somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ রজনী

২৩ শে জুলাই, ২০১৬ রাত ১:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



চোখ খুলে ত্রিশ সেকেন্ড লাগলো আশেপাশের পরিবেশটা বুঝতে ।
অবশ্য চোখ না খুলেও রাতুল বলে দিতে পারতো এটা হাসপাতাল বা ঐধরনের কোন জায়গা । ফিনাইলের কড়া গন্ধ এসে নাকে লাগছে । তারপরেও চোখখুলে নিজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হলো । শুয়ে আছে ছোট্ট একটা কেবিনে । মোটামুটি গোছালো একটা কেবিন । দেয়ালের রঙ এবং বেডের কাপড় দেখে বলে দেওয়া যায় এটা একটা মাঝারি গোছের প্রাইভেট ক্লিনিক । বাঁ হাতটা নাড়াতে গিয়ে অসাড়তা টের পেলো । মাথাটা সামান্য বাঁ দিকে কাত করতেই দেখতে পেলো একটা সুচ নিজের বাঁ হাতে ফোড়ানো সেই সুচের অপর প্রান্তে ঝোলানো প্লাস্টিকের বোতল ভর্তি সাদা তরল । ঢেকির মত নির্দিষ্ট সময় দম নিয়ে সেই তরল ফোটায় ফোটায় পাইপের মধ্য দিয়ে রাতুলের দেহে প্রবেশ করছে । সেদিকে নজর নিয়ে যেতেই ভেতরে তরলের যাতায়াত অনুভব করলো । ডান দিকে তাকাতেই আরেকটি বেডে রাতুল তার মা মাহমুদা খাতুন কে দেখতে পেলো । বেচারী ঘুমে ঢুলুঢুলু করছে , অথচ ঘুমাচ্ছে না । হয়তো রাতুলের জন্যই সে জেগে আছে । মায়ের মাথার উপরের দেয়ালঘড়িতে তখন রাত তিনটার মতো বাজে । এতক্ষন পর রাতুলের মাথা কাজ করা শুরু করে দিয়েছে । সে নিজেকে জিজ্ঞেস করল , " আমি এখানে কেন ? "
মাথার প্রতিটা কোনা কোনা খুজেও সে প্রশ্নের কোন উত্তর মিললো না । শুধু মাথার পেছনে একটা গরম অনুভুতি টের পেলো । মনে হচ্ছে সেখানে কেউ একটা লোহার শিক চেপে ধরে আছে । লোহার শিকের কথা মনে আসতেই মনে পড়ে গেলো অতীতের সব স্মৃতি । খুজে পেলো তার হাসপাতালে আসার রহস্য ।

