অনেক দিন দেখা নেই জাফরের সাথে। ছেলেটা বেশ ভাল- সহজ, সরল। মনে কোন প্যাচ নাই। সাদাসিদে পোষাক আশাকের মতো মনটাও সাদা। কিন্তু সব সময় যেন কিসের ভাবনায় ডুবে থাকে। একা থাকলে আরো বেশি ডুবে থাকে আপন ভুবনে। পরিবারের সবাই এ নিয়ে বেশ হতাশ। বিএ পাশ দিয়ে ছেলে যদি অমন বাউন্ডেলে হয়, তবে লেখাপড়া করে লাভ হল কি? চাকরি করার কোন ইচ্ছা দেখা যায় না। পরিবারের দায় দায়িত্ব নিতে হবে কে তারে বোঝাবে?
তার বিষয়ে আমার আগ্রহের কারণটা অন্যখানে। মোবারকের বিখ্যাত টি ষ্টলে বসে মাঝে মাঝে তার সাথে আমার আলাপ জমে ওঠে। চা খেতে খেতে, সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে কত যে কথা হয়। আমার মতো আগ্রহী শ্রোতা পেয়ে তারও যেন কথার খই ফোটে। তবে তা স্রেফ দুজনের মধ্যেই। তৃতীয় কেউ আগ্রহী হলে জাফর কেমন মিইয়ে যায়। কথা বন্ধ করে দেয়।
সাধু, সাধক, সাধনা নিয়ে আমার আবার পরম আগ্রহ। সেই ছাত্রাবস্থায় লালন সাইয়ের মাজারে গিয়ে মনটা অজান্তেই শুন্য হয়ে গিয়েছিল। চৈত্রের খোলা মাঠের হু হু করা হাওয়ার মতো পরম শুন্যতা ঘিরে ধরেছিল। সত্যিইতো - কি লাভ এত মোহাবিষ্টতায়! বেলা শেষে সবইতো শেষ! কিচ্ছুটি নিজের নয়।
আহা, মৃত্যুর পর যখন মানুষটির হাত থেকে তার প্রিয় আংটিটি খুলে নেয়- সে কি চিৎকার করে ওঠে?
- না। তোমরা ওটা খুলো না। এটা আমার। এটা আমার কত প্রিয় জানো না। তবে খুলে নিচ্ছ কেন?
তার আওয়াজ পৌছায় না জীবিতদের কানে। তারা খুলে নেয়। প্রিয় সব কিছু রেখে দেয়। একদম জনম ন্যাংটো করে বিদায় দেয়!
ইশশ কি কষ্ট! ভাবতেই বুকের ভেতর এক অসীম শুন্যতা ফেঁপে ওঠে। অবোধ্যতার কষ্ট এক সময় দীর্ঘশ্বাস হয়ে মিশে যায় মহাকালে।
যদিও আমি সংসারধর্ম, চাকুরী ব্যবসা সব নিয়েই আছি তবু -আমার আগ্রহটা দিন দিন বাড়ে বৈ কমে না। শুনে জাফর হাসে। বলে - আপনি হলে সালেক মজনু।
আমার অবাক মুখে কথা বেরুবার আগেই বলতে থাকে
- যারা সংসার ধর্ম করেও মনে বৈরাগ্য লালন করে তারা সালেক মজনু। আর যারা বৈরাগ্যের সাধনে সংসার ধর্ম ছেড়ে ছুড়ে দেয়- তারা মজনুন। আর যারা খাদ্য, বস্ত্র মোহও ত্যাগ করে তারা মজজুব। স্রস্টার প্রেমে বিভোর হয়ে থাকে। মজজুবদের জন্য শরিয়তি বিধানও প্রযোজ্য নয়।
আমি হেসে বলি -তুমিতো তবে মজনুন হালে পৌঁছে গেছো। মিষ্টি লাজুক হাসি দিয়ে বলে- ম্যা’ভাই যে কি বলেন?
