প্রসঙ্গঃ অর্থসংকট এবং বাংলাদেশ....
দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন উদ্বেগজনক। বাজারে কোনো পণ্যের কমতি নাই কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নাই। হঠাৎ এই দেউলিয়াপনা নিয়ে সাধারণ মানুষের চোখ খুললেও ক্ষমতাসীনদের 'কানে পানি গিয়েছে' তেমনটা মনে হয় না। তথাকথিত উন্নয়নের বাগাড়ম্বরে বিশ্বজুড়ে আর্থিক ক্ষয়িষ্ণু দেশগুলোর পিছু নিয়েছে বাংলাদেশ। তাদের মতই আর্থিক পরিকাঠামোয় গলদ রেখে বাহ্যিক চাকচিক্য রাখতে গিয়ে আজ এই হাল! তার ওপর গোদের ওপর বিষ ফোঁড়া হয়েছে সর্বস্তরে আগ্রাসী দুর্নীতি।
কিন্তু এতো গেল অর্থনীতির কঠিন ব্যাপার। সহজ কথাটি হল, অনেক আগেই এই বিপদের আভাস পাওয়া গেছে। কিন্তু বিশ্বের এক নম্বর অর্থ মন্ত্রী তথা সরকার নজর না দিলেও মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী ঠিকই এদেশের সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ বুঝতে পেরে 'কচুরিপানা খাওয়ার' নছীহত করেছেন বছর খানিক আগেই!
খেয়াল করবেন- পাড়ায়, রাস্তার মোড়ে, চায়ের দোকানে, স্কুল কলেজ, মার্কেটের গেইটে বেকার যুবকদের ভীড়৷ এই এলাকা ভিত্তিক আড্ডার নিরিখে সারা দেশের যুবসমাজের কথা ভাবুন।
অথচ, আমরা সেটাকে নেহাৎ আড্ডা বলে এড়িয়ে যাই। সামাজিক অবক্ষয়ের দোহাই দিই। আসল কথা হল লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী বেকার। অর্থাৎ দেশের একটা বৃহত্তর প্রজন্ম কর্মহীন।
শহর থেকে গ্রামেও দেখুন- দামী বাইক, দামী মোবাইল, দামী বাড়ি, দামী আসবাব। সব কিছুই যুগের সাথে পাল্টাচ্ছে। নিত্যনতুন মডেল চেঞ্জ হচ্ছে। নতুন নতুন কেনা দামী পণ্যগুলো মুহূর্তে সেকেন্ড হ্যান্ড হয়ে যাচ্ছে। তারমানে কি অর্থনীতি চাঙ্গা রয়েছে?
মানুষের হাতে টাকা আছে?
মোটেই না।
খেলাপী ঋণের দায়ে ক্ষুদ্র কৃষকের কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যায় আর হাজার হাজার কোটি টাকার লুটেরাদের ভিআইপি মর্যাদায় লালন পালন করা হয়। ঋণের অর্থনীতি, ঋণের উন্নয়ন চলছে। সহজ কিস্তি সবাইকে গিলে নিয়েছে। কৃষিজমির বিকাশ নেই। কিন্তু কৃষিজমি বাস্তুজমিতে উন্নত করতে হচ্ছে। খাদ্যসংকট আর ঋণ দুটোই আমাদের ভবিষ্যত।
আমার মনে আছে, পাব্লিক ফোন বুথ উঠে গিয়ে যখন থেকে মোবাইলের দোকান হল তখন তার আলো ঝকঝকে বিপননী আমাদের নজর কেড়েছিল। এখন অনলাইন ব্যবসা তাদের পথে বসিয়ে দিয়েছে। কাঠের অভাবে কাঠের আসবাবের দোকানগুলো এখন বন্ধ। বিদেশি চকচকে ফিনিশ ফার্নিচার, স্টিল আয়রনের আসবাব এসেছে। তাহলে কাঠমিস্ত্রীরা গেল কোথায়? পাড়ার মোড়ের বিরিয়ানির দোকানটা উঠে গেছে, যাবতীয় খাবার অনলাইন হোম ডেলিভারি এসেছে। ক্যাবট্যাক্সি-উবার-পাঠাও এসে গণপরিবহন ব্যবসায় অন্ধকার টেনে এনেছে। এভাবেই আমাদের অজান্তেই চোখের সামনে পাড়ার কাপড়ের দোকান, টেইলার্স, মুদির দোকানকে গিলে খেয়েছে বড় কোম্পানীর বড় বিপননী। চারিদিকে আরও বেকার বাড়বে। কিন্তু বেক্সিমকো, সামিট, ইউনাইটেড, এস আলম, আকিজ, ট্রান্সকম, হা মীমদের ব্যবসার কোনো ক্ষতি হবে না। তারা আরও নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগ করবেন।
আমাদের দেশে এখন আরেক মাৎসায়নের যুগ চলছে। আমরা দেখেও দেখিনা। তাই পরে বিপদের চরম মূহুর্তে আমাদের জ্ঞান ফেরে। অনুকরণ প্রিয় বাংগালী থার্টি ফার্স্ট নাইটে বিদেশি গিলে নোংরামি করে। ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে বেলেল্লাপনা করে স্মার্ট হয়।একদিনের বাংগালীদের ইলিশ উৎসবের ছবি দেখে একবারও মনে হয় না কেন আমাদের মধ্যবিত্ত নামের নিম্নবিত্তদের পাতে এক টুকরো ইলিশ কতদিনেও আসেনি? কেন পুলিপিঠের ব্রান্ডেড উৎসবে গিয়ে মা বোন স্ত্রীর হাতের বানানো জিনিস দশগুন দামে কিনি?
আসল কথাটা হল, আমরা ভাবতে চাই না। তাই সব কিছুকে মেনে নেবার অভ্যাস হয়ে গেছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো বণিকের মানদন্ডের ইশারায় চলছে। তাই শিল্পপতিরা হাজার কোটি নিয়ে বিদেশে পালাতে পারে আর রাজনীতিকরা হাজার লক্ষ নিয়েও বহাল তবিয়তে 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত অভিযোগ' বলে আইওয়াশ করে দিন কাটিয়ে দেন।
'দেশী পণ্য কিনে হও ধন্য'- সস্তা বিজ্ঞাপন শুনি। কিন্তু না ঠকলে জাগি না। কিন্তু আর কতদিন?
মনে রাখবেন, অদুর ভবিষ্যতে নাহলেও সুদূর ভবিষ্যতে একটা শ্রেণীযুদ্ধ হবেই। যারা চোখ বুজে ঘুমাতে ভালোবাসেন তারাও কিন্তু রেহাই পাবেন না।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০২৪ সকাল ১১:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


