উদাস চোখে তাকিয়ে আছি। মাথায় এলোমেলো ভাবনা, নখের আগায় আর খই ফুটছে না। মনের সুখে কি সব লিখছিলাম, এখন সব রথী মহারথীরা পড়া শুরু করেছেন।
নিকট অতীতে ঘটে যাওয়া এক অসাধারণ ঘটনার স্ফুলিঙ্গ আমাদের জাতিসত্বার জন্ম দিয়েছে। তারই অর্ধশতাব্দী পরে কিছু মানবসন্তান তাদের সুতীব্র আবেগ নিয়ে লিখছেন দেখে আমারো কিছু লিখতে মনে চেয়েছিল, তাই এক-দুই-তিন করে সাজিয়ে ফেলেছিলাম। কেউ একমত হতে পারেন, দ্বিমত হবার অধিকার এই ব্লগে অবশ্যই আছে, কিন্তু এগুলো আমার একান্তই ব্যাক্তিগত ভাবনা, যার সবগুলো মনে হয় ফেলে দেয়া যায়না।
সুদীর্ঘ ইতিহাস আর অনিশ্চিত অনন্ত ভবিষ্যতের দিকে তাকালে এই জীবনকে একেবারেই ক্ষুদ্র মনে হয়। সেবা প্রকাশনীর কোন এক বইয়ে পড়া খিযির (আঃ) এর একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। যিনি অবিশ্বাস্য দীর্ঘ জীবন পাবার কারণে একই স্থানকে কখনো দেখেছিলেন বিশাল মাঠ হিসাবে, আবার কালের পরিক্রমায় তা রূপ নেয় সুরম্য নগরীতে, যা পরে কোন সময় বিরান হয়ে পড়ে মরূ এলাকায় আর সময়ের খেলায় তা হয়ে যায় এক দুকূল ছাপানো স্রোতস্বিনী নদীতে। এই ক্ষুদ্র জীবনে মানুষের আছে অসম্ভবকে সম্ভব করার ক্ষমতা যা তাকে সৃষ্ট জগতের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছে। খুব অল্প কিছু সৌভাগ্যবানেরই জীবনে তার সম্ভাবনার সদব্যাবহার হয়। বটবৃক্ষ হয় সুবিশাল, কিন্তু তার বীজ নিতান্তই ক্ষুদ্র। এই ক্ষূদ্র জীবনের কর্মফলই হবে আমাদের অনন্ত ভবিষ্যতের জবাব।
আমার মনে হয়না পৃথিবীতে এমন কোন ভাষা নাই যার বিস্তৃতি আছে কিন্তু আঞ্চলিকতা নাই। ব্রিটেনে আসার আগে আমার একেবারেই ধারনা ছিল না যে ইংরেজদের ইংরেজী এতোটা আঞ্চলিকতা দোষে দুষ্ট হতে পারে। আজকাল সিস্টেম সাপোর্টে ফোন করলে নর্থ বা আইরিশ কল সেন্টারগুলোতে ফোন কেউ ফোন ধরলে তাদের ইংরেজী নিয়ে আমরা হাসাহাসি করি। আর কিঞ্চিত কান পাকার পর এখন বুঝি আমেরিকারও পেনসিলভানিয়া আর আলাবামার ইংরেজী কতটা ফারাক। তবে আমার মত হল, কোন এক জনগোষ্টী যখন কোন ভৌগলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ হয়, আর তাদের একই ভাষা হয়, তখন কোন এক রীতিকে বা এলাকার ভাষাকে মানদন্ড বা সূচক হিসাবে স্থির করে নেয়াটা ভূল নয়। কারণ সমস্ত এলাকার আঞ্চলিকতাকে সমভাবে গূরুত্ব দিতে গেলে শেষ পর্যন্ত সবাইকে বিভ্রান্ত হতে হবে। তাই পশ্চিম বঙ্গের জন্য শান্তিনিকেতনের বাংলা বা আমাদের জন্য সাধারণ চলতি বাংলার ধারা যেটা সাধারণ জনপ্রিয় কথ্য বা লেখ্যরূপ হিসাবে লিখিত বা অলিখিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেটাকে মেনে চলার চেষ্টা করলে সবার জন্যই মনের ভাব বিনিময় স্বচ্ছ হবে।
এখানে একটি বিষয় নিয়ে অল্প কিছু লিখে আমি আমার প্রথম এবং সম্ভবত শেষ সিরিজ শেষ করছি। আমাদের জন্য বাংলার গুরুত্ব সম্পর্কে আমার প্রিয় আরেকটি লেখা যোগাড়ের চেষ্টা করছি, পেলে টুকে দেব।
