somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাজেট ও কাল টাকা

০৮ ই জুন, ২০২৪ বিকাল ৪:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাজেট এবং কালো টাকা

আমরা সকলেই সম্ভবত বাজেট করে চলি। ব্যক্তিগত বাজেট এবং রাষ্ট্রের বাজেটের মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের বাজেট হল মাস ভিত্তিক বাজেট। আমরা এখানে চিন্তা করি আমাদের উপার্জন এত, এই টাকার মধ্যে থেকে কিভাবে খরচ করে মাস চালানো সম্ভব। আমাদের বাজেট হল ইনকাম বেজড বাজেট। সমর্থ্য না থাকলে অনেক জরুরী প্রয়োজন আমাদেরকে কাটছাঁট করতে হয়। অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবার চেষ্টা করে ধার না করে কিভাবে মাস চালিয়ে দেওয়া যায় এবং সম্ভব হলে যাতে মাসে শেষে সামান্য কিছু হলেও সঞ্চয় থাকে। যদিও বর্তমান বাস্তবতায় এটা কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাষ্ট্রের বাজেট হলো নিড বেসড বাজেট। এটা বছর ওয়ারি করা হয় (এখন মিড টার্ম বেজড বাজেটের দিকে সরকার অনেক এগিয়েছে, অনেক প্রকল্পেই টাকা তিন বছর ধরে ছাড়করা হয়)। ‌ টাকা কত আছে সেটা মূল বিষয় না, কি প্রয়োজন সেটা মূল বিষয়। রাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতিমূলক হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র হিসাব করে এই খাত থেকে এত টাকা আসবে , এই এই খাতে এত টাকা ব্যয় হবে । দেখা যায় রাষ্ট্রের ব্যয় সবসময় আয়ের চেয়ে বেশি। এই ঘাটতিটা বিভিন্ন রকমের লোন এবং অনুদান থেকে আসে।

আমার বাবা বলেন উনি দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পূর্ব পাকিস্তানের বাজেট ৭৫ কোটি রুপি দেখেছেন। এই বছরের বাজেট প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকা। ৫৪ বছরে বাজেটের আকার দশ হাজার গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরকারের মূল আয়ের খাত গুলো হলো আমদানি শুল্ক, ভ্যাট বিভিন্ন রকমের সম্পূরক শুল্ক এবং আয়কর। আয়কর কে প্রত্যক্ষ কর বলা হয়।

আমাদের দেশে ন্যূনতম কর যোগ্য আয় বছরে তিন লক্ষ টাকা। এর নিচে আয় হলে কর দিতে হয় না। এর উপরে আয় হলে বিভিন্ন স্ল্যাবে কর দিতে হয়।
বছরে তিন লক্ষ টাকা মানে মাসে ২৫ হাজার টাকা।

সরকারি হিসেবে আমাদের পার হেড ইনকাম (২০২২ সালের হিসাব) ২৭০০ ডলার, যা টাকাতে প্রায় ৩ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা। একজন পরিবারে চারজন সদস্য হলে পরিবারের গড় আয় সাড়ে ১২ লক্ষ টাকার উপরে। বাংলাদেশে ৪ কোটির উপরে পরিবার আছে। প্রতি পরিবারে একজন উপার্জন ক্ষম থাকলে দেশে ৪ কোটি ইন্ডিভিজুয়াল ট্যাক্স পেয়ার থাকা উচিত। কোন কোন পরিবারে একের অধিক জন উপার্জন ক্ষম আছেন।
এন বি আর এর হিসাবে বাংলাদেশে টিন নাম্বার ধারী লোকের সংখ্যা এক কোটির কাছাকাছি। কিন্তু এর মধ্যে রিটার্ন সাবমিট করে মাত্র ৩২ থেকে ৩৫ লাখ (শেষ হিসাব জানিনা, এন বি আর এর আশাবাদ এই বছর রিটার্ন সাবমিটকারীর সংখ্যা ৪০ লক্ষ পার হবে)।

সরকারের যে পার ক্যাপিটা ইনকামের হিসাব তা কতখানি শুদ্ধ বলা মুশকিল। তবে টিন নাম্বার ধারীর সঙ্গে বা রিটার্ন সাবমিট কারীর সঙ্গে পার ক্যাপিটা ইনকাম কো রিলেট করেনা।

