somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দু জন গাড়ীচালকের কথা (আগে...লাগত ৩০ টাকা। এখন...৯০ টাকা।”......আমি কিভাবে বেতন বাড়ানোর কথা উঠাই আপনি বলেন!”)

০৩ রা আগস্ট, ২০০৯ রাত ১১:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




বন্ধুর বাড়ীর সামনে তার গাড়ীটি দাড়িয়ে আছে। ওকে আগে থেকেই মোবাইলে ফোন করে এসেছি, ও নামবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। উপরে উঠে গুরুজনদের সাথে দু-চারটা কথাবার্তা বলার অভ্যাসটা চলে না গেলেও, ওর বাড়ীতে আমার প্রায় রোজ যাতায়াত আছে বলে এইসব ভদ্রতা সবসময় মেনে চলি না।
উঠে পরলাম তার গাড়ীর সামনের আসনে। সালাম দিলাম চালক সাহেবকে। গাড়ীর রেডিও টিউন করতে করতে, তিনি অন্যমনষ্ক ভাবে সালাম ফিরালেন। তার সাথেও আমার অনেক দিনের পরিচয়। একই পাড়ায় থাকি, ছোটবেলার বন্ধুর গাড়ী চালান। শৈশবে আমাকেও মাঝেমাঝে স্কুল থেকে আনা-নেওয়া করেছেন।
চালক সাহেব তার আকাঙ্খিত স্টেশন খুজে পেলেন। বিবিসি সংলাপ শুনবার জন্যে টিউন করছিলেন। অনুষ্ঠানটি শুরু হয়ে গেছে, তাই জানতে পারলাম না সেদিনের আলোচনার বিষয় কি ছিল। তবে তখন যে আলোচনা বর্তমান সরকার ও মূল্যস্ফিতি ঘিরে চলছিল এতটুকু বোঝা গেল। অনুষ্ঠানে যোগদানকারীদের মধ্যে একজন মন্তব্য করলেন, যে একটি নির্বাচিত সরকার কখনই খাদ্য-পরিস্থিতিকে এরকম নাজুক পর্যায়ে আসতে দিত না।
আমি চালক সাহেবের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম তিনি এই কথার সাথে একমত কি না। এক মুহুর্তও দ্বিধা না করে তিনি জানালেন যে তিনি একই কথায় বিশ্বাস করেন যে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসলে মূল্যস্ফিতির হার কমবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য স্থীতিশীল হবে।
এই ঘটনার দু’তিন দিন আগে টিভিতে দেখছিলাম একটি অনুষ্ঠান। রাস্তায় “সাধারণ” মানুষের সাক্ষাৎকার। অনেক রকমেরই প্রশ্ন করে থাকে সেই অনুষ্ঠানে, বেশীর ভাগই হালকা আমেজের, মানুষকে অল্পক্ষাণিকের জন্যে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা। তবে সেদিন হাসিঠাট্টার করতে করতেই করে বসল একটি গুরু-গম্ভীর প্রশ্ন : “আপনাদের মতে কি এই বছর নির্বাচন হবে?”
তিন-চারজনের উত্তর দেখিয়েছিল। তার মধ্যে দু’জন বলেছিল যে নির্বাচন না হলে জিনিসপত্রের দাম কমবে না, এবং সে কারণে নির্বাচন অনিবার্য। ঠিক চালক সাহেবের মতো। শুনে মনে হয়েছিল যে সামনে যেই নির্বাচন করে ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা মানুষের ক্ষাণিকটা অবাস্তবিক আশা-আকাঙ্খা মিটাতে পারবে না। সেসব আশা-আকাঙ্খার চাপে হয়ত মারও খেয়ে যেতে পারেন। তাই, কারই উচিৎ হবে না এরকম নাজুক পরিস্থিতিতে মানুষকে মিছে আশা দেওয়ার। নির্বাচন হলেই অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে যাবে, তার কোন নিশ্চয়তা নেই।
এই কথাগুলো চালক সাহেবকে বললাম। তিনি মন দিয়ে শুনলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলাম তার কি কারণ আছে আশা করার যে নির্বাচন হলেই মানুষের জীবনের উন্নতি ঘটবে। তার উত্তর ছিল অনেকটা এয় রকম: “ভাইয়া, জিনিসপত্রের দাম বাড়বে, এইটাই স্বাভাবিক। তবে তার সাথে সাথে যদি আমাদের বেতন না বাড়ে, তাহলে কেমন করে পোশায় বলেন? আগে বাড়ীতে যাইতে লাগত ৩০ টাকা। এখন সেখানে লাগে ৯০ টাকা।”
“এটা কতদিন আগের কথা? বাসের ভাড়া? না ট্রেনের?”
