somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নেপথ্যের নায়কেরা

৩১ শে আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ১২:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



১২ ই এপ্রিল ১৯৬১ , স্থান বইকানুর কসমোড্রম , কাজাকিস্তান, সোভিয়েত ইউনিয়ন । মহাকাশযানে অবস্থানরত এক নভোচারীর সাথে, মহাকাশ যান নিয়ন্ত্রন কক্ষের কথোপকথনঃ
নিয়ন্ত্রন কক্ষ লাইন ১ : ইউরা আলেক্সিবিচ , আমি জারিয়া-১ বলছি । আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন ?
মহাকাশযানে নভোচারীঃ অবশ্যই , আমি রেডিও সিগন্যাল যন্ত্রটি প্রস্তুত করছিলাম । তাই শুনতে ১ সেকেন্ড দেরী হল ।
নিয়ন্ত্রন কক্ষ লাইন ১ : কমরেড , উড্ডয়নের সময় , আমাদের প্রশ্নের উত্তর না দিলেও চলবে । আমি সবকিছু সিগন্যাল কোডের মাধ্যমে পাঠাবো ।
মহাকাশযানে নভোচারীঃ ঠিক আছে।
নিয়ন্ত্রন কক্ষ লাইন ১: আমরা মহাকাশযানের ইঞ্জিন পুরোপুরি চালু করছি । আপনি কি প্রস্তুত?
মহাকাশযানে নভোচারীঃ বুজতে পারছি , অনুভব করছি ।
নিয়ন্ত্রন কক্ষ লাইন ১ :এখন পুরো উড্ডয়ন অবস্থা ।
মহাকাশযানে নভোচারীঃ বুজলাম ।
নিয়ন্ত্রন কক্ষ লাইন ১: উড্ডয়নের নির্দেশ দিলাম ।
মহাকাশযানে নভোচারীঃ "পায়েখালি" , রুশ ভাষায় এর মানে হচ্ছে “চললাম”

পাঠক , উপরের কথোপকথনটি মহাকাশে প্রথম মানুষ রুশ নভোচারী , “ইউরি আলেক্সিবিচ গ্যগারিন” এর সাথে বইকানুর কসমোড্রমে নিয়ন্ত্রন কক্ষে বসা , এক মহাকাশ বিজ্ঞানীর সাথে । গ্যগারিন ভস্তক – 3A , মহাকাশে প্রথম মানুস হিসেবে উড্ডয়নের পূর্ব মুহূর্তে , কসমোড্রমের নিয়ন্ত্রন কক্ষে বসা এক মহাকাশ বিজ্ঞানীর সাথে কথা বলছিলেন ।
পাঠক , মহাকাশে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুৎনিক ওয়ান , মহাকাশে প্রথম প্রাণী লাইকা , মহাকাশে প্রথম মানুষ “ইউরি আলেক্সিবিচ গ্যগারিন” , প্রথম নারী ভালেন্তিনা তেরেস্কোভা , এদের বহন করা ভস্তক সিরিজের মহাকাশযানগুলো - এদের সম্পর্কে আপনারা সবাই জানেন । কিন্তু সোভিয়েতের এতবড় মহাকাশ প্রকল্পের একজন নায়ক রয়েছেন , যিনি তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্পুৎনিক ওয়ান থেকে , মহাকাশে প্রথম মানুষ, মহাকাশে প্রথম নারী ইত্যাদি সমস্ত প্রকল্প পরিচালনা করেছেন । সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘুণাক্ষরে ১৯৯০ , মানে সোভিয়েত ভেঙ্গে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর নাম পরিচয় কোথাও প্রকাশ করেনি, সামান্য কারনে তাঁর উপর করেছে অকথ্য অত্যাচার , খাটিয়েছে তাকে ১০ বছরেরে জেল । এই নেপথ্যের নায়কেই নিয়েই আমার আজকের এই লেখা । তাঁর নাম “সেরগেই পাভলোবিচ কারালেভ" - সোভিয়েত সমস্ত মহাকাশ প্রকল্পের তিনিই ছিলেন মুল পরিকল্পনাকারী , যার অবদান সবচেয়ে বেশি , তিনিই ছিলেন দলনেতা (Team Leader) এবং মূল পরিকল্পনাকারী (chief architect) । গ্যাগারিনের সাথে উপরের কথোপকথনটি তাঁর ।


ছবি ১ : সেরগেই পাভলোবিচ কারালেভ

তৎকালীন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র ইউক্রেনে জন্মগ্রহন করা এই বিজ্ঞানী মাত্র ১৭ বছর বয়সে গ্লাইডার তৈরি করে তাক লাগিয়ে দেন । মস্কো রাষ্ট্রীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর অর্জন করার সময়ই সোভিয়েত সরকারের নজর কাড়েন । কিছু রকেট পাগল তরুন এবং সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করা প্রকৌশলীদের নিয়ে সোভিয়েত সরকার গড়ে তোলে “Group for the study of Jet Propulation”। সারগেই কারালেভ ছিলেন এই পাঠচক্র (Study group) এর প্রধান সমন্বয়কারী । তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সোভিয়েত রকেট বিজ্ঞানী “সান্দের ফ্রেড্রিক” , মিখাইল তিখনারভ প্রমুখ ।
পাঠক, যেহেতু আমার এই লেখাটি রকেট এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির সাথে সম্পর্কিত তাই আমি রকেট প্রযুক্তি সম্পর্কে সামান্য ধারনা দেওয়ার চেষ্টা করব । আমি মনে করি , সামহোয়্যারইন ব্লগ বাংলা ভাষার সকল শ্রেণীর পাঠকের সবচেয়ে বড় মিলন মেলা । তাই সবার কথা মাথায় রেখে আমি পুরো লেখায় জটিল কোনও বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব কিংবা গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার করি নি । যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি খুব সহজভাবে ব্যাপারগুলো ব্যাখ্যা করার।
রকেট কি ? রকেট এমন এক ধরনের যন্ত্র যার সাহায্যে নভোখেয়াযান (space ship) , কৃত্রিম উপগ্রহ ইত্যাদিকে মহাশুন্যে নিয়ে যাওয়া হয় । সুতরাং নভোযান মানেই রকেট নয়, রকেট শুধুমাত্র নভোযানগুলোকে মহাশূন্যে বহন করে এবং নভোযানকে তাদের নির্ধারিত গন্তব্য পর্যন্ত পৌছে দেয় । এক্ষেত্রে রকেট কার্যত “নদীপথে ফেরীর মত” কাজ করে । এটা রকেটের শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ।
সামরিক ক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে তাদের নির্দিষ্ট লক্ষে আঘাত হানার জন্যে রকেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যেমন : আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র । এক্ষেত্রে রকেট ওয়ারহেড (বিস্ফোরক) বহন করে নিয়ে যায় ।
সুতরাং বলা যায় রকেট এক ধরনের বাহক (Carrier) ।
আমি প্রশ্ন করতে পারি “আমিতো উড়োজাহাজের মাধ্যমে নভোযান কিংবা কৃত্রিম উপগ্রহগুলোকে মহাশূন্যে নিয়ে যেতে পারি , আলাদা করে আবার রকেটের প্রয়োজন কি ? অনেকগুলো কারনের মধ্যে যেটা অন্যতম , উড়োজাহাজগুলোতে যে ইঞ্জিনগুলো ব্যবহৃত হয় , আকাশে সেটাকে সচল রাখতে বাতাস থেকে অক্সিজেন নেওয়ার প্রয়োজন পরে , কিন্তু মহাশূন্যে কোন বাতাস নেই তাই অক্সিজেন পাওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না । আবার রকেট তাঁর ইঞ্জিনকে সচল রাখতে মহাশূন্যে রকেট নিজেই তার প্রয়োজনীয় অক্সিজেন বহন করে নিয়ে যায় । যার ফলে রকেট ইঞ্জিন মহাশূন্যে সচল থাকে ।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ১০০ কিঃমিঃ উপরের অংশ থেকে মহাশূন্য শুরু । এই অংশে বিজ্ঞানীরা একটা দাগ কল্পনা করেছেন , যাকে বলা হয় কারমেনের দাগ (Kármán line) ।


ছবি ২ : কারমেনের দাগ (Kármán line) ।

এই থেকে মহাশূন্য শুরু । আমরা জানি যেকোনো কিছুকে উপরের দিকে ছুঁড়ে দিলে , পৃথিবীর মহাকর্ষ বলের কারনে তা নিচের দিকে নেমে আসতে বাধ্য । রকেটকে লাঞ্চ প্যাড থেকে ছুড়ে দেওয়ার পর , পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের বিপরীতে উপরের দিকে উঠে কারমেনের দাগ অতিক্রম করে মহাশূন্য পর্যন্ত পৌঁছতে প্রয়োজন প্রচুর পরিমান বিপরীতমুখী বল এবং প্রচুর জ্বালানী। উদহারন স্বরূপ বলা যায় বর্তমানে উড়োজাহাজে ব্যবহৃত একটি শক্তিশালী ইঞ্জিন হচ্ছে বোয়িং কোম্পানির GE 9X বল হচ্ছে ৪,৭০,০০০ নিউটন (বলের একক) । আর যে রকেটটি ব্যবহার করে মানুষ চাঁদে পৌঁছেছিল SATURN C , তার ইঞ্জিনের বল ছিল ৬, ৭০০,০০০ নিউটন অর্থাৎ বর্তমান পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট উড়োজাহাজ ইঞ্জিনের থেকে ১৪ গুন বেশী ।

