somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পশ্চিমবঙ্গে মমতা দিদি নিশ্চিত জিতে যেতেন যদি..

২৩ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আগামীকাল পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম ধাপ। গোটা রাজ্যে এখন যে উত্তাপ চলছে, সেটা এপ্রিলের গরমকেও হার মানাচ্ছে। এক দিকে মমতা ব্যানার্জি, তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেত্রী, টানা তৃতীয় মেয়াদের পর চতুর্থবারও মসনদ ধরে রাখার স্বপ্নে বিভোর। অন্য দিকে বিজেপি, যারা বছরের পর বছর ধরে "এবার বাংলা বদলাবে" বলে আসছে, আর বাংলা প্রতিবারই বদলায় না। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে, এটা সবাই জানে। কিন্তু আজকে এই লড়াইয়ের হিসাব নিকাশের মাঝখানে একজনের কথা মনে পড়ে গেল। মমতা দিদির কাছে এমন একজন ছিলেন, এবারও যদি তাকে মাঠে নামানো যেত, তাহলে হয়তো ভোটের হিসাবটাই অন্যরকম হয়ে যেত। সেই মানুষটার নাম ফেরদৌস আহমেদ।

বাংলাদেশের নায়ক ফেরদৌস। যার রাজনৈতিক জীবন একটি বটতলার উপন্যাসের মতো। শুরুটা নাটকীয়, মাঝখানে ট্র্যাজেডি, আর শেষটা এখনো রহস্যে ঢাকা। ফেরদৌসের নায়ক হিসাবে আসলে শুরুটা হয়েছিল কলকাতা থেকেই। ১৯৯৮ সাল। বাসু চ্যাটার্জির "হঠাৎ বৃষ্টি"। এক লহমায় দুই বাংলায় পরিচিত মুখ হয়ে গেলেন। দেখতে বেশ হ্যান্ডসাম, পর্দায় চোখ সরানো মুশকিল। কলকাতার দর্শক তাকে আপন করে নিল। টলিউডে নিয়মিত কাজ শুরু হলো, ঋতুপর্ণার সাথে বন্ধুত্ব হলো, দুই বাংলার সেতু হয়ে উঠলেন। ক্যারিয়ার বেশ ভালোই চলছিল, যদিও মাঝে মাঝে বাংলাদেশের পর্দায় "খায়রুন সুন্দরী" বা "বাংলার বউ" টাইপের ছবিতেও দেখা যেত, সেটা নিয়ে না হয় কথা না-ই বাড়ালাম।

কিন্তু ২০১৯ সালে ফেরদৌস নিজেই প্রমাণ করলেন যে তিনি শুধু পর্দার নায়ক না, মঞ্চেরও নায়ক হতে পারেন। লোকসভা নির্বাচন চলছে। উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ। বাংলাদেশ সীমান্তের একদম কাছে। তৃণমূলের প্রার্থী কানাইয়ালাল আগরওয়াল। আর সেই প্রার্থীর হয়ে জিপে চড়ে করণদীঘি থেকে ইসলামপুর পর্যন্ত রোড শো করছেন ফেরদৌস আহমেদ। সাথে টলিউডের অঙ্কুশ আর পায়েলও আছেন। মাইকে বলছেন, "সবাই তৃণমূলকে ভোট দিন, দিদিকে ভোট দিন।"

দৃশ্যটা একটু ভাবুন। একজন বাংলাদেশি নায়ক, বিজনেস ভিসায় ভারতে এসেছেন, শুটিং করার কথা ছিল, কিন্তু জিপে চড়ে ভোট চাইছেন। বিজেপি গগন বিদারি চিৎকার শুরু করল। নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ গেল। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নড়ে বসল। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ফেরদৌসের বিজনেস ভিসা বাতিল, "Leave India" নোটিশ, আর ব্ল্যাকলিস্ট, তিনটা একসাথে। সেই রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে ঢাকা। তারপর ক্ষমা চাইলেন। বললেন অনিচ্ছাকৃত ভুল। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকে করেছিলেন। ভালোবাসা থেকে বিদেশি ভিসা ভেঙে ভোট চাওয়া, এই যুক্তিটা ধোপে টিকলো না।

মমতা দিদির এবারের বিধান সভার নির্বাচনে যদি নায়ক ফেরদৌস থাকতেন তাহলে কী হতো? রায়গঞ্জ বা মালদহ বা মুর্শিদাবাদের সীমান্তবর্তী কোনো আসনে একটা রোড শো। জিপে উঠলেন ফেরদৌস, মাইক হাতে। "দিদিকে ভোট দিন" এই একটা বাক্যেই যে কাজ হতো, সেটা বিজেপির দশটা জনসভায়ও হতো না। কিন্তু সমস্যা হলো ফেরদৌস এখন সেই অবস্থায় নেই। কারণ ২০২৪ সালে তিনি নিজের জীবনে একটা নতুন পরিচয় যোগ করেছিলেন। বাংলাদেশের ১২তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে ঢাকা দশ আসন থেকে এমপি হলেন। ধানমন্ডি নিউমার্কেট এলাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ আসন। জিতলেনও। সংসদে গেলেন। শেখ হাসিনার সাথে ছবি তুললেন। সব মিলিয়ে জীবন তখন বেশ ছন্দেই চলছিল।

