somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চিরকুমারসন্দর্শন

০১ লা নভেম্বর, ২০১৯ দুপুর ১:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


কোন নারী যদি একা জীবন কাটাতে চায় তখন তাকে সমীহের চোখে দেখা হয়! স্বাধীনচেতা, আত্মনির্ভরশীল, পুরুষের দাসত্ব বিরোধী ইত্যাদি ইত্যাদি বিশেষণে অলঙ্কৃত হয় সে! কিন্তু একজন পুরুষ যদি একা জীবন কাটাতে চায় তখন সমাজ তাকে প্রশংসা নয়, বলা যায় খুবই নিকৃষ্ট করে দেখে!

মন্তব্যটা নারী পুরুষ বিদ্বেষ মূলক ঠেকতে পারে বা দুর্বোধ্য শোনাতে পারে; এখানে বিদ্বেষের কিছু নেই, বাস্তবতাটা বিশেষ একটা সমস্যা তুলে ধরতেই উল্লেখ করা হল, পরবর্তী পাঠে তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে বলেই বিশ্বাস করি।

পরিবার বিষয়টা সহজে মানতে চায়নি, জোর করে বিয়ে দেবার চুড়ান্ত সব চেষ্টা করেছে, আমি শেষমেশ মানাতে পেরেছি যে আমার কারও প্রতি কোন অভিযোগ নেই, নিজের ব্যক্তিগত দর্শনের কারণেই আমি বিয়ে বিহীন একাকী জীবন কাটাতে চাই! খুব সহজে মানেনি কেউ, পনেরটা বছর ঘর ছেড়ে অন্য শহরে গিয়ে ছিলাম। আমার মা শোকে শোকেই মারা গেলেন! আমি নিশ্চিত, আমার পরিবারের সবাই অর্থাৎ ভাই বোন এবং মরার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মা নিজেও- আমার এই একাকী জীবনের জন্য প্রত্যেকেই নিজ নিজকে দায়ী ভেবেছে! জীবিতরা এখনও ভাবছে!

আমার বয়স এখন আটচল্লিশ! বুড়ো হয়ে গেছি পুরোপুরি! আমার ভাই বোন নিজ নিজ সংসার জেঁকে বসেছে, তবু সবার সহমর্মিতার অর্ধেক দৃষ্টি থাকে আমার দিকে! ওরা পারলে আমাকে এখন শিশুর মতই লালন পালন করতে চায়! কিন্তু ওদের তো সংসার আছে, নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন আছে, আমি সেখানে ঝামেলা হব না বলেই নিজের পথ নিজে করেছি। একা একটা বাড়িতে থাকি। বাড়িটা কোনমতে নিজে করেছি। একজন চিরকুমারকে কোন বাড়িওয়ালা যে বাসা ভাড়া দিতে চান না এই সহজ সত্যটা আপনারা সকলেই তো জানেন!

চিরকুমারের জীবন কাটাতে গিয়ে যেসব সমস্যার শিকার হয়েছি তাই লিখছি এখন। একজন পুরুষ বিয়ে করছে না মানেই প্রথমে সবার যে চিন্তাটা মাথায় আসে তা হল পৌরুষের অক্ষমতা! সবাই সন্দেহে ভোগে, নিশ্চয়ই সঙ্গমের ক্ষমতা নেই, কিংবা হিঁজড়া নয় তো!
কী অদ্ভুত না? মানদণ্ড এই সঙ্গমের যোগ্যতা! কানাঘুষা শুনতে হয়েছে বিস্তর! অনেকে ইঙ্গিতে এমনও জানতে চেয়েছে যে উত্তেজনা উঠলে কী কী করেন! কেউ কেউ সমকামী ভেবেও এড়িয়ে চলেছে! কখনও কোন বাচ্চাকে কোলে নিতে গেলেও তা ভালোভাবে নেওয়া হয়নি। বিকৃত যৌনরুচির বলে সন্দেহ করেছে! চিরকুমার হতে গিয়েই জেনেছি, সব কিছুরই আবর্তে মানুষের কেবলই যৌন চেতনা! ওটাই প্রধান মাপকাঠি!
কোথাও গেলে পেছনে অনেকগুলো সন্দিহান চোখ আটকে থাকে আমার দিকে, আমি টের পাই!

