somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্যাঙ্গ যখন বঙ্গতে

১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ৮:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



(কোলকাটা লিটারারি ফেস্ট এর একটি কথাপোকথন)

বাংলা ভাষায় হাস্যরসাত্মক সাহিত্যচর্চাকে কি একটু খেলো বা তরল হিসেবে দেখা হয় ? ধরা যাক কেউ একটা শিল্প সৃষ্টি করেছে, যার ভিতরে একটু মজা আছে। তাহলে ধরেই নেয়া হয়, শিল্পটা কম গুরুত্বপূর্ন, অথবা এই পার্টিকুলার শিল্পের মধ্য দিয়ে জীবনের যাথাযত গুরুত্ব প্রকাশ পায়নি। ধরা যাক, কেউ শিশু সাহিত্য করেন। এ রকম লেখকদের আমরা একটু বিলো ক্যাটাগরি হিসেবেই দেখে থাকি। তিনি নাকি আনন্দের বেশাতিই করেছেন। এমন কি হুমায়ুনের মত বাজারি লেখকের তকমাও পেয়ে যেতে পারেন অনেকে। কাওকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, বাংলা সাহিত্যে সেরা লেখক কারা ? কেউ হয়তো রবীন্দ্রনাথের কথা বলবে, কেউ বলবে জীবনানন্দ কিংবা ছফার কথা। কিন্তু কেউ সুকুমার রায়ের কথা কিন্তু বলবে না। আবার আলাদা করে সুকুমারের কথা জিজ্ঞেস করলে বলবে, ও হ্যাঁ, তিনি অবশ্যই ভালো লিখতেন। খুব মজা পেয়েছি। একটা লোক খুব মজা করবেন, কিন্তু তিনি একই সাথে ভালোও লিখবেন, এইটা বোধকরি বাঙ্গালীরা বিশ্বাস করে না। গুরুগম্ভীর, কিংবা বিমর্ষ না হলে যেন ভালো কিছু লেখা যায়না, ভারি কিছু বলা যায় না। আবার এটাও অস্বীকার করা যায় না যে, বাংগালীর সেন্সিবিলিটি এতটাই ডেলিকেট, যে স্যাটায়ারটাও অনেকেই নিতে পারেন না। অথচ বিদেশী ভাষায় আমরা অসঙ্খ্য ভালো ভালো স্যাটায়ার পাই। এমন কি পাশের দেশেও আমরা রিসেন্ট সময়ে ভূতের ভবিষ্যতের মত কি অসাধারন স্যাটায়ার সিনেমা দেখতে পাই, সত্যজিতের হিরক রাজার দেশেতো বাদই দিলাম।

আমরা কিন্তু দেখেছি, স্যাটায়ার বাংলার ট্রেডিশন এবং স্পেশালি লিটারারি ট্রেডিশনে বরাবরি ছিলো। এমনকি পোস্ট কলোনিয়াল মডার্নিটির ছোয়া লাগার অনেক আগে থেকেই বাউল গান, কবিগান কিংবা সাহিত্যে স্যাটায়ার একটি ভালো যায়গা দখল করেই ছিলো। প্রসঙ্গত মনে পড়লো, শিক্ষা সঙ্ক্রান্ত রবীন্দ্রনাথের তোতাকাহিনী একটা কালোত্তির্ন স্যাটায়ার যা এখনকার সময়েও ভীষনভাবে প্রাসঙ্গিক। তাছাড়া তাঁর হেয়ালি নাটক, মাইকেলের বুড়ো শালীকের ঘাড়ে রোঁ, এমকি বঙ্কিমের লেখাতেও আমরা স্যাটায়ার পাই। তবে আমার যেটা মনে হলো, কোন একজন লেখক যখন বিখ্যাত হয়ে গেছেন, অনেক গ্রহণযোগ্য ভালো লেখা লিখে ফেলেছেন, তারপর যদি উনি কোন রম্য লিখেন, তখন আমরা বলি,’ দেখেছো ! উনি এইটাও লিখতে পারেন’। বঙ্কিম যখন বেশি ভারি ভারি ছ’খানা উপন্যাস লিখে তারপর ‘কমলাকন্তের দপ্তর’ লিখেন, বা রবীন্দ্রনাথ যখন অসাধারন সব গান, কবিতা, গল্প লিখে তারপরে ‘হেয়ালী’ তে হাত দেন, তখন আর তাদের রম্য গ্রহণে আমাদের বাধা থাকেনা। বিদেশি সিনেমাও আমরা যখন দেখি, চার্লি চ্যাপলিনের কথাই ধরুন না। হাস্যরসের আড়ালে কি অসাধারন সব ম্যাসেজ তিনি দিয়ে গিয়েছিলেন। ধরুন বার্গম্যানের সিনেমা...সেখানে ক্লাউন বিবেকের রোল প্লে করে। সেই এসে মোদ্যা কথাটা বলে চলে যায়। অথচ আমাদের এখানে খুব কমই দেখা যায়, কমেডিয়ান খুব ভাইটাল রোল প্লে করে। বাংলায় প্রিয় নায়কের কথা বললে উত্তম কুমার কিংবা রাজ্জাকের নামই শোনা যায়। অথচ রবী ঘোষ আমার প্রিয় অভিনেতা, এই কথাটা কাওকে বলতে শুনিনি। যেন, উত্তম কুমার তো নায়ক, আর রবী ঘোষ হচ্ছেন শুধুই লোক হাসানোর অভিনেতা। অথচ রবী ঘোষের মতন শক্তিশালী অভিনেতা খুব কমই জন্ম নেয়। সার্কাসের বেলাতেই দেখুন না, সার্কাস মানুষ দেখেই বাঘের খেলা, ট্র্যাপেজি, এইগুলান দেখার জন্য, ক্লাউন কে কি কেউ সার্কাসের মধ্যবিন্দু বলে, বলুন ?

