somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

লাল সালুতে মজিদ টিকে গিয়েছিল, শামীম সেটা পারেনি।

১১ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১০:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আজ শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর গ্রামের তৌহিদি জনতা মব করে একজন মানুষকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে মেরে ফেলেছে, তার আস্তানা ভাঙচুর করেছে, আগুন দিয়েছে। নিহত ব্যক্তির নাম শামীম রেজা, এলাকায় পরিচিত ছিলেন কথিত পীর হিসেবে। পুলিশ ঘটনাস্থলে ছিল, শামীমকে উদ্ধারও করেছিল, কিন্তু পুলিশ সুপারের ভাষায় "বিক্ষুব্ধ জনতার তুলনায় পুলিশ কম ছিল।" ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে তার একটা ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল যেখানে ইসলাম নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য ছিল। তবে পুলিশ সুপার নিজেই স্বীকার করেছেন ভিডিওটা অনেক পুরনো এবং কারা এটা নতুন করে ছড়িয়েছে সেটা তদন্ত করা হচ্ছে।

শামীম রেজা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এম কম পাস করে ঢাকায় শিক্ষকতা করতেন। একসময় এলাকায় ফিরে এসে আস্তানা গড়েন এবং নিজস্ব একটা ধর্মীয় চর্চা শুরু করেন যেটা নিয়ে বিতর্ক ছিল বহুদিন ধরেই। ভক্তরা তাকে দুধ দিয়ে পা ধুইয়ে দিত, সিজদা করত, "হরে শামীম হরে শামীম" বলে নাচত। ২০২১ সালে ক্যান্সারে মারা যাওয়া এক কিশোরের লাশ তার বাবা শামীমের হাতে তুলে দিলে শামীম ঢোল পিটিয়ে নেচে গেয়ে সেই লাশ দাফন করেন। এই ভিডিও ভাইরাল হলে এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মামলা হয়, পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর ছাড়া পেয়ে তিনি আবার একই কাজ শুরু করেন। আজ সেই পুরনো ভিডিও হঠাৎ নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে এবং বাকিটা আপনারা জানেন।

শামীম যা করেছেন সেটা আসলে আদিবাসী বা বাউল ঘরানার চর্চা। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ে ব্যান্ড বাজিয়ে শবযাত্রার রীতি আছে, সাঁওতাল মুন্ডা গারোদের মধ্যে গান বাজনায় আত্মাকে বিদায় দেওয়ার রীতি আছে, লালন ঘরানার বাউলদের মধ্যেও মৃতদেহ সামনে রেখে গান গাওয়ার চল আছে। এই তুলনাগুলো ভুল নয়, কিন্তু এগুলো দিয়ে শামীমকে defend করতে গেলে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় হোঁচট খেতে হয়।

সাঁওতালরা সাঁওতাল পরিচয়ে এই কাজ করে, বাউলরা বাউল পরিচয়ে করে। শামীম কিন্তু মুসলিম পীর পরিচয়ে একটা মুসলিম পরিবারের ছেলের লাশ নিয়ে এই কাজ করেছেন এবং সেটাকে ইসলামিক দাফন হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন। পরিচয়ের এই গোলমালটাই আসল সমস্যা তৈরি করেছে। আপনি যদি ভিন্ন ধারার সাধক হন তাহলে সেটা খোলামেলাভাবে বলুন। কিন্তু ইসলামের খোলস পরে ভেতরে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু করলে যে বিস্ফোরণ হয় সেটার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। শামীম প্রস্তুত ছিলেন না।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ যখন মজিদকে নিয়ে লিখেছিলেন তখন হয়তো ভাবেননি যে সেই চরিত্রের একটা অসম্পূর্ণ আনাড়ি সংস্করণ একদিন দৌলতপুরে আস্তানা গাড়বে। মজিদ ছিল একটা সিস্টেম, একটা রাজনৈতিক প্রাণী যে জানত কখন ধর্মের তরবারি বের করতে হয় আর কখন খাপে রাখতে হয়। সে তাহেরকে ভয় দেখিয়েছে, খালেককে নিয়ন্ত্রণ করেছে, মোদাচ্ছেরের জমিতে মাজার বসিয়েছে এবং সবচেয়ে বড় কথা সে কখনো ক্ষমতার বিরুদ্ধে যায়নি, বরং ক্ষমতাকে নিজের কাজে লাগিয়েছে। শামীম সেই পাঠটা নেয়নি। সে এমন একটা কাজ করে বসেছে যাতে ধর্মপ্রাণ মানুষ, স্থানীয় নেতা, সংসদ সদস্য সবাই একসাথে তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। এত বড় ভুল মজিদ কখনো করত না। মজিদ বরং এই মানুষগুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে নিজে মাঝখানে বসে থাকত।

২০২১ সালে জেল হয়েছে, বেরিয়ে এসে আবার শুরু করেছে। এই জায়গাটায় এসে মানুষের মধ্যে দুইটা মত শোনা গেছে। একদল বলছে এটা নির্বুদ্ধিতা, আরেকদল বলছে এটা সাহস। কিন্তু দুটোর কোনোটাই তার কাজে আসেনি। কারণ বাংলাদেশে নির্বুদ্ধিতা আর সাহস দুটোরই পরিণতি মাঝে মাঝে একই হয়, বিশেষত যখন একটা পুরনো ভিডিও সঠিক সময়ে সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছে যায়।