কিভাবে রকেট এই পরিমান বল তৈরি করে ? রকেটের মূল শক্তি হচ্ছে তার ইঞ্জিন ।


ছবি ৩ : তরল জ্বালানীর রকেট ইঞ্জিন - liquid propellant rocket propulsion system

রকেট-ইঞ্জিন এ যে যন্ত্রাংশগুলো থাকে সেগুলো হচ্ছে ,
১) জ্বালানী ধারক (Fuel Tank) : যেখানে জ্বালানী হিসাবে তরল হাইড্রোজেন , কেরোসিন কিংবা গ্যাসোলিন থাকে ।
২) জারক ধারক (Oxidizer Tank): অক্সিডাইজার এমন এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ , যা দহনে সহায়ক। রকেটের ক্ষেত্রে অক্সিডাইজার হচ্ছে তরল অক্সিজেন , যা রকেট ইঞ্জিনে জ্বালানীকে পুড়তে সহায়তা করে , কিন্তু মহাশূন্যে অক্সিজেন বা অন্যান্য অক্সিডাইজার নেই , তাই রকেটকে পর্যাপ্ত পরিমান অক্সিজেন সাথে করে নিয়ে যেতে হয় ।
৩) টার্বো পাম্প (Turbo Pump) : এটা এমন এক ধরনের যন্ত্র , যা প্রবল চাপে তরল জ্বালানী ও জারককে দহন কক্ষের দিকে ঠেলে দেয় ।
৪) নিয়ন্ত্রন চাবি (Controlling valve): ইঞ্জিনের এই অংশটি দহন কক্ষে জ্বালানী প্রবাহ নিয়ন্ত্রন করে ।
৫) দহন কক্ষ (combustion chamber) : নামটা শুনেই বোযা যাচ্ছে এই কক্ষে তরল জ্বালানী এবং অক্সিডাইজারের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তরল জ্বালানী দহনের ফলে উৎপন্ন হয় বিপুল পরিমান গ্যাস , যাকে বলা হয় exhaust.
৬) বহির্গমন নল (nozzle): এই বিপুল পরিমান গ্যাস যে নল দিয়ে বাইরে নির্গত হয় তাকে বলা হয় বহির্গমন নল । এটা একদম রকেটের নিচের অংশ ।

এখন দেখা যাক রকেট ইঞ্জিন কিভাবে কাজ করে ?
রকেট ইঞ্জিন যে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে কাজ করে সেটা আমরা সবাই জানি , নিউটনের চিরায়ত বলবিদ্যার সূত্রগুলো । এক্ষেত্রে তৃতীয় সূত্রটির প্রভাব তুলনামুলকভাবে একটু বেশি । কথিত আছে নিউটন সাহেব আপেল গাছের নিচে বসে এগুলো চিন্তা করেছিলেন , আদৌ সত্য কিনা আমি জানি না (এমনি ইংল্যান্ড , আমেরিকার লোক একটু গুল টুল বেশি মারতে বেশি পছন্দ করে) । নিউটনের তৃতীয় সূত্র প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
ধরুন আমার কাছে একটি বাতাস দিয়ে ফুলানো বেলুন রয়েছে এবং বেলুনের মুখ রাবারব্যান্ড দিয়ে আটকানো । এখন আমি যদি বেলুনের মুখ থেকে হঠাত রাবারব্যান্ড টান দিয়ে খুলে দি , তখন বেলুনটি সব বাতাস বের না হওয়া পর্যন্ত , বিভিন্ন দিকে ছুটতে থাকে । এখানে যেটা ঘটেছে কিছু বাতাস , বেলুনের মধ্যে ঢুকিয়ে একটি বহির্মুখী চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে । এই বাতাস একটু বের হওয়ার জায়গা পেলেই , প্রচণ্ড বেগে বাইরে চলে আসে এবং যেদিক বাতাস বেরুচ্ছে , বেলুনটি তার বিপরীতদিকে সামনে ছুটতে থাকে । এক্ষেত্রে বেলুনটির রাবারব্যান্ড খুলে গ্যাস বের করে দেওয়া - ক্রিয়া (Action) এবং যার ফলে বেলুনের বিপরীত দিকে ছুটতে শুরু করা এটা বিপরীত প্রতিক্রিয়া (Reaction) । রকেটের ক্ষেত্রে , একই নিয়মই প্রযোজ্য ।
জ্বালানী ধারক থেকে তরল জ্বালানী এবং জারক ধারক থেকে তরল জারক টার্বো পাম্পের মাধ্যমে দহন কক্ষে প্রেরন করা হয় । দহন কক্ষে তরল জ্বালানী এবং জারকের রাসায়নিক বিক্রিয়া – দহনের ফলে উৎপন্ন হয় উচ্চ তাপমাত্রা , প্রবল ভরের গ্যাস এবং অগ্নিশিখা । এখানে প্রবল ভরের গ্যাস কথাটা কেন বললাম ? তার কারন রকেটে যে পরিমান জ্বালানী ব্যবহার করা হয় , সেটা রকেটের সামগ্রিক ভরের ৮৫% থেকে ৯০% (গাড়ির ক্ষেত্রে গাড়ির মোট ভরের ৪% এবং একটি জাহাজের ক্ষেত্রে ৩%)। জ্বালানী যখন কঠিন বা তরল অবস্থা থেকে পোড়ার পর গ্যাসীয় অবস্থা ধারন করে , তখনও জ্বালানীর ভরের কোনও পরিবর্তন হয় না। যদি এক পাউন্ড জ্বালানী পোড়ানো হয় তবে নজেল দিয়ে ওই এক পাউন্ড সমমানের উচ্চ তাপমাত্রার , উচ্চ চাপের ও প্রচণ্ড গতির গ্যাস বের হবে। এই ঘটনাতে শক্তির ধরন বদলায় , ভর বদলায় না । একই সাথে এই গ্যাস দহন কক্ষের একটি ছোট ছিদ্র দিয়ে প্রবল বেগে বের হয়ে আসে । একে বলা হয় Throat এবং অবশেষে বহির্গমন নল দিয়ে এই প্রবল ভরের গ্যাস এবং অগ্নিশিখা বাইরে নির্গত হয় ।
এখানে দহন কক্ষে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে উৎপাদিত প্রবল ভরের গ্যাস যে উচ্চচাপের (High Pressure) সৃষ্টি করে , সেটা একদিকে গ্যাস , অগ্নিশিখা ইত্যাদিকে দ্রুতগতিতে পেছনের দিকে বের করে দিচ্ছে , এটা ক্রিয়া আর তার প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট বল রকেটকে উপরের দিকে ধাক্কা দিচ্ছে , যার ফলে রকেট উপরের দিকে ছুটে চলে । যে বল , রকেটকে ধাক্কা দিয়ে উপরের দিকে উঠিয়ে নিয়ে যায় , তাকে বলা হয় Thrust. ক্রিয়ার ফলে , প্রতিক্রিয়ায় এই ইঞ্জিন চলে বলে , রকেট ইঞ্জিন কে বলা হয় Reaction ইঞ্জিন আর এই পুরো প্রক্রিয়াকে বলা হয় Rocket Propulsion system.

এতক্ষন আমরা রকেট ইঞ্জিন সম্পর্কে জেনেছি , এবার আমরা জানবো রকেটের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সম্পর্কেঃ


ছবি ৪ : রকেটের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ

মূল কাঠামো (Rocket Body ): যা সব যন্ত্রাংশ যেমনঃ রকেট ইঞ্জিনের বিভিন্ন অংশ যেমন জ্বালানী ধারক , টার্বো পাম্প ইত্যাদিকে একটার সাথে একটাকে ধরে রাখে যা পুরটাই একটা নলের মত ।

ফিন (Fins) : ফিন এমন এক ধরনের যন্ত্র , যা রকেটকে সোজা উপরের দিকে উঠতে সাহায্য করে ।

শঙ্কু আকৃতির অগ্রভাগ বা রকেটের মুখ (Nose Cone): রকেটের অগ্রভাগ এই নোসকনে থাকে রকেটের পেলোড (Pay Load), মানে রকেট যেটা মহাশূন্যে বয়ে নিয়ে যায় । হতে পারে এটা কোন নভোখেয়াযান , কৃত্রিম উপগ্রহ , রোবট কিংবা কোন প্রানী । সাধারনত আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র গুলো যে পেলোড বহন করে নিয়ে যায় তাকে বলে warhead ।

