somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাশিয়া 1919 (পর্ব 4, মস্কোর প্রথম দিনগুলি)

২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ সকাল ১০:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

4.

দিনটা ছিল প্রচন্ড ঠান্ডা । আমি ট্রেন থেকে নেমে মেত্রোপোল হোটেলে যাবার জন্য স্লেজ-চালকদের জিগ্যেস করতেই ওরা একশো রুবল চেয়ে বসল । একবছর আগে আমি যখন কর্নেল রবিন্স এর সাথে এসেছিলাম তখন আমরা সর্বোচ্চ দশ রুবল ভাড়া দিতাম, অধিকংশ সময় আট রুবলেই হয়ে যেত । অনেক কথা কাটাকাটির পরে পঞ্চাশ রুবলে রফা হল, আমার সাথে লাগেজ বলতে ছিল কেবল একটা টাইপরাইটার ।

রাস্তায় পুরু হয়ে বরফ জমে আছে, পেত্রোগ্রাদের থেকে কম পরিস্কার, তবে গত বছরের মস্কো থেকে বেশি সাফ করা হয়েছে । রাস্তায় ট্রাম চলছে, এবং আমার মনে হল প্রায় ততগুলো স্লেজ চলছে রাস্তায় । স্লেজটানা ঘোড়াগুলোর স্বাস্থ্যও গত গ্রীস্মের থেকে সামান্য ভাল বলে মনে হল । আমি স্লেজ-চালককে জিগ্যেস করতে ও বলল এখন মানুষের ঘোড়াদেরও সামন্য যবের রেশন দেয়া হয় । অনেক লোকজন আছে রাস্তায়, কিন্তু বন্ধ দোকানপাটের সংখ্যা দেখলে মন খারাপ হয় । আসলে তখন সমস্ত ব্যাবসা বানিজ্যের জাতীয়করণ চলছিল, আমি যাওয়ার আগেই বেশ অনেক দোকান আবার চালু হয় সমবায় হিসেবে । নতুন দোকান গুলোর নাম ছিল অনেকটা এরকম, '5 নম্বর বুটের দোকান, মস্কো সোভিয়েত,' '3 নম্বর কাপড়ের দোকান মস্কো সোভিয়েত,' '11 নম্বর বইয়ের দোকান মস্কো সোভিয়েত' ।

ফটকাবাজরা যা করত তা হচ্ছে ধরা যাক আধা ডজন ওভারকোট কিনে সবচেয়ে বেশিদাম যে হাঁকছে তার কাছে বিক্রি করে দিল, যে ভাবে টাকা আছে এমন লোকেরাই জিনিস কিনতে পারত । একন কেউ যদি কাপড় পেতে চায় তাকে তার আবাসিক কমিটিতে গিয়ে পুরনো কাপড় দেখিয়ে কমিটকে সন্তুষ্ট করতে হবে যে তার সত্যিই নতুন কাপড়ের প্রয়োজন । ফটকাবাজি বন্ধ করার জন্যই এমন করা হয়েছে । মেত্রোপোল হোটেলে আমার জন্য অন্য চমক অপেক্ষা করছিল । দেয়ালে গত গ্রীস্মের শেলের গর্ত আর গুলির দাগ মেরামত করা হয়েছে ।

লিতভিনভ আমাকে একটা চিঠি দিয়েছিলেন পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিশারিয়েটের কারাখানকে দেয়ার জন্য । দাড়ি-গোঁফ সজ্জিত কারাখান (অথবা কারাহান, যেহেতু রুশ ভাষায় 'খ' এর উচ্চারণ হ এর মত হয়) সুপুরুষ আর্মেনিয়ান, রাদেকের ভাষায় 'একজন ক্লাসিকালসৌন্দর্যমন্ডিত গর্দভ' । কারাখান সবসময়ে বহির্বিশ্বের সাথে মানিয়ে চলার পক্ষপাতি, বললেন অভ্যাতদের ক্রেমলিনে থাকার ব্যাবস্থা করা হয়েছে । আমি যখন বললাম, আমি ক্রেমলিনে থাকার চেয়ে একটা সাধারন হোটেলে থাকাই বেশি পছন্দ করব, তখন তিনি হোটেলের অনুমতি যোগাড় করে দিলেন । কাজটা মোটেই সহজ ছিল না, কারন এজন্য নির্বাহী কমিটির স্ভের্দলভের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হল আমি মেত্রোপোল হোটেল বা ন্যাশনাল হোটেল, এ দুটোর কোন একটাতে আমি থাকতে পারি । প্রথমটা সাধারনত সরকারী ডেলিগেটদের জন্য, তবে দেখা গেল দুটো হোটেলই একেবারে ভর্তি । অতএব আমাকে লোসকুৎনায়া হোটেলে জায়গা দেয়া হল, যেটা তখন নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের থাকার জায়গা ছিল ।

