somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দূরাগত ডাক

২৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১২ বিকাল ৩:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


দাদু ও দাদু... ও... দা...দু...
ত্যাঁদড় ছেলেটা সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। ভীষণ বিরক্ত হলেন শামসুল আলম। তাঁর এ নাতিটা যতই বড় হচ্ছে ততই যেন শিশু হয়ে যাচ্ছে। সকাল বেলায় দুম দুম করে,দরজা ধাক্কিয়ে এমন চেঁচিয়ে ডাকছে যে বুকটা ধড়ফড় করছে।

গতকাল,শবে বরাতের রাতে নামাজ পড়ে আসার সময় বৃষ্টি নেমেছিল। তুমুল বৃষ্টি নয়;একটানা একঘেয়ে ঝির ঝির বৃষ্টি। তিনি বৃষ্টি থামার জন্য কোথাও অপেক্ষা না করে ভিজতে ভিজতেই ঘরে চলে এলেন। ঘরে এসে মনে হল একটু জ্বর জ্বর লাগছে। তা তো লাগবেই বয়স তো আর কম হয়নি,৭০ তো পেরিয়েছে।

এই সকাল বেলায় জ্বরটা আরো বেড়েছে।তিনি বিছানায় শুয়ে ছিলেন।শোয়া অবস্থায় জিজ্ঞেস করলেন," কি হয়েছে মুরাদ এমন চেঁচাচ্ছিস কেন"
"শওকত দাদু মারা গেছে!"শান্ত গলায় বলল মুরাদ।
চমকে উঠে,লাফিয়ে বিছানা থেকে ওঠলেন উনি।দরজা খুলেই মুরাদকে বললেন,"কে বলেছে তোকে,কোথায় শুনলি?"
"এই তো এখন;জহির চাচ্চু বলে গেল"
মুহুর্তেই,কোথায় উড়ে চলে গেল তাঁর জ্বর । কিন্তু বুকের কোথাও কে যেন প্রচন্ড জোরে হাতুড়ি পেটাচ্ছে। তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেননা যে,
শওকত মারা গেছে ।গতকালই তো দুজন নামাজ পড়ল একসাথে!

গোসল সেরে,সাদা পাঞ্জাবীটা গায়ে চড়িয়ে,দরজার কোনায় রাখা লাঠিটা হাতে নিলেন তিনি। শওকত সাহেবকে শেষ দেখাটা দেখে আসবেন।

"মরা বাড়ি"তে পৌছতে না পৌছতেই, কান্নার শব্দে তাঁর বুকটা ভেঙ্গে যাচ্ছিল। এমনিতে তিনি খুব একটা দুর্বল চিত্তের মানুষ নন, কিন্তু মরা বাড়ির কান্না শুনলে তিনি নিজেকে কখনো সামলাতে পারেননি।
শওকত সাহেবের মুখটা দেখে নিয়ে,একটা লাঠিতে ভর দিয়ে উঠানের একপাশে দাঁড়ালেন তিনি। আকাশের মেঘ কেটে গিয়ে বাইরে চমৎকার আবহাওয়া; উজ্জ্বল রোদে উঠোনটা ঝলমল করছে। প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলে,কারো বিদায়-বেলায় সে বিষন্ন হয়না।

একটা সাদা পর্দা দিয়ে চারপাশটা ঘেরাও করে "গোসল দেয়া" হচ্ছিল শওকত সাহেবকে। ঠিক এ সময় কতগুলো বাচ্চা ছেলে মার্বেল খেলছে উঠানের যে পাশে পুকুর আছে সে পাশে। এ দৃশ্য দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল শামসুল আলম সাহেবের। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি ।এই মাটির পৃথিবীতে থেকে শিশুরা বাস করে কল্পনার এক অদ্ভুত সুন্দর রাজ্যে। মৃত্যুর মত অনিবার্য বাস্তবতাও যাকে স্পর্শ করতে পারেনা।

কোত্থেকে একটা চেয়ার নিয়ে এসে জহির বলল, "বসেন চাচা"
তিনি হাত নেড়ে নেড়ে বললেন "লাগবেনা লাগবেনা নিয়ে যাও" অন্য সময় তিনি এতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতে পারতেন না।কিন্তু আজ পারছেন। কারন আজকের দিন টা আলাদা। ভাবনার একটা তীব্র ঘোর তাকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারবে আরো অনেক্ষন।

বাদ আসর অনুষ্ঠিত হল জানাজা নামাজ।বেশ ভালই লোক সমাগম হয়েছে। জানাজা নামাজ থেকে শুরু করে মাটি দেয়া পর্যন্ত সবকিছুতে তিনি অংশ নিয়েছেন।মনটা একেবারে ভেঙ্গে গিয়েছে তাঁর। ফিরে আসার সময় তাঁর মনে হল শরীরটা নিয়ন্ত্রনে নেই। কোনমতে ঘরে এসে সোজা চলে গেলেন ছাদে।
ছাদের যেখানে আম গাছটির ছায়া এসে পড়েছে সেখানে চেয়ারটা টেনে এনে বসলেন তিনি। আলোর তেজ যত কমে আসছে তাঁর মন ততই বিষণ্ণ থেকে বিষন্নতর হচ্ছে।
ধীরে ধীরে কখন যে একটি আঁধারি পর্দা ঘিরে ধরেছে সমস্ত চরাচর,তিনি টের-ই পেলেন না। টের পেলেন যখন মসজিদ থেকে ভেসে আসল মাগরিবের আযান। মনটা হুহু করে উঠল তাঁর।এমন কতবার তিনি সন্ধ্যার আযান শুনেছেন। এরকম বিষণ্ণ,করুন,হৃদয় শূন্য করা আযান তিনি কি আর কখনো শুনেছেন?গাল বেয়ে অকারণ অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। কিংবা হয়তো অকারণ নয়, হয়তো এর পেছনে লুকিয়ে আছে মানুষের অনাদি কালের অসহায়ত্ব,অনাদি কালের ইতিহাস!

অনেক অনেক দূরের লালচে আকাশটার দিকে তাকিয়ে তাঁর বারবার মনে হচ্ছে- দূরাগত ডাক তিনি শুনতে পাচ্ছেন। সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে। সময় খুব দ্রুত চলে যায়; খুব দ্রুত!
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×