এক্ষেত্রে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে , রকেটের স্টেজ ।


ছবি ৫ : রকেটের স্টেজ

একটি রকেটকে একটা বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য যে গতিবেগ দরকার তা এক স্তরের রকেট দিয়ে সম্ভব নয় । তাই বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করার সুবিধার্থে রকেটকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা হয় । প্রত্যেকটি স্তরের রকেটের নিজস্ব জ্বালানী এবং নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা থাকে। সাথে আরেকটি যন্ত্রাংশ থাকে যাকে বলা হয় বুস্টার (এ নিয়ে পরের অংশে লিখছি)। প্রথম , দ্বিতীয় স্তরের কাজ হয়ে গেলে, সেগুলো সর্বশেষ স্তর থেকে আলাদা হয়ে যায় , পরে শেষ স্তরটি পেলোড হিসাবে নভোযান কিংবা কৃত্রিম উপগ্রহকে মহাশূন্যে নিয়ে যায় ।
পাঠক , এতক্ষণ আমি যা আলোচনা করলাম তা তরল জ্বালানীর রকেট ইঞ্জিন - liquid propellant rocket propulsion system , কিন্তু এ ছাড়াও কঠিন জ্বালানীর রকেটও - solid fuel rocket propulsion system পৃথিবীতে বহুল প্রচলিত ।



ছবি ৬ কঠিন জ্বালানীর রকেট - solid fuel rocket

কঠিন জ্বালানীর রকেটে , জ্বালানী হিসাবে ব্যবহৃত হয় Gunpowder – এটা সাধারনত সালফার, চারকোল এর মিশ্রণ এবং জারক হিসাবে ব্যবহৃত হয় পটাশিয়াম নাইট্রেট । এরা সাধারনত তরল জ্বালানীর রকেটের সহায়ক হিসাবে ব্যবহৃত হয় , যাদেরকে বলা হয় Booster. সাধারনত প্রাথমিক স্তরে (Primary stage) বা প্রথম স্তরে তরল জ্বালানীর রকেটকে উড্ডয়নে সাহায্য করে । যখন জ্বালানী শেষ হয়ে যায় , তখন এরা খসে পরে , একে বলা হয় Booster engine cut-off । বেস কিছু ক্ষেপণাস্ত্র বর্তমানে কঠিন জ্বালানীর রকেট ইঞ্জিন ব্যবহার করছে । কঠিন জ্বালানীর রকেট পৃথিবীর সর্বপ্রথম রকেট । আজকে আমরা ঈদের দিন চান রাতে কিংবা কালীপূজোয় যে আতসবাজিগুলো উড়াই , সেগুলো কঠিন জ্বালানীর রকেটের আদিরূপ , এগুলোতে গান পাউডার ব্যবহার করা হয় । শুরুতে রকেটের ব্যবহার ছিল শুধুমাত্র সামরিক ক্ষেত্রে এবং তারা বুঝতে পেড়েছিল যে গানপাউডারের বিস্ফোরনের ফলে নির্গত গ্যাস , অপেক্ষাকৃত বড় ধরনের টিউবকেও দূরে ছুড়ে ফেলতে সক্ষম । চীন , ভারত প্রভৃতি জায়গাতে এ ধরনের টিউবের ব্যবহার ছিল ।

১৮৯৮ সালে এসে কন্স্তান্তিন এদুয়ার্দোভিচ সিওলকোভ্স্কি (Konstantin Eduardovich Tsiolkovsky) নামে এক রুশ স্কুল শিক্ষক তার একটি গবেষণাপত্রে দেখান যে , তরল জ্বালানী ব্যবহার করে রকেটকে অনেকদূর পর্যন্ত প্রেরন করা সম্ভব এবং নিক্ষিপ্ত রকেটের গতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এর থেকে নির্গত গ্যাসের পরিমান ও গতির পরিবর্তনের মাধ্যমে ।


ছবি ৭ এদুয়ার্দোভিচ সিওলকোভ্স্কি (Konstantin Eduardovich Tsiolkovsky)

১৯০৩ সালে তিনি প্রকাশ করেন তার বিখ্যাত বই “Exploration of outer space by means of Rocket device”.


ছবি ৮ “Exploration of outer space by means of Rocket device” এর অরিজিনাল কপি।

এই বইতেই তিনি প্রকাশ করেন , তার বিখ্যাত রকেট সমীকরণ যা ব্যবহার করে বের করা সম্ভব তরল জ্বালানির রকেটকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌছতে কি পরিমান তরল জ্বালানীর প্রয়োজন , সেটা নির্ভর করে গ্যাসের নির্গমন গতিবেগ ও গতিবেগ পরিবর্তনের হারের উপর । এছাড়াও তিনি উল্লিখিত গ্রন্থে , পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ এড়ানোর জন্য বহু স্টেজের রকেট , জ্বালানী এবং জারক হিসাবে তরল অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের ব্যবহার , কক্ষপথে ব্যবহারের জন্য ঘূর্ণায়মান স্টেশন , নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় গতি গণনার সমীকরণ ইত্যাদি বহু ধারনা দিয়ে গেছেন কোন বড় বিজ্ঞানী বা প্রকৌশলীদের সাহায্য ছাড়াই । কিন্তু তিনি তার কোন ধারনাই বাস্তবে রুপ দিতে পারেন নি ।

এটা সম্ভব করেছিলো রবার্ট হাচিংস গডার্ড - Robert H. Goddard নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিজ্ঞানী , তিনি খুব সৌভাগ্যবান ছিলেন কারন তার কখনই তহবিলের অভাব হয় নি , কারন মার্কিন সরকার সেনাবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্রের আরও উন্নয়ন চাচ্ছিলো , বেশ কয়েকবার অসফল হওয়ার পর ১৯২৬ সালে গডার্ড তার রকেটের একটা প্রোটোটাইপ তৈরি করতে সক্ষম হন এবং সেটাতে জ্বালানী হিসাবে তরল গ্যাসোলিন ব্যবহৃত হয়েছিল।


ছবি ৯ঃ রবার্ট হাচিংস গডার্ড - Robert H. Goddard ও তার রকেট

এই রকেট আড়াই মিনিটে ১২ মিটার উড়তে সক্ষম হয়েছিল । গডার্ড এর রকেট রাইট ভাত্রিদ্বয়ের উড়োজাহাজের মত এত জনপ্রিয় না হলেও এটা রকেট গবেষণায় নতুন যুগের সূচনা করে । তাই গডার্ডকে আধুনিক রকেট গবেষণার জনক বলা হয় ।

এবার আমি মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি । তরল জ্বালানীর রকেট প্রযুক্তিতে এই সাফল্য গোয়েন্দা মারফত , সোভিয়েতদের কানে আসার পরই কারালেভ ও তার সহকর্মীদের প্রতি সরকারের উচ্চ মহল থেকে চাপ আসছিলো । ১৯৩৬ , ১৭ই আগস্ট কারালেভ এবং তাঁর সহকর্মীদের নেতৃত্বে, তাঁরা সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম মনুষ্যবিহীন তরল জ্বালানী রকেট (Liquid Fuel Rocket) এর পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করেন ।


ছবি ১০ঃ GIRD-9 রকেট

এটা ছিল সোভিয়েত মিসাইল প্রযুক্তির আদিরূপ ।এবং রকেটটির নাম ছিল GIRD-9 এবং এই রকেট ৪০০ মিটার পর্যন্ত উচ্চতায় পৌছতে সক্ষম হয়েছিলো ।
একই সময়ে জার্মানিতে রকেট গবেষণার জন্য গঠিত হয় Verein fur Raumschiffahrt (Society for Space Travel), এই গবেষণায় নিযুক্ত এক তরুন বিজ্ঞানী পরে রকেট প্রযুক্তির মোড় ঘুরিয়ে দেয় ।
এরপর কারালেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য Cruise Missile তৈরির গবেষণায় মত্ত হন এবং ১৯৩৪ সালে প্রকাশ করেন তার প্রথম বই “Rocket Flight in Stratosphere”। পাঠক , এখানে আমি সামান্য করে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সম্পর্কে ধারনা দেব।

(ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রঃ এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সাধারনত পাইলট বিহীন উড়োজাহাজের ছোট রুপ। এরা সাধারনত রামজেট ইঞ্জিন ব্যবহার করে । এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর কাজ হল নির্দিষ্ট লক্ষে ৪৫০ কেজি -৯০০ কেজি পর্যন্ত বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো । বোমার বিস্ফোরণের পর ক্ষেপনাস্ত্রটি ধ্বংস হয়ে যায়। এদের আরেকটি বিশেষত্ব হচ্ছে , নিক্ষেপের পর এরা সাধারণত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ না করে সম্পূর্ণ ভ্রমনপথ (Trajectory) নিজের জ্বালানী খরচ করে নির্দিষ্ট লক্ষে আঘাত হানে ।


ছবি ১১ঃ ক্ষেপনাস্ত্র হচ্ছে BRAHMOS (PJ-10)