কেউ যদি বলে থাকে, খুব বেশি রসত্তির্ন ব্যঙ্গ লেখা হচ্ছে না বাংলা সাহিত্যে, তাহলে কারনটা আসলে কি হতে পারে ? আমার যেটা মনে হয়, ব্যাঙ্গ করতে গেলে, প্রথমত তো খুব একটা রাগ দরকার, তারপর পরই অদ্ভুত একটা ব্যালেন্স এ দরকার প্রসন্নতা। সিস্টেমের অংশ হবার পরেও, একটু দূর থেকে, বলা ভালো সিস্টেমের বাইরে থেকে পুরো ব্যাপারটা দেখা, ডিটেইলগুলো ধরতে পারা। এমনকি পুরা চিত্রের মধ্যে নিজেকেও দেখার ক্ষমতাটা থাকতে হবে। সবার আগে, নিজের অসঙ্গতি নিয়েই যদি না হাসা যায়, তাহলে ব্যাঙ্গ করবে কেমন করে ? বাংলার বেশ ভালো ভালো লেখকেরাই যেন কিছুটা বিমর্ষ থাকেন। অনেক স্বীকৃত লেখকও মনে করে থাকেন, তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দেয়া হয়নি। এই কথাটা আমি অনেক বড় লেখকদের মুখেই শুনেছি। অর্থাৎ কাওকে হয়তো বাংলা একাডেমি ডাকেনি, হয়তো বাংলা একাডেমি ডেকেছে, কিন্তু প্রথম আলো পুরষ্কার দেয়নি, কিংবা বর্ষসেরা লেখকও হয়েছেন, কিন্তু নোবেল কমিটি ডাকেন নি। তাদের কি আর হতাশার শেষ আছে ? ক্ষোভের তো আর শেষ নেই, না ? এখন সমস্যাটা হচ্ছে, ক্ষোভ আর অভিমান নিয়ে গাল ফুলিয়েই যদি নিজেকে সর্বাঙ্গীন এবং সম্যকভাবে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভেবে নেয়া হয়, তাহলে অমুক কে কিংবা তমুক কে নিয়ে লেখা যাক, কিন্তু নিজের দিকে কলম বা ক্যামেরা তাক করতে হয় না। এইভাবে চললে কিন্ত বাংলা সাহিত্যে ভালো স্যাটায়ার হয়ার ঝামেলা আছে। আমার মনে হয়, আমাদের লেখক সমাজে এই সমস্যাটা খুব প্রবলভাবেই আছে।

