[ব্লগে বেশ গল্প লেখার জোয়ার, ভাল লাগছে দেখে। অনেক আগে পোস্ট করা গল্পটাই আবার দিলাম, কেউ যদি পড়েন এই আশায় ]
===============================
পর্ব-২, পর্ব-৩
||এক||
-------
অগাস্ট ১৯, ২০০৬/ বিকেল ৪টা
এ.সি রুমে বসেও রাশেদ হালকা ঘামতে লাগল; এবং অবশ্যই বেশ বিরক্ত হচ্ছে সে এই মুহূর্তে।
ভদ্রমহিলার চেম্বারে ঢোকার সময় যেরকম এয়ার-হোস্টেস মার্কা মিষ্টি হাসি দিয়ে তিনি অভিবাদন করেছিলেন, তাতে রাশেদের মনে হয়েছিল সময়টা ভালই কাটবে;
একদম মনখুলে কথা বলা যাবে।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যতটা ভাল কাটবে বলে মনে হয়েছিল, তার অর্ধেকটা হবারও তেমন সম্ভাবনা নেই।
ভদ্রমহিলা একদৃষ্টে রাশেদের কাগজপত্র গুলো উল্টে পাল্টে দেখছেন;
মাঝে মাঝে আগের পৃষ্ঠাগুলোতে ফিরে এসে আবার দেখছেন।
রাশেদের সামান্য সন্দেহ হলো মহিলার মেমোরীতে সমস্যা আছে, নাহলে একই পেইজে বারবার ফিরে আসবে কেন?
এই মহিলা তার কিসের কাউন্সেলিং করবে? সেতো সব যাবে ভুলে, কনফার্ম!
একবার ভাবল একটু গলা খাঁকারি দেবে নাকি;
আবার মনে হলো, আজকালকার ডাক্তাররা যা বদরাগী, তারওপর ইনি তো আবার সাইক্রিয়াটিস্ট গোছের। হয়ত মারধোরও করে বসতে পারে।
রাশেদ একমনে টেবিলের ওপর রাখা মহিলার ফুটফুটে মেয়েটার ছবি দেখতে লাগল;
কি আর করা? কিছু একটা করে তো সময় কাটাতেই হবে।
নীরবতা ভেঙে ভদ্রমহিলা, মানে ড. আয়শাই বললেন, লেবুর শরবত খাবেন? যা গরম পড়েছে! মুখে সেই ম্যানুয়াল গাইডেড হাসি, তবে হাসিটা সুন্দর। এই বয়েসেও মানিয়েছে।
কিছুটা সম্বিৎ ফিরে পেল রাশেদ। একটু হন্তদন্ত হয়েই বলে উঠল, না না, আমি ঠিক আছি। আপনার এ.সি.টা বেশ ভাল। আমার গরম লাগছেনা।
মহিলা আরও বিনীতভাবে বললেন, আমি খাব তো! আপনাকেও দিতে বলি?
রাশেদ সঙ্কোচের সাথে মাথা নাড়ে।
এখন আবার মহিলার আচরণে মনে মনে আশা করতে লাগল যে মন খুলে কথা বলা যাবে।
পরমুহূর্তেই আবার যখন চশমা চোখে ঠেসে দিয়ে মহিলা বিজ্ঞের মতো কাগজগুলোর দিকে তাকলেন তখন আবার আশাটা ঝাপসা হয়ে গেল। দেখে একদম ঠিক হাই স্কুলের বদরাগী মিসট্রেস মিসট্রেস লাগছে। রাশেদ বুঝতে পারছেনা কি বলে শুরু করা উচিত, আর কিইবা বলা উচিত।
মহিলার ব্যাপারে সে এখনও একটু কনফিউজড।
ড. আয়শা টেবিলের উপর দুহাতে কগাজগুলো মেলে ধরলেন।
একটু ঝুঁকে এসে খুবই কোমল গলায় বললেন, আপনার ক্যান্সার ধরা পড়েছে কতদিন হলো?
রাশেদ বলল, গত মাসের ১৭ তারিখ, মানে একমাস দুইদিন।
সে তো বেশ লম্বা সময়!! ডাক্তার কি বলছেন?
আরও কিছু চেকাপ করানোর কথা বলেছেন; বিশেষ করে রক্তে ছড়িয়ে পড়েছে কিনা সেটার চেকাপ।
করেছেন?
হ্যাঁ, এমাসের প্রথম সপ্তাহে। এখানে একবার করালাম, তারপর ১০তারিখে যখন ইন্ডিয়া গেলাম, তখন করালাম।
রেজালট পেয়েছেন?
হ্যাঁ, এখনও লিউকেমিয়ার পর্যায়ে যায়নি। তবে রক্তে ছড়িয়েছে। এখন সবচেয়ে খারাপ অবস্থা স্টমাকের।
হুমম।
ডা. আয়শা আবারও কাগজপত্রে ডুবে গেলেন। তবে এবার বেশী সময় নিলেননা; মিনিটখানেকের মাঝেই আবার মাথা তুলে জিঞ্জেস করলেন,
তো আপনার সমস্যা কি? আমি কি করতে পারি?