এদের সাধারনত যুদ্ধবিমান , স্থলবাহিনীর যুদ্ধ যান (Ground vehicles) , যুদ্ধজাহাজ , সাবমেরিন প্রভৃতি থেকে নিক্ষেপ করা হয়। এদের গতি এবং গতিপথ , নির্ভুল ভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া থাকে । তবে এদের দিক (Direction) এবং International Navigation system এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রন করা যায় (Guided Missile)। এরা সাধারণত মাঝারী পাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র , কিন্তু এরা কখনোই আন্তঃমহাদেশীয় নয় । বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন ক্রুজ ক্ষেপনাস্ত্র হচ্ছে BRAHMOS (PJ-10) যা বেশ কিছুদিন আগে ভারত , রাশিয়া যৌথ উদ্যোগে তৈরি করেছে । এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ২.৮-৩.০ Mach speed গতিতে চলাচল করে (১ ম্যাক্ নাম্বার = ঘন্টায় ১৩৬২ কিঃমিঃ)

১৮৯৬ এর জানুয়ারিতে কারালেভ এবং তার সহকর্মী বন্ধু ভালেন্তিন পেত্রভিচ গ্লুশকো - Valentin Petrovich Glushko মিলে শুরু করেন প্রজেক্ট ২১২ ।


ছবি ১২ঃ রকেট বিজ্ঞানী ভালেন্তিন পেত্রভিচ গ্লুশকো - Valentin Petrovich Glushko

তাঁরা ২১২ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রটি আরও বেশি দূরত্বে পাঠানোর চেষ্টা করছিলেন । কিন্তু নিচের ঘটনাটা সোভিয়েত রকেট গবেষণার পর্দা আপাতত এখানেই ইতি টানে ।

সেদিনটা ছিল গ্রীষ্মের মাঝামাঝি ২২ এ জুন ১৯৩৮ । রাত ৯ টার কারালেভ তাঁর মস্কোর লুবনিনার বাসায় নিজের তৈরি গবেষণাগারে অধ্যয়নরত। হটাৎ কলিং বেল এবং জোড়ে দরজা ধাক্কানোর শব্দ । কারালেভের স্ত্রী সোনিয়া দরজা খুলে দেওয়ার প্রায় ১০ জনের মত সোভিয়েত ইন্টেলিজেন্সের (People's Commissariat for Internal Affairs –NKVD) লোক কারালেভের সাথে দেখা করতে চায় , বিনা অনুমতিতে তারা কারালেভের পড়ার ঘরে প্রবেশ করে তাকে তার কলার ধরে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে আসে , ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত কারালেভ তার প্রিয় বন্ধু গ্লুশকো কে ফোন করতে চাইলে তাকে দেওয়া হয় নি । টেনে হিঁচড়ে তাকে গাড়িতে তোলা হয় এবং তাঁকে জানতে দেওয়া হয় নি যে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এরপর দুদিন কারালেভের কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি । তাঁর বাগদত্তা সেনিয়া কারালেভের কর্মস্থল RENI – Jet propulsion research institute এর মাধ্যমে জানতে পারেন কারালেভের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র দ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং শীঘ্রই তাঁর বিচার হবে ।
পরে কারালেভের আত্মজীবনী থেকে জানা যায় – মূল রুশ থেকে অনুবাদ
“তখন সমগ্র সোভিয়েত ইউনিয়ন জুড়ে চলছিল স্ট্যলিনের ট্রতস্কি বিরোধী শুদ্ধি অভিযান । আমার আর গ্লুসকোর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে আমাদেরই RNII এর প্রধান আমাদের বিরুদ্ধে NKVD কে অভিযোগ করেছিলো যে আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্রুজ মিসাইল কেন্দ্রিক গবেষণায় হেলা ফেলা করছি এবং নির্দিষ্ট সময়ে সফল হতে পারি নি । তিনি এতই ধূর্ত ছিলেন যে আমার কারারুদ্ধ হওয়ার পর আমার স্ত্রী সেনিয়াকে তার সাথে ঘুমানর প্রস্তাব দেন এবং আমার স্ত্রী ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখান করেন । আমকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তাদের টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং অভিযোগ পড়ে শোনানো হয় সোভিয়েত রাজের অর্থ অপচয়কারী আমি , কর্তব্যে অবহেলা , নির্দিষ্ট সময়ে ক্রুজ মিসাইল কেন্দ্রিক গবেষণা শেষ না করা , আমি উত্তরে বললাম কোন গবেষণা কর্ম কখনও একদিনে শেষ হয় না , আমাদের আরও সময় দরকার। তারা আমাকে বলল তুমি তোমার অপরাধ স্বীকার করে নাও । আমি বললাম “না” । আমি কোন অপরাধ করিনি যে স্বীকার করব। তারা আমাকে প্রায় এরকম প্রতিদিন দু ঘণ্টা করে রুটিন মাফিক পেটাত । আমি রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতাম , একদিন জল চেয়েছিলাম , সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থার এক অফিসার আমার মুখে প্রস্রাব করে দেয় , চীৎকার করে বলতে থাকে তুই রাস্টদ্রোহী, জিজ্ঞাসাবাদের এই সময়ে আমাকে প্রায়ই খেতে দেওয়া হত না । একদিন আমাকে মাড়তে মাড়তে আমার দুই চোয়াল ভেঙ্গে দেওয়া হয় , আমি প্রায় ছ মাস চিকিৎসাধীন ছিলাম । এর পরও অনেকদিন আমার খেতে কষ্ট হয়েছে । তবুও আমাকে দিয়ে তারা স্বীকারোক্তি আদায় করতে পারে নি”।


ছবি ১৩ঃ সোভিয়েত গুলাগে কয়েদির বেসে কারালেভ

পাঠক , একটু খেয়াল করুন যে সমাজ ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র বিশ্বের মজদুর , শোষিত , নির্যাতিত মানুষের প্রতিনিধি বলে দাবী করেছিল – জ্ঞানী , গুনি মানুষের প্রতি এই প্রলিতারিয়েত নামক গুন্ডাদের ব্যবহারটা একবার দেখুন। যদিও এইসব ব্যপারে সোভিয়েত প্রিমিয়ার স্ট্যালিন তখন কিছুই জানতেন না ।

পুত্রশোকে কারালেভের মা অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন , তাঁর আত্মজীবনী থেকে কিছু অংশ নেওয়া
“আমি অনেকবার ক্রেমলিনে কমরেড স্ট্যালিনের সাথে দেখা করার চেষ্টা করেছি ,কমিউনিস্ট পার্টির অনেকেই আমাকে আশ্বাস দিয়েছিল, তাদের টাকাও দিয়েছি , কোন লাভ হয় নি ।পত্রপত্রিকায় দেখি স্টালিন নাগরিকদের লেখা চিঠি পড়েন । খুব আশা নিয়ে , পর্যাপ্ত প্রমান সহ একটি চিঠি প্রস্তুত করলাম। ডাকঘরে কর্মরত মেয়েটি আমাকে প্রশ্ন করল তো “চিঠিটা আপনি কাকে পাঠাবেন কমরেড স্ট্যালিনকে ? তো এই ধরনের চিঠি তো আমরা নি না , আপনি একটা কাজ করুন আমাদের ডাকঘরের কাছেই একটা মানসিক হাসপাতাল আছে , সেখানে ভর্তি হন ।“ পাঠক , এটাই ছিল প্রলতারিএতদের তৈরি করা সমাজ ব্যবস্থা।
সোভিয়েত আদালত কারালেভকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয় ।
সাধারন কয়েদীর মত তাকে পাঠানো হয় GULAG (Main Administration of Camps) – ভয়ঙ্কর সোভিয়েত জেল ।
১৯৩৯ থেকে প্রায় ১৯৪১ সাল পর্যন্ত তিনি সশ্রম কারাদণ্ড হিসাবে সোনার খনিতে কাজ করেছেন। তাঁর মেয়ের ভাষায় “বাবা , সোনা সহ যেকোনো অলংকারকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন । একবার , মা , বাবাকে জন্মদিনে সোনার আংটি উপহার দিয়েছিলেন – বাবা , মাকে বলেছিলেন , আংটিটা বদলে তার সমপরিমান টাকা দিয়ে আমার জন্যে ফুল নিয়ে এসো ।

১৯৩৯ সালের শেষের দিকে আরেক বিখ্যাত ক্ষেপণাস্ত্র বিজ্ঞানী Alexei Andreyevich Tupolev টুপালেভের অনুরোধে কারালেভ ও গ্লুশকোকে মস্কোতে স্থানান্তরিত করা হয় । শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধর শুরুতে সোভিয়েত বাহিনী জার্মান নাজী বাহিনীর হাতে প্রচণ্ড মার খেতে থাকে । সোভিয়েত বিমান বাহিনী অত্যাধুনিক বিমানের অভাবে , জার্মান নাজি বাহিনীর সামনে দাঁড়াতেই পারছিলো না । এ সময় আরও উন্নত যুদ্ধবিমানের নকশা প্রনয়নের লক্ষ্যে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রকৌশলী টুপালেভকে দায়িত্ব দেওয়া হয় । টুপালেভ জেলের ভেতরেই , কারালেভ ও গ্লুশকোকে সাথে নিয়ে , ডিজাইন করে সোভিয়েত ইউনিয়নের সে সময়কার সবচেয়ে শক্তিশালী যুদ্ধবিমান TU-2 এবং PC-2 । উল্লেখ্য সোভিয়েত ইউনিয়নের এই দুটো যুদ্ধবিমানই জার্মানির বিপক্ষে জেতার জন্য , যুদ্ধের মোড় সম্পূর্ণ অন্যদিকে ঘুড়িয়ে দেয় ।
জেলজীবন সম্পর্কে কারালেভের আত্মজীবনী থেকে “সেলে বসে আমি একা একা মাঝে মাঝে ভাবতাম কোথায় আমার কন্যা , আমার মাই বা কেমন আছেন ? আমি রাষ্ট্রদ্রোহী! ছি! কেন আমাকে মেরে ফেলা হচ্ছেনা ?”।