প্রথম দিন ম্যা’ভাই শুনে অবাক হয়েছিলাম। জাফর হেসে বলে- আমাদের এলাকায় বড়, গুরুজন যাকে ভালবাসা যায়, সম্মান করা যায়- তাকে মিয়া ভাই বলে। মিয়া ভাই-ই সংক্ষেপে কথ্যতে ম্যা’ভাই হয়ে যায়। সেদিন থেকে জাফর আমাকে ভালবেসে ম্যা’ভাই বলে, আমার বেশ লাগে।
মনটা আকুলি বিকুলি করে ওঠে। আহা মজজুব না হোক মজনুন ও যদি হতে পারতাম! গিন্নির ফোনে ভাবনাটা ভাবনাই থেকে যায়। চাল, ডাল আলু পিয়াজের উর্ধগতির চিন্তায় ভাটা পড়ে সাধু হবার সাধে।
সপ্তাহ খানেক পর, একা একা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে নিজের ব্যর্থ বৈরাগ্য নিয়ে আনমনা হয়ে ছিলাম। হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলো জাফর। চোখে মূখে উজ্জ্বল দ্যুতি।
গরম চায়ে চুমুক দিয়েই বললো -আলহামদুলিল্লাহ। নিরবে চেয়ে রইলাম। জাফর আপন মনেই বলতে লাগলো- আমাদের তিন মাত্রার জগতের এক মাত্রার জ্ঞান নিয়েই আমরা কত্ত বড়াই করি। টু ডি থ্রিডি ভার্চুয়াল ইফেক্টে মুগ্ধ হই। অথচ আত্মার জগতের বহুমাত্রিকতায় সন্দেহ পোষণ করি! কি অদ্ভুত বৈপরীত্য তাই না ম্যা’ভাই? আমি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ি।
অথচ দেখুন সেদিন পরম দয়াল, (বলেই অদৃশ্যে হাত জোর করে ভক্তি জানাল দয়ালকে) কত দয়াময়। ভক্ত খাঁটি দিলে চাওয়া মাত্র তার ইচ্ছা পূরণ করে দেন। নতুন কিছুর সন্ধান পেয়ে নড়েচড়ে বসি। নতুন করে সিগ্রেটে আগুন দিয়ে আয়েশ করে শুনতে থাকি জাফরের কথা।
-নফসকে যখন আপনি নিয়ন্ত্রন করতে পারবেন, তখন প্রাণ সাগরে আসবে জোয়ার । আপনার দেহ নৌকা ভাব সাগরে তরতর করে চলতে থাকবে। দয়ালের কৃপা হলে উড়বে পাল। পালে লাগবে হাওয়া। বাড়বে গতি । প্রায় ঠান্ডা কাপেই তৃপ্তির সাথে চুমুক দেয় জাফর।
আপনাকে তো আগেই বলেছি- এলিয়েনদের সাথে আমার যোগাযোগ হয়। আমার ভাষায় এঞ্জেল। বলেই হাসে। আমাকে ভ্রমন করায় মহাজগতের বহু স্থানে। বিস্ময়কর সব অভিজ্ঞতা। যদিও বাসার এবং পরিচিত সবাই বলে - আমাকে নাকি জ্বিনে ধরেছে! বলেই হো হো করে হেসে নেয় এক চোট। আমিও হাসি তালে তালে।
-তো এইবার কোন জগতে ঘুরে এলে? হাসতে হাসতেই বলি।
এবার বেশ সিরিয়াস মুডে চলে আসে জাফর হঠাৎই। তা বলতেই তো দৌড়ে আপনার কাছে এসেছি। --- জানেন ম্যা’ভাই সত্য শোনার, বুঝার আর মানার লোকের খুব অভাব দুনিয়ায়। বেশ দার্শনিক ভঙ্গিতে বলে কথাগুলো। বেশির ভাগ লোক যারা হেসেই উড়িয়ে দেয় সত্যকে, তারাই আবার মিথ্যের পিছে, মোহের পিছে পাগলের মতো ছুটছে।
পলকে মুড সুইং করে চলে আসে বর্তমানে। আরেক কাপ চায়ের অর্ডার দেই। হাসি মূখে জাফর চায়ে মনোযোগ দেয়। যেন কাপের গরম ধোঁয়ায় খুঁজে ফেরে রহস্যভেদী তত্ত¡।
