somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি নাকফুল এবং তিনদিন তিন রাত্রির গল্প (২য় পর্ব )

০৪ ঠা এপ্রিল, ২০০৯ বিকাল ৪:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আগের পর্ব: Click This Link

বাদল চলে যেতে অনেকক্ষন মূর্তির মত বসে থাকে হীরা । নিজের হাতের চামড়ায় চিমটি কেটে দেখে এসব সত্যি কিনা ।
ঘুমের ওষুধ খেয়েছে সে , বেশীক্ষন জাগতে পারবেনা । মেইল চেক করতে বসে দেখে তার বহু আকাঙ্খার মেইল , বাদলের মেইল । ক'বছর আগে হঠাৎ করে যখন বাদল অদ্ভুত আচরন করল , ফোন ধরেনা , মেইল করে না ; তখন কতদিন কতবার মেইল বক্স খুলে হতাশ হয়েছে , কিন্তু সেটা খোঁজা ওর অভ্যাস হয়ে গিয়েছে । এক বন্ধু আশিক তখন অনেক সাপোর্ট দিয়েছে , ভেঙে পড়তে দেয়নি । বলেছে , দেখো বাদল ঠিক একদিন তোমায় ফোন করবে , স্যরি বলবে ; তুমি অপেক্ষা করো ।
সে অপেক্ষা এভাবে শেষ হবে বুঝেছিল কোনদিন !
বাদল লিখেছে , তুমি সেবার মেইল করে জানতে চেয়েছিলে , কেন অমন করেছিলাম , এবার সুযোগ হয়েছে তোমাকে জানাবো সব ।
হীরা বুঝল , রুমে গিয়ে মেইল করেছে সে । বাসায় মেইল করল । শালটা গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়ল সে । বাদল কি জানে না , বাদলের উপর রাগ করবার মত শক্তি তার নেই , উপায়ও নেই । তবে সেবার মন খারাপ হয়েছিল খুব । কেবলই তখন মনে হত , তার ভাল লাগা অনেকদিন বাদে যখন ধরা পড়েই গেল , বাদল কেন তারপরে হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করল আর দুই দেশের অধিবাসী দুজনের সে যোগাযোগে কার কি ক্ষতি হত ! বন্ধু আশিক বুঝিয়েছিল তাকে যে বাদলের পারিবারিক সমস্যা হতে পারে , তার বউ হয়তো এটাকে ভাল ভাবে নেয়নি । তারপরেও হীরার কেবল মনে হত একবার বাদল নিজে থেকে ওকে সব জানাবে , ও অপেক্ষা করেছে , জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাই করতো ।
আর বাদল কেন দু:খিত হবে ? সারা জীবনের জন্য সে নিজে দু:খিত বাদলের কাছে । পরিস্থিতির কারনে খালিদকে বিয়ে করে সেই তো পর হয়ে গিয়েছে । আরো যখন মনে হয় বাদলের বউ শিউলী বাদলকে অতটা বোঝে না , বোঝার চেষ্টা করেনা , তখন আর ভাল লাগেনা তার ।