রকেট প্রকৌশলী টুপালেভ স্টালিনকে জানান নিরাপরাধ চৌকষ রকেট প্রকৌশলীরা , আজ প্রায় অনেক বছর আপনার গোয়েন্দা বিভাগের কারনে গুলাগে বন্দি , যারা আমাদের যুদ্ধবিমান উন্নয়নে অবদান রেখেছেন । তৎক্ষণাৎ স্টালিন এই ব্যাপারে উদ্যোগ নেন এবং তাঁর নির্দেশে সোভিয়েত সরকার এক বিশেষ ডিক্রি জারি করে কারালেভ ও গ্লুশকো সহ অন্যান্য রকেট প্রকৌশলীদের মুক্তি দেয় । এটা ছিল ২৭ এ জুন ১৯৪৪ ।

ক্রেমলিনে কারালেভ ও গ্লুশকো প্রায় ১ ঘণ্টা বৈঠক করেন । কারালেভের আত্মজীবনী থেকে (মূল রুশ থেকে অনুবাদ)
“পাহাড় প্রমান ব্যক্তিত্বের অধিকারী স্তালিনের সামনে , আমি নত হয়ে গিয়েছিলাম , কথা বলছিল গ্লুশকো , আমি শুধু শুনছিলাম , তবে বুঝতে পারছিলাম আমি সহ অন্যান্য রকেট প্রকৌশলী কে ষড়যন্ত্র করে সরানো হয়েছে , এই ব্যপারে স্তালিন কিছুই জানতেন না । যাইহোক আমরা দাবী করলাম রকেট এবং ক্ষেপনাস্ত্র বিষয়ক গবেষণা সংস্থা RNII কে পুরোপুরি NKVD (সোভিয়েত পুলিশও গোয়েন্দা সংস্থা) এর প্রভাবমুক্ত করা হোক । গঠন করা হোক আলাদা কমিশন । এই কমিশন সরাসরি ক্রেমলিনে তাদের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে ধারনা দেবে , অন্য কারও মাধমে নয় ।
অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময় জার্মানরা রকেট প্রযুক্তিতে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করে । যার ফলাফল V2 রকেট। এটা ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত পৃথিবীর প্রথম তরল জ্বালানীর সামরিক ক্ষেপণাস্ত্র যা ৩২০ কিঃমিঃ পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছিলো । উল্লেখ্য যে এই ক্ষেপণাস্ত্রটিকে বহন করা রকেটি ছিল , পৃথিবীর প্রথম রকেট, যেটা আমাদের আয়ন মণ্ডলের কারমান লাইন অতিক্রম করে মহাশূন্যে ভ্রমন করেছিলো ।


ছবি ১৪ঃ Wernher Freiherr von Braun

এই রকেট প্রকল্পের মূল পরিকল্পনাকারী Wernher Freiherr von Braun , যাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর , মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যায় এবং নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নতি সাধনে কাজে লাগায় ।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর , রকেটের মোটর প্রযুক্তির উন্নয়নে অবদান রাখার জন্যে , কারালেভকে রেড আর্মির “পল্কভনিক (কর্নেল)” উপাধিতে ভূষিত করা হয় । ক্ষেপনাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়ন অব্যাহত রাখার জন্যে কারালেভের গবেষণা প্রতিষ্ঠানটিকে (যা OKB-1 নামে পরিচিত ছিল এবং বর্তমানে Energia Corporation) প্রচুর পরিমানে অর্থায়ন করা হয় এবং তাকে নিযুক্ত করা হয় এই গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান পরিকল্পনাকারী বা সমন্বয়কারী Chief designer ।

১৯৪৬ সালে স্তালিন এক গোপন বৈঠকে কারালেভকে আরও দুরপাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র তৈরিতে উৎসাহিত করেন এবং বলেন সোভিয়েত সরকার এর পুরোপুরি অর্থায়নে প্রস্তুত । এসময় , ঠিক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পর কারালেভ , v2 ক্ষেপণাস্ত্রটির রকেট ইঞ্জিন সম্পর্কিত তথ্য আহরনের জন্যে বার্লিনে এ আসেন , কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি তিনি বার্লিনে এসে কাজে লাগানোর উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই পেলেন না , পেলেন শুধুমাত্র V2 রকেটের কিছু প্রোটোটাইপ । জার্মান প্রকৌশলীদের সাথে কথা বললেন , তারা তাকে জানালেন যে V2 রকেট এর সাথে সংশ্লিষ্ট Wernher Freiherr von Braun সহ সকল রকেট বিজ্ঞানী operation paperclip এর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের দেশে ধরে নিয়ে গেছে , তাদের নিজেদের রকেট প্রযুক্তির উন্নতি সাধন করার জন্যে ।

পাঠক , বাংলাদেশের কিছু দালাল শ্রেণীর লোকের বইয়ে এই কথাটা খুব ফলাও করে প্রচার করা হয় দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর রকেট বিজ্ঞানীদেরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ভাগাভাগি করে নিয়ে যায় , তাই তারা রকেট প্রযুক্তিতে এত উন্নত । এখানে যে ব্যপারটা ঘটেছিল জার্মানি থেকে রকেট বিজ্ঞানীদেরকে ভাগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র । তাদের explorar -1 থেকে Apollo 11 mission পর্যন্ত সবই ছিল কিছু জার্মান নাগরিকের অবদান । আর অন্যদিকে রুশরা যেভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছিল কিংবা এখনো করছে সেটা তাদের মেধা ও প্রজ্ঞায় ।

কারালেভ ও পৃথিবীর প্রথম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপনাস্ত্র : (intercontinental ballistic missile (ICBM) :

পাঠক, আমার লেখার এই অংশে , আমি প্রথমে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপনাস্ত্র সম্পর্কে ধারনা দেওয়ার চেষ্টা করব ।
আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রগুলো রকেট ইঞ্জিন ব্যবহার করে , উৎক্ষেপণের পর এই ধরনের ব্যালেস্টিক পথ (Ballistic trajectory) ব্যবহার করে বলেই এদের বলা হয় ব্যলেস্টিক মিসাইল!
ব্যালেস্টিক ক্ষেপনাস্ত্রের কার্যপ্রণালী পুরটাই রকেটের মত । এরাও বেশ কয়েকটি স্তরে (stage) বিভক্ত থাকে। এটা আমি আগেই আলোচনা করেছি ।

কেন আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র বা ICBM কে ব্যালেস্টিক বলা হচ্ছে ?
এখানে প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে ব্যালেস্টিক জিনিষটা কি ? ক্রিকেটে জোড়ে একটা ছক্কা হাঁকালেন , খেয়াল করুন বলটা, প্রথমে উপরে উঠে একটা অর্ধ বৃত্তাকার পথ পাড়ি দিয়ে সীমানা (Boundry) তে গিয়ে পড়ছে। এখানে যে বলটা আপনি ব্যাট দিয়ে আঘাত করেছেন সেটা একটা নিক্ষিপ্ত বস্তু , যে অর্ধবৃত্তাকার পথ পাড়ি দিয়ে বাউন্ডারিতে গিয়ে পড়েছে । সেটা নিক্ষিপ্ত বস্তুর বা বলটার ট্রাজেক্টরি ভ্রমন পথ ।এবং যে গতিতে (Motion of projectile) বলটা প্রথমে উপরের দিকে উঠে , পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের কারনে , আবার নিচের দিকে নেমে আসছে , সেই গতিবিসয়ক বিজ্ঞানকেই বলা হয় ব্যালেস্টিক । অর্থাৎ এক কথায় যে সব নিক্ষিপ্ত বস্তুর ভ্রমনপথ আবক্র বা অর্ধবৃত্তাকার , সেই সব নিক্ষিপ্ত বস্তুর গতিবিষয়ক বিজ্ঞানকেই বলা হয় ব্যালেস্টিক । আর এই নিক্ষিপ্ত বস্তু (যেমন ছক্কা হাঁকানোর বল) যা অর্ধবৃত্তাকার পথে উপরে উঠে আবার নিচের দিকে নেমে আসে , সেই অর্ধবৃত্তাকার পথটাকেই বলা হয় ব্যালেস্টিক ট্রাজেক্টরি । উৎক্ষেপণের পর আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ঠিক এই ধরনের ব্যালেস্টিক ট্রাজেক্টরি ব্যবহার করে বলেই এদেরকে বলা হয় আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপনাস্ত্র বা (Iintercontinental ballistic missile (ICBM) ).
ব্যালেস্টিক ক্ষেপনাস্ত্রের কার্যপ্রণালী পুরটাই রকেটের মত । এরাও বেশ কয়েকটি স্তরে (stage) বিভক্ত থাকে ।
প্রত্যেকটি স্তরে (Stage) এ আলাদা আলাদা রকেট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয় । কারন বড় একটা রকেট ইঞ্জিন তৈরির চেয়ে ছোট একটি রকেট ইঞ্জিন তৈরি ও বহন করা সহজ ।