সম্ভাবনা খুব বেশি যে দেশের জনগণের বিশাল অংশ কর যোগ্য আয় করলেও কর দিতে আগ্রহী না। দেশে জর্দার ব্যবসায়ী সবচেয়ে বড় করদাতা, আর দরবেশ সাহেব সবচেয়ে বড় ঋণ খেলাপি।

সরকারের কাছ থেকে একটি শ্রেণি বড় রকমের সুবিধা নিচ্ছে বিনিময়ে তারা সরকারকে টিকিয়ে রাখছে। এরা যত আয় করুক না কেন কোন ট্যাক্স দিতে হয় না। দেশ চালানোর জন্য সরকারকে বাধ্য হয়ে সম্পূরক শুল্ক সহ বিভিন্ন রকমের ট্যাক্স আদায় করতে হচ্ছে।
শুনলে অবিশ্বাস্য লাগবে কিন্তু বাস্তবতা এই যে আমরা অনেক ক্ষেত্রে ইউরোপ আমেরিকার লোকদের চেয়ে বেশি ট্যাক্স দিয়ে থাকি। আপনি যখন মোবাইলে কথা বলেন তখন ১০০ টাকায় প্রায় ৪০ টাকা ট্যাক্স দিতে হয় । এটা ৩৩ টাকা ছিল, নতুন বাজেটে উনচল্লিশ টাকার কিছু বেশি করা হয়েছে। রাউন্ড ফিগারে আমি ৪০ টাকা ধরেছি। অনুরূপভাবে দেশের বাহির থেকে একটা মোবাইল ফোন আমদানি করা হলে তার উপরে প্রায় ৪৯ শতাংশ ট্যাক্স দিতে হয়। জীবন রক্ষাকারী ওষুধে সাড়ে ১৭% ভ্যাট দিতে হয়। ইউরোপ বা আমেরিকার কোন কোন দেশে এই পরিমাণ ট্যাক্স দিতে হয় আমার জানা নেই। পক্ষান্তরে ইউরোপ আমেরিকাতে যারা ট্যাক্স দেয় তারা বিনিময়ে সরকারের কাছ থেকে অনেক সুবিধা পায় । আমাদের দেশে নাগরিক সুবিধা কি কি আছে সে বিষয়ে আলোচনা করলাম না। ‌
সরকার যখন পরোক্ষ কর নেয়, তখন একজন ভিক্ষুক কেও কর দিতে হয়। যেমন ভিক্ষুক লবণ কেনে , তেল কেনে, এর উপরেও ট্যাক্স দিতে হয়। এক্ষেত্রে ধনী-গরিব সবাইকে সমান হারে ট্যাক্স দিতে হয়। একটি স্বাধীন দেশে এই ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত অমানবিক।

সরকারের উচিত প্রত্যক্ষ কর বাড়িয়ে পরোক্ষ কর কমানো।

বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে টিন বাধ্যতামূলক, ইংলিশ মিডিয়ামে বাচ্চার পড়াশোনা করাতে গেলে ন্যূনতম এক লক্ষ টাকা ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করতে হবে, হাসপাতালে কেবিনে চিকিৎসা নিতে গেলে ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করতে হবে, বাচ্চাকে প্রাইভেট স্কুলে পড়াতে গেলে ন্যূনতম ২৫ হাজার টাকা ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করতে হবে, এয়ারলাইন্সে বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণ করতে হলে বছরে ১ লক্ষ টাকা ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করতে হবে- এরকম কিছু বিধান থাকলে রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যা বাড়তো বলে মনে হয়।

সবশেষে কালো টাকার কথা বলতে হয়।

সরকার গত কয়েক বছর ধরে কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ দিয়ে আসছে তা সৎ ভাবে যারা রিটার্ন দাখিল করেন তাদের উপর চরম অবিচার বলে আমার কাছে মনে হয়। ‌

একটি উদাহরণ দেই ‌ । ধরা যাক জনাব ক একজন সৎ নাগরিক তিনি বিধি-বিধান মেনে তার ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করেন। পক্ষান্তরে জনাব খ আইনের ফাক ফোকর খুঁজে বের করেন এবং ট্যাক্স রিটার্ন দাখিলে অসাধুতা করেন। ধরা যাক দুজনেরই বাৎসরিক আয় এক কোটি টাকা । (বাংলাদেশ ১ কোটি টাকা বছরে আয় করেন এমন লোকের সংখ্যা খুব কম না । বরং আমি বলবো কালো টাকা সাদা করার সুযোগ যাদের দেওয়া হয়েছে তাদের বাৎসরিক ইনকাম এর কয়েকশো গুণ বেশি। এই ফিগার শুধু উদাহরণ হিসেবে দিচ্ছি) ।