থাকার জায়গা কাপড়ের মতই বরাদ্দ করা হত, জরিপ চালিয়ে মানুষে চাহিদা মাপা হচ্ছিল । আবাসিক কমিটিতে গিয়ে সবাই থাকার জায়গার জন্য আবেদন করতে হবে । প্রত্যেকের একটা করে কামরা থাকবে যতক্ষণ না সবার জন্য দুটো কামরা পাওয়া যায় এই নীতিতে বিশ্বাসী কর্তৃপক্ষ । মস্কোর কাছের এক কারখানা ম্যানেজার বললেন তাঁর বাড়ির একট অংশ কারখানার শ্রমিকদের থাকবার জন্য দিয়ে দেয়া হয়েছে । এই আইন অবশ্যই বাড়ির মালিকদের ভীষন কষ্টকর, এবং অনেক নতুন লোক এসে বাড়ির অবস্থা বারোটা বাজিয়ে দেয় ।

কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর পররাষ্ট্র কমিশারিয়েটের চিচেরিনের সাথে কথা বললাম । কারখানের চেয়ে অনেক কম বন্ধুত্বপুর্ণ চিচেরিন, বয়স আনেক বেড়ে তাঁর । ইংল্যান্ডের কথা জানতে চাইলেন তিনি । আমি বললাম লিতভিনভ এ ব্যাপারে আমার থেকে ভাল জানেন । আজকেই লিতভিনভের একটা সাক্ষাৎকার টেলিগ্রাফ করে পাঠিয়ে দিয়েছি আমি । আমি ব্যাক্তিগতভাবে বললাম যে, রাশিয়ার মত একটা বিশাল দেশকে অবরোধ দিয়ে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না ।

এরপরে প্রাচ্য বিষয়ক কমিসার ভোযনেসেনস্কির সাথে আলাপ হলো আমার । মেত্রোপোলে খাবার জন্য একটা টিকেট দিলেন তিনি আমাকে । টিকেটটা ন্যাশনালে জায়গা পাবার পরে আমাকে ছাড়তে হয়েছিল । ডিনারে ছিল একপ্লেট স্যুপের সাথে অন্য একটা কিছু । প্রতি গ্লাস পাতলা চা ত্রিশ কোপেক করে বিক্রি হচ্ছে । আমার বোন আমাকে এক প্যাকেট স্যাকারিন দিয়েছিলেন । আমার বন্ধুরা যেভাবে স্যাকারিনে মিষ্টি করা চায়ের উপর বাচ্চাদের মত হামলে পড়লেন দেখে মায়াই লাগছিল আমার ।

মেত্রোপোল থেকে লোস্কুৎনায়া হোটেলে গেলাম আমি । ছ'মাস আগে এই হোটেলের পরিবেশ অনেকটা পরিচ্ছন্ন ছিল । কিন্তু নাবিকরা হোটেলটাকে কী রকম নোংরা করে ফেলেছে তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় । ঘর গরম করার কোন ব্যাবস্থা নেই আর খুব সামান্য আলোর ব্যাবস্থা হোটেলে । ঘরের কোন একটা পুরনো সামোভার আর ঘরভর্তি নানান আবর্জনা । বেয়ারাকে ডাকিয়ে এনে ঘরটাকে কিছুটা সাফ করলাম । একটা নতুন সামোভার আনানো গেল, কিন্তু কোন কাঁটাচামচ, চামচ বা ছুরি দিতে পারল না ও । অনেক কষ্টে পানি খাবার গ্লাস আদায় করা গেল ওর কাছ থেকে ।

টেলিফোনটা অবশ্য ভাল আছে এবং চা কাবার পরে আমি মাদাম রাদেকের সাথে কথা বললাম, উনি মেত্রোপোল থেকে ক্রেমলিনে চলে গেছেন । এখনো ক্রেমলিনে যাবার পাস পাইনি আমি । উনি বললেন কমান্ডান্টের কাছ থেকে পাস যোগাড় করে দিতে পারবেন তিনি । তুষার ঢাকা রাস্তা ধরে পার্কটার পাশ দিয়ে, সেতু পার হয়ে ক্রেমলিনের ফটকে এসে হাজির হলাম আমি । গাছের গুঁড়ি জ্বালিয়ে আগুন পোহাচ্ছে কয়েকজন সৈন্য । মাদাম রাদেক সেখানে হাত গরম করছিলেন, আমাকে তিনি ক্রেমলিনের ভিতরে নিয়ে গেলেন ।