ছবি ১৫ঃ ব্যালেস্টিক ট্রাজেক্টরি

প্রথম স্তরে রকেট ইঞ্জিন ও বুস্টারের সাহায্যে পুরো ক্ষেপণাস্ত্রটিকে ছুড়ে দেওয়ার পর , এরা এক ধাক্কায় উঁচুতে ওঠে আকাশ পানে । তারপর প্রথম স্তরের রকেট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় । দ্বিতীয় স্তরের রকেটটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয় , পৃথিবীর আবহমণ্ডল এবং কারম্যানের দাগ থেকে বেশি উচ্চতায় । তখন রকেটের এই স্তরটি চলে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিতে । এই স্তরটিও জ্বালানী পুড়িয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় । বাকি থাকে তৃতীয় স্তর, এটা একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করার পর , সেটা নেমে আসতে থাকে পৃথিবীর দিকে , পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে ভূপৃষ্ঠে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে । এই তৃতীয় স্তরটি ক্ষেপনাস্ত্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই তৃতীয় স্তরটি পেলোড হিসাবে বহন করে ওয়ারহেড । ওয়ারহেড হতে পারে পারমানবিক বোমা রাসায়নিক অস্ত্র , জৈবিক অস্ত্র এবং যেকোনো ধরনের উচ্চ বিস্ফোরক , যা পৃথিবীতে আঘাত হানে ।
পৃথিবীকে নিজস্ব কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে , পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদ । তাই এদের ভ্রমনপথকে orbital trajectory বলা হয় , আর অন্যদিকে ক্ষেপনাস্ত্রকে বহনকারী রকেট , পৃথিবীর আবহমণ্ডলের বেশ কিছু উপরে উঠে , সেটা আবার কিছুটা পথ মহকাশে পাড়ি দিয়ে , পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ করে পৃথিবীতে আঘাত হানে ,তাই তাদের ভ্রমনপথকে বলা হয় Suborbital trajectory এবং মহাকাশ থেকে পুনরায় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করাকে বলা হয় ক্ষেপনাস্ত্রের Aatmospheric reentry . বর্তমানে আধুনিক আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপনাস্ত্রগুলো , বায়ুমণ্ডল থেকে যখন পৃথিবীতে আঘাত হানার জন্যে নেমে আসে , তখন এদের ওয়ারহেড বা বিস্ফোরকগুলো বিভিন্ন জায়গায় একই সাথে আঘাত , একি সময়ে আঘাত হানতে পারে , হতে পারে এটা ৬টা বিভিন্ন ধরনের ওয়ারহেড। তখন এই ধরনের ICBM কে বলা হয় MIRV (Multiple independently targetable reentry vehicle (MIRV) )
এখন আপনি প্রশ্ন করতে পারেন এই ধরনের ক্ষেপনাস্ত্র গুলোকে , মহাকাশে পাঠিয়ে আবার সেখান থেকে আঘাত হানার দরকার কি ? সরাসরি ক্রুজ ক্ষেপনাস্ত্রের মত ছেড়ে দিলেই তো হয়ে গেল ?
পাঠক , এখানে ব্যপারটা দূরত্বের। ক্রুজ মিসাইল পাড়ি দিতে সক্ষম ১০০০ থেকে ১২০০ কিঃমিঃ। কিন্ত বর্তমানের সবচেয়ে শক্তিশালী ICBM হচ্ছে রাশিয়ার SATAN SS-18 , R-36M যা ৭.৯ কিঃ মিঃ পের সেকেন্ডে ১৬০০০ কিঃমিঃ পর্যন্ত দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।


ছবি ১৬ : রাশিয়ার SATAN SS-18 , R-36M ICBM

এতবড় দূরত্ব অতিক্রম করার জন্যে এই ধরনের JET engine এখনো আবিষ্কৃত হয় নি । তাই রকেট ইঞ্জিন এর সাহায্যে এদেরকে মহাকাশে পাঠিয়ে, ওখান থেকে পৃথিবীতে আঘাত হানাই সাশ্রয়ী এবং একমাত্র অবলম্বন ।
এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। জার্মানি থেকে লব্ধ সামান্য জ্ঞান এবং পূর্বের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কারালেভ ও গ্লুশকো মিলে তৈরি করেন V2 রকেটের উন্নত সংস্করণ R5 যেটা V2 রকেটের দ্বিগুণ প্রায় ১২০০ কিঃমিঃ দূরের লক্ষবস্তুতে আঘাত হান্তে পারে । উল্লেখ্য এখানে জার্মানি থেকে বিজ্ঞানীদের ভাগিয়ে নিয়ে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাস্ত্র চেষ্টা করছিল V2 রকেটের এর উন্নত সংস্করণ তৈরি করতে তারা সক্ষমও হয়েছিল যার নাম ছিল Redstone. কিন্ত কারালেভের R5 এর কাছে সেটা ছিল নিতান্তই শিশু , যেটা মাত্র ৩০০ কিঃমিঃ দূরের লক্ষবস্তুতে আঘাত আনতে পারতো ।
তবুও সোভিয়েত রাজ খুশি হতে পারলো না । আদেশ জারী হল আমাদের এমন ক্ষেপনাস্ত্র তৈরি করতে হবে যার লক্ষ্যবস্তু হবে পুরো ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাস্ট্র। ওদিকে আবার ২২ এ নভেম্বর , ১৯৫৫ তে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম হাইড্রোজেন বোমার সফল বিস্ফোরণ ঘটায় । এই বোমার ওজোন ছিল ১.৬ মেগাটন। কারালেভ ও গ্লুশকো্র উপর দায়িত্ব ছিল এই হাইড্রোজেন বোমাটা ক্ষেপনাস্ত্রের ওয়ারহেড হিসাবে ব্যবহার করা এবং এটাকে সর্বোচ্চ ৮০০০ কিঃমিঃ দুরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা। সমস্যাটা হচ্ছিলো গ্লুশকোর ডিজাইন করা ইঞ্জিনে । সাধারনত R1-R6 পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর রকেট ইঞ্জিনগুলো ছিল ঢাউস সাইজের এবং ছিল প্রচুর ওজন । এই ওজনের ইঞ্জিনগুলো দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রটিকে ৮০০০ কিঃমিঃ পাঠানো ছিল যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। যাইহোক এগিয়ে এলেন আরেকজন রকেট বিজ্ঞানী – তার নাম Mikhail Klavdievich Tikhonravov , উল্লেখ্য কারালেভের সাথে এই রকেট বিজ্ঞানী GRID X project এ কাজ করেছেন। তৈরি হল আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র R7।


ছবি ১৭ : আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র R7

পেলোডে ওয়ারহেড হিসাবে যুক্ত করা হল ১.৬ মেগাটন হাইড্রোজেন বোম। প্রথম দুটো পরীক্ষা হল অসফল । অবশেষে ২১ এ আগস্ট ১৯৫৭ , R-7 আন্তঃমহাদেসীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপনাস্ত্র ছোড়া হল উড্ডয়ন কেন্দ্র বোইকানুর (বর্তমানে কাজাকিস্তানের ) থেকে রাশিয়ার কামচাটকা পর্যন্ত প্রায় ৮০০০ কিঃমিঃ এর বেশি । সফল পরীক্ষা হল পৃথিবীর প্রথম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপনাস্ত্র বা (Iintercontinental ballistic missile (ICBM) )এর।


ছবি ১৮ঃ রকেট ইঞ্জিন ১০৭


ছবি ১৯: R-7 রকেটে , পেলোড হাইড্রোজেন বোমা

এই ক্ষেপনাস্ত্রে যে ইঞ্জিনটি ব্যবহার করা হয়েছিল সেটা ছিল RD-107 এবং RD-108 , যেগুলো এখনো পর্যন্ত কার্যকরী বলা যায়। এই R-7 , হাইড্রোজেন বোমাবাহী রকেটটি দুই স্তর (2 stages) বিশিষ্ট রকেট ছিল।

আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপনাস্ত্র R7 থেকে স্পুৎনিক ১ –সামরিক ক্ষেপনাস্ত্রের শান্তিপূর্ণ ব্যবহারঃ