“এই বছর-দেড়েক হবে। বাস করেই যাই। আশা যাওয়া কমায় দিসি, আর কি করব?” – এখানে বলে রাখি যে তার মা অনেক দিন ধরে অসুস্থ বলে তিনি ঘনঘন গ্রামের বাড়ী যেতেন – “সাহেবের কাছেও বেতন বাড়ার কথা নিয়ে কয়দিন পরপর তো যাওয়া যায় না। গত জুনে আমার বেতন বাড়াইসে, এখন ফেব্রুয়ারি মাস। আমি কিভাবে বেতন বাড়ানোর কথা উঠাই আপনি বলেন!”
“সত্যি কথা। দাম বাড়ার হার আপনার আয় বাড়ার হার ছাড়িয়ে গেছে। তবে ভাইয়া, বললেন না তো আমাকে, এই পরিস্থিতি বদলাবে কেমনে যদি কালকে একটা নির্বাচিত সরকার আসে।”
বেশ লজ্জার সাথেই আপনাদের কাছে স্বীকার করছি যে আমি এই প্রশ্নের ভাল জবাব আশা করছিলাম না। তবে তিনি আমাকে অবাক করে বললেন, “এখন অর্থনীতির দুরবস্থা চলতেসে। সবাই ভয় পেয়ে লুকায় আছে, কেউ কেউ আমদানী করতে ভয় পাচ্ছে, কেউ কেউ টাকা খাটাইতে চাচ্ছে না। বিনিয়োগের হার কম, তার মানে চাকুড়িও দিনে দিনে কমে যাচ্ছে, তার মানে মানুষের ব্যবসাও আগের মতো চলতেসে না। যদি একটা নির্বাচিত সরকার জিনিসপত্রের দাম ধরে রাখতে নাও পারে, অন্তত আমাদের আয়-রোজকার হয়ত ঠিক থাকব আগের মতো। আপনি কি বলেন?”
বলার কিছুই ছিল না। আমি জানালাম যে তার সাথে প্রায় একমত আমি। তিনিও আশা করছেন না এক নির্বাচিত সরকার এসে রাতারাতি যাদুকরের খেলা দেখাবে আমাদের।
তার সাথে কথা বলে আমাদের অর্থনৈতিক সংকটের একটি বিশেষ দিক আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল, যা মাঝে মাঝে আমাদের তর্ক-বিতর্কের মধ্যে হারিয়ে যায়। মূল্যস্ফিতির হার যেমন বেড়েছে, সেই সাথে অনেক মানুষের আয়-উপার্যনের ব্যবস্থায়েও সঙ্কট দেখা দিয়েছে। গ্রামাঞ্চলে হয়ত তা হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে, তবে শহরাঞ্চলগুলোতে এর জন্যে প্রধানত দায় করা যায় এই সরকারের “দুর্নীতি দমন” অভিযানের নামে কয়েকটি অতিরিক্তি এবং অপ্রয়োজনীয় পদক্ষেপকে। মাঝারি আকারের ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অবিচারের কথা (যেমন VoIP) বাদ দিলেও, বস্তি- ভাঙ্গা, রাস্তার-পাশের দোকান উচ্ছেদ করা এসবের প্রয়োজন কি ছিল ২০০৭এর মতো এক বছরে, সেই প্রশ্নটি সরকারকে করা উচিৎ। উত্তরের অপেক্ষায় বসে থাকলাম না।

আরেকদিন, আরেক বন্ধুর গাড়ী। গাড়ীতে কোন চালক নেই, আমার বন্ধুই চালাচ্ছে। যাচ্ছিলাম ধানমন্ডি। প্রধান মন্ত্রীর/উপদেশটার কার্যালয়ের সামনে জামে বসে আছি। মনে পড়ছে না কি ভাবে কথার মোড় অর্থনীতির দিকে ঘুরেছিল।
Real Incomeএর কথা উঠার সাথে সাথে আমার বন্ধু ক্ষাণিকটা উত্তেজিত হয়ে বলল, “সেই দিন তো ——– ভাইই আমাকে বলতেসিল আমাকে এই কথা। উনি বলতেসিল, ‘ভাইয়া আমার বেতন বাড়াইসেন কয়েক মাস হয়, তবে আমি তো বুঝতে পারি যে আমার বেতন আসলে বাড়ে নাই। বরং কমে গেসে।’ ”
“——— ভাই মানে ড্রাইভার সাহেব?”