আলো নিভিয়ে শাল জড়িয়ে শুয়ে পড়ে ; ঘুমিয়ে পড়ে অনেকদিন পর বাদলের প্রশান্ত মুখচ্ছবি মনে করে ।
পরদিন যথারীতি সম্মেলন কেন্দ্রে প্রোগ্রাম , লাঞ্চ তারপরে । কে বলবে যে গতকালের ঝড়ের পরে আজকের এই হীরা । আজ ওকে আরো সতেজ সুন্দর লাগছে । লাঞ্চের পরে বাদল দেখা করে জানাল , ইচ্ছা করে তাকে বিশ্রাম নিতে দেবে বলে আর দেখা করেনি । বিকেলে আসবে । বিকেলের আগে একটা শাড়ি পছন্দ করে পরে নিল । এবার আর ভুল করেও মনের ভাব , ভাল লাগা বুঝতে দেবে না সে ঠিক করে মনে মনে । বিকেলে চলে এল বাদল । বলল আজ চা খাবে এ ঘরে । তারপরে আবার চুপচাপ । কি যেন বলতে চায় বাদল বোঝা যাচ্ছিল ; বলে হীরা তুমি কি কিছু জানতে চাইবে না । হীরা বলে , হ্যা বল শিউলী কেমন আছে ? বাচ্চারা কতটুকু হল ? তোমার লক্ষ্মী ছেলেটা কি কি করে । উত্তর দিয়ে যায় সে । তারপরে বলে , আর কিছু নেই জানবার ? চুপ করে থাকে হীরা । নিজ থেকে বলে যায় বাদল । তোমার সাথে অমনি করে যোগাযোগ বন্ধ করবার কথা তো ছিল না ! ফোনে তোমার নামে নম্বর সেভ করা ছিল , শিউলীর চোখে পড়ে তোমার মিসকল । তারপর ও তোমাকে নিয়ে এমন সব অশোভন কথা বলে যে আমার খারাপ লাগে । আমাদের দুজনকে নিয়ে এমন সব কটুক্তি করে যা শোনার কথা না , প্রতিবাদ করতে গেলে সে আরো বেপরোয়া হয়ে যায় ; বাসায় বাচ্চারা ছিল , তাদের সামনে । তোমার আড়ালে হলেও তোমাকে অসন্মান করছে আমি মানতে পারিনি । প্রবাস জীবনে অফিসের দায়িত্ব পালন করতে হিমশিম খাচ্ছিলাম ,আর তখন বাসায় ফিরে শিউলীর তোমাকে নিয়ে সন্দেহবাতিক কথাবার্তা আমার ভাল লাগেনি । আমার ব্যাপারে তোমার দুর্বলতা তোমার সংসার জীবনকে ক্ষতিগ্রস্থ না করে সে চিন্তাও ছিল আমার । তোমার ভাল লাগা অসন্মান করতে আমি কোনদিন পারবো না , তবু ভান করে চুপ করে গেলাম । তোমার সব কিছু সহ্য করতে কত কষ্ট পেতে হয়েছে বুঝতে পেরেছিলাম , তবু মনে হত তোমার বিয়ের পরে আমি যে কষ্ট পেয়েছি সেটা তো কাটিয়ে উঠতে পেরেছি । বল হীরা , তুমি আর কি জানতে চাও ? হীরার খুব ইচ্ছে হল জানতে , কেন শিউলী হীরার বিষয়ে এত স্পর্শকাতর , কি এমন কথা হয়েছে তার বাদলের সাথে হীরাকে নিয়ে যার কারনে শিউলীর এত প্রতিক্রিয়া ; যেখানে বাদল আর হীরার মনে মনে গড়ে ওঠা গভীর সম্পর্ক লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে গেছে যুগ পার করে , সেখানে শিউলীর মন খারাপ করবার মত বিষয়টা কি হতে পারে , জানতে ইচ্ছে হয় । বাদলের কোন্ আচরনে শিউলী এমন করেছে জানতে চেয়েও কিছুই জিজ্ঞেস করা হয় না বাদলকে ।
দেখে অপরাধীর মত চুপ করে বসে আছে বাদল । হীরার বুকটা ভেঙে যায় , মনে হয় বলে , বাদল আমারই তো ভুল ছিল ; আমি খালিদের সাথে সম্পর্কে না গিয়ে অপেক্ষা করতে পারতাম যদিও পারিবারিকভাবে , সামাজিকভাবে আমি অনোন্যপায় ছিলাম । কিছু বলতে পারে না ।

