somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঢাবিতে মেয়েরা নিরাপদ, শুধু একটু সতর্ক থাকলেই হয়

২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


এই দেশে কিছু মানুষ আছেন যাঁরা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। তাঁরা ঘুমান না, বিশ্রাম নেন না, নিজেদের সুখ-আরাম বিসর্জন দিয়ে সমাজের সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রাচীন ও গৌরবময় প্রতিষ্ঠানে এই রকম মানুষের সংখ্যা বরাবরই বেশি, এবং সেটাই স্বাভাবিক কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় মেধাবী ও সংবেদনশীল মানুষ তৈরি করে এসেছে।

সর্বমিত্র চাকমাকে দিয়েই শুরু করি। এই তরুণ ডাকসুতে প্রায় নয় হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, যা তাঁর গ্রহণযোগ্যতার একটি নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। তিনি ক্যাম্পাসকে ভালোবাসেন, এটা বোঝা যায়। রাতের বেলা মাদকাসক্ত ও ভবঘুরেরা ক্যাম্পাসে ঘোরাফেরা করলে নারী শিক্ষার্থীরা অনিরাপদ বোধ করেন, এই চিন্তাটা তাঁর মাথায় এসেছিল এবং এটা একটি চিন্তাশীল মানুষের লক্ষণ। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেই পরিস্থিতি সামলাবেন।

জানুয়ারির ছয় তারিখে কেন্দ্রীয় মাঠে ত্রিশজন কিশোরকে লাঠি হাতে সারিবদ্ধভাবে কান ধরে উঠবস করালেন। এই দৃশ্যটি দেখে যে কেউ মুগ্ধ হবেন, কারণ এখানে একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির কর্তব্যপরায়ণতা স্পষ্ট। যে ছেলেগুলো কান ধরে উঠবস করছিল তারা নিশ্চয়ই কোনো না কোনো অপরাধ করেছিল, এবং সেই অপরাধের বিচার তাৎক্ষণিকভাবে করার ক্ষমতা একজন নির্বাচিত ছাত্রপ্রতিনিধির থাকা উচিত, এমনটাই মনে করেন অনেকে।

সমালোচনা হলো। সর্বমিত্র দুঃখ প্রকাশ করলেন, পদত্যাগের কথা বললেন, তারপর শিক্ষার্থীদের আবেদনে থেকে গেলেন। এই নমনীয়তাটুকুর প্রশংসা করতে হয়। একজন মানুষ ভুল করেন, স্বীকার করেন, এবং তারপর একই পদে থেকে যান। এই চক্রটি সুন্দর এবং এই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাথে সংগতিপূর্ণ।

এবার আসি মোস্তফা আসিফ অর্ণবের কথায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে কর্মরত একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটল। একজন ছাত্রী জাতীয় যাদুঘরের পাশ দিয়ে হেঁটে ক্যাম্পাসে আসছিলেন। অর্ণব তাঁকে থামিয়ে পর্দা ও ওড়না সংক্রান্ত কিছু পরামর্শ দিলেন এবং এর সাথে এমন কিছু কথা বললেন যেগুলো আদালতের ভাষায় যৌন হয়রানি, যদিও অর্ণবের ভাষায় হয়তো সেগুলো সামাজিক সংশোধনমূলক উদ্যোগ ছিল।

অর্ণবকে গ্রেফতার করা হলো। সেই রাতেই ভালো জনতা থানার সামনে জড়ো হলেন এবং সকাল পর্যন্ত অর্ণবের মুক্তি চাইলেন। পরদিন এক হাজার টাকা মুচলেকায় জামিন হলো। জেল থেকে বের হওয়ার পর ফুলের মালা গলায় দিয়ে কোরআন হাতে ধরিয়ে তাঁকে বরণ করা হলো। এই দৃশ্যটি একটি সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য কারণ এখানে মানুষ তার প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ায়, বিপদটা কী কারণে হয়েছে সেটা বিবেচ্য নয়।