ক্রেমলিনে তখন কমিসারদের একটা সন্মেলন চলছিল । প্রাচীন গির্জাগুলোর নীচে অনেকগুলো কালো রঙের মোটরগাড়ি বরফের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল । আমরা ডানদিকে মোড় নিয়েক্যাভালরি হাউজ আর পোতিশনি প্রাসাদের মধ্যে দিয়ে দ্ভোর্তযোভায়া স্ট্রিট ধরে হাঁটতে লাগলাম । একটা খিলানের নীচের ফটক দিয়ে খুব সম্ভবত প্লেজার প্যালেসে পা রাখলাম । এখানে বিপ্লবের ধ্বংস থেকে জমকালো বেঁচে যাওয়া গোবেলিন ট্যাপেস্ট্রি ঘেরা একটা কামরায় সুইস আন্তর্জাতিক আন্দোলনের নেতা কার্ল মুরকে দেখতে পেলাম । স্কটিশ নেতা কেইর হার্ডি আর হাইন্ডম্যানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বললেন ওঁরা সত্যিকারের সমাজতন্ত্রী ছিলেন । আমি এ দু'জন সম্বন্ধে কিছূ জানি না দেখে ভারী হতাশ হলেন তিনি ।

মাদাম রাদেক অবশ্যই রাদেক (কার্ল রাদেক) সম্বন্ধে জানতে চাইলেন । আমি বললাম স্টকহোমের কাগজে আমি পড়েছি ব্রুন্সইউকের প্রাসাদে আছেন । অনেক পরে আমরা জেনেছিলাম তিনি বার্লিনে আটক হয়ে জেলে গেছেন । গত ছয়মাসে কী কী পরিবর্তন আমি দেখতে পাচ্ছি সেটাও তিনি জানতে চাইলেন । পুরনো চেনাজানাদের খবর জানতে চাইলেন আমি । পিয়াতাকভ মিত্রপক্ষের কাছ থেকে উক্রাইনে জার্মানদের বিরুদ্ধে ব্যাবহারের জন্য মেশিনগান চাইছিলেন । শুনলাম এখন রাকোভস্কি পিয়াতাকভের জায়গা নিয়েছেন । খার্কভ স্বাধীনতা ঘোষনা করেছে, কিন্তু কিয়েভ এখনো মস্কোর নিয়ন্ত্রণে ।

সে রাতে হোটেলে ফিরে আমার এত ঠান্ডা লাগল যে আমি ভেড়ার চামড়ার কোট গায়ে দিয়ে উপরে সমস্ত কাপড়চোপড় আর তোষক চাপিয়ে শুলাম, তবু শীত গেল না । খুব খারাপ ঘুম হল আমার ।

আরেকটা ভাল জায়গা পাওয়ার জন্য তদবির আরম্ভ করে দিলাম । পথ চলতে চলতে দেখলাম মস্কোর রাস্তাগুলো নানান বিপ্লবী ভাস্কর্যে ভরে গেছে । কোনোটা খুব বদখত দেখতে, কোনোটা বেশ ইন্টারেস্টিং, দেয়ালের বিজ্ঞাপনগুলো স্থানীয় শিল্পীরা ছবি এঁকে ঢেকে দিয়েছে । এই আবহাওয়াতে অবশ্য এর বেশীরভাগই নষ্ট হয়ে গেছে, তবু বোঝা যায় কী দারুন গ্যালারি ছিল সে সব । একটা দালানের সামনের পুরোটা জুড়ে ছিল বিজ্ঞাপন, সেখানে এখন বিপ্লবের নানান মোটিফ নিয়ে বিশাল সব ছবি এঁকে ভরে দিয়েছে । ৎভেরস্কায়ার পুরো একটা ব্লক জুড়ে শোভা পাচ্ছে ফিউচারিস্ট শিল্পীদের পেইন্টিং । সব মিলিয়ে আগের মস্কোর একঘেয়ে হলুদ রঙের জায়গায় নানান ঝকমকে রঙের বাহার ।