বলে , চল বাদল বাইরে খেয়ে আসি । দুজনে বেরিয়ে পড়ে , খাওয়া সেরে নেয় । পরদিন আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ভ্রমনের ব্যবস্থা । ওরা দুজন যাবে না , নিজেরা ঘুরবে সারাদিন । হীরার মনে পড়ে ওর সাথে টিপ নেই পরবার অথচ ইচ্ছে করছে পরতে , বাদলকে সাথে নিয়ে টিপ কেনে । বাদল সুগন্ধী ফুল কেনে একতোড়া । কাল সন্ধ্যায় চলে যাবে হীরা দেশে , পরদিন সকালে তার ফ্লাইট দূরদেশে । আর কবে কিভাবে ওদের দেখা হবে জানে না । ঘরে ঢুকে পানি দিয়ে ফুল দানীতে সাজিয়ে রাখে ফুলগুলো । মিষ্টি সুরভীতে ভরে যায় ঘর । হীরা ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে আসে কপালে টিপ পরে , ছেলেমানুষীতে পেয়ে বসেছে তাকে আজ । বাদল লাজুক প্রকৃতির ছেলে ছিল , এখনও তাই । চোখ তুলে তাকাতে সময় নিল ; কিন্তু তাকিয়ে আর চোখ সরাতে ইচ্ছে করে না ওর । দুজনের চেহারায় স্বর্গীয় আভা ছড়িয়ে পড়ে , সে আভায় ঘর ভরে যায় ভাল লাগা আবেশে ।
হীরা মনে করিয়ে দেয় রাত দশটা বেজে যাচ্ছে , বাদলের রুমে যাওয়া উচিৎ । জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের রঙ বেরঙের আলোকসজ্জা দেখে ভাল লাগে তার । যেন ওর মনের রঙেরা খেলা করছে চোখের সামনে ওকে ভুলিয়ে রাখতে ! উঠে আসে বাদল । ওর পাশে দাড়ায় । ধরা গলায় বলে , কাল সন্ধ্যায় দুজন আবার দূরের মানুষ , তারপরে কি হবে জানিনা ।তুমি অনুমতি দিলে একটা ইচ্ছা ছিল আমার পূর্ন করে নিতাম ।
অবাক হয় হীরা , বাদল এমন করে কথা বলছে কেন ? এ কোন বাদল ? বুঝতে পারে না । বলে তোমার কোন ইচ্ছা আমি অপূর্ন রাখতে পারি না , কিছুতে না । এত বছরেও কিছু চাওনি তুমি ; তবু একটু বলবে আমায় কি সে ইচ্ছা ! বাদল বলে , তোমার কপালে একটু আদর করবো , আর যখন বলেই ফেলেছি তুমি না করো না । বলে ঘুরে দাড়ায় মুখোমুখি , দুহাতে হীরার মুখটা তুলে ধরে , দেখে চোখ থেকে মুক্তোদানার মত অশ্রু বেয়ে নামছে । রুমের মৃদু আলোয় এক ছায়া সুন্দরী তাকে আলোড়িত করে , ভাঙ্গে ; নিজেকে ধরে রাখতে পারে না সে । হীরা বলে , জান বাদল , আমি তোমার ভালবাসার আলোতে বেঁচে থাকি , আমার দিন কাটে রাত কাটে সে আলোয় ভেসে , আমি ভাল থাকি , এত বছর ধরে তাই আছি ।

বাদলের ঠোট ছুয়ে যায় হীরার কপাল , হীরার দুচোখেও আদরের পরশ বুলিয়ে দেয় সে । বন্ধ চোখে হীরা এক অন্য মানুষ হয়ে যায় । বাদলের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলে পরম নির্ভরতায় , তার অনন্ত আরাধনার ঠাই যে !বাদল সব শক্তি দিয়ে দুহাতে জড়ায় ওকে , ভরে রাখে শূন্য বুক ক্ষনিক পাওয়ায় ।
হীরা টের পায় তার মাথায় ঝরে পড়ছে চোখের জল বাদলের , বাদল কি কাঁদতে পারে ! বাদলের বুক ভিজে যায় হীরার চোখের জলে । এমন সুখের কান্না ওরা কখনো কাঁদেনি ; এমন সুখ থাকতে পারে তাদের জন্য বরাদ্দ ভাবতে পারেনা তারা । এ আনন্দ অশ্রুর জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল অনেক বছর ।


চলবে ।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০১১ বিকাল ৪:৫৯
২৫টি মন্তব্য ২২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×