ক্লাস ফাইভ থেকে একসাথে পড়ি।
এবং আমার হষ্টেল লাইফের ছয় বছরের রুমমেট। সেভেন থেকে টুয়েলভ আমরা একসাথে কাটিয়েছি।
কলেজ লাইফের শেষ দিকে এসে হঠাৎ ওর বাবা মারা যান। আংকেল কুমিল্লা শহরের নামকরা প্রফেসর ছিলেন। ম্যাথস পড়াতেন। আলী হোসেন মজুমদার।
তখন আমাদের সম্ভবত বছরের শেষ সেমেস্টার চলছিলো। মৃত্যুর খবর শুনে ও ছুটি নিয়ে বাসায় চলে গেলো। ফিরেও এলো কদিন পরে।
ব্যাক্তিগত শোকগুলোকে কেমন করে জানি খুব সহজেই সামলাতে শিখে গেছিলাম আমরা। তানভীরও কদিন পরে স্বাভাবিক হলো।
তখন মোবাইলের এরকম সহজ ব্যবহার ছিল না। তারচেয়ে বড় কথা ফোন ব্যাপারটাই অ্যালাউড ছিলোনা কলেজে। বাসার সাথে যোগাযোগের জন্যে চিঠিই একমাত্র ভরসা। প্রচুর চিঠি লিখতাম সবাই। বাসা থেকেও আসতো।
একদিন দুপুরে, রুমে, আমি বিছানায় শোয়া। তানভীর ওর পড়ার টেবিলে বসে মাত্রই একটা চিঠি লিখা শেষ করলো। আমি দেখলাম ও একটা হলুদ খাম নিয়ে তাতে ঠিকানা লিখছে।
হঠাৎ তাকিয়ে দেখি ও দু'হাতে মুখ ঢেকে বসে আছে। আমার একটু অস্বাভাবিক লাগলো। বললাম, কি রে?
ও মাথা তুলে তাকালো। চোখ ভেসে যাচ্ছে পানিতে। আমি চট করে উঠে বসলাম। আবারো জিজ্ঞেস করলাম কি হলো?
ও আস্তে করে হাতের খামটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো- দ্যাখ না। ভুল করে ঠিকানায় আব্বুর নাম লিখে ফেলেছি!
আমি দেখলাম তাই। চিরকালের অভ্যেস। প্রাপকের জায়গায় তাই আংকেলের নাম।
ও কলম নিলো হাতে ঠিক করার জন্যে। কোন কথা না বলে আমি হাত বাড়িয়ে খামটা নিয়ে নিলাম ওর হাত থেকে। তারপরে আমার শেল্ফ থেকে নতুন একটা খাম নিয়ে কাঁপা হাতে ওর ঠিকানা লিখলাম তাতে। লেখা শেষে ওর চিঠিটা খামে ভরে অফিসে গিয়ে পোষ্ট করে দিয়ে এলাম।
রুমে ফিরে ঝাপসা চোখে তাকিয়ে দেখি তখনো দু'হাতে মুখ ঢেকেই বসে আছে আমার বন্ধু।
-------------
আজ 23 আগষ্ট, আমার আরেকজন প্রিয় বন্ধুর জন্যে খুব কষ্টের একটা দিন।
সবাইতো আর আমার বা আপনার মত ভাগ্যবান হয় না। বাবা অথবা মা যেকোন একজনের নাম খামের উপরে লিখলেই আমাদের চলে যায়।
অনেকেরই যায় না।
অনেকেই তাই ভুল করে লিখে ফেলা নাম কাটার জন্যে কলম তুলে নেয় আবার। কতটা কষ্ট বুকে চেপে যে করে মানুষ সেটা!
প্রিয় তিতলি,
অনেকদিন আগে তানভীরকে দেয়া সেই হলুদ খামটা আজ তোকেও দিলাম।
খুব সুন্দর করে তোর মামণির নাম লেখা আছে তাতে, ঠিকানাও। তোর যেমন ইচ্ছা চিঠি লিখ আজ। এক বছর ধরে জমানো সব অভিমান, অনুযোগ আর ভালোবাসার কথা লিখ সেখানে।
যা ইচ্ছা হয়, তাই লিখ।
সৃষ্টিকর্তা নিজেই যেখানে পোষ্টম্যান, আমি জানি, সন্তানদের লেখা চিঠিগুলোও তিনি ঠিক পৌছে দেন বাবা-মার কাছে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