কিন্তু ছবিগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া ভেড়ার চামড়ার কোট আর মাথায় রুমাল বাঁধা মহিলাদের দেখে মনে হচ্ছে মধ্যযুগের সাথে আধুনিক মস্কোর মেলবন্ধন ঘটেছে । বেশ কিছু প্রাচীনপন্থী লোক এসব অতি আধুনিক শিল্পীদের কার্যকলাপে বিরক্ত । সাধারন মানুষ বুঝতে পারএ এমন জিনিস আঁকা উচিৎ দাবী করে ওরা ।

সে সন্ধ্যায় ন্যাশনাল হোটেলে, বুড়ো রাইনস্টাইনের সাথে আলাপ হল আমার । রাইনস্টাইন, আমেরিকান সোশ্যালিস্ট লেবার পাটির্র সদস্য, বিপ্লবের নাড়ি-নক্ষত্র জানেন । কম করে হলেও রাইনস্টাইনের বয়স সত্তর, কিন্তু এখনো মস্কো সোভিয়েত বা নির্বাহী কমিটির কোন মিটিং মিস করেন না তিনি । সকাল সাতটায় মস্কোর এ মাথা থেকে ও মাথা ঘুরে বেড়ান, নতুন সোভিয়েত বাহিনীর অফিসারদের উদ্দেশ্যে লেকচার দেন ।

ইংরেজ যুদ্ধবন্দীদের ভাগ্য তাঁরই হাতে বলা চলে । ওদের বলশেভিক হবার কোন আশা তিনি দেখেন না । আমার সাথে করে কোন আমেরিকান পত্রিকা আনিনি দেখে তিনি দুঃখ করলেন । মস্কোতে যোগাযোগ বিভ্রাট নিয়ে তিনি অভিযোগ করলেন, বোধহয় সেদিন তিনি তৃতীয় ব্যাক্তি যে ওই প্রসঙ্গ তুলল । রাজনৈতিকভাবে সরকার তার অবস্থান শক্ত করতে পেরেছে বলেই তিনি মনে করেন, যদিও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ । ট্রেনের অভাবে খাদ্যশস্য শহরে এসে পৌঁছাতে পারছে না । এসব ব্যাপার রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে ।

ইংরেজ বন্দীদের প্রসঙ্গ তুললেন তিনি এরপরে । মস্কোতে যেসব বন্দী আছে, তাদের বিশেষ পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে, তারা শহরের যে কোনো জায়গায় আসতে বা যেতে পারে । আমি অফিসারদের কথা জিগ্যেস করতে তিনি বললেন ওরা কারাগারে বন্দী আছে, আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রতিনিধিরা ওদের সাথে দেখা সাক্ষাত করতে পারে । একবার রাইনস্টাইন আরখাংজগেল ফ্রন্টে একজন আমেরিকান আর একজন ব্রিটিশ বন্দী অফিসারকে নিয়ে গেছিলেন ওখানকার কোনো ফ্রন্টে একটা বিশেষ সাক্ষাৎকারের জন্য ।

একটা সেতুর মাঝখানে তাদের কথা হলো, রাইনস্টাইনের সাথে দু'জন রাশিয়ানও ছিল । ওদিকের আমেরিকানটা রাইনস্টাইনকে বলল তাদের এলাকায় যেতে । ও একটা হলফনামাও লিখে দিলো যে রাইনস্টআইনের কোন ক্ষতি হবে না (একজন রুশ সৈন্যের তার পিঠটা টেবিল হিসেবে ব্যাবহার করতে দিল) । সন্ধ্যায় যখন যাবার সময় হলো তখন আমেরিকানটা দুই বন্দী (আমেরিকান আর ব্রিটিশ) কে থেকে যেতে বলেছিল । কিন্তু ওরা রাইনস্টাইনের সাথে সেতু পার হয়ে রুশ এলাকায় চলে এল । হলফনামাটা আমাকে দেখালেন রাইনস্টাইন ।

শুনলাম পরদিন নাকি ন্যাশনাল হোটেলের এক গেস্ট চলে যাবে, মানে আমার একটা কামরা পাওয়ার আশা আছে । রাইনস্টাইনের কাছ থেকে ফিরে, কাপড়চোপড়ের পাহাড় বানিয়ে তার ভিতরে সেঁধিয়ে আবার ঘুমাতে চেষ্টা করলাম আমি ।

পরদিন ন্যাশনাল হোটেলে গিয়ে খোঁজ নিতেই কামরা পেয়ে গেলাম আমি । রুমটা চমৎকার, কিচেনের ঠিক পাশে বলে বেশ আরামদায়কভাবে গরম । তবে একশো গজ দূরের পুরনো হোটেল থেকে আমার জিনিসপত্র আনতে চলি্লশ রুবল গুনতে হলো । কিছ বই কিনলাম, যে সব মানুষে রসাথে দেখা হওয়া দরকার তাদের একটা তালিকা বানালাম ।