সেদিন সকাল সাড়ে সাতটা
রাতুলের ঘুম ভাংলো তার মায়ের মধুর চেচিমেচিতে । নাহহ এটা নতুন কোন ঘটনা না রাতুলের প্রতিদিন ঘুম ভাঙ্গে এই শব্দে । এই শব্দ না শুনলে মনে হয় তার ঘুম ভাংবে না । পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে অন্যের ঘুম ভাঙ্গানো । এই কাজটা মাহমুদা খাতুন খুব ভালো করে এবং সহজে করতে পারেন । রাতুলের ধারনা ঘুম ভাঙ্গানোর উপর যদি নোবেল পুরস্কার দেওয়া হতো তাহলে সেটা তার মাইই পেতেন । রাতুলদের এই ছাদপেটা একতলা বাড়িটায় যে চারটা শোবার ঘর আছে তাদের ভেতরে আরাম করে ঘুমানো সকল প্রানীর ঘুম ভাঙ্গানোর কাজ খুব নিপুণ ভাবে গত একত্রিশ বছর ধরে করে আসছেন তিনি । যদিও এই সংসার নিয়ে তার অভিযোগ এর শেষ নেই । তার মোট অভিযোগ দিয়ে যদি বই লেখা যায় তাহলে সেটার সাইজ মোটামুটি দেড় হাজার পৃষ্ঠার তো হবেই । রাতুল ইদানিং মায়ের অভিযোগ গুলো খুব মনো্যোগ দিয়ে শোনে । তারপর সেগুলো সে তার ডায়েরীর বিশেষ পাতায় সংরক্ষন করে রাখে । মাহমুদা খাতুন তার দুঃখের কথাগুলো বলে হয়তো একটু শান্তি পান আর রাতুল শান্তি পায় সেগুলো নিজ ডায়েরীতে লিখে ।
যাইহোক , ঘুম থেকে উঠে রাতুল বাথরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিলো । এরপর রুমে এসের ফোনটা হাতে নিয়ে মোবাইল ডাটা কানেশনটা অন করলো । সাথে সাথে মেসেঞ্জার টুং করে বেজে উঠলো । মেসেজ এসেছে দুইটা । একটা দিয়েছে ফাহিম - কিরে ক্লাসে যাবি না ?
আরেকটা দিয়েছে সুপ্তা - আজকে দেখা করতে পারবা ? ১০ টা, থিউনি পার্কে ?
প্রথম মেসেজটা না যতটা বিরক্তি ধরিয়ে দিয়েছে দ্বিতীয় মেসেজটা তার চেয়ে কয়েকগুন বেশী আনন্দ দিয়ে দিলো । আসলেই নিউটনের তৃতীয় সুত্র সবজায়গায় খাটে । সুপ্তা রাতুলের গার্লফ্রেন্ড । বেচারা রাতুল লাস্ট তেড় দিন থেকে সুপ্তার সাথে দেখা করে নি । আজকে দেখা করতে পারবে শুনে মনে মনে গ্যাংনাম স্টাইলে নেচে নিলো । তার কাছে মনে হচ্ছে ঈদের চাঁদ ৩ মাস আগেই তার মনের আকাশে উঠে গেছে ।দুনিয়ার সবকিছু এক মুহুর্তের জন্য হলেও ভুলে যেতে বাধ্য হলো । কিছুক্ষন মনের সুখে রোমান্টিক গান গেয়ে নিলো ।
তোমাকে বেসেছি কত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে ......
গলার স্বরটা মনে হয় একটু বেশিই উচু হয়ে গেছিলো , পাশের রুম থেকে মাহমুদা খাতুন ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন, কাকে এত ভালোবাসছিস ? হা ?
ব্যাপারটার জন্য একেবারেই তৈরী ছিলো না রাতুল । “তোমাকে বেসেছি মা”, কথাটা বলে কোনরকমে তখনকার মত ব্যাপারটা ধামাচাপা দিয়ে দিলো । এদিকে মাহমুদা খাতুন ছেলের কথা শুনে একরকম অবাকই হলো । কি হয়েছে ছেলের আজ !
সে কি আর জানে ছেলে আজকে ডেটিং এ যাবে ।
অনেকদিন পর গত ঈদে মায়ের দেওয়া দামি টিশার্ট টা গায়ে চাপিয়ে নিলো । পারফিউমটা দিবে দিবে করেও দিয়ে ফেললো । বাইরে বের হয়ে দ্যাখে মা দাঁড়িয়ে হাতে নাস্তার প্লেট । সেটা শেষ করে বের হয়ে গেলো বাসা থেকে ।
আজকে সে অনেক খুশি । সে আর এমনি এমনি আশাহীন পথের পথিক হয়ে আজকে ঘুরবে না । সে আজকে যাচ্ছে ডেটিং এ । এই অনুভুতির বর্ণনা কখনো কোন কবি সাহিত্যিকের লেখায় উঠে আসে নি । এ এক অকৃত্রিম আবেগের সুখময় অনুভুতি । এখানে কোন ভাষার দরকার হয় না । এখানে কবি নীরব । নীরব কবি এই দৃশ্যের বর্ননায় এক গাদা মুচকি হাসি ছাড়া আর কিছুই দিতে পারবে না ।
খুশি মুখেই রাতুল রিকশা ডাক দিলো ।
- রিকশা যাবা
- কোথায় মামা ?
- থিওনি পার্ক
- ভাড়া কিন্তু মামা ৭০ টাকা ।
- কি কও ! ভাড়া না ৪০ টাকা ?
- মামা রাস্তায় জাম বেশি ভাড়া বেশি দেওয়া লাগবে নাইলে যামু না ।
- ওহ আচ্ছা চলো ।
অন্যদিন হলে হয়তো মেজাজ খারাপ করে রিকশাওয়ালার উদ্দেশ্যে দুয়েকটা পবিত্রবানী ছুড়ে দিত । কিন্তু আজকে তার খুশির দিন । এদিনে সে খারাপ ব্যাবহার করতে চায় না । মনে মনে চিন্তা করতেছে এম বি এ না করে যদি রিকশা চালাইতো তাহলেই ভালো করতো । পরের উপর নিজের কথার জোর কিভাবে খাটাতে হয় সেটার সর্বোচ্চ ব্যাবহার এই রিকশাওয়ালারাই পারে ।
রিকশা এসে থামলো থিওনি পার্কের গেটে । ঘড়িতে সময় তখন নয়টা পনের মিনিট । এখনো পয়তাল্লিশ মিনিট বসে বসে অপেক্ষা করতে হবে !
তবে কিছু অপেক্ষা মধুর থেকেও মধুর হয় । কোন কোন সময় এই অপেক্ষার জন্যই অপেক্ষা করতে হয় । রাতুল বিশ টাকার বাদাম কিনে একটা বেঞ্চে এসে বস্লো । করুক রাতুল সুপ্তার জন্য অপেক্ষা ।
চলবে ...

সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুলাই, ২০১৬ রাত ১:৪৩
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

উচ্চবংশীয় ছাগল!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০৯



এককালে কেবল ঘড়িতেই বাজতো টিক টিক- টিক টিক;
বারবেলায় এসে দেখছি টিক টিক বলে কিছু নেই আর ঠিক ঠিক!
বরং 'টিকটক'- এ আকণ্ঠ বুদ হয়ে আছে আবালবৃদ্ধবনিতা!
মানুষের লম্ফঝম্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডাইভারসিটি ভিসা লটারি আবার চালুর নির্দেশ আদালতের

লিখেছেন শিমুল মামুন, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৬



যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৭ অর্থবছরের ডাইভারসিটি ইমিগ্র্যান্ট ভিসা (ডিভি লটারি) লটারির নিবন্ধন আবার চালু করতে ট্রাম্প প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন একটি ফেডারেল আদালত। আগামী ১ নভেম্বরের মধ্যে আবেদন গ্রহণ শুরু করতে এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

“‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’: ঘোষণার পর রাষ্ট্র কতটা বদলায়?”

লিখেছেন raselabe, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৪

রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি পরিকল্পনা তখনই কার্যকর রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে রূপ নেয়, যখন তা ব্যক্তিগত ঘোষণা থেকে বেরিয়ে সুস্পষ্ট নীতি, নির্দিষ্ট দায়িত্ব, বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা এবং পরিমাপযোগ্য জনকল্যাণের লক্ষ্যে পরিণত হয়।

এখানে নেতৃত্বের প্রথম... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোন কিছুর অস্তীত্ব বিহীন মহাশূন্যে অস্তিত্বের প্রক্রিয়া কি ছিল?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৭



কোন কিছুর অস্তীত্ব বিহীন মহাশূন্যে অস্তিত্বের প্রক্রিয়া হলো উদ্ভব। কারণ সৃষ্টি বা তৈরী কারক না থাকা। তাতে কী উদ্ভব হবে এটা অনিদৃষ্ট। কারণ এটা নিদৃষ্ট করার কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মক্কা থেকে বদর: মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ভূরাজনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৫


মুসলিম বিশ্বে ঐক্যের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। অন্তত চুক্তিগুলোর নাম শুনলে তেমনটাই মনে হয়। মক্কা ও বদর। মুসলিম ইতিহাসের দুটি পরিচিত নাম। নাম শুনে মনে হতে পারে, বহুদিনের বিভেদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×