ভুক্তভোগী ছাত্রী এরপর ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি পেলেন। তাঁর ব্যক্তিগত তথ্য থানা থেকে ফাঁস হয়ে গেল। শেষমেশ তিনি মামলা তুলে নিলেন। এই পরিণতিটা একটু মন খারাপ করার মতো, স্বীকার করি। কিন্তু একটি বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ছোট ছোট মন খারাপের জায়গা থাকেই এবং সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যায়, এই বিশ্বাসটুকু আমাদের ধরে রাখতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় অর্ণবকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে, বিশটি বিভাগ তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। এই সিদ্ধান্তগুলো যথাযথ, যদিও যে মেয়েটির কথা বলা হচ্ছে তিনি এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন সেটা নিয়ে আর বেশি কথা বলার প্রয়োজন নেই কারণ মামলাই তো নেই।

সবশেষে আসি সবচেয়ে আলোচিত ঘটনায়। রমজান মাসের ভোররাতে দুটি মেয়ে পুরান ঢাকায় সেহরি খেয়ে টিএসসির দিকে হেঁটে আসছিলেন। মেয়ে দুটি কি ভুল করেছিলেন? হ্যাঁ, নিশ্চয়ই করেছিলেন। এই দেশে রাতের বেলা নারীর হেঁটে বেড়ানো একটি গুরুতর অপরাধ, যদিও দণ্ডবিধিতে এর কোনো ধারা নেই। তবে দণ্ডবিধির বাইরেও একটি অলিখিত বিচারব্যবস্থা আছে, যেটির বিচারক থেকে শাস্তি প্রদানকারী সবকিছু একই মানুষ। সেই মানুষটির নাম মো. রাকিব, বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের ছাত্র, এবং তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অত্যন্ত দায়িত্ববান সদস্য।

রাকিব সাহেব লাঠি হাতে মেয়েটির দিকে তেড়ে গেলেন। এটাকে যদি কেউ হিংসাত্মক বলেন, তাহলে বলব, দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা। আসলে তিনি ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছিলেন। ক্যাম্পাসে নারীদের নিরাপদ রাখার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো তাদেরকে লাঠি দিয়ে তাড়া করা, এটা বোঝার জন্য বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনার প্রয়োজন, যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের নেই।মেয়েটি কেঁদে বললেন, "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আমরা মেয়েরা নিরাপদ না।"

এই মন্তব্যটি অত্যন্ত অন্যায্য কারণ তিনি যে লাঠিটির কথা বলছেন সেটি একটি কাঠের লাঠি, কোনো ধারালো অস্ত্র নয়। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাজ করতে রাকিব সাহেব গাজীপুরে গিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কালিয়াকৈরের একটি দশতলা ভবনের ছাদে তাঁর বন্ধু সাব্বির হোসেনকে কুপিয়ে নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, এবং সেই ঘটনার মামলায় রাকিব আসামি। দুই কিশোরকে মুড়ি কিনতে পাঠিয়ে এই কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছিল, এবং এই পরিকল্পনার মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট সৌন্দর্য আছে যেটা আমি আপনাদের নিজেদের আবিষ্কার করার জন্য ছেড়ে দিতে চাই । এই মামলায় তিনি ও তাঁর যমজ ভাই আসামি এবং মামলার পর থেকে তাঁরা পলাতক।

পলাতক মানুষ সাধারণত নিজেকে গোপন রাখেন। কিন্তু রাকিব সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন, ডাকসু প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন, এবং রমজানে ভোররাতে ক্যাম্পাসে টহল দিয়েছেন। মামলার বাদীপক্ষ পুলিশকে বারবার জানিয়েছেন। পুলিশ বলেছেন আদালত থেকে ওয়ারেন্ট আসেনি। আদালত থেকে ওয়ারেন্ট আসেনি কারণ প্রক্রিয়ায় সময় লাগে। এই সময় লাগে কথাটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার একটি গভীর দার্শনিক অবস্থান, এবং এই অবস্থানের সুফলভোগী হিসেবে রাকিব সাহেব নিঃসন্দেহে কৃতজ্ঞ।

বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এটা তাদের প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্য এবং এই ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতে হয়। কমিটি তদন্ত করবে, রিপোর্ট তৈরি হবে। রিপোর্টটি কোনো একটি ফাইলে ঢুকবে এবং সেই ফাইলের পাশে আরও অনেক ফাইল জমা হবে। এই ফাইলগুলোর মধ্যে অর্ণবের ফাইলও আছে, সর্বমিত্রের ফাইলও আছে, এবং এই সিরিজটা এখানেই শেষ নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। জীবন্ত প্রতিষ্ঠান মানে সেখানে নানা ঘটনা ঘটে, নানা মানুষ আসে, নানা স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের জন্ম হয়। যে মেয়েটি ভোররাতে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন "আমরা নিরাপদ না", তিনি আসলে বিশ্ববিদ্যালয়কে ভালোবাসেন বলেই এত কষ্ট পেয়েছেন। যাঁরা ভালোবাসেন না তাঁরা কাঁদেন না।

বর্ষাকালে ঢাকার রাস্তায় হাঁটু পানি জমে, মানুষ ভিজে যায়, পরের বছর আবার একই পানি আসে। এই চক্রটা নিয়ে আমরা প্রতি বছর কথা বলি এবং প্রতি বছর ভুলে যাই। ঢাবির গল্পটাও এই রকম। পার্থক্য শুধু একটাই। রাস্তার পানি সবার পায়ে লাগে। ঢাবির এই বর্ষার পানি কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর গায়ে পড়ে এবং সেই গোষ্ঠীটি প্রতিবারই একই, শুধু তাদের নাম বদলায়। তদন্ত কমিটি তার কাজ করুক।



https://bangla.thedailystar.net/youth/education/campus/news-3902206

ঢাবিতে দুই নারীকে মারধর ও ‘যৌনকর্মী’ বলে হেনস্তার অভিযোগ — Copied from http://www.khoborsangjog.com

সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:২১
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সাব ইয়াদ রাখহা জায়েগা

লিখেছেন শূন্য সময়, ২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৫২

বিডিআর ম্যাসাকারের বিচার জীবনেও হবেনা। হলফ করে বলতে পারি।
কার বিচার করা হবে? হাসিনার? তাপসের? শেখ সেলিমের? সর্বোপরি, ভারতের?
কে করবে বিচার? বিচিহীন বিএনপি যে ভারতের পারমিশনে দেশে ফিরেছে? যার মুরোদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান কীভাবে মুখে মুখে ছড়িয়ে দেওয়া যায়?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:১৮



বাংলাদেশের মতো একটি দেশের সরকারের প্রথম কাজ কি হতে পারে? আমার মতে – দেশের দরীদ্র জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই সবার আগে সরকারের প্রথম টার্গেট হওয়া উচিৎ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে সব আলেম ঐক্যবদ্ধ নয় তাদের ঐক্যের যোগ্যতা নাই

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৫১



সূরাঃ ৩ আলে-ইমরান, ১০৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১০৩। তোমরা একত্রে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধর! আর বিচ্ছিন্ন হবে না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর।যখন তোমরা শত্রু ছিলে তখন তিনি... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুলসিরাত

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩৪


দিনটা ছিল দুর্যোগময়। সকাল থেকে বৃষ্টি- জলে ঢেকে গিয়েছিল রাস্তা-ঘাট। ঢেকে গিয়েছিল ঢাকনা খোলা ম্যানহোল। পরিণত হয়েছিল অদৃশ্য মরণকূপে। এর মধ্যেই মানুষ বেরিয়েছিল কাজে। উদ্বিগ্ন আর ক্ষুদ্ধ মানুষেরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার কথা : একুশে বইমেলায় আপনাদের আন্তরিক আমন্ত্রণ।

লিখেছেন সুম১৪৩২, ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:০৩



অনেক জল্পনা–কল্পনার পর অবশেষে শুরু হলো একুশে বইমেলা ২০২৬।
বইপ্রেমীদের এই মহোৎসবে এবার আমার জন্য একটি বিশেষ মুহূর্ত—
এই প্রথম আমার দুটি বই একসাথে মেলায় এসেছে।



বই দুটি প্রকাশিত হয়েছে প্রতিভা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×