রাশেদ বলতে শুরু করল, আপা, আসলে আমার ফ্যামিলি বা বন্ধু-বান্ধব এমনকি অফিসের কলিগ, কাউকেই কিছু জানাইনি এখনও।
কেন!!! , ডাক্তার প্রায় চিৎকার করে উঠলেন।
আসলে আমার বেশ কিছু টেকনিক্যাল সমস্যা আছে; যেমন, আমি বিয়ে করেছি মাত্র সাতমাস! বলুন, আমি আমার ওয়াইফকে কিভাবে এখন একথা বলি? তারপর, বাবা-মা'র কথা ধরুন; উনারা ময়মনসিংহে থাকেন একা; আমরা তিনভাইয়ের তিনজনই ঢাকায় থাকি। বোনরাও দূরে থাকে, একজন ঢাকায়, একজন লন্ডনে।
আপনার বা-মা কি অসুস্থ?
না, তেমন সিভিয়ার কিছুনা, তবে বোঝেনই তো। বুড়ো বয়েস, দুজনই সিক্সটির আশেপাশে। প্রেসারের প্রবলেমও আছে, হার্টের প্রবলেমও আছে। তারা এখবর শুনলে সহ্য করতে পারবে বলে মনে হয়না।
আপনার ভাই-বোনদের?
ওদের বললে বাবা-মা পরদিনই জেনে যাবে; আসলে আমি চাইছিলাম আগে ভালমতো দেখি অসুখটা কতদূর জটিল। ভেবেছিলাম, যদি খুব প্রাইমারী স্টেজ হয় , তাহলে লোকজানাজানি না করে নিজে নিজেই একটা ব্যবস্থা করে ফেলব।
কিন্তু কাগজপত্রে তো বলছে
জি আপা, সেজন্যই আপনার কাছে আসা। আমার অসুখটা বেশ সিরিয়াস পর্যায়ে চলে গেছে। ডাক্তার বললেন, কেমোথেরাপি নিতেই হবে;
কেমো নিয়ে একটা ভাল অবস্থানে আসলে তখন স্টমাকে অপারেশান হবে। এদিকে আমার অফিসেও বলতে পারছিনা, রাশেদ মিনমিনে স্বরে বলল।
কেন? , ড. আয়শা চমকে উঠলেন আবার।
যদিও অফিসে জয়েন করেছি চারবছর, তবে এবছরই প্রথম আমাকে বড় বড় দু'টা প্রজেক্টের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দুটো প্রজেক্টই অবশ্য আমার নিজের আইডিয়া, ফরেন ডেলিগেটও ইনভলভড। এখন মাঝপথে এসে আমি যদি বলি একথা, তাহলে বস কিভাবে নেয় সেটা নিয়ে খুবই চিন্তায় আছি।
কেন আপনার এসিস্ট্যান্ট নেই? যিনি আপনার অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব নেবেন?
না। সেখানেও সমস্যা হয়েছে। আমার টিমে সব ইয়াং, নিউ গ্র্যাজুয়েটদের নিয়েছিলাম। আমার নিজেরই ভুল, কারণ ভেবেছিলাম ওরা খুব ওবিডিয়েন্ট হয়ে কাজ করবে আর প্রজেক্টের দেখাশোনা আমি একাই করব।
বেশী কনফিডেন্স ছিল নিজের ওপর।
এখন আমি বসকে বলার সাহসই পাচ্ছিনা যে আমার রেস্ট দরকার। জানেন, আজও অফিস করেছি। এখানে শেষ হলে আবার যাব।
আপনি তো মারা পড়বেন!!
সেজন্যই এসেছি আপনার কাছে। আমার মনে হচ্ছে আমি শেষ সীমায় চলে এসেছি। মনে হচ্ছে সবাইকে এখন খুলে বলা দরকার।
আপনার টাকা-পয়সার কি অবস্থা?
টাকা-পয়সা আপাতত চিন্তা না। আমার ব্যাংক ব্যালেন্স আছে মোটামুটি সাত লাখ।
ও, তাহলে প্রথম ধাককাটা সামলানো যাবে; কিন্তু মনে রাখবেন আরও অনেক লাগবে।
আমি জানি, ম্যাডাম। তবে তার চেয়েও বড় দূশ্চিন্তা এখন আমি কিভাবে সবাইকে বলব?
আমার মনে হয়, আপনি সবার আগে আপনার কোন রিলায়াবল বন্ধুকে বা আপনার ভাইদেরকে বলতে পারেন। তারা আপনার বাবা-মাকে ধীরে সুস্থে বুঝিয়ে বলবেন;
আর আপনার স্ত্রীকে যদি সরাসরি বলতে খুব সমস্যা হয়, তাহলে আপনার ভাবী বা বন্ধুর স্ত্রীদের সাহায্য নিতে পারেন।
ড. আয়শা একটু দম নিলেন।
ও, আর বসকে আপনার বলতেই হবে, কাজেই অধীনস্থ ছেলেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে রিলায়েবল যে ছেলেটি, মেধাবী না হলেও চলবে, ওকে আগামী এক সপ্তাহ কাজগুলো আস্তে আস্তে বুঝান।
আগামী একসপ্তাহ কি কাজ করতে পারবেন? নিজের কথার মাঝেই ড. আয়শা প্রশ্ন করলেন।
আসলে বলতে পারছিনা; পেইনের উপর সব নির্ভর করছে। তবে আমার মূল সমস্যা হলো আমার স্ত্রীকে নিয়ে। রাশেদ শুকনো গলায় টেনেটেনে বলল।
কেন?