হিসাবের সুবিধার জন্য ধরে নেই জনাব্য এবং খ দুইজনের আয়ের পুরো টাকাই কর যোগ্য (প্রথম তিন লক্ষ টাকা বাদে) ।

এখন জনাব ক নিয়মমাফিক পূর্ণ আয় দেখিয়ে রিটার্ন সাবমিট করলেন। তার আয়কর বাইশ লক্ষ ৯৫ হাজার টাকা ।

জনাব খ রিটার্ন দাখিল এর সময় দেখালেন তার আয় তিন লক্ষ টাকা। কোন কর দিতে হবে না। তার কাছে ৯৭ লক্ষ টাকা কালো টাকা রয়ে গেল। সরকারি সুবিধা অনুসারে তিনি এই 97 লক্ষ টাকার উপরে 15% ট্যাক্স দিয়ে এটাকে সাদা করে নিলেন। ৯৭ লক্ষ টাকার ১৫% হয় ১৪ লক্ষ ৫৫ হাজার টাকা।

জনাব ক সৎ হওয়ার কারণে তাকে দন্ডি দিতে হলো ৮ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা।
এটা কেমন বিচার?

(ইনকাম ট্যাক্স এর হিসাব ২০২৩-২৪ সালের স্ল্যাব ধরে করা হয়েছে, ২০২৪-২৫ বছরের স্ল্যাব আমার জানা নেই , যতদূর জানি এটা এখনো ঘোষণা হয়নি। পার্থক্য খুব বেশি হওয়ার কথা না) ।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুন, ২০২৪ বিকাল ৪:০৮
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গোড়াতেই একটা বড় মিথ্যা বলিয়া আরম্ভ করিলেন , সেটা কি ভাল?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে মে, ২০২৬ রাত ৯:৩৭


ঈদ-উল-আজহার এই আনন্দের সময়ে যখন দেশের মানুষ কোরবানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং ছুটির আমেজ উপভোগ করছেন, ঠিক তখনই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ শব্দটিকে কেন্দ্র করে নতুন নাটক শুরু হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিশুদের প্রতি হুজুরদের কেন এই দুর্নিবার আকর্ষণ? | বলৎকার পিডিয়া

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২৭ শে মে, ২০২৬ রাত ১:১২



আমাদের দেশে প্রায় সারা বছরই দেশের কোথাও না কোথাও মাদ্রাসার হুজুরদের দ্বারা ছেলে শিশু বলৎকার, মেয়ে শিশুকে ধর্ষণের ঘটনার খবর শুনতে পাওয়া যায়, তবে ইদানিং এমন ন্যক্কারজন ঘটনার হার বেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপি সবটা খেতে চাইলে সবটা হারাবে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৭ শে মে, ২০২৬ সকাল ৭:৫৯




আপা ড. ইউনুসের চুক্তি মেনে নিলে, আমেরিকা ও ভারত এক হলে এবং সেনা আপার পক্ষে গেলে আপার আগমনে বিএনপিকে পালিয়ে যেতে হবে।তখন আপা কি করবেন সেটা আপার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ ঈদ উৎসব এবং মা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৭ শে মে, ২০২৬ সকাল ৯:১৩



ভোর বিহানে আজান হলেই মা করতেন ডাকাডাকি।
এই ঈদে আর ডাকেনিগো মা, এ দুঃখ কোথায় রাখি!

হারিয়ে গেছে মা জননী আমার, শূন্যতা অপার
এই জীবনে মায়ের সাথে দেখা কি হবে আর?... ...বাকিটুকু পড়ুন

বঙ্গঁবন্ধুর আত্মত্যাগ আর শেখ হাসিনার দৃঢ়তা । (নিজেকে শেখ হাসিনার স্থানে দাঁড় করিয়ে ভাবুন)

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৭ শে মে, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



বাকশাল করার জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজ দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগকে পর্যন্ত বিলুপ্ত করেছেন। এরপরও যারা বাকশাল ( বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামীলীগ) কে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা আখ্যা দিয়ে বিচারপতি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×