মাঝে মাঝেই নিজেকে বড় অসহায় মনে হয় আরবীর এত কাছে থেকেও সারা জীবন শুধু বারান্দায় পায়চারী করলাম। আসল দালানে প্রবেশের কোন সুযোগই হল না। কোন ভাষা, উক্তি, বা বক্তব্য তার মূল ভাষা থেকে অনুবাদে শুধু ভাবটুকুই প্রবাহিত হয়, কিন্তু তারপরও অনেক কিছুই মূল ভাষাতেই রয়ে যায়। তাই যখনই হাদীসের মুখোমুখী হয়েছি তখনই সেই মানুষটিকে পাবার চেষ্টা করেছি। তার আরবীর সৌন্দর্যটুকু ধরতে পারিনি, কিন্তু বাচনভঙ্গী, বাক্যবিন্যাস আর প্রজ্ঞার যে অসাধারণ পরাম্পরা, ভাবানুবাদের ক্ষেত্রেও তার ছাপ কখনই মুছে নাই। আমার কৌতুহল ছিল, বাগ্মীতা আর কাব্যচর্চার যুগে কোরআন যখন সকল কাব্যের নিস্তব্ধকারী, তখন কোরআন বাহকের ভাষা সম্পর্কে তার সমসাময়িকদের কি ধারণা ছিল। মনের মধ্যে খটকা থাকলে তার জবাব দিয়ে দেয়া হয়। সেদিন খাসায়েসুল কুবরা পড়তে গিয়ে এক যায়গায় চোখ আটকে গেল। নির্ভূল উক্তি দিতে পারছি না তবে ভাবটুকু হল এই,
নিরক্ষর এই জ্ঞানসাগরের ভাষা ও বাচনভঙ্গী ছিল সবসময়েই সমকালিনদের মাঝে অদ্বিতীয়। কখনো তাঁকে প্রশ্নও করা হয়েছে যে, হে আব্দুল্লাহর পূত্র, আপনি আমাদের মাঝেই জন্ম আর আমাদের মাঝেই আপনার বেড়ে ওঠা, অথচ এমন আকর্ষনীয় ও চমতকার ভাষা তো আমাদের নয়। এর রহস্য কোথায়। সৃষ্টজগতের শান্তিদূতের জবাব ছিল, আমার প্রতিপালক বিশুদ্ধ আরবীর জ্ঞান দান করেছিলেন তাঁর দূত ইব্রাহীম পূত্র ঈসমাইলকে, আর তার মাধ্যমেই এই ভাষাকে বংশানুক্রমে প্রচলিত করেছেন। সময়ের বিবর্তনে আর আঞ্চলিকতা আরবীর সেই মূল থেকে সরে গেছে। আমাকে পুনরায় সেই ঈসমাইলী আরবী শিক্ষা দেয়া হয়েছে। তাই সমকালীন প্রচলিত আরবীর তুলনায় তাঁর ভাষা ছিল সর্বদাই প্রশংসনীয়।
আরেক সূত্রে পেয়েছিলাম, শৈশবেই তাঁকে নাগরিক কলুষতা স্পর্শ করার আগেই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল ধাত্রী হালিমার গোত্রে, যেখানে ছিল খোলা হাওয়া, পরিশ্রমী জীবন, আর আঞ্চলিকতা দোষমুক্ত বিশুদ্ধ ভাষা। আমি এটুকু বুঝেছি, যে যাঁর প্রতিটি মুহুর্তের কর্মকান্ডকে মানবজাতির মুক্তির দিশারী হিসাবে নির্দেশিত হয়েছে, আর তাঁর মুখে সুললিত মাতৃভাষা আমাদের পথ প্রদর্শক।
ভারাক্রান্ত হৃদয়ে দেখি যে, বেড়ে উঠেছি এমন এক সময়ে আর পরিবেশে যেখানে সুন্নতের সুন্দরতম শিক্ষাগুলোকে বানানো হয় কৌতুকের উপকরণ, অথবা এমন কোন জরুরী বিষয় না বলে লঘীভূত করা হয়। এখন এটুকুই আশা যে, মৃত্যুপূর্ব জীবনের প্রতিটি মূহুর্তের জবাব যখন দিতে হবে, সেই মহাসঙ্কটের দিনে কিছু মানুষ হয়ত তার মাতৃভাষার যথাযোগ্য অবদান রাখার কারনে উত্তম বিনিময় প্রাপ্ত হবেন।
সকলের জন্য শূভকামনা, সিরিজ সমাপ্ত।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৬:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