ম্যাডাম, ওর অনেক স্বপ্নলাইফে। দেখুন, আমাদের বিয়েটা সেটলড ম্যারেজ, আর মাত্র সাতমাস হয়েছে। গত একমাস আমি খেয়াল করেছি, ওর মাঝে প্রেগনেন্সির কোন লক্ষণ নেই।
এখন, আমার এই ভয়াবহ জীবনের সাথে ওকে আর কতটুকু জড়াব, সেটা নিয়েই আমি চিন্তিত। কারণ, ডাক্তার বলেছেন আগামী পাঁচ বছর খুবই ক্রুসিয়াল। আমার নিজেরও মনে হচ্ছে এরবেশী আমি বাঁচব কিনা সন্দেহ।
তারপর যদি বেঁচেও যাই, এই পাঁচ বছরে ওবেচারীর লাইফের উপর দিয়ে যে পরিমাণ ঝড়-ঝাপটা যাবে, তাতে তার বাকী জীবনে কোনদিনই স্বপ্নগুলো পূরণ হবেনা। এই ব্যাপারটা নিয়েই আমি বেশী চিন্তিত।
আপনার ওয়াইফের কি এমন স্বপ্ন
ম্যাডাম, ও খুব ভাল স্টুডেন্ট; এখন একটা ফার্মাসিউটিকালে চাকরীও করছে। ওর স্বপ্ন বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করবে, বাইরের কোম্পানীতে চাকরী করবে। আমি নিজেও মনে মনে হায়ার স্টাডিজ এর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ভেবেছিলাম এই নভেম্বরে এপ্লাই করব।
হুমম
আপা, আমরা যখন আমাদের এই স্বপ্নগুলো নিয়ে কথা বলি, তখন ওর সুখী চেহারাটা দেখে আমি বুঝি ওর স্বপ্নটা কত মূল্যবান। আমি চাইনা সেগুলো নষ্ট হয়ে যাক।
তো আপনি কি করবেন বলে ঠিক করলেন?
দেখুন, আমি ভর্তি হব হাসপাতালে; আমার এক্সট্রা কেয়ার নেয়ার কারও প্রয়োজন আসলে নেই। শুধুশুধু রিপাকে, মানে আমার ওয়াইফকে দূশ্চিন্তায় কাটাতে হবে যতদিন আমি বেঁচে থাকি।
এটুকু বলে রাশেদ একটু দম নিয়ে থিতু হল। তারপর ঝড়ের বেগে বলল,
তাই, আমি ভাবছি আমরা ডিভোর্স করব।
কিছুক্ষণ ঝিম মেরে রইলেন দুজনেই।
ড. আয়শা মুখ খুললেন,
হুমম, আপনার ডিসিশানটা হয়ত খুব প্র্যাকটিকাল। হয়ত এটাই সবচেয়ে ভাল ডিসিশান। কিন্তু, আপনার ওয়াইফ কি তা মানবে? আমার মনে হয়না কোন মেয়েই তা মানবে।
আমি জানি এত সহজে সে রাজী হবেনা। সেজন্যই আমি তাকে নিয়ে আপনার কাছে আসতে চাই। আমাদের দুজনের জয়েন্ট-কাউন্সেলিং করতে চাচ্ছি।
আপনার পয়েন্টটা আমি বুঝেছি। কিন্তু আপনার নিজের মানসিক অবস্থার কথা কি খেয়াল করেছেন। ডিভোর্স হলে আপনি নিজেও একটা মানসিক ধাককা খাবেন। আর আপনি হয়ত অলরেডী জানেন, এরকম বড় রোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঢাল হলো মানসিক শক্তি।
ম্যাডাম, ডিসিশানটা প্রায় দুই সপ্তাহ আগে আমি নিয়েছি। ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা শুরু করেছি মাসখানেক। আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত।
দেখুন, আপনাকে একটা কথা বলি। মেইন সিচুয়েশানটা ফেইস না করা পর্যন্ত আপনি নিজেও বুঝতে পারবেননা আপনি মানসিকভাবে প্রস্তুত কিনা। সে যাইহোক, আপনি আগে আপনার স্ত্রীকে নিয়ে আসুন, ওনার সাথে কথা বলি।
তারপর আমি আপনাকে কথা দিতে পারব যে আমি আপনাকে এব্যাপারে হেল্প করব কিনা।
তারমানে, আমি কি ওকে এখন কিছুই বলবনা!
না! আপনি অবশ্যই আপনার অসুখের কথা তাকে বলবেন। এবং তা অবশ্যই আজই।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০০৭ সকাল ১০:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