R সিরিজের R5 ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপণের পর কারালেভের স্বপ্ন ছিল মহাকাশে এমন একটা যন্ত্র স্থাপন করবেন , যেটা চাঁদের মত পৃথিবীকে করে নিজস্ব কক্ষপথে ঘুরতে থাকবে এবং এই যন্ত্রটির সাহায্যে পৃথিবী পৃষ্ঠের ছবি , মহাজাগতিক রশ্মি গুলো চিহ্নিতকরন , মহাকাশে প্রাণীদের নিয়ে পরীক্ষা এবং আয়নমণ্ডল সম্পর্কে আরও জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হবে । R5 এর সফল উৎক্ষেপণের পর কারালেভ তাঁর পরিকল্পনা গ্লুশকো্কে জানান। ১৯৩৪ সালের মার্চ মাসে তিন রকেট বিজ্ঞানী Mikhail Klavdievich Tikhonravov, গ্লুশকো এবং কারালেভ মিলে সোভিয়েত সরকারকে এই ব্যপারে একটা পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেন , যে তাঁরা মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপন করতে পারবেন । R5 কে আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্রে রূপান্তরিত করার পাশাপাশি , তাঁরা চালাতে থাকেন কৃত্রিম উপগ্রহকে কিভাবে কক্ষপথে স্থাপন করা যায় তাঁর গবেষণা। এই পুরো দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন কারালেভ নিজেই । অবশেষে তারা ডিজাইন করলেন একটি কৃত্রিম উপগ্রহ যার নাম Object-D. কিন্তু Object-D এর কার্য প্রক্রিয়া ছিল খুবই জটিল । তাই তারা আপাতত Object-D এর কাজ ফেলে রেখে শুরু করলেন খুবই সাধারন দুটি কৃত্রিম উপগ্রহের কাজ । রুশ ভাষায় এদের নাম ছিল প্রাস্তই স্পুৎনিক ১ ও ২ - PS -1 , PS - 2, এখানে প্রাস্তই শব্দের অর্থ হচ্ছে সাধারন।

১৫ ই ফেব্রুয়ারী ১৯৫৭ , কেজিবির ( সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থার ) এক রিপোর্টে কারালেভকে জানানো হয় , মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা , কারালেভদের গবেষণাগার থেকে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর পরিকল্পনার কথা জেনে গেছে এবং তারাও এই ব্যপারে অগ্রসর হচ্ছে । তাই দেরি না করে , কারালেভ , তৎকালীন সোভিয়েত প্রিমিয়ার নিকিতা ক্রুশ্চেভ এর সাথে এক জরুরী বৈঠকে মিলিত হন এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয় যে , অক্টোবরের মধ্যেই মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপন করতে হবে। হোক সেটা খুব সাধারন কৃত্রিম উপগ্রহ । কাজ এগিয়ে চলল খুব দ্রুত গতিতে ।

মস্কোর অদূরে কারালেভের নেতৃত্বে বসানো হল গ্রাউন্ড স্টেশন এবং আর ১৫টি ট্র্যাকিং সেন্টার বসানো হল রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে। তৈরি হল ৮৩.৬ কিলোগ্রাম ওজনের একটি কৃত্রিম উপগ্রহ । কারালেভের সহায়তায় এটি তৈরি করেছিলেন Mikhail S. Khomyakov । পৃথিবীর প্রথম আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র R7 রকেট এর মাধ্যমে এই কৃত্রিম উপগ্রহটিকে মহাশূন্যে কক্ষপথে স্থাপন করা হবে – এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল ।


ছবি ২০ঃ PS -1 বা স্পুৎনিক ১ এর প্রোটোটাইপ


ছবি ২১ঃ স্পুৎনিক ১ উৎক্ষেপণের পূর্ব মুহূর্তে

অবশেষে হল অনেক অপেক্ষা এবং পরিশ্রমের অবসান । ৪ঠা অক্টোবর , ১৯৫৭ , মস্কো সময় ২২:২৮ , কাজাকিস্তানের বইকানুর কসমোড্রম থেকে পৃথিবীর প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুৎনিক ১ কে নিয়ে মহাকাশে উড়ে গেল , পৃথিবীর প্রথম আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্রের জন্য তৈরি R7 রকেট (8K71PS) । হল সামরিক অস্ত্রের প্রথম শান্তিপূর্ণ ব্যবহার । এর সাথে যুক্ত ছিল Radio transmitter (20.005–40.002 MHz)। ২১ দিনে , এই স্পুৎনিক ১ , পৃথিবীকে ১৪৪০ বার প্রদক্ষিণ করেছে (orbital trajectory)। ২১ দিন ধরে এই স্পুৎনিক ১ , পৃথিবীতে রেডিও তরঙ্গ প্রেরন করেছে এবং এই ২১ দিন যাবত পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে , উৎসাহী জনতা তাদের ঘরে থাকা রেডিওটি থেকে স্পুটনিক ১ থেকে প্রেরিত “বিপ বিপ বিপ” শব্দটি শুনতে পেয়েছিল ।


ছবি ২২ঃ স্পুৎনিক ১ থেকে পাঠান রেডিও সিগন্যাল

উন্মোচিত হল মহাকাশ বিজ্ঞানের একটি নতুন অধ্যায় । স্পুটনিক ১ এর মাধ্যমে জানা গেল , পৃথিবীর আয়ন মণ্ডলের অনেক অজানা তথ্য, প্রমানিত হল মহাকাশ থেকে সহজেই রেডিও তরঙ্গ আদান , প্রদান করা যায় ।

স্পুটনিক- ২ ও লাইকার গল্পঃ প্রাস্তই স্পুৎনিক ২ বা PS-2 যেটা একই সাথে স্পুটনিক- ১ এর সাথে তৈরি হয়েছিল , সিদ্ধান্ত হল এটাকে এবার মহাশুন্যে পাঠানো হবে , তবে অবশ্যই এর আরোহী হবে একটা প্রাণী। ১৯৪৯ সালের দিকে কারালেভের সাথে পরিচয় হয় রুশ সেনাবাহিনীর একজন ডাক্তার , Biomedical বিশেষজ্ঞ Vladimir Yazdovsky এর সাথে। তখন থেকেই কারালেভ তাঁর সাথে কিভাবে মহাশূন্যে কোন প্রাণী প্রেরন করা যায় , সে ব্যপারে আলাপ , আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকেন এবং ১৯৫১ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত তাঁরা R1 রকেটের সাহায্যে অনেকগুলো কুকুরকে বিভিন্ন দূরত্বে পাঠাতে সক্ষম হন । পূর্বের অভিজ্ঞতার কারনে , কারালেভ Vladimir Yazdovsky কে এই প্রকল্পতে যুক্ত করেন এবং Oleg Gazenko কে , যে কুকুরটিকে মহাকাশে পাঠানও হবে মানে লাইকা , তার প্রশিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করেন । এই স্পুৎনিক ২ ছিল পৃথিবীর প্রথম মহাকাশ বিষয়ক ছোট একটি গবেষণাগার , যা মহাশূন্য থেক প্রচুর বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিল , এর সাথে যুক্ত ছিল Solar UV and X-ray sensor , KS-5 Cosmic Ray Counter ইত্যাদি । এই প্রকল্পের মুল উদ্দেশ্য ছিল মহাকাশে পৃথিবী থেকে পাঠানো প্রাণী , প্রবল আভ্যন্তরীণ এবং সূর্যের তাপমাত্রায় কিভাবে এবং কতক্ষন বেঁচে থাকবে , তাদের হ্রদস্পন্দন , রক্তচাপ সহ অন্যান্য দৈহিক অবস্থা কেমন থাকবে , তাদের খাদ্যগ্রহন প্রক্রিয়া ইত্যাদি । ১৯৫৭ সালের ৩রা নভেম্বর , আবার কাজাকিস্তানের বইকানুর কসমোড্রম থেকে কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুৎনিক - ২ উড়ে গেল , পৃথিবী হতে পাঠানো প্রথম প্রাণী লাইকা নামের কুকুরটিকে নিয়ে। অবশ্যই এটাকে বহনকারী রকেট ছিল আগেরটার মতই R7 । এটার কক্ষীয় পর্যায়কাল ছিল (Orbital period ) ১০৩.৭৩ মিনিট এবং এটা ২৫৭০ বার পৃথিবীকে কেন্দ্র করে আবর্তন করে (orbital trajectory) ।


ছবি ২৩ঃ কারালেভ ও লাইকা

কিন্তু ৪র্থ কিংবা ৫ম বার আবর্তন করার সময় লাইকা নামের কুকুরটি মহাকাশে মারা যায়। কারালেভ ব্যাক্তিগত ভাবে লাইকাকে খুব আদর করতেন, শত কাজের ফাঁকে প্রতিদিন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গিয়ে কুকুরটার খোঁজখবর রাখতেন ।

বেলকা ও এস্ত্রেল্কার গল্পঃ এর পর কারালেভের নেতৃত্বে আর দুটো কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানো হয়। এরা ছিল যথাক্রমে স্পুৎনিক – ৩ ও ৪ । কিন্তু লাইকার ঘটনার পর কারালেভের লক্ষ্য থাকে , পৃথিবী থেকে পাঠানো যেকোনো প্রাণী যাতে মহাকাশে বেঁচে থাকে এবং তাদের সফল্ভাবে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা যায়। অবশেষে তিনি সফল হন । লাইকাকে আমরা সবাই চিনি , কিন্তু যে দুটি কুকুর মহাকাশে গিয়ে আবার সফল্ভাবে পৃথিবীতে ফিরে এসেছিল , তাদের আমরা অনেকেই হয়ত চিনিনা , এই দুটো কুকুরের নাম ছিল বেলকা ও এস্ত্রেল্কা ।


