somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিক্ষকের মর্যাদা

২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


কবিতাটার কথা কি মনে আছে? বাদশাহ আলমগীর একদা প্রভাতে গিয়ে দেখলেন, শাহজাদা এক পাত্র হাতে নিয়ে শিক্ষকের চরণে পানি ঢালছে, আর শিক্ষক নিজ হাতে নিজের পায়ের ধূলি মুছে সাফ করছেন। বাদশাহ সেদিন ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তাঁর পুত্র কেন নিজ হাত দিয়ে শিক্ষকের পা ধুয়ে দিল না? শিক্ষক মৌলভী যখন বাদশাহর এই মনের উদারতা বুঝতে পারলেন, তখন তিনি উচ্ছ্বাসভরে দাঁড়িয়ে সগৌরবে কুর্নিশ করে বলে উঠেছিলেন, "আজ হতে চির-উন্নত হলো শিক্ষাগুরুর শির, সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ আলমগীর।"

মৌলভী সেদিন বাদশাহকে মহান বলেছিলেন কারণ তিনি দেখেছিলেন, একজন সম্রাট হয়েও আলমগীর শিক্ষকের মর্যাদা রাজসিংহাসনের উপরে স্থান দিয়েছেন। সেই কবিতা আমরা ছোটবেলায় মুখস্থ করেছি। কিন্তু আজ আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে ক্ষমতার প্রভাবে শিক্ষকের শির ক্রমেই অবনত হচ্ছে। রাজধানী ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে সম্প্রতি যে ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটল, তা আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

গত ১৬ এপ্রিল, দশম শ্রেণির বিজ্ঞান ক্লাসে সহকারী শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পাল পদার্থবিজ্ঞান পড়াচ্ছিলেন। এক শিক্ষার্থী বারবার অন্য বিষয়ে কথা বলে তাঁকে বিরক্ত করছিল। স্যার তাকে বিষয়টা জিজ্ঞেস করলে সে বাংলার একটি সমস্যা বুঝিয়ে দিতে বলে। স্যার জানালেন, তিনি বিজ্ঞানের শিক্ষক। কিন্তু শিক্ষার্থী থামল না, আবারও দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করল। স্যার কাছে আসতেই সে হঠাৎ শিক্ষকের স্পর্শকাতর স্থানে(যৌনাঙ্গে) দুইবার জোরে চাপ দেয়। একজন ১৬-১৭ বছরের কিশোর যখন তার শিক্ষকের সঙ্গে এমন বিকৃত আচরণ করে, তখন সেটা শুধু বেয়াদবি নয়, সেটা একটা চরম সামাজিক অবক্ষয়। এই ঘটনার পর শিক্ষক পরিস্থিতি সামাল দিতে ওই শিক্ষার্থীকে তিনটি থাপ্পড় মারেন।

ওই শিক্ষার্থীর বাবা হাইকোর্টের বিচারপতি মো. আলী রেজা। অভিযোগ উঠেছে, তিনি নিজের বিচার বিভাগীয় ক্ষমতার জোর দেখিয়ে শিক্ষক দয়াল পালকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের মাধ্যমে নিজের বাসায় ডেকে পাঠান। ১৮ এপ্রিল সহকারী প্রধান শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে দয়াল স্যার সেই বাসায় পৌঁছালে সেখানে যা ঘটল, তা যেকোনো সভ্য মানুষের গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো। বিচারপতির স্ত্রী সরাসরি শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে বললেন, "এই তুই, ওর পা ধরে এখনই মাফ চা!" একজন শিক্ষককে "তুই" বলে সম্বোধন করা, তাঁর ছাত্রের পা ধরে ক্ষমা চাইতে বলা, এটা শুধু অশালীনতা নয়, এটা একটা সভ্য সমাজের মুখে চপেটাঘাত। এরপর বিচারপতি নিজেও শিক্ষককে অকথ্য ভাষায় অপমান করেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই শিক্ষককে তাঁরই ছাত্রের কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়।

একজন মানুষ যখন বিচারপতির আসনে বসেন, তিনি শপথ নেন যে ভয় বা অনুগ্রহের উপরে উঠে ন্যায়বিচার করবেন। কিন্তু নিজের সন্তানের করা এই কুৎসিত আচরণের বিচার না করে, উলটো একজন সাধারণ শিক্ষককে পুলিশের ভয় দেখানো এবং গ্রেপ্তারের হুমকি দেওয়া কি সেই শপথের চরম অমর্যাদা নয়? এই বিচারপতি কার বিচার করবেন, যিনি নিজেই ব্যক্তিগত অহংকারের বিচার করতে বসেন?