ঘরটা চমৎকারভাবে পরিচ্ছন্ন । সকালবেলা যে পরিচারিকা এখানে ঘর পরিস্কা করে সে যে কাজে ফাঁকি দেয় না, বোঝাই যায় । মেঝেতে দেশলাইয়ের কাঠি ফেলতে আমাকে বকা দিল সে । নতুন সরকার কেমন কাজ করছে জানতে চাইলাম আমি, মেয়েটা বলল খাবারের অভাব খুব বেশি, তবে পরিস্থিতি আগের থেকে ভাল ।

বিকালবেলায় নীচতলায় হোটেলের মুল কিচেনে নামলাম আমি, সেখানে গরম পানির ঢালাও বন্দোবস্ত আছে । একটা কিচেন শুধুমাত্র হোটেলের লোকজনের ব্যাবহারের জন্য । একদল লোক স্টোভ ঘিরে দাঁড়িয়ে । ওদের মধ্যে একজন ধুসরচুল কসাককে দেখলাম আমি । কসাক কেতায় বুলেটখচিত লম্বা ঝুলের সরু কোমরের কাল কোটের নীচে লাল টিউনিক পরে আছে সে । সু্যুপের বাটি গরম করছে সে, পাশে এক চশমা পরা সোভিয়েত সদস্যও খাবার গরম করছেন । দুটো ছোট মেয়ে পুরনো কৌটার মত্যে আলু সিদ্ধ করছে । চুলে নীল রুমাল বাঁধা একজন মহিলা কাপড় ইস্ত্রি করছেন । কেউ সম্ভবত বড় কড়াইটাতে কাপড় সিদ্ধ করছে ।

সারা হোটেল থেকেই মানুষ, কেটলি, জগ এমন কী কৌটা নিয়ে আসছে গরম পানি নেবার জন্য । কিচেনে এক পাশে খাটো একটা কাউন্টার মত রাখা, সেখান থেক সবাই টিকেট দেখিয়ে খাবার নিচ্ছে পাত্রে । রেঁস্তোরায় না গিয়ে সবাই নিজের কামরায় গিয়ে খাবে । হতে পারে ওদের ধারনা এভাবে ওরা বেশি খাবার পাবে । আমার সেরকম কিছু মনে হলো না । তাছাড়া আমার কাছে কোন সসপ্যান ছিল না ।

আমাকে তাতে সপ্তাহের দিনগুলো ছাপানো একটা কার্ড দেয়া হয়েছিল । দিনে একটা করে ডিনার পাবো আমি । খাবার দেয়ার সাথে সেদিনের নাম লেখা কাডের্র অংশটুকু ছিঁড়ে নেয়া হলো । ছিল একবাটি স্যুপের সাথে মাংস বা মাছের একটা পদ । খাবারের দাম পাঁচ থেকে সাত রুবলের মধ্যে ।

খাবার পাওয়া যেত দুপুর দুটো থেকে সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে । সকাল বেলাটা ক্ষুধার্ত অবস্থায় কাটিয়ে দুপুরে আমি এ ব্যাপারে আশ্বস্ত হতাম যে যেকোনো আমি খেতে পারি । এই আশ্বাসের বশবর্তী হবে আমি খাবারে সময় পিছিয়ে দিতাম এবং প্রায় সন্ধ্যা ছয়টায় সময় ডিনার সারতাম । বাইরের লঙ্গরখানাগুলিতে খোঁজ নিয়ে দেখলাম ঠিক একই খাবার একই পরিমানে দেয়া হয় সেখানে ।

একধরনের সহজ সমবায় ব্যাবস্থা গড়ে উঠেছিল সেখানে । একদিন সিঁড়ির উপর নোটিশ দেখা গেল, সবাইকে হোটেল কমিটি থেকে এক বয়াম জ্যাম দেয়া হবে । আমিও জ্যাম পেলাম, আরেকদিন মিলল খানিকটা উক্রাইনিয়ান সসেজ ।

