somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘র’-এর কৌশল, প্রভাব ও গুপ্তচরবৃত্তির প্রকৃতি , পর্ব ০১

১৫ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

'র'-এর গুপ্তচরবৃত্তির প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করার পূর্বে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন ও তৎপরবর্তী পরিচালিত কয়েক ধরনের স্ট্র্যাটেজি ও বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতার বিবরণ দেয়া প্রয়োজন । ১৯৬৮ সালে 'র' গঠিত হয়েছিল মূলত বৈদেশিক গুপ্তচরবৃত্তি পরিচালনার জন্য। এর পূর্বে আইবি (Investigation Bureau) এতদসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করত। তখন স্বভাবতই প্রশাসনিক ক্যাডার ও পুলিশ বাহিনীর লোকজন দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় তাদের গুপ্তচরবৃত্তির প্রকৃতি ছিল অনেকটা 'আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার জটিলতায়' আক্রান্ত ধীর, শ্লথ ও কোন কোন ক্ষেত্রে 'হতাশাপূর্ণ'। কিন্তু 'র' গঠন করার পর ইন্দিরা গান্ধীর মত একজন তুখোড় স্টেটসম্যান আধুনিক ধ্যান ধারণার পরিপূর্ণ সুযোগকে কাজে লাগান; তবে সার্বিকভাবে ভারতীয় রাজনীতিবিদগণ ‘চানক্যের' গুপ্তচরবৃত্তির দর্শনকেই মৌলিক চেতনা হিসেবে বেছে নেন। যার ফলশ্রুতিতে ভারত তৃতীয় বিশ্বের একটি হত দরিদ্র, শত অভ্যন্তরীণ সমস্যাসঙ্কুল দেশ হওয়া স্বত্ত্বেও ‘র' গঠনের মাত্র তিন বছরের মধ্যে 'বাংলাদেশ অপারেশনের' মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরিতে সুচারুরূপে সমর্থ হয়। পক্ষান্তরে প্রাচীন ধ্যান ধারণা পোষণকারী কেবলমাত্র সামরিক প্রাধান্যে পরিচালিত পাকিস্তানী গুপ্তচর সংস্থা-আই এস আই পরিস্থিতিকে 'হযবরল' অবস্থায় নিয়ে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ হতে সম্প্রতিক কাল পর্যন্ত পরিচালিত 'র' কার্যক্রমে মৌলিক কিছু পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশের জনগণের বিপরীতে পরিচালিত কর্মধারায় এখনো কোন পরিবর্তন হয়নি বলে ধরে নেয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সে সময় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত আমাদের সহায়তা করেছে ও অতি দ্রুত স্বাধীনতা লাভে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশ আন্দোলনের প্রথম হতেই আমাদের তৎকালীন জাতীয়তাবাদী নেতাদের সাথে আইবি ও পরবর্তীতে 'র' কর্মকর্তারা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় 'র'-এর সক্রিয় প্রশিক্ষণ পরিচালনা, ভারত ও বাংলাদেশ সরকারকে হানাদার পাকবাহিনীর রণকৌশল সম্পর্কে বিশ্লেষণাত্মক উপদেশ প্রদান, গেরিলা যুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য হাসিলে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সর্বশেষে সম্মুখ যুদ্ধে ব্যাপক ইন্টেলিজেন্স তৎপরতা বিশেষভাবে স্মরণীয়।

তখন বাংলাদেশ সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠিত ইন্টেলিজেন্স সংস্থা না থাকায় 'র' আমাদের সকল প্রয়োজন পূরণ না করলেও বেশিরভাগ প্রয়োজন মেটাতো। স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে মনে হবে-‘অহিংস' ভারত মানবতার অপমানে লজ্জিত (!) হয়ে কি মানবিক আচরণই না প্রদর্শন করলো! তবে ভারতের মনোভাব বা সহায়তার পিছনের ইতিহাস সম্পূর্ণ না টেনেও শুধু ‘গোপন সাত দফা চুক্তি'র কথাটি যদি কোন স্বাধীনচেতা বাংলাদেশী ভেবে দেখেন (যা প্রস্তুত করেছিল 'র' কর্মকর্তাগণ), তবে পৃথিবীতে ভারতের পরিচয় অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়ে উঠবে, যা উপলব্ধি করতে পেরে তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাত দফা চুক্তিতে বাধ্য হয়ে স্বাক্ষর করার পর মূর্ছা গিয়েছিলেন। আসলে 'শতাব্দীর সুযোগ'কে তারা এমনি এমনিই কাজে লাগায়নি। বরং এর পিছনে যে আজন্ম লালিত আর্য-চানক্য নীতির প্রভাব ছিল তা বলাই বাহুল্য। যদি তাই না হবে তবে ভারত কেন পরবর্তীতে ফারাক্কা চালু করে চরম অমানবিক কাজ করলো? কেন আজ ভারত সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ের পানি দয়া (!) করে বাংলাদেশকে দিয়ে চার কোটি মানুষকে প্রত্যক্ষভাবে চরম অমানবিক কায়দায় শুকিয়ে মারছে? কেন সৃষ্টি করেছে শান্তিবাহিনী, বঙ্গসেনা, মোহাজির সংঘের মতো সংগঠনের? অনেকেই হয়তো এ কথাটি জানেন না যে, ১৬ ডিসেম্বরের পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিলটিও প্রস্তুত করেছিল 'র'-এর কর্মকর্তারা। 'নিয়াজী আত্মসমর্পণে রাজী হওয়ার পর 'র'-এর অফিস হতেই আত্মসমর্পণের চুক্তিমালা প্রণয়ন করা হয়’। এবং ‘র ই অবশেষে ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে শেখ মুজিব সরকারকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে’। 'র'-এর কর্মকর্তারা এতবড় কাজ শুধুমাত্র আমাদের স্বাধীনতায় খুশী হয়ে সম্পাদন করেনি। বরং নিজ স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যেই তারা এ ভূমিকা পালন করেছিল ও এখনো করছে। তাই দেখা যায়, বাংলাদেশে 'বন্ধুপ্রতিম দল' ক্ষমতাসীন না হলে ভারত 'বন্ধুত্ব'কে ছুড়ে ফেলে দেয় দূরে, বহুদূরে ।

এদিকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করার সময় এ উপমহাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে ভারতের কয়েকটি বিশেষ লক্ষ্য ছিল বলে ধরে নেয়া যায়।

প্রথমতঃ চির বৈরী পাকিস্তানকে দুর্বল করে দিয়ে সামরিক, অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা এবং ১৯৬২ ও '৬৫ সালের যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনী যে পেশাগত দুর্নামের ভাগীদার হয় তা দূর করার মাধ্যমে হীনমন্যতার বীজ নষ্ট করে দেয়া।

দ্বিতীয়তঃ দ্বি-জাতি তত্ত্ব মিথ্যা প্রমাণিত করার অজুহাত সৃষ্টির আড়ালে বাঙালীদের মনে অখণ্ড ভারত চেতনার অনুপ্রবেশ ঘটানো। সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে ১৯৪৭ সাল ও পূর্ববর্তী ঘটনাবলী অস্বীকার করার ভিত্তি তৈরি করা ।
তৃতীয়তঃ চীনের বিপরীতে ও রাশিয়ার পক্ষে অত্র অঞ্চলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা বজায় রাখা। এ ব্যাপারে মূলত রাশিয়ার কাছ থেকে চুক্তি মোতাবেক নিজ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ও সমরাস্ত্র পাওয়ার প্রশ্নটিই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল ।
চতুর্থতঃ বাংলাদেশে একটি বন্ধুভাবাপন্ন দলকে রাজনৈতিক পর্যায়ে সর্বতো উপায়ে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে টিকিয়ে রাখা। যাতে এ অঞ্চলে ভারতের অনুকূলে ক্ষমতার ভারসাম্য বাজায় থাকে ও পার্শ্ববর্তী ৭টি বিচ্ছিন্নতাবাদ আক্রান্ত রাজ্যের বিদ্রোহ দমানোর জন্য বাংলাদেশকে প্রয়োজনে কাজে লাগানো যায়। এর নিশ্চয়তা বিধানের জন্য 'র'-এর মাধ্যমে সকল পর্যায়ে ভারতীয়করণ প্রক্রিয়া জোরদারকরণ ও বাংলাদেশের নব্য প্রতিষ্ঠিত সরকারের সাথে চুক্তি সম্পাদন করা হয়।
পঞ্চমতঃ ভারতীয় চেতনার অনুকূলে বাংলাদেশে যদি কার্যকরভাবে কিছু সময়ের জন্য
স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তার অজুহাতে খবরদারী করা যায় তবে বাংলাদেশের মতো তিনদিকে ভারত বেষ্টিত একটি দেশের বন্ধুত্ব ভারতীয় জাতীয় নিরাপত্তায় বড় রকমের প্লাস পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে- এই পরিকল্পনানুযায়ী এগিয়ে যাওয়া। ষষ্ঠতঃ 'ভেতো বাঙালীকে' পশ্চিমবঙ্গীয়দের মতো শুধুমাত্র সংস্কৃতি চর্চার আঁতেলেকচুয়াল কায় কারবারে মত্ত রেখে একটি নির্জীব জাতিতে পরিণত করা। তাই বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যায় হতে সশস্ত্র বাহিনী বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে আধিপত্য কায়েম করা। যদি বাংলাদেশীরা এ প্রক্রিয়াতেও 'পথে না আসে' তবে যেন-তেন প্রকারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙে দিয়ে আজন্ম ভারতের উপর নির্ভরশীল করে রাখা।