ব্যাঙ্গ মূলত অতিরেকের উপরে দাঁড়িয়ে থাকে। চার্লি চ্যাপলিন কি করতেন ? একটা লোক যেভাবে অপদস্ত হতে পারে, উনি তার সবচাইতে বেশিটাই দেখাতেন। এমনভাবে মার খেতেন, যেভাবে আর কেউ খায় না। তাতে আমাদের প্রচন্ড হাসি পায়। হয়তো, হয়তো এরপরে কখনো বাস্তবে অমন দৃশ্য দেখার পর মনে হতেই পারে, আমরা তো আসলেই সমাজের কিছু মানুষের সাথে এমন করছি। কাজেই অতিরেক হচ্ছে স্যাটায়ার বা ব্যাঙ্গের প্রধান অস্র। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, এখন আমাদের সমাজে বা দেশে যা হচ্ছে, তাতে আসলে অতিরেকের আর কিছু বাকি নাই। স্যাটায়ার হবে কি নিয়ে ! বাস্তবতাই তো ফিকশনের চাইতে বেশি হাস্যকর হয়ে দাড়িয়েছে আমাদের দেশে। লোকে এখন কমেডিয়ানের কথা সিরিইয়াসলি নেয়, আর পলিটিশিয়ানের কথায় মূত্র বিসর্জন করে। খবরের কাগজের প্রতিদিনকার হেড লাইনগুলা এক করেও মোটামুটি একটা কমেডি স্ক্রিপ্ট লিখে ফেলা যায়। সুকুমার রায় আজ বেচে থাকলে হয়তো ‘ষোল আনাই মিছে লিখতেন না, দ্বীজেন্দ্রলাল রায় লিখতেন না ‘নন্দলাল’। কারন এরা এখন আর অলীক চরিত্র নয়, এনারাই আমাদেরি মন্ত্রী মিনিস্টার, এনারাই আমাদের বুদ্ধিজীবি। লাইফই যখন ক্যারিকেচার, তখন আর ফিকশনে ক্যারিকেচার করে লাভ কি? আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমরা কিন্তু চমৎকার ভাবে অভ্যস্ত হয়ে গেছি এই লাইফস্টাইলে। এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে যে কোনদিন উত্তরণ হতে পারে, সে ভাবনাই আমরা আর করি না। নিয়ম ভাংতে ভাংতে অনিয়মটাই এখন আমাদের কাছে স্বাভাবিক। কাজেই আমাদের নিজেদেরি যখন এই অবস্থা, তখন রাজা বাদশাদের কিংবা অথরিটিদের নিয়ে স্যাটায়ার লিখলে এখন আর কজন পড়বে বা সমাজে কি প্রভাব পড়বে, সেটাই চিন্তার বিষয়।

কে জানে, আমাদের ভবিষ্যত পৃথিবী হয়তো হাসি খুশির পৃথিবী নয়, রাগ আর শুধুই বিষন্নতার পৃথিবী।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ১:১২
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নতুন কোন কোন সমস্যাকে মেগা-প্রজেক্ট হিসেবে প্রাইওরিটি দেয়ার দরকার?

লিখেছেন সোনাগাজী, ০৩ রা জুলাই, ২০২২ রাত ৮:৩৮



পদ্মায় সেতুর প্রয়োজন ছিলো বলেই ইহা মেগা প্রজেক্টে পরিণত হয়েছিলো; যখন সরকারগুলো সেতু তৈরির জন্য মনস্হির করেনি, তখন তারা উনার বিকল্প ব্যবস্হা চালু রেখেছিলো (ফেরী ও লন্চ... ...বাকিটুকু পড়ুন

টোলে অবস্থা টালমাটাল (!!!) (সাময়িক)

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ০৩ রা জুলাই, ২০২২ রাত ১০:১৯


গুগল ম্যাপ বলছে আমার বাড়ি ঢাকার উত্তর বাড্ডা থেকে মাওয়ার পদ্মা সেতু হয়ে কুয়াকাটার সমূদ্র সৈকত পর্যন্ত যেতে পারি দিতে হবে ২৯৯ কিলোমিটার পথ। সময় লাগবে ৬ ঘন্টা ৪০... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশেষ মহল কেন মটরসাইকেল রাইডাদের পেছনে লেগেছে !!!

লিখেছেন অপলক , ০৩ রা জুলাই, ২০২২ রাত ১১:২২

আসুন জেনে নেই, ঈদ আসলেই কিছু বিশেষ মহল কেন বাইক রাইডারদের উপর চড়াও হয় ?

আসলে যারা ক্ষমতায় থাকে তারা মুখোশধারী। নির্বাচন সামনে, প্রচুর কাঁচা টাকা দরকার হবে। ভোট কেনা বেচা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি একটি অশিক্ষিত পরিবার থেকে উঠে এসেছেন তা সবাইকে জানাতে হবে? ১৮+

লিখেছেন মোহাম্মদ গোফরান, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২২ রাত ১:৩৩

- ছবিতে- মারিয়া নূর । ফটোশ্যুট - আমার এড ফার্ম।

৩ দিন আগে ফেসবুকে সবাই দেখসে বাংলাদেশ এবি পার্টি ওরফে জামাত-শিবির পার্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

কিছু উত্তর আশা করছি,ব্লগারদের কাছে।

লিখেছেন শূন্য সারমর্ম, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২২ সকাল ১১:৪৩




/ অশ্বথ গাছের নিচে বসার ঘন্টাখানেক আগে গৌতম কি ভেবেছিল?
/ হেরাগুহায় অহী পাওয়ার আনন্দ কে লিখে গেছে?
/ সক্রেটিসকে হেমলকের পরিবর্তে ক্রুসে ঝুলানো হলে কি হতো?
/ নোয়াহ হারারী ধ্যান করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×