১ম পর্ব
Click This Link
২য় পর্ব
Click This Link
(৩)
মার্চ মাস এসে গেল।বসন্ত আসবে আসবে করছে। ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসে রুপ বদলাতে শুরু করল। চারিদিকে সুবুজ রঙ, উজ্জ্বল দিন, আর অসংখ্য পখির গানের সকাল। মঝে মাঝে সকালে হাটার সময় দুই একটা কাঠবিড়ালীকেদ্রুত পথ ছেড়ে দিতে দেখি । আমি শুধু মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকি। ভাবি কত সুন্দর এই দেশটা।
প্রায় ত্রিশ হাজার ছাত্রের ইউনিভার্সিটি, তাও সবসময় কেমন যান সৌম্য শান্ত।খুব বেশী শব্দ নেই, হট্টগোল নেই, কে্মন যেন শান্তির ছোয়া সবকিছুতে। ব্যাতিক্রম শুধু আমার মন। আমার মন ভাল নেই। সারাদিন শুধু টার্বুলেন্স কোর্সের কথা ভাবি।ভাবি ফেল করার কারনে দুমাস পরে আমাকে চলে যেতে হবে।
বাড়ী থেকে অনেক দুরের জীবন তখন কিছুটা সয়ে এসেছে। নতুন এক রুমমেটের সাথে ইউনিভার্সিটির এপার্টমেন্টে এসে উঠেছি। উনি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনজিনিইয়ারিং এ মাস্টার্স করছেন। আমার সাথে উনার খুব মিল হয়ে গেল। উনি আমাকে সব সময় সান্তনা দেন।
এর মধ্যে রিসার্চের কাজও পুরোপুরি শুরু হয়ে গেছে। আমার কাজ হচ্ছে ল্যাবের আরেকজন সিনিয়র পিএইচডি ছাত্র শনকে সাহায্য করা। সে তরল মিথেন জালানীর দহ্ন সংক্রান্তে একটা কাজ করছে। কাজটা আমার খুব পছন্দ হল। বুঝি না বুঝি এ বিষয়ে অনেক কিছু পড়ে ফেললাম। আমি সারাদিন ওর সাথে টেস্ট বাঙ্কারে কাটিয়ে দেই। আর সন্ধ্যায় দুজন বসে টেস্ট ডাটা প্রসেস করি। ওর সাথে কাজ করে আস্তে আস্তে মনে হল আমাদের বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ডারগ্রাজুয়েট আর আমেরিকার অ্যান্ডারগ্রাজুয়েট প্রোগ্রামের পদ্ধতিগত কিছু প্রভেদ আছে।।ভাল খারাপ মিলিয়েই। তবে ওদের ডিজাইন সেন্সটা আমাদের থেকে ভাল। একদিন শুনালাম ও আমাদের প্রফেসরকে বলছে,
“নতুন ছাত্রকে আমাকে সাহায্য করতে দেওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। ওর কাজের কারনেই মনে হচ্ছে আমি এক সেমিস্টার আগে গ্রাজুয়েট করতে পারব। কিছু কিছু বিষয় ও আমাদের থেকে অনেক ভাল বোঝে, সম্ভবত তোমার থেকেও ভাল বোঝে”।
শুনলাম আমার প্রফেসের আস্তে হেসে বলছেন,
“ও যেখান থেকে এসেছে অখানে অল্প কিছু ছাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পায়। অসম্ভব মেধাবীরাই কেবল ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে যায়। তবে আমি মনে করিনা ও আমার থেকে বেশী বুঝে”।
আমেরিকায় আসার পর এই প্রথম আমি খুশিতে কাদলাম।