তারপর থেকে আর কারও বাচ্চাকে কোলে নেবার সাহস হয়নি। একটা সন্তানের লোভ আমার বরাবরই হত। একবার বাচ্চা দত্তক নেবার সিদ্ধান্ত নিলাম। যোগাযোগ করলাম এক এতিমখানায়! আমি বিবাহিত নই জেনে তারা আর রাজি হল না! আমার নিজেরই সংসার নেই, আমি বাচ্চা পালব কিভাবে! তার উপর আমার শখ ছিল একটি মেয়ের! কোন কর্তৃপক্ষই রাজি হল না, কেউ কেউ পার্ভার্ট বলে সন্দেহও করল! আশা ছেড়ে দিলাম শেষমেশ!

দিনকে দিন বিচ্ছিন্ন হতে লাগলাম সমাজ থেকে, একঘরে হয়ে পড়লাম পুরোপুরি! এখন বয়স আটচল্লিশ, চামড়ায় ভাজ পড়েছে, মাথার চুল ঝরে গেছে অনেকাংশেই, নিজের চিরচেনা শরীরটাকে দুর্বল হিসেবে আবিষ্কার করতে আরম্ভ করেছি! প্রায়ই মনে হয়, এই একটা মানবজীবন পেলাম, কেমন তরতর করে শেষ হয়ে গেল! কবি শহীদ কাদরী মারা গেলেন জার্মানিতে, খবর পেলাম! মরার সময় নাকি কেউ পাশে ছিল না! কবি হেলাল হাফিজের কথা শুনলাম, একা থাকেন, এক গ্লাস পানি ঢেলে দেবার মত একজন মানুষের অভাবও কখনও কখনও বোধ করেন! এই বার্ধক্যে এসে এখন নতুন করে ভাবতে বসেছেন, আজীবন একা থাকার এই সিদ্ধান্ত কি ভুল ছিল, না সঠিক!

আমি বুঝতে পারি, একা একা মরে যাবার মত কষ্টের কিছু নেই। জীবন একটাই পেয়েছি, হিসেব কষিনি, দেনা পাওনাও রাখিনি। একা থেকে ভুল করেছি কি না ভাবি না কখনও, শুধু জানি, আবেগের অসম্মান করিনি, যা আমার কাছে সুন্দর ছিল, তাকে নষ্ট হতে দিইনি।

জীবনের যা সঞ্চয় তা দিয়ে একটি এতিমখানা খোলার কথা ভাবছি, আমার এই বাড়িটাতেই শুরু করব। একটি সন্তানের হাহাকার ছিল, এবার আমি শত শত শিশু পাব, আমার নিজের রক্ত কথা না বলুক, শত সন্তানের রক্ত আমার হয়ে কথা বলবে সেই বা কম কী!

শুভরাত্রি!
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা নভেম্বর, ২০১৯ দুপুর ১:০৮
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রতি বছর জুলাই আসলেই কি কাউয়া ক্যাচাল লাগতে হবে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:৫০


জুলাই মাসটা আবার ঘুরে ফিরে আসতেই দেশের রাজনৈতিক পাড়ায় পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা গত দুই বছর আগের আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলেছেন, তাদের কাছে এই জুলাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা ভয়ংকর

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সকাল ৮:৪৯



বাঙালির উদরঘাটতি থাকলেও উৎসবে সদা মশগুল!
দ্যাশ নতুন কইরা স্বাধীন হইছে গো!
রঙবেরঙে পতাকায় বিলুপ্ত স্বজাতির মানচিত্র!

শুধু পতাকায় সীমাবদ্ধ নেই!
মনে হচ্ছে পাল্টে গেছে জাতীয়তা!
মধ্যরাতে ভেঙে যায় সুনিদ্রা কর্কশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:০১


জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

আমাদের দৃষ্টিতে, তথাকথিত "জুলাই" বাংলাদেশের জন্য কোনো গৌরবের অধ্যায় নয়; বরং এটি জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, অর্থনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাপান যেভাবে মাত্র ৭ বছরে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭



জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়াতো ইকেদা ১৯৬০ সালের শেষভাগে তাঁর বিখ্যাত "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" বা "আয় দ্বিগুণকরণ পরিকল্পনা" চালু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জাপানের অর্থনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাংগুক অচলায়তন

লিখেছেন মাসুদ রানা শাহীন, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৯


ভয় পাবেন না
আশার পিদিম জ্বালিয়ে রাখুন
প্রাণের ধুকপুকি জাগিয়ে রাখুন
হেরে যাবেন না।

ঘাবড়াবেন না
নতুন স্বর ও সাহসী উচ্চারণে অনবদ্য হোন
ক্ষুরধার সৃষ্টির ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত হোন
থামবেন না।

নগদমূল্যে বিকোবেন না
ক্লান্ত শিরায় নতুন রক্ত বইয়ে দিন
তাতিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×