গত ২০ মাসে আমরা লক্ষ্য করছি, দেশে একের পর এক শিক্ষককে মব জাস্টিসের মাধ্যমে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। কোথাও ধর্ম অবমাননার মিথ্যা তকমা দিয়ে, কোথাও রাজনৈতিক তকমা দিয়ে শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করানো হচ্ছে। মুন্সিগঞ্জের হৃদয় মণ্ডলের ঘটনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যে চিত্র আমরা দেখেছি, তাতে স্পষ্ট যে শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা আজ শূন্যের কোঠায়। শিক্ষার্থীরা বুঝে গেছে, একবার "ধর্ম" বা "ক্ষমতা"র অস্ত্র ব্যবহার করতে পারলে শিক্ষককে জিম্মি করা খুব সহজ।

আমরা আগেকার দিনের নাটক বা সিনেমায় দেখতাম, শিক্ষক রাগ হলেও অভিভাবকরা এসে হাতজোড় করে বলতেন, "মাস্টার মশাই, ও তো আপনারই সন্তান, ওকে মানুষ করার দায়িত্ব আপনার।" কিন্তু এখনকার নাটকে কেবল ক্ষমতার দাপট আর অহংকারের লড়াই দেখানো হয়, যা দেখে বাচ্চারা কিছুই শিখছে না। একটা পুরনো নাটকের কথা এখনো মনে আছে, যেখানে শিক্ষক শাসন করার সময় ছাত্র তাঁর বেত কেড়ে নিয়েছিল। বহু বছর পর সেই ছাত্র যখন অপরাধের পথে পা বাড়িয়ে পুলিশের কাছে ধরা পড়েছিল, তখন সে অনুভব করেছিল, শিক্ষকের সেই শাসনই আসলে তার জীবনের শেষ রক্ষা হতে পারত। আজকের অভিভাবকরা সন্তানদের যে অন্ধ প্রশ্রয় দিচ্ছেন, তাতে তারা আসলে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিজেই ধ্বংস করে দিচ্ছেন।

বাদশাহ আলমগীর আর আজকের এই বিচারপতি বাবার মতো মানুষদের মানসিকতার তুলনা করলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই আসে না। পাঠ্যবইয়ে "শিক্ষাগুরুর মর্যাদা"র মতো কবিতাগুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। শুধু মুখস্থ করার জন্য নয়, এই নীতিগুলো অন্তরে লালন করার জন্য। শিক্ষকের মর্যাদা যদি সমাজ রক্ষা করতে না পারে, তবে সেই জাতি কোনো দিন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। যে সমাজ শিক্ষককে অপমান করে, সেই সমাজ আসলে নিজের ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। বাদশাহ আলমগীর সেদিন শিক্ষকের শির উন্নত করেছিলেন বলেই তিনি ইতিহাসে মহান হয়েছিলেন। আজ আমাদের অভিভাবক ও বিচারকদেরও সেই মানসিকতা ধারণ করা জরুরি।

বিচারপতির বাসায় নিয়ে শিক্ষককে অপমান, জোর করে ক্ষমা চাওয়ানোর অভিযোগ-দৈনিক শিক্ষাডটকম
কী ঘটেছিল উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে-দৈনিক শিক্ষাডটকম

সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৯:২৮
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যে শহরে বৃষ্টি নেই

লিখেছেন রিয়াজ দ্বীন নূর, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:৩০



শহরটা নিচে। অনেক নিচে। রিকশার টুংটাং, বাসের হর্ন, কারো হাসির শব্দ, কারো ঝগড়ার শব্দ — সব মিলিয়ে একটা জীবন্ত শহর। কিন্তু রিয়াজের কাছে এই সব শব্দ এখন অনেক দূরের।... ...বাকিটুকু পড়ুন

Dual Currency Card Needed for Meta Monetization. Urgent National Interest.

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৭:৪৬

ছবি

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি প্রায় চল্লিশ মিনিট। এক জায়গায় এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে সাধারণত দুই ধরনের সন্দেহ হয়- এক, লোকটা কিছু করতে এসেছে। দুই, লোকটার করার কিছু নেই। আমি কোনোটাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

’দেশ বিক্রির অভিযোগ, কাঠগড়ায় ইউনূস–জামাত–বিএনপি–এনসিপি”

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:১৩

’দেশ বিক্রির অভিযোগ, কাঠগড়ায় ইউনূস–জামাত–বিএনপি–এনসিপি”
==========================================
চুক্তি মানেই তো স্বার্থের ভারসাম্য। কিন্তু সেই ভারসাম্য যখন দেশের স্বার্থকে উপেক্ষা করে, তখন সেটি আর চুক্তি থাকে না প্রশ্নবিদ্ধ সমঝোতায় পরিণত হয়। ইউনূসের শেষ সময়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

গুপ্তদের সকল অপকর্মের তদন্ত হোক....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:৪৮


সময় যত যাচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে অস্বস্তিকর সত্য!
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে- আর অতীতের অনেক ঘটনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ, সাক্ষ্য ও তথ্য সামনে আসছে-
যেখানে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী... ...বাকিটুকু পড়ুন

হযরত ইব্রাহীমের (আ.) কুরাইশ আহলে বাইতের মধ্যে হযরত আলীর (রা.) মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের সময় সবচেয়ে কম

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:৫৯



সূরাঃ ২ বাকারা, ১২৪ নং আয়াতের অনুবাদ-
১২৪। আর যখন তোমার প্রতিপালক ইব্রাহীমকে কয়েকটি বাক্য (কালিমাত) দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন, পরে সে তা পূর্ণ করেছিল; তিনি বললেন নিশ্চয়ই আমি তোমাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×