কার্ড ছাড়াও রাস্তায় গলা কাটা দামে খাবার পাওয়া যায় । খাবারের দামের পার্থক্যটা বোঝার জন্য নীচের তুলনাটাই যথেষ্ট হবে । কার্ড অনুযায়ী এক পাউন্ড রুটি এক রুবল বিশ কোপেক, বাইরে 15-20 রুবল । চিনি কার্ডে বারো রুবল, বাইরে পঞ্চাশ রুবল । এর মানে হচ্ছে কার্ড পদ্ধতি তুলে দিলে ধনীরা জিনিস পাবে, তবে গরিবের ভাগ্যে কিছুই জুটবে না । তবে একজন আমাকে বলেছিল কার্ড অনুযায়ী যদি যথেষ্ট জিনিসের সরবরাহ থাকে তাহলেই ফটকাবাজি কমে যাবে । কেউ যদি 1.2 রুবল দিয়ে রুটি কিনতে পারে তাহলে সে কেনব আরো চোদ্দ রুবল বেশী খরচ করে বাইরে থেকে রুটি কিনবে ? যুদ্ধ শেষ হলে আশা করা যায় পরিস্থিতির উন্নতি হবে ।

মস্কোতে যে দুর্ভিক্ষ চলছে তাতে কোন সন্দেহ নেই । এখানে আশার তৃতীয় দিনে আমি একজন লোককে স্লেজভর্তি করে ঘোড়ার মাংস নিয়ে যেতে দেখেছি । মাংসের চেয়ে হাড়ের পরিমানই বেশি, খুব সম্ভবত মরে যাওয়া স্লেজটানা ঘোড়া থেকে নেয়া হয়েছে । ও যখন স্লেজট আচালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল একদঙ্গলো কালো কাক স্লেজটাকে অনুসরণ করছিল । কাকেদের এমনই দুরবস্থা এখন যে কিছু কাক আমার ঘরের সরু ভেন্টিলেটর ঠেলে ঢুকে পড়ত কিছু খাবার আশায় । যুদ্ধের আগে অসংখ্য কবুতর চড়ে বেড়াতো, ধর্মীয় কারনে মানুষ মারত না ওদের; এখন সম্পুর্ন অদৃশ্য ।

ঠান্ডার ব্যাপারেও কিছু বলবার নেই । যখন দেখলাম পররাষ্ট্র দফতরের লোকেরাও আমার মতই কষ্টে আছে তখন ক্ষোভটা একটু কমল । এমন কী ক্রেমলিনের আরকাইভ রক্ষককেও দেখতাম ভেড়ার চামড়ার কোট গায়ে দিয়ে মাঝে মাঝে প্রায় জমে হাত চাপড়ে গরম করতে । যেমনটা আগেকার দিনে লন্ডনের ঘোড়ার গাড়ির গাড়োয়ানদের করতে দেখতাম ।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিয়া আচরণে অতিষ্ট হয়ে হযরত আলী (রা.) ও তাঁর শিয়ার বিপক্ষের সত্য প্রকাশ করতে হয়

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০১ লা মে, ২০২৬ ভোর ৬:৩১



সূরাঃ ৮ আনফাল, ৬৭ থেকে ৬৯ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৭।দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবির উচিত নয়। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর। আল্লাহ চান... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামীলীগ ও তার রাজনীতির চারটি ভিত্তি, অচিরে পঞ্চম ভিত্তি তৈরি হবে।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ০১ লা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৩


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত চারটি বিষয়ের উপর মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
প্রথমত, মানুষ মনে করে এ দলটি ক্ষমতায় থাকলে স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। এটা খুবই সত্য যে ১৯৭১ সালে আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯০

লিখেছেন রাজীব নুর, ০১ লা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৯



আমাদের ছোট্র বাংলাদেশে অনেক কিছু ঘটে।
সেই বিষয় গুলো পত্রিকায় আসে না। ফেসবুকেও আসে না। অতি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মানুষ মাতামাতি করে না। কিন্তু তুচ্ছ বিষয় গুলো আমার ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

সনদ জালিয়াতি

লিখেছেন ঢাকার লোক, ০১ লা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫২


গতকাল দুটো সংবাদ চোখে পড়লো যার মূল কথা সনদ জালিয়াতি ! একটা খবরে জানা যায় ৪ জন ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করা হয়েছে জাল জন্ম মৃত্যু সনদ দেয়ার জন্য, আরেকটি খবরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেষ বিকেলের বৃষ্টি

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৭


বিকেলের শেষে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলে চুপ,
তোমার ওমন ঘন মেঘের মতো চুলে
জমে ছিল আকাশের গন্ধ,
কদমফুলের মতো বিষণ্ন তার রূপ।

আমি তখন পথহারা এক নগর বাউল,
বুকের ভেতর কেবল ধোঁয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

×