“হ্যা। উনি আমাদের সাথে কতদিন আছে জানিস? আমার দাদার গাড়ী চালাইত। তাই আব্বা উনাকে একটু বেশী বাড়ায়ই দেয়। জীবনে তাকে তার বেতন নিয়ে অশন্তোষ প্রকাশ করতে শুনি নাই। এই বছর উনি এমন একটা কথা বলল যেইটা ভুলতেই পারি না। সেদিন কোথায় জানি যাচ্ছি, একথা সে কথায় সে হঠাৎ বলে, ‘ভাইয়া, আমার বেতনতো দিন দিন কইমাই যাইতেসে, তবে রাস্তায় কিন্তু নতুন গাড়ীর সংখ্যা বাইড়াই যায়। নিজেকে ভাল, সভ্য মানুষ ভাবতাম সবসময়। কিন্তু এইভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে আমিও কিন্তু ওই নতুন গাড়ীগুলির সামনে গিয়ে দাঁড়ায় পরব আর গাড়ীর মালিকদের বলব আমাকে টাকা দিতে না হলে তাদের গাড়ী ভাইঙ্গা ফেলব। ভাল মানুষ হয়ে আর কুলাইবো না।’ ”
দুইজন কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম। জাম একটু ছাড়ল আর আমরাও একটু আগালাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, “এই কথার পর তুই কি বললি?”
“আমি আর কি বলব। তুই জানিস আমি মার্কসিস্ট না, তবে ডিস্‌আগ্রি করব কোন জায়গায়? যদি ওই পর্যায় চলে যায়, তখন তার সেইটা করা ছাড়া উপায় কি? মানুষের ক্ষুদার উপর কে কথা বলবে? ঠিক আছে, আমরা হয়ত ——- ভাইকে দেখলাম। তার মতো যে হাজার হাজার মানুষ আছে, তাদের দেখাশুনার ভার কে নেবে? তুই আর আমি?”
আবার কিছুক্ষণ চুপ থাকলাম। তারপর সে আরও শান্ত ভাবে বলল, “আর মনে রাখিস, শহরের প্রাইভেট গাড়ীচালকরা কিন্তু সামাজিক দিক দিয়ে “poor” হিসাবে গণ্য করা হয় না। কিন্তু এই রকম দাম-বাড়ার পর তারা এখন poverty-lineএর উপর না নিচে আছে, সেটা দিনে দিনে বলা মুসকিল হয়ে যাচ্ছে।
“এই শ্রেণীর মানুষের দিকে কারা তাকাচ্ছে এই মুহুর্তে? কেউই না। গতো কয়েক বছর ধরে তারা মর্যাদার সাথে জীবন যাপন করছিল। আমি বলছি না যে তাদেরকে খুব আরামে রেখেছি আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষরা বা তাদের মর্যাদা রক্ষা আমরা করেছি, তবে বৃহত্তর সমাজে তাদের একটি মর্যাদা আছে, এবং সেটা বজায় রেখে চলার সামর্থ তাদের ছিল। এখন যদি সেটা উধাও হয়ে যায়, তা হলে সেই পরিস্থিতিতে তাদের জবাব কি হবে?”
এবং সেটা চিন্তা করতে করতেই পৌছে গেলাম ধানমন্ডি।
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×