অনেকদিন বিরতির পর তারা গতরাতে এসেছিল। ওরা আসলেই আমি অদ্ভুত একটা ঘ্রান পাই। বেরিয়ে পড়ি শুনশান এলাকার দিতে। অতিদ্রুত পৌঁছে যাই। তখন তাদের শক্তির প্রভাবে আমার গতি যেন বেড়ে যায় বহুগুন। দৌড়ে গেলে মনে হয় উড়ে উড়ে যাচ্ছি। স্বপ্ন আর বাস্তবের মিশেলে এক জটিল হাল । সকল দৃশ্যগুলো স্পষ্ট স্বচ্ছ, এই যে, আপনাকে যেমন দেখছি বলে আমার দিকে তাকাল- এমনি স্পষ্ট। প্রথম প্রথম তাদের দেখতে পেতাম না। আমার শুন্যানুভবে কষ্ট হয় অনুভব করে আমার দৃষ্টি সহনীয় মনুষ্য আকৃতির ছায়া রুপে দৃশ্যমান হয়। তাতে আমি খুব আরাম বোধ করি।
তো এবার পৌঁছাতেই অতিদ্রুত তাদের ক্যাপসুলে উঠে বসি। শুয়ে পড়ি নির্ধারীত সীটে। প্রচন্ড গতি দেহ সইতে পারেনা দেখেই শুধু আত্মিক ভ্রমনে যেতে দেহটাকে ক্যপসুলে শুইয়ে চলে যেতে হয় অসীমের দেশে। জানেন নিশ্চয়ই আত্মা আলো আর শক্তির তৈরী। আরবীতে বলে নূর। তার শক্তিকে বহুমাত্রায় বুষ্ট আপ করা যায়। তখন হাজার লক্ষ আলোক বর্ষ পথ পলকে পেরিয়ে যাওয়া যায়।

দুই দুয়ারী হলো বহুমাত্রিক জগতের প্রবেশ দ্বার। দুই দুয়ারী পেরিয়ে যাচ্ছি তো যাচ্ছি। কত গতি, কতটুকু পথ মাপার একক বোধকরি পৃথিবী এখনো ভাবতে পারেনি। হঠাৎ যান থামলো এক ঘাটে। নামতেই টানেলের মতো পথ। হালকা অন্ধকার। হামাগুড়ি দিয়ে চলতে হয়! হঠাৎ পেছনে চেয়ে দেখি আমার জন্মদাতা পিতা। আরেহ, বাবা এলেন কোত্থেকে! বিস্ময়ের ঘোর কাটতে দেখি মাথায় খনি শ্রমিকদের মতো হেলমেট লাগানো। তারচে' অবাক করা বিষয় হলো- তা থেকে আলো ঠিকরে বেরিয়ে পথটাকে আলোকিত করেছে। ইন্তেকালের এত দীর্ঘ সময় পর বাবাকে এইরুপে দেখে, সাথে পেয়ে আমি খুবই খুশি। বিস্মিত, আপ্লুত আমার সাধনার পথেও উনার এই ভালবাসা আমাকে বিগলিত করলো। আমি বিনয়ের সাথে বল্লাম - আব্বা আপনি সামনে থাকুন। তিনি মাথা নাড়িয়ে মানা করে আমাকে সামনে তাকাতে ইশারা দিলেন।
সামনে তাকিয়ে আমি বিস্ময়ে হতবাক। আরেহ আমার মাথায় হেলমেট এলো কোত্থেকে? আর তা থেকে অমনি আলোও নির্গত হচ্ছে। এখন পথটা বেশ আলোকিত। যেন ভরা পূর্ণিমার জোছনায় মাখামাখি।
দুজনে পথ চলছি। বামে মোড় ঘুরতে গিয়ে ছোট্ খাট কারো সাথে ধাক্কা লাগতেই পুতুল পুতুল সফটি ছোঁয়া লাগলো। বল্লাম ইনি কে? অদৃশ্য কন্ঠ আওয়াজ দিলো- উনাকে চিনো না? উনিতো অমুক নবী। বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে চলছি। একটু পরই বেশ খোলামেলা জায়গা। দুজনেই সোজা হয়ে দাড়ালাম। সামনে তাকালাম কোন কিছু নেই। নীচের দিকে তাকাতেই চমকে গেলাম!