এরিই মধ্যে দ্বিতীয় মিডটার্ম এসে গেল। তখন আমার সবসময়ের সাথি হুমায়ুন আহমেদের প্রথম দিকের একটা বই। নাম হল হোটেল গ্রেভার ইন। বইটাতে আমার মত একটা গল্প আছে, যেখানে লেখক কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটা কোর্স নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তারপর ক্লাসের এক অন্ধ ছাত্রকে দেখে ভিষন প্রেরনা পান। অনেক পড়াশুনা করেন। কোর্সটা ১০০ তে ১০০ দিয়ে শেষ করেন। আমি ধরে নিলাম আমারও তাই হবে। অনেক পড়াশুনা শুরু করলাম। পরিক্ষা দিলাম। ১০০ তে ৩৯ পেলাম। বুঝলাম আমার সব কিছু শেষ হয়ে গেছে।
দ্বিতীয় মিডটার্মের পরে বাকী ছিল ফাইনাল আর প্রজেক্ট। এ দুইটাতে যদি আমি ১০০ ও পাই, তবেও কোর্সে পাশ করতে পারব না। চুপি চুপি দেশে ফেরার টিকিট কেটে ফেললাম। ১৩ ই মে যেতে চেয়েছিলাম, টিকিট পেলাম না, তাই ১৬ই মের টিকিট নিলাম। ওয়ান ওয়ে টিকিট। আমার রুমমেটকে কিছু জানালামনা। বাসায় জানালাম মন খারপ লাগছে তাই বেড়াতে আসব।
টিকিট কাটার পর মনটা হালকা হয়ে গেল। কয়দিন ক্লাসে গেলাম না। তবে প্রজেক্টা নিয়ে আনেক খাটাখাটি করলাম। ক্লাসে না যাওয়ার কারনে দেখি ডঃ কুমার আমার মেইল বক্সে একটা নোট দিয়ে গেছেন। জানতে চেয়েছেন কি হয়েছে, ক্লাসে আসছি না কেন।
ফাইনাল হয়ে গেল, প্রজেক্ট প্রেজন্টেসন ও শেষ হল। গ্রেড পাওয়া নিয়ে আমার কোন তাড়া নেই। তখনও ইন্টারনেটে সাথে সাথে গ্রেড চেক করা যেত না। বাসায় মেল আসত, অথবা রেজিস্ট্রার অফিশ থেকে প্রিন্ট করে আনা যেত। ডঃ কুমারে অফিসে গিয়ে গ্রেড জানার কোন ইচ্ছে আমার ছিল না।
দেখতে দেখতে ১৬ তারিখ এসে গেল। তার আগের দিন আমার প্রফেসরকে জানিয়েছি হঠাৎ করে আমাকে দেশে যেত হবে, দেশে একটা সমস্যা হয়েছে। উনি জানতে চাইলেন,
-কবে আসবে?
আমি বললাম
-বলতে পারছিনা, দেশে গিয়ে জানাব।
উনি অসম্ভব বিরক্ত হলেন।
আমার রুমমেটতো রেগে আগুন। বললেন আমি পাগল।আমার আমেরিকায় আসায় ঠিক হয়নি।
ফ্লাইট ১-৩০এ। ১০টার দিকে শেষ বারের মত ডিপার্টমেন্টে গেলাম। দেখি মেইল বাক্সে ডঃ কুমারের একটা নোট। খুলতে ইচ্ছে করছিলনা। জানি কি লেখা আছে। খুব খারাপ একটা খবর। ভাবলাম দেশে গিয়ে খুলব।
একজন বড় ভাই এসেছিলেন এয়ারপোর্টে পৌছে দেবার জন্য।এয়ারপোর্টের সারাপথ মনটা খুব বিষন্ন লাগল। এবার আমি মন খারাপ করলাম অপুর্ব এই শহরটা ছেড়ে চলে যাবার জন্য।
দুবাই যখন পৌছালাম তখন ওখানে রাত। ঢাকার ফ্লাইট আরো ৪ ঘন্টা বাকী। হঠাৎ কি মনে হল, হাত ব্যাগ থেকে নোটটা খুলে ফেললাম। নোটটার দিকে তাকিয়ে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
চলব
কপিরাইট©২০১১ স্পার্টন
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০১১ রাত ৮:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



