somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দিলে কাজ হবে ?

০৩ রা মার্চ, ২০২৬ রাত ১০:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সম্প্রতি শিয়া ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ কামাল আল-হাইদারির পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে 'জিহাদের' ডাক দেওয়া হয়েছে। ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব রক্ষার দোহাই দিয়ে এই আহ্বান জানানো হলেও, কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ডাক কি আসলেও মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে পৌঁছাবে? নাকি এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা মিলিশিয়া বাহিনীর হুঙ্কার হয়েই থেকে যাবে? বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরান আসলে এক গভীর গোলকধাঁধায় আটকে আছে।

মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে কট্টরপন্থী সুন্নি সমাজ, ইরানকে কোনোভাবেই 'ইসলামিক রাষ্ট্র' হিসেবে মনে-প্রাণে গ্রহণ করতে পারে না। অনেকের চোখে শিয়াদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-আচরণ এতটাই ভিন্ন যে, তারা তাদের অনেকটা কাদিয়ানিদের (আহমদীয়া) মতোই ইসলামের মূলধারার বাইরের কোনো দল হিসেবে গণ্য করে।

এই যে বিশ্বাসের দেয়াল, এটিই ইরানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। খামেনি বা হাইদারির মতো নেতারা যখন জিহাদের কথা বলেন, তখন সাধারণ সুন্নি মুসলমানদের বড় একটি অংশ একে 'ইসলামের লড়াই' হিসেবে না দেখে 'শিয়া শক্তির উত্থান' হিসেবে দেখে। যার ফলে খামেনির মতো বড় নেতার প্রয়াণেও মুসলিম বিশ্বে তেমন কোনো শোকের ছায়া দেখা যায় না, বরং এক ধরণের নীরবতা বা উদাসীনতা কাজ করে।

বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে যখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরান কথা বলে, তখন সাধারণ মানুষ ইরানকে বাহবা দেয়। কিন্তু এই সমর্থনটা যতটা না ইরানের প্রতি ভালোবাসায়, তার চেয়ে অনেক বেশি ইসরায়েল বা আমেরিকার প্রতি ঘৃণায়। অর্থাৎ, "শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু"—এই তত্ত্বে ইরান সাময়িক জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু যদি ধর্মীয় ঐক্যের প্রশ্ন আসে, তবে সেই একই মানুষগুলোই আবার শিয়া মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করতে দ্বিধা করবে না।

একটি রাষ্ট্র যখন বাইরের শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দেয়, তখন তার ভেতরে থাকা উচিত ইস্পাতকঠিন ঐক্য। কিন্তু ইরানের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। শত শত মানবাধিকার কর্মী এবং নোবেলজয়ী নার্গিস মোহাম্মদীকে বন্দী রেখে জনগণের হৃদয়ে জায়গা পাওয়া সম্ভব নয়। বিগত বছরগুলোতে হিজাব ইস্যু বা অর্থনৈতিক মন্দার সময় সরকার যেভাবে কঠোর অবস্থানে ছিল, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি এক ধরণের ক্ষোভ জমে আছে।

ইরান যদি আজ বন্দীদের মুক্তি দিত, জনগণের কাছে নিজেদের গতানুগতিক ভুলগুলোর জন্য ক্ষমা চাইত এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের ডাক দিত—তবে হয়তো তারা তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য এক বিশাল জনশক্তি পেত। কিন্তু তা না করে জিহাদের স্লোগান দেওয়াটা অনেকটা ফাঁকা কলসির শব্দ-এর মতো শোনাচ্ছে।

ইরানের আসল শক্তি এখন তাদের নিয়মিত সেনাবাহিনী নয়, বরং হিজবুল্লাহ, হুথি বা ইরাকি শিয়া মিলিশিয়াদের মতো প্রক্সি গ্রুপগুলো। জিহাদের ডাক দিলে হয়তো এই গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হবে, কিন্তু কোনো একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র সরাসরি ইরানের হয়ে যুদ্ধে নামার ঝুঁকি নেবে না। ফলে ইরান যদি কোনো বড় সংঘাতে জড়ায়, তবে তাকে তার এই 'প্রক্সি' নেটওয়ার্ক নিয়েই লড়তে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দিকেই ঠেলে দেয়।

ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে সাময়িক আবেগ ছড়ানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে জয়ী হতে হলে জনগণের নৈতিক সমর্থন এবং বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা প্রয়োজন। ইরান যদি নিজেকে মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে দেখতে চায়, তবে তাকে আগে নিজের দেশের মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং শিয়া-সুন্নি ধর্মীয় বিভাজন ঘুচানোর বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায়, এই জিহাদের ডাক ইরানকে আরও বেশি একাকী এবং কোণঠাসা করে ফেলবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক - কালবেলা নিউজ

https://www.kalbela.com/world/middle-east/271130


সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:১৭
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একটা অপরাধ দশটা অপরাধের সুযোগ করে দিতে পারে ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


রাড্ডা হাসপাতালে লুটপাট
ঢাকার মিরপুর এক নম্বরে রাড্ডা ক্লিনিকের ওপর দিয়ে যেন টর্নেডো বয়ে গেছে! গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতের অন্ধকারে ১৫০-২০০ জন দুর্বৃত্ত রাড্ডা ক্লিনিকের ভেতরে প্রবেশ করে রীতিমতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিজন দাদা, হারালে কোথায় ?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


নিত্য নতুন পোস্টের ভিড়ে
সেই চেনা মুখটি আজ আর দেখি না
কোথায় হারালে বিজন দাদা
ব্লগের উঠোনে তোমার সেই ছায়াটি আর মেলে না।

কোনো লেখা যখন সদ্য প্রসবের ব্যথায়
শব্দেরা যখন খুঁজত একটু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সক্রেটিস ঈশ্বরের বাণী প্রচার করতেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৫



সক্রেটিস মানুষের সাথে কথা বলতে ভালোবাসতেন। তিনি যখনই সময়ে পেতেন, মানুষের সমাগম যেখানেই হতো, সেখানেই তিনি বক্তব্য দিতেন। সেই বক্তব্যগুলো ছিলো, সক্রেটিসের ভাষায়, 'দৈব বাণী' বাঁ 'ঈশ্বরের বাণী'। এজন্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাল বদর, কালা বদর এবং ছাপরি.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১১

লাল বদর, কালা বদর এবং ছাপরি.....

লাল বদরঃ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া একটি নতুন ও রাজনৈতিক কটূক্তিবাচক শব্দ বা স্লোগান। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সরকার পতনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সর্ব্বহারা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০



দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।
১৯৪৩ সালে জাপান ভারতে আচমকা বেশ কিছু বোমা হামলা করে। সম্ভবত হিটলারকে খুশি করতেই জাপান এই কাজ করে। একের পর এক বোমা ফেলে মাদ্রাজে (বতর্মান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×