১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করার পর যখন বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন- সার্বভৌম দেশের উৎপত্তি হলো যার স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে 'সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়' নীতির আলোকে অর্থনৈতিকভাবে একটি শক্তিশালী দেশ গঠন তখন ভারতের প্রবীণ রাজনীতিবিদ শ্রী জয় প্রকাশ নারায়ণ (এখন পরলোকগত) বলেছিলেন, 'ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন করে দিয়ে আরেকটি পাকিস্তান সৃষ্টি করলো।' এছাড়া তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত ভালভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, বাংলাদেশ শেখ মুজিবের ভাষ্যমতে 'দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র'।

এছাড়া আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন ভারতের সেনা প্রধান ফিল্ড মার্শাল মানেকশ'-বলেছিলেন,
'বাংলাদেশে যদি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয় তাহলে ভারতের তাতে অবাক হবার কিছু নেই । আমাদের সৈনিকগণ যেদিন বাংলাদেশ মুক্ত করে সেদিনই আমি এই সত্য উপলব্ধি করি। বাংলাদেশের কখনোই ভারতের প্রতি তেমন ভালবাসা ছিল না। জানতাম ভারতের প্রতি তাদের ভালবাসা ক্ষণস্থায়ী। অনুপ্রেরণার জন্য তারা ভারতের দিকে না তাকিয়ে বরং মক্কা ও পাকিস্তানের দিকেই তাকাবে। আমাদের সত্যাশ্রয়ী হওয়া উচিত'ত

এখন পর্যন্ত যদিও বাংলাদেশ ইসলামী প্রজাতন্ত্র' হিসেবে পরিচিতি পায়নি, কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর মনে সে ভয় প্রথম থেকেই ছিল। তাই তিনি শেখ মুজিবের মতো বড় মাপের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নেতাকেও সযতনে ইসলামী ভাবধারা হতে সরিয়ে রাখার জন্য আওয়ামী লীগে অনুপ্রবিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের মাধ্যমে চাপ দিয়ে এসেছেন । মূলত বাংলাদেশে লুটপাটের প্রথম ক্ষণে যখন মেজর জলিল ও লাখো জনতা অল্প সময়ের মধ্যেই ভারতীয় আচরণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তখনই ভারত সরকার বুঝেছিল যে, এ জাতিকে সরাসরি শোষণ করা যাবে না। এরপর ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে শেখ মুজিব বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে যখন একের পর এক প্রচেষ্টায় যতটুকু সম্ভব ভারতীয় চাপের বলয় হতে বের হয়ে আসার চেষ্টা করেছেন তখন ইন্দিরা গান্ধীকে স্বতন্ত্র চেতনাসমৃদ্ধ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তার পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় পেয়ে বসে। এবং অবন্ধুসুলভ বাংলাদেশ তাঁকে 'দ্বিতীয় চিন্তা' গ্রহণে বাধ্য
করে।

তিনি (ইন্দিরা গান্ধী) অত্যন্ত ভালভাবেই হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন যে, যদি বাংলাদেশ একটি স্বনির্ভর ও স্বতন্ত্র চেতনাসমৃদ্ধ শক্তিশালী দেশে পরিণত হয় তবে তাতে অবশ্যই ভারতের বিভিন্ন স্বাধীনচেতা জাতিসমূহ তাদের স্বাধীনতা আন্দোলন বেগবান করার একটি উৎকৃষ্ট নৈতিক সমর্থন লাভ করবে। কারণ তারা তখন ভাববে যে বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র একটি দেশ যদি তিনদিকে ভারত পরিবেষ্টিত হয়েও সুখে শান্তিতে থাকতে পারে তবে তারাও স্বাধীনতা লাভের পর বৃহৎ ভারতকে পাশে রেখে টিকে থাকতে পারবে। এছাড়াও ইন্দিরা গান্ধী চাননি যে, ভারতের পূর্ব পাশে পাকিস্তানের মতো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটুক। তাই তাঁর Brain Child 'র' কে? যেনতেন প্রকারে একটি দুর্বল বাংলাদেশ ও সেখানে একটি তাঁবেদার শাসক শ্রেণী প্রতিষ্ঠার আদেশ প্রদান করেন এবং পরবর্তীতে গোপন সাতদফা চুক্তির ভয়াবহতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে প্রয়োজনানুযায়ী ব্যবহারের জন্য ‘পঁচিশ বছর মেয়াদী মৈত্রী চুক্তিতে' আবদ্ধ হতে বাধ্য করান। এমনকি যে শেখ মুজিবকে পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালীরা তখন দেবতা জ্ঞান করতো সেই মুজিবকে তখন বাংলাদেশের আবির্ভাবে ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চাঙ্গা হয় কিনা এ ভয়ে পশ্চিমবঙ্গ সফরকালে কলকাতা এয়ারপোর্ট হতে হেলিকপ্টারযোগে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অথচ দিল্লী ভ্রমণের সময় শেখ মুজিব গাড়িতে করেই এয়ারপোর্ট থেকে গন্তব্যে পৌছান। মূলত ভারতীয় স্ট্র্যাটেজিক বিশেষজ্ঞদের মতে
'বাংলাদেশের আবির্