এখানেই আসল ঘটনার শুরু । পুলিশ সুপার নিজেই বলেছেন ভিডিওটা পুরনো। কিন্তু আজকে কেন ভাইরাল হলো, কার মোবাইল থেকে ছড়াল, কোন গ্রুপে আগে পাঠানো হলো, এই প্রশ্নগুলো তদন্তে আছে বলে জানানো হয়েছে। বাংলাদেশে এই ধরনের তদন্তের পরিণতি সম্পর্কে আলাদা করে কিছু বলার নেই, পাঠক নিজেই অনুমান করতে পারবেন। যে মানুষটা ভিডিও ছড়িয়েছে সে হয়তো জানত কী হবে। হয়তো জানত না। হয়তো জানত এবং সেটাই চেয়েছিল। এই তিনটা সম্ভাবনার মধ্যে কোনটা সত্যি সেটা হয়তো কোনোদিন জানা যাবে না, কারণ যে জানত সে এখন আর বলার অবস্থায় নেই।

শামীমকে নিয়ে এখন দুইটা ভাষ্য চলছে। একদল বলছে সে ভণ্ড পীর ছিল, পরিণতি সে পেয়েছে। আরেকদল বলছে সে সুফি সাধক ছিল, তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। দুইটা দলই আসলে একই কাজ করছে, একটা মৃত মানুষকে লেবেল দিয়ে আসল প্রশ্নটা এড়িয়ে যাচ্ছে। আসল প্রশ্ন হলো সে যা-ই হোক না কেন, বিচার ছাড়া একটা মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার অধিকার কার আছে। ২০২১ সালেই মামলা হয়েছিল, আদালত ছিল, জেল ছিল। সেই প্রক্রিয়াটা চলতে দিলে কী এমন ক্ষতি হতো সেটা কেউ জিজ্ঞেস করছে না।

মজিদ উপন্যাসের শেষে বেঁচে ছিল। লেখক তাকে মারেননি কারণ মজিদরা মরে না, তারা রূপ বদলায়। শামীম মরে গেছে কারণ সে মজিদ ছিল না, সে ছিল মজিদের একটা নকল যে মূল চরিত্রের সবচেয়ে দরকারি গুণটাই রপ্ত করতে পারেনি। কিন্তু এই মৃত্যুতে যা তৈরি হয়েছে সেটা হলো একটা প্রমাণিত পদ্ধতি। একটা পুরনো ভিডিও ভাইরাল করো, মব তৈরি হবে, কাজ শেষ। আদালত লাগবে না, প্রমাণ লাগবে না, রায় লাগবে না। পরের বার এই পদ্ধতি কার উপর ব্যবহার হবে সেটা এখনো ঠিক হয়নি, তবে পদ্ধতিটা প্রস্তুত আছে।

কুষ্টিয়ার সেই কথিত পীর গণপিটুনিতে নিহত- যুগান্তর
নেচে-গেয়ে লাশ দাফনের পর সেই ‘ভণ্ডপীরের’ আরেক ভিডিও ভাইরাল- বাংলা ট্রিবিউন
অবশেষে সেই ‘ভণ্ড পীর’ শামীম গ্রেফতার- dhaka post



সর্বশেষ এডিট : ১১ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১০:৫০
৫টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পারমাণবিক বিস্ফোরণের আগে সন্তানের সাথে আমি যে কথাগুলো বলবো

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১১ ই এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৫:১০


যদি শুনি আজ রাত আটটায় পারমাণবিক বোমা হামলা হবে আমাদের এই শহরে, যেমন ইরানে সভ্যতা মুছে ফেলা হবে বলে ঘোষণা দিলেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী মহামান্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, তাহলে আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ ঝড়

লিখেছেন ইসিয়াক, ১১ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭


ঈশান কোণে মেঘ গুড়-গুড় হঠাৎ এলো ঝড়,
প্রবল বাতাসে ঘূর্ণিপাকে ধুলো মাটি খড়।

পাখপাখালি ত্রস্ত চোখে খুঁজছে আশ্রয়
বিপদাপন্নর চোখে মুখে নানা আশঙ্কা-ভয়।

কড়-কড়-কড় বাজ পড়ছে আলোর ঝিলিকে
প্রলয় তান্ডব  ঘটে চলেছে বাংলার মুলুকে।

মহাসংকটেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রান্সজেন্ডাদের উপর কারা হামলা করলো ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:৫৩


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গত সপ্তাহে সংসদে দাঁড়িয়ে একটি কথা বললেন যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর আগে কেউ সরকারিভাবে বলেননি। মানবাধিকার কমিশন নিয়ে আলোচনার মাঝখানে তিনি বললেন, বাংলাদেশে LGBT ইস্যু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সন্ধ্যা

লিখেছেন কালো যাদুকর, ১১ ই এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:১১

সময় নেই, এটাই কেন মনে আসে,
চিত্ত চঞ্চল হয় তব পিয়াসে,

তবে কি দিনের শেষে সন্ধ্যা নেমেছে
সুন্দর মুহূর্ত সাজিয়ে ওই আকাশে ।

আমার না হয় দিন গেল
পৃথিবীর সময় কেবল বেড়েই গেল,
তাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাল সালুতে মজিদ টিকে গিয়েছিল, শামীম সেটা পারেনি।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১০:৪৮


আজ শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর গ্রামের তৌহিদি জনতা মব করে একজন মানুষকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে মেরে ফেলেছে, তার আস্তানা ভাঙচুর করেছে, আগুন দিয়েছে। নিহত ব্যক্তির... ...বাকিটুকু পড়ুন

×