ছবি ২৪ঃ বেলকা ও এস্ত্রেল্কা

লাইকার প্রায় তিন বছর পর ১৯ এ আগস্ট ১৯৬০ , বেলকা ও এস্ত্রেল্কা কে নিয়ে , স্পুৎনিক ৫ , মহাকাশে উড়ে যায় এবং ২০ এ আগস্ট এই দুটো কুকুরকে নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসে । এই ঘটনা কারালেভকে , মহাকাশে মানুষ পাঠানোর ব্যাপারে আরও উৎসাহী করে তোলে ।

মহাকাশে প্রথম মানুষ “ইউরি আলেক্সিবিচ গ্যগারিন” ও কারালেভঃ মহাকাশে প্রথম মানুষ সম্পর্কে অন্তর্জালে অনেক লেখা রয়েছে , তাই আমি এই ব্যাপারে বিস্তারিত গেলাম না । এই প্রোগ্রামটিকে বলা হয় Vostok program. এই প্রোগ্রামের মুল পরিকল্পনাকারী ছিলেন কারালেভ নিজেই এবং ১২ই এপ্রিল ১৯৬১ , উড্ডয়নের দিন থেকে , গ্যগারিনের অবতরণ পর্যন্ত , বইকানুর কসমোড্রমে তিনি ছিলেন capsule coordinator , মানে গ্যগারিনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছিলেন , রেডিও সিগন্যাল এর মাধ্যমে। এখানে একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা আমি গ্যগারিন এর আত্মজীবনী থেকে , সরাসরি রুশ থেকে অনুবাদ করলামঃ


ছবি ২৫ঃ কারালেভ ও ইউরি আলেক্সিবিচ গ্যগারিন অন্তরঙ্গ মুহূর্তে


ছবি ২৬ঃ capsule coordinator কারালেভ

“ কারালেভ ছিলেন খুব রসিক লোক , সবসময় মজা করতে পছন্দ করতেন । আমি নির্বাচিত হওয়ার পর আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন “ওহে ছোকরা ! তুমিতো খুব হ্যান্ডসাম , তো আমাকে কিছু সুন্দরীর সাথে পরিচয় করিয়ে দাও । আর এ পর্যন্ত কটা বান্ধবী ছিল , কটা প্রেম করেছো ? আমি বললাম ৯টা , উনি প্রতিউত্তরে বললেন – মাত্র , তো এর মধ্যে ভালবেসেছ কটাকে ? আমি বললাম , একজনকেও না । উনি বললেন “ব্রাভো , এই তো চাই , তুমিই পারবে”।

মহাকাশে প্রথম নারী ভালেন্তিনা তেরেস্কোভা ও কারালেভঃ ভালেন্তিনা তেরেস্কোভাকে , কারালেভ আদর করে ডাকতেন “my little seagull.” ।


ছবি ২৭ঃ ভালেন্তিনা তেরেস্কোভা ও কারালেভ

অন্য সবগুলোর মতো , এটাও ছিল কারালেভের অবদান । প্রথমে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির পলিটবুরো কোনমতেই রাজি ছিল না , তিনি তৎকালীন সোভিয়েত প্রিমিয়ার নিকিতা ক্রুশ্চেভ কে অনুরোধ করে মহাকাশে প্রথম নারী প্রকল্পের অর্থায়নের অনুমোদন নেন এবং Vostok 6 নভোযান তিনি নিজে ডিজাইন করেন , যে নভোযানে চরে ভালেন্তিনা তেরেস্কোভা ১৬ই জুন ১৯৬৩ তে মহাশূন্যে গিয়েছিলেন ।

কারালেভের স্বপ্ন ছিল , তিনি শুধু চন্দ্র জয় করবেন না , জয় করবেন শুক্র ও মঙ্গল । তাই তিনি হাতে নিয়েছিলেন Raketa-nositel, lit. "Rocket-carrier" N1 program. কিন্ত ১৯৬৫ সালের শুরুর দিক থেকে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং ১৪ই জানুয়ারী ১৯৬৬ মৃত্যুবরণ করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে যারা ৫ বছরের অধিক সময় জেল খাটত তারা সবাই দুরারোগ্য কোন না কোন রোগে মৃত্যুবরণ করত । তাঁর মৃত্যুর পর সোভিয়েত সরকার আশ্চর্যজনক ভাবে তাঁর সকল মহাকাশ বিষয়ক প্রোগ্রাম বন্ধ করে দেয় এবং কোথাও তাঁর মৃত্যুর খবর প্রচার বা তাঁকে নিয়ে কোন বই প্রকাশ করা হয় নি নিকিতা ক্রুশ্চেভ , সোভিয়েত প্রিমিয়ার থাকা পর্যন্ত । তার উপর কারলেভকে দেওয়া ফ্ল্যাটবাড়িটি ,১৯৭৫ সালে , reconstruction এর নাম দিয়ে সোভিয়েত প্রিমিয়ার ব্রেজনেভ দখল করে রাখে । কারালেভ ও তাঁর সহকর্মীরা সোভিয়েত সরকার এর কাছ থেকে তেমন কিছুই পাই নি। ১৯৯১ সালে ভ্লাদ জুরালেভ নামে এক মহাকাশ বিষয়ক লেখক ও সাংবাদিক , মস্কোর গোপন আর্কাইভ থেকে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে প্রকাশ করেন। বর্তমানে পুতিন সরকার , কারালেভের নামে সেন্ট পিটারসবারগ এ একটা রাস্তার নামকরন করেছে।

পর্দার আড়ালে থাকা এইসব ব্যক্তি নিরবে কোন অর্থ , নাম বা যস এর তোয়াক্কা না করে , মানব সভ্যতায় অবদান রেখেছেন। সমাজ ও রাস্ট্রযন্ত্র এদের করেনি সঠিক মূল্যায়ন। পৃথিবী ও তাঁর মানুষের কাছ থেকে সীমাহীন ভালবাসা এদের প্রাপ্য। পাঠক , আমি এত বড় সোভিয়েত রকেট প্রোগ্রামের এই বিশাল সমুদ্রে , অতি ক্ষুদ্র কিছু জলরাশি নিয়ে এই লেখাটা লিখলাম , ভবিষ্যতে পুরো বিশ্বের রকেট প্রোগ্রামের উপর বাংলায় একটি বই লেখার ইচ্ছা আছে । সবার আশীর্বাদ কাম্য ।

References :
http://www.lookatme.ru/mag/people/icon/202903-korolev
https://spacegid.com/pervyiy-sputnik-zemli.html
https://spacegid.com/pervyiy-sputnik-zemli.html
https://www.latimes.com/archives/la-xpm-2007-jan-14-adfg-space14-story.html
https://stuki-druki.com/authors/Korolev.php
https://tverdyi-znak.livejournal.com/2858858.html
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ২:০২
৭টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জাপান কেন বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু?

লিখেছেন রায়হানুল এফ রাজ, ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৮:৫০



জাপানী সম্রাট হিরোহিতো বাঙ্গলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলেছিলেন, ‘যতদিন জাপান থাকবে, বাঙালি খাদ্যাভাবে, অর্থকষ্টে মরবেনা। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু’! এটি শুধু কথার কথা ছিলো না, তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার লেখা প্রথম বই

লিখেছেন ফারহানা শারমিন, ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৯:১৩



ছোটবেলা থেকেই প্রচন্ড রকম কল্পনাপ্রবণ আমি। একটুতেই কল্পনাই হারিয়ে যাই। গল্প লেখার সময় অন্য লেখকদের মত আমিও কল্পনায় গল্প আঁকি।আমার বহু আকাংখিত বই হাতে পেয়ে প্রথমে খুবই আশাহত হয়েছি। আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির আয়নায়

লিখেছেন নিভৃতা , ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ১১:০৪





কিছুদিন আগে নস্টালজিতে আক্রান্ত হই আমার বাসার বুয়ার জীবনের একটি গল্প শুনে। স্মৃতিকাতর হয়ে সেই বিটিভি যুগে ফিরে গিয়েছিলাম।

এই বুয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন জীবন- নয়

লিখেছেন করুণাধারা, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ দুপুর ১২:০২



আগের পর্ব: নতুন জীবন- আট

অবশেষে আনুষ্ঠানিক ভাবে আমার বোন পেট্রার জন্মকে স্বীকৃতি দেয়া হল। আমাকে জানানো হল আমার একটা বোন হয়েছে। আমি বোন দেখতে গেলাম, দেখি মায়ের পাশে ছোট একটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সর্বশ্রেষ্ঠ নবী এবং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর ওফাতকালীন ঘটনাসমূহ (প্রথম পর্ব)

লিখেছেন নীল আকাশ, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৪:৩৬



[সকল প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য, যিনি আমাদেরকে সর্বোত্তম দীনের অনুসারী ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উম্মত হওয়ার তৌফিক দান করেছেন। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×