
ক্ষমতায় বসার এক মাস পেরোতে না পেরোতেই নতুন সরকার একের পর এক ঘোষণা দিয়েই যাচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষি ঋণ মওকুফ, ইমাম-মুয়াজ্জিন ভাতা, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন আর গুম হওয়া পরিবারের জন্য ভাতার প্রস্তাব ; তালিকাটা প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে।
প্রতিটি ঘোষণার পর সংবাদ সম্মেলনে হাসিমুখ দেখা যাচ্ছে, পত্রিকায় আসছে বড় বড় শিরোনাম। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন কোথাও করা হচ্ছে না: এই বিপুল পরিমাণ টাকা আসবে কোথা থেকে? সরকারের যুক্তিটা খুব সহজ। তাদের মতে, মানুষের হাতে টাকা দিলে বাজারে চাহিদা বাড়বে, উৎপাদন বাড়বে এবং অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় Keynesian Stimulus ; ১৯৩০-এর মহামন্দার সময় এই তত্ত্ব দিয়েই আমেরিকা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।
এই তত্ত্বের কেন্দ্রে আছে মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট (Multiplier Effect)। ধারণাটি হলো: সরকার যদি বাজারে ১০০ টাকা ছাড়ে, তবে সেই টাকা একজনের হাত থেকে অন্যজনের হাতে ঘোরে। এতে কেনাকাটা বাড়ে, ব্যবসা সম্প্রসারিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিতে মোট প্রভাব ১০০ টাকার চেয়েও অনেক বেশি হয়। কাগজে-কলমে এই যুক্তি চমৎকার শোনালেও বাস্তবে এটি কাজ করার একটি প্রধান শর্ত আছে। শর্তটি হলো: বাজারে পণ্য বা উৎপাদনের সক্ষমতা থাকতে হবে। মানুষ টাকা পেয়ে যখন কিনতে যাবে, তখন বাজারে পণ্য মজুদ থাকতে হবে এবং কারখানায় উৎপাদন সচল থাকতে হবে।
১৯৩০-এর দশকে কেইনসীয় তত্ত্ব কাজ করেছিল কারণ তখন কারখানায় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও চাহিদার অভাবে সেগুলো অলস পড়ে ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা ঠিক এর উল্টো। এখানে সমস্যা চাহিদার অভাব নয়, বরং অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় 'কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন' (Cost-push inflation)। অর্থাৎ, চাহিদার চাপে নয়, বরং উৎপাদন ও সরবরাহের খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণেই বাজারে দাম বাড়ছে।
এই সংকটকালীন মুহূর্তে সরকার যখন সরাসরি বাজারে টাকা ছাড়ছে, তখন মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট কাজ করবে ঠিক উল্টোভাবে। এই বাড়তি টাকা উৎপাদন না বাড়িয়ে বরং মূল্যস্ফীতির আগুনকে আরও উসকে দিবে । ফলে ১০০ টাকার সরকারি সহায়তা দিনশেষে মুদ্রাস্ফীতির পেটে চলে যাচ্ছে এবং এর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা দাঁড়াবে মাত্র ৬০ টাকায়। সহজ কথায়, এটি একটি ভুল রোগে ভুল ওষুধ দেওয়ার মতো অবস্থা যেখানে ভুল চিকিৎসার কারণে রোগীর সুস্থ হওয়ার বদলে অবস্থা আরও জটিল হচ্ছে।"
গ্যাস সংকটটি বিশ্লেষণ করলে পুরো চিত্রটি পরিষ্কার হয়ে যায়। দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট, অথচ সরবরাহ মাত্র ২৭০ কোটি। অর্থাৎ, প্রতিদিন ৩০ শতাংশ ঘাটতি নিয়ে দেশ চলছে। যুদ্ধের কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে ডাবল দামে বিদেশ থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে ডলারে । এই সংকটে দেশের পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। রাজধানীতে দিনের বড় একটা সময় গ্যাস থাকে না। টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস কারখানায় উৎপাদন কমেছে ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ। রাইড শেয়ারিং চালকরা সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকছেন। একটি সংকট থেকে জন্ম নিচ্ছে নতুন হাজারো সংকট।
এই চরম গ্যাস সংকটের মাঝেই সরকার কৃষক কার্ড এবং সরাসরি সার পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু সার তৈরির কারখানা তো বন্ধ! বিদেশ থেকে আমদানি করতে হলে প্রয়োজন ডলার। আর সেই ডলার মূলত আসে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে।আমাদের মোট রেমিট্যান্সের ৪৫ শতাংশই আসে ওই অঞ্চলের ছয়টি দেশ থেকে, যেখানে এখন যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ডলার সংকট আরও বাড়বে এবং সার আমদানি করা কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে কার্ড দিলেও শেষ পর্যন্ত সার দেওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ডলারের সংকট অন্য খাতেও সরাসরি আঘাত হানছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ফি এক লাফে ৪১ শতাংশ বেড়েছে। পোশাক শিল্পের রপ্তানি খরচ বাড়ছে, ফলে বৈশ্বিক বাজারে আমরা প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা হারাচ্ছি। বিদেশি ক্রেতারা তাদের অর্ডার ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ায় সরিয়ে নিচ্ছেন। বিদ্যুৎ খাতের অবস্থা আরও শোচনীয়। পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১২ টাকায় কিনে ৭ টাকায় বিক্রি করছে। প্রতি মাসে সরকারের হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হচ্ছে। পাওনা না মেটানোয় বিদেশি কোম্পানিগুলো বিদ্যুৎ বন্ধের হুমকি দিচ্ছে। গ্রীষ্মে যখন চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাবে, তখন পরিস্থিতি সামলানোর টাকা নেই।
সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো : যে সরকারি অফিসগুলো এই সংকট সামলানোর দাবি করছে, তারা নিজেরাই নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল দিচ্ছে না। কোটি কোটি টাকা বকেয়া রেখে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিল আদায় করার নৈতিক ভিত্তি সরকারের কোথায়? চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই রাজস্ব ঘাটতি ৫৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও সর্বনিম্ন। অথচ বড় বড় করফাঁকিবাজদের ধরার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। এই বিশাল ঘাটতির মাঝে ভাতার পেছনে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার বাড়তি খরচ রাষ্ট্রের কাঁধে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এই অবস্থায় সরকারের সামনে পথ খোলা মাত্র তিনটি। প্রথমত, বিদেশি ঋণ নেওয়া (যা ইতোমধ্যে অনেক বেড়েছে)। দ্বিতীয়ত, ভ্যাট ও কর বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ দেওয়া। এবং তৃতীয়ত, টাকা ছাপানো যার অনিবার্য ফল হলো আরও ভয়ংকর মূল্যস্ফীতি। এই তিনটি পথের যেটাই বেছে নেওয়া হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় এসেই দৃশ্যমান কিছু করার প্রবণতা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবারের ভিত্তিটা অত্যন্ত নাজুক।
গ্যাস সংকট, ডলারের টানাপোড়েন, বিদ্যুৎ খাতের দেউলিয়াত্ব আর বিশাল রাজস্ব ঘাটতির ওপর দাঁড়িয়ে যদি আয়ের পথ না খুঁজে শুধু খরচের খাতা খোলা হয়, তবে আজকের এই রঙিন প্রতিশ্রুতিগুলো ভবিষ্যতের জন্য বড় বিপদ হয়েই দেখা দেবে। কেউ কেউ যুক্তি দিতে পারেন যে সংকটের মাঝেও সামাজিক সুরক্ষা জরুরি, কারণ দরিদ্র মানুষ অপেক্ষা করতে পারে না। এই যুক্তি অমূলক নয়। কিন্তু সুরক্ষা তখনই টেকসই হয় যখন রাষ্ট্রের নিজের আর্থিক ভিত্তি মজবুত থাকে। তাই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত : আগে রাজস্ব বাড়ানো, বকেয়া আদায়, গ্যাস সংকট সমাধান এবং নিজেদের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ। তারপর ভাতার পরিসর বাড়ানো। এই ক্রমটি উল্টে গেলে উপকার হবে স্বল্পমেয়াদে মাত্র কয়েকজনের, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী বিপদে পড়বে পুরো দেশ।
(ক্ষমতায় বসার মাত্র এক মাসেই সরকারের খরচের খাতা যে হারে ভারী হচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক; কৃষি ঋণ মওকুফেই এক দফায় চলে গেছে ১,৫৫০ কোটি টাকা, যেখানে ১২ লাখ কৃষকের শস্য থেকে শুরু করে পশুপালন খাতের ঋণ সুদসহ মফকুফ করা হয়েছে। এর ওপর ইমাম-মুয়াজ্জিন ভাতা আর ফ্যামিলি কার্ডের মতো জনবান্ধব প্রকল্পগুলো পুরোপুরি চালু হলে বছরে খরচ দাঁড়াবে যথাক্রমে ৪,৪০০ কোটি ও ৬০,০০০ কোটি টাকা যা এরই মধ্যে বিদ্যমান ৫৮,০০০ কোটির বিশাল রাজস্ব ঘাটতিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম। অথচ কৃষক কার্ড, খাল খনন কিংবা গুম হওয়া পরিবারগুলোর ভাতার মতো সংবেদনশীল খাতের ব্যয়ের হিসাব এখনো অন্ধকারে, সাথে বিশাল মন্ত্রিসভার মাসিক রাজকীয় পরিচালন ব্যয় তো আছেই। সব মিলিয়ে বছরে সম্ভাব্য খরচ যখন ৭০,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে তখন আয়ের নতুন কোনো উৎস বা রাজস্ব বাড়ানোর কার্যকর দিকনির্দেশনা না থাকাটা বেশ উদ্বেগজনক; সংবাদ সম্মেলনে অনেক আশার বাণী শোনা গেলেও, দিনশেষে এই বিপুল অর্থ আসলে কোথা থেকে আসবে—সেই যুৎসই উত্তরটি এখনো অধরাই রয়ে গেছে। )
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



