ও সমাজসংস্কারক। তাঁকে শুধু “বিদ্রোহী কবি” বললে তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না;... ...বাকিটুকু পড়ুন

Humans are (not) from Earth- তবে কি আমরা মহাবিশ্বের ভৃত্য?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৫৫

Humans are not from Earth: A Scientific Evaluation of the Evidence বইটির লেখক ডক্টর এলিস সিলভার (Dr. Ellis Silver)-এর ব্যক্তিগত ও একাডেমিক জীবন নিয়ে মূলধারার তথ্যমাধ্যমে এক ধরনের রহস্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ-পর্ব ২

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:০১


বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ: মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নের বিকল্প কৌশল
একটি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফিজিবিলিটি স্টাডি ।

একটি ধারাবাহিক গবেষনামুলক পোস্ট
[link|https://www.somewhereinblog.net/blog/ali2016/30393976|প্রথম পর্বে থাকা গবেষনাটির পটভুমির লিংক – পর্ব... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা ইতিহাসের ছিন্নপত্র...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:০৩



আমরা ইতিহাসের ছিন্নপত্র...

২০১০, এক-এগারোর পর থেকে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত- যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল, যারা গুম, নির্যাতন, কারাবাস, মামলা, চাকরি হারানো, পরিবার ভেঙে যাওয়া- সবকিছুর মূল্য দিয়েছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৭


আজ দেশজুড়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। ২৪ -এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভ্ন্নি সময়ে বহু নিরীহ প্রাণ অকালে ঝরেছে। আবু সাঈদ, মুগ্ধ ছাড়াও নাম জানা-অজানা হাজারো ব্যাক্তি তাদের প্রাণ হারিয়েছেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×