সেবারের নমিনেশন নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যাদের মনোনয়ন দিয়েছিল, কথিত আছে তাদের একটা বড় অংশ ছিল ভারতঘেঁষা পরিচিত মুখ। শিল্পী, তারকা, সংস্কৃতিজগতের মানুষ। অনেকে বলেন এই মনোনয়ন ছিল কৌশলী সিদ্ধান্ত, অনেকে বলেন ভোট টানার ফাঁদ। ফেরদৌস তো আছেনই, আরও অনেকেই সেই তালিকায় ছিলেন। যারা ভারতের সাথে নিজের যোগাযোগ আর পরিচিতিকে পুঁজি করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঢুকেছিলেন। যাই হোক, ফেরদৌস এমপি হলেন। কিন্তু সেই সুখ কপালে সাত মাসের বেশি সইলো না ।

আগস্ট ২০২৪। শেখ হাসিনা সরকারের পতন। সংসদ ভাঙল। ফেরদৌসের এমপি পদও গেল। আর তারপর নায়ক উধাও। মোবাইল বন্ধ। ফেসবুকে নীরবতা। কোথায় আছেন? দেশে না বিদেশে? গুঞ্জন আছে ভারতে আছেন। কোথায় ঠিক কেউ জানে না। তবে টলিউড নায়িকা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত জানেন। কারণ এই বছর তাঁর জন্মদিনে ফেরদৌস লুকিয়ে ঘরে বসে কবিতা লিখে পাঠিয়েছেন। ঋতুপর্ণা সেই কবিতা ফেসবুকে দিয়েছেন। আত্মগোপনে কবিতা লেখা, এটা নায়কের কাজই বটে।

এখন একটু ভাবুন। যে মানুষ ২০১৯ সালে বিজনেস ভিসায় এসে তৃণমূলের হয়ে ভোট চেয়েছিলেন, সেই মানুষ এখন হয়তো ভারতেই আছেন। আর আগামীকাল পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন। মমতা দিদি হয়তো জানেনই না, তাঁর সেই প্রচারকর্মী হয়তো রাজ্যের কোথাও বসে ভোটের দিন গুনছেন। কিন্তু মাঠে নামার কোনো উপায় নেই। ২০১৯ সালে ভোট চাইতে গিয়ে ব্ল্যাকলিস্ট হয়েছিলেন। ২০২৬ সালে হয়তো আছেনই সেই মাটিতে, কিন্তু এবার আর মাইক হাতে নেওয়ার সাহস নেই। কারণ এবার শুধু ভিসা বাতিল না, দেশে ফিরলে হত্যা মামলা অপেক্ষা করছে। থাকলেও বিপদ, গেলেও বিপদ।

এই হলো ফেরদৌস আহমেদের গল্প। দুই বাংলার নায়ক। কলকাতার "হঠাৎ বৃষ্টি" দিয়ে উত্থান, ঢাকায় আওয়ামী লীগের এমপি হয়ে মধ্যগগন, তারপর মাঝ আকাশে হঠাৎ মেঘের মতো মিলিয়ে যাওয়া। জীবনটা যেন তাঁর নিজের একটা সিনেমা। শুধু পরিচালক পালটে যায়, প্রতিটি দৃশ্যে। মমতা দিদি এবারের নির্বাচনে অনেক নায়ক-নায়িকা কে কাজে লাগাচ্ছেন। দেব আছেন, মিমি আছেন, সায়নী আছেন। কিন্তু একটা মানুষ নেই। ফেরদৌস। আর সেটাই হয়তো তৃণমূলের সবচেয়ে বড় অভাব এই মুহূর্তে। মাঠে থাকলে হয়তো দিদিকে জিতিয়েই বাংলা ছাড়তেন ।

https://www.deshrupantor.com/136559

সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:০২
৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার একশততম পোস্ট!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১৮



আমার একশততম পোস্ট!

আজ আমার লেখকজীবনের এক ছোট্ট কিন্তু হৃদয়ের গভীরে দাগ কাটা দিন- সামহোয়্যারইন ব্লগ এ আমার একশততম পোস্ট। সংখ্যার হিসেবে হয়তো ১০০ খুব বড় কিছু নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

খরচ

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:২৯


কোন কোন রাত্রি শেষের বেগুনী আলোয়
বাতাস যখন রতিতৃপ্ত দৃষ্টির মত কোমল-
উন্মোচনের আগ্রহে উদগ্রীব আলো
কী এক দ্বিধায় থমকে আছে পুবের দরজায়,
হঠাৎ যেন কেউ মাছের মত
ছেকে তোলে জালে।
লাগায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংসদের বায়না : ৩০ সেট গয়না

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:১৪

একসময় এই প্রবাদটি খুব প্রচলিত ছিল, এমনকি পণ্ডিত মহলেও এটি নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করা হতো।
সময় বদলে গেছে; যমুনা নদী দিয়ে বহু জল বয়ে গিয়ে সাগরে মিশেছে।



বাস্তবতার নিরিখে আমাদের সমাজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফুল ট্যাঙ্ক স্বপ্ন

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৬



শহরের সকালগুলো এখন আর আগের মতো নয়। সূর্য ওঠার আগেই পেট্রোল পাম্পের সামনে লম্বা লাইন পড়ে যায়। সেই লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে রিদম—একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আর জীবনের বাস্তবতায় আটকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশি দৃষ্টিতে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও ভারতের হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২৩ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:০৬


কাল থেকে দুই ধাপে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ভারতের কেন্দ্রীয় শাসনক্ষমতা ও মতাদর্শ দ্বারা যেমন প্রভাবিত, তেমনি এর প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশেও প্রতিফলিত হয়। ভারতে যখন হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×