পর্ব-১, পর্ব-৩
||দ্বিতীয় পর্ব||
অগাস্ট ১৯, ২০০৪; রাত ৮ টা।
আজকাল সন্ধ্যা আটটার দিকে রাশেদ অফিস থেকে বের হয়।
অফিসের বড়সাহেব ইকবাল হোসেন হয়ত এব্যাপারটাতে একটু অসন্তুষ্ট, কিন্তু যেহেতু প্রজেক্ট দুটোরই কাজ সময়মতো চলছে, উইকলি মিটিংয়ে রাশেদের তত্বাবধানের দুটো গ্রুপই যথেষ্ট প্রোগ্রেস দেখাচ্ছে, তাই এব্যাপারে তিনি তেমন কিছু বলতেও পারছেননা।
তবে ইকবাল হোসেন বেশ কয়েকবারই মিনমিনিয়ে মনের কথা জানিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন, যার মানে মানে আরও কিছুক্ষণ বেশী কাজ করো, এগুচ্ছে ঠিকমতো ভাল কথা, কিন্তু আরও এগিয়ে রাখতে দোষ কি, এরকম ভাবসাব।
আজও যেমন রাশেদ যখন অফিস থেকে বেরোবার আগে স্যারের রূমে উঁকি দিয়ে বলেছিল 'স্যার, আমি যাচ্ছি', তখন তিনি মুখে একগাল হাসি নিয়ে বলে বসলেন 'কি!! বউয়ের ভয়ে আজকাল সময়মতো ফেরা হচ্ছে, এ্যাঁ'।
রাশেদের মনটাই খারাপ হয়ে গেল, তারওপর ব্যাটার মুখের ঐ 'এ্যাঁ'টাও বেমনান।
মেজাজ দ্বিগুন চড়ানোর জন্য ঐ এক 'এ্যাঁ'ই যথেষ্ট।
অফিসের সবার ব্যাপারে রাশেদ কিছুটা হতাশও বোধ করে;
গত একমাসে ওর ওজন কমেছে মিনিমাম ছয় কে.জি। অথচ অফিসে কেউ ব্যাপারটা খেয়ালও করছেনা!
বিয়ের আগে যে শীলা এসে প্রায়ই গায়ে ঢলে পড়ে রংঢং করত সেওতো একবার বলতেও পারত, 'রাশেদ ভাই, ভাবী বুঝি তেমন যতন নেয়না?'
অথবা মুখপাতলা রাজীব ভাইটা যদি একবারও বলত 'কিহে, বউ কি খুবই ব্যাস্ত রাখে নাকি হে?'
তাও রাশেদ একটু খুশী হত।
আচ্ছা সবাই নিজেকে নিয়ে এতই ব্যস্ত!!
গুলশান থেকে মীরপুরের দিকে এসময় কোন ট্রাফিকই যেতে চায়না;
প্রায় হাতে-পায়ে ধরে রাজী করাতে হয় সি.এন.জি চালকদের। আগে হলে ওর বিরক্তিতে গা ধরে যেত, হাঁটা শুরু করত হয়ত।
কিন্তু এখন অফিসের কাছাকাছি কোথাও প্রায় গা এলিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করে, আধগন্টা, চল্লিশ মিনিট; এখন উলটো সি.এন.জি বা ট্যাক্সিওয়ালাদেরই এসে অনুরোধ করতে হয়, 'স্যার, কই যাইবেন?'
কারণ, যত দেরীতে বাসায় ফেরা যায় ততই ভাল।
গত একমাস রিপাকে সে বুঝিয়ে আসছে যে সে খুবই খুবই ব্যাস্ত;
সকালে উঠেই ঠান্ডা দুধে একটা পাউরুটি ভিজিয়ে খেয়ে রওয়ানা দেয়।
রাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দশটা বাজায়।
ক্লান্তির অভিনয় করতে হয়না, এমনিতেই ক্লান্ত থাকে।
যদিও অফিসে কাজের লোড অত নেয়না।
রিপার সাথে হয়ত সম্পর্কটা এমনিতেই টিকবেনা; প্রায় নয়টার দিকে ট্যাক্সির সীটে গা এলিয়ে দিতে দিতে রাশেদ ভাবে।
ব্যাপারটা ভেবে ও একধরনের স্বস্তিও অনুভব করে। এমনি এমনিই যদি বিয়েটা না টিকে তাহলেইতো সবচেয়ে ভাল।
ক্যান্সার ধরা পড়ার পর গত একমাসে সেক্স করেনি;
ডাক্তার বলেছেন শরীরের উপর অযথা প্রেসার না নেয়া ভাল।
বাচ্চা নেয়া তো কোনভাবেই উচিত না। সেজন্য সেক্স এড়িয়ে চলাই ভাল। অথচ নতুন বিয়ে, সাতমাসও পুরো হয়নি।
এটা সেটা ধানাই পানাই করে আর কত কাটাবে সে রিপাকে!
ভাগ্যভাল রিপা এখনও পরকীয়া টাইপের কিছু সন্দেহ করেনি হয়ত, কারণ কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
নাকি সন্দেহ করছে, কিন্তু বলছেনা। সেটাও রাশেদ জানেনা।
আজেবাজে এটাসেটা চিন্তা করে মাথাটা এলোমেলো হয়ে যায় রাশেদের। এরমধ্যে একদিনতো রিপা শুধু ব্রা আর পেটিকোট পরে শুতে আসল; মুখে মিষ্টি হাসি।
রাশেদ যখন ওর কপালে হালকা একটা চুমু দিয়ে বলল, 'লক্ষী আমার, রাগ কোরোনা; কাল খুবই ভোরে অফিস যেতে হবে, জহির ওরা এসে বসে থাকবে মিটিঙের জন্য', তখন তো রিপা একদম রেগে মেগে আগুন; ধুপধাপ করে উঠে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর গায়ে নাইটি চাপিয়ে দিয়ে এসে বলল, 'তোমরা ছেলেরা না সব এক! আরে! আমি কি ওসবেরজন্য কিছু করেছি নাকি? যা গরম পড়েছে! তোমার জ্বালায় তো আমার গরমে মরতে হবে।'
রাশেদ সবজান্তা টাইপের হাসি হেসে চোখ বন্ধ করে নাকডাকা শুরু করল; গত একমাস প্রতিদিন চলে এই নাকডাকা অভিনয়, কমসেকম আধগন্টার জন্য।
এই নাকডাকা বিদ্যেটা রপ্ত করতে হয়েছিল শাহীনের কাছে সপ্তা তিনেক আগে। শাহীনকে অবশ্য রাশেদ সব খুলে বলেনি।
কারণ, তেমন খুব ঘনিষ্ট কোন বন্ধু না শাহীন; তারওপর ব্যাটার চরিত্র তেমন সুবিধার না হওয়ায় রাশেদ ওকে এড়িয়েই চলে।
বিয়ের পর এই নিয়ে যতবার দেখা, প্রত্যেকবারই হাতে একটা সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে বলে 'বল, তোর মজমার গল্প বল'।
রাশেদ মুচকি হেসে এড়ায় আর মনে মনে ভাবে 'হারামজাদা, তোমার তো বয়স বাড়লনা!'
এমনি হলে হয়ত আগামী দু'তিন বছরেও শাহীনের ডেরায় পা দেয়া হতোনা।
শুধু শাহীনের ঐ নাকডাকা বিদ্যেটাই রাশেদকে টেনেছিল।
হঠাৎই একদিন অফিস থেকে সাড়ে ছয়টার দিকে বের হয়ে ওর মহাখালীর ফ্লাটে হানা দেয়। লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে শাহিনের কাছে গল্প ফাঁদে।
রাশেদ ভালই জানে কোন ডিরেকশানে গেলে শাহীন একদম জানপ্রাণ দিয়ে হেল্প করবে।
শাহীনকে বোঝায়, 'দেখ দোস্ত, সকাল সাতটায় উঠে অফিসের জন্য রেডী হতে হয়; বউয়ের অফিস তো বাসা থেকে রিক্সায় দশ মিনিট, সেতো আর বুঝেনা! রাত চারটা পর্যন্ত তো সম্ভব না। তুই আমারে নাকডাকার বিদ্যাটা শিখা।'
শাহীন ঘন্টা দুয়েক ধরে দরাজদিলে লেসন দেয়;
নিজের নাকডাকা শুনে রাশেদ নিজেই বুঝে 'পারফেক্ট!!'
ট্যাক্সিতে বসে এসব সাতপাঁচ স্মৃতি ভাজতে ভাজতে রাশেদ ভাবে কত নীচে নামতে হয়েছে তাকে একটা ব্যাপার গোপন করতে! রিপার প্রতি ভীষণ অন্যায় হয়েছে।
আচ্ছা! রিপা ক্যান্সারের খবরটা যখন জানবে তখন কি প্রতিক্রিয়া করবে?
রাশেদের সাব-কনসাজ মন ভাবতে চায়, খবরটা শুনে রিপা বেঁহূশ হয়ে পড়বে; পাগলের মতো আচরণ করবে, রাশেদের চেয়ে রাশেদের জন্য বেশী চিন্তিত হয়ে পড়বে রিপা।
সবকিছু উৎসর্গ করে দেবে রাশেদের জন্য, আর তখন রাশেদের মনে হবে 'কেন এই একমাস শুধুশুধু লুকোলাম?'
আবার মনের অন্যদিকটা একইসাথে নিরুৎসাহিত করে ফেরে সারাক্ষণ;
কিভাবে সম্ভব! মাত্র সাতমাস হলো বিয়ের, এখনও তো আমরা নিজেরা একে অন্যকেই তেমন জানিনা; হানিমুনেও যাওয়া হয়নি। বিয়ের পরইতো আবার সেই গতবাঁধা ব্যাস্ত জীবন। রিপা বরং শুনে শকড হবে, তার লাইফটা রাশেদের সাথে জড়ানোর ফলে এভাবে নষ্ট হয়ে যাবে কেন, তার স্বপ্নগুলো সব চুরমার হয়ে যাবে কেন! এটা সেটা ভেবে নিশ্চয়ই রিপা রাশেদকেই দোষ দিতে থাকবে মনে মনে।
'আমার রিপার কাছে তেমন আশা করা মোটেও ঠিক হবেনা।'
এলোমেলো, এটাসেটা ভেবে রাশেদ যেন স্বস্তি পায়না।
হঠাৎ হয়ত স্বস্তি ফিরিয়ে আনার জন্যই একটু নড়েচড়ে বসে, তারপর বিড়বিড় করে নিজেকেই বলে
'নাহ, আজই রিপাকে সব খুলে বলতে হবে। ওর প্রতি ভীষণ অন্যায় করা হচ্ছে।'
মেপে মেপে পাঁচটার সময় রিপা অফিস থেকে ফেরে, সংসারের সবকাজই তো সামলায়। রান্নাবাড়ি করে, তারপর টিপিকাল বাঙালী নারীর মতো স্বামীর অপেক্ষায় বসে থাকে।
মুখে কুটোটিও যেন নেয়না যেন।
আজও হয়ত গিয়ে দেখবে ডাইনিং টেবিলে বসে ঝিমোচ্ছে।
কেমন যেন একটা ভালবাসার মতো ব্যাপার অনুভব করে।
ফুলের দোকানের পাশ দিয়ে যখন ট্যাক্সিটা গেল হঠাৎ রাশেদের মনে হলো একটু থামি, কয়েকটা ফুল নিয়ে যাই আজ রিপার জন্য।
ট্যাক্সিওয়ালাকে 'এইযে' বলে ফেলার পরই আবার বাকীটুকু গলার ভেতর আটকে গেল।
ভাবল, কি লাভ!
কারণ, দুসপ্তাহ আগেই রাশেদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে রিপাকে আর ভালবাসবেনা!
রাত প্রায় পৌনেদশটায় ট্যাক্সি যখন বাড়ির গেটে পৌঁছাল, রাশেদ উপরে তাকিয়ে দেখে রিপা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে নিচের দিকে, ওর দিকে।
রাশেদের চোখে জল;
আচ্ছা রিপার চোখেও কি জল?
নাহ, ওর চোখে জল থাকবে কেন?
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০০৭ সকাল ১০:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