একি বিস্ময়! এতো দেখছি অতিকায় ক্ষুদ্র মানুষদের জগত। বড়জোর মধ্যমার সমান আকৃতি বিশিষ্ট। অতি সাবধানে পা ফেলছি। আহারে, না জাতি কতপ্রাণ পায়ের নীচে পড়ে মারা যাবে। জড়তায় হাটাহাটি না করে ভাল করে তাকিয়ে শুধু দেখছি।
ছোট ছোট প্রাসাদ। সম্ভবত রাজবাড়ী হবে। ছোট ছোট রাজা-রানী। পারিষদ। বেশ উৎসব আমেজ। আরেকটু নীচু হয়ে দেখতে গভীর ভাবে তাকালাম। হুম বিয়ের আয়োজন। ঘোড়ার গাড়ী সাজানো। বর-কনে উঠে বসলো গাড়ীতে। চলতে থাকলো ছোট্ট ছোট্ট ঘোড়ার ছোট্ট ছোট্ট গাড়ীগুলো। খানিকটা এগিয়ে ডানে মোড় নিতে গিয়ে কাত হয়ে গেল বড় গাড়ীটা। ঘোড়া গুলো কোনভাবেই উঠতে পারছে না, গাড়ীকেও টেনে উঠাতে পারছে না। সাবধানে হাত বাড়িয়ে দিলাম। আলতো করে গাড়ীটাকে সোজা করে দিতেই চলতে থাকলো।
এমন সময় আগন্তুক কন্ঠ অদৃশ থেকেই বললো আপনার এখানে দাড়িয়ে কেন? আসুন আসুন মেহমান খানায় আসুন। আগন্তুকের কন্ঠ অনুসরন করে রওনা দিলাম!
বলেই চুপ করে রইল।
পরম আগ্রহে জানতে চাইলাম- তারপর কি হলো?
জাফর চুপ।
চেহারায় বিষন্নতার ছাপ ভাসছে যেন। অনেক দূরের গভীর থেকে যেন ভেসে আসছে কন্ঠ- - মায়ের জলের ছিটায় ধরফর করে জেগে উঠতে হলো। মাতো জানেনা এভাবে জাগালে যে কোন দিন মরেও যেতে পারি। আত্মা ফিরে আসতে যে সময়টুকু লাগে তা না পেলে আত্মা আটকে যাবে ঐ জগতেই! কিন্তু
মা ভেবেছে আমি ঘুমুচ্ছি। তাই বেশ রাগের সাথেই এই কান্ড ঘটালো। কিন্তু মাতো জানেন না আমি কোথায় ছিলাম।
তবুও কোন রাগ নেই। মাতো। মায়ের সাথে কি রাগ করা যায়?
বলেই হেসে ফেললো। সেই চিরচেনা হাসি। আমিও ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হেসে বল্লাম - আজ তাহলে আসি
ছবি কৃতজ্ঞতা: গুগল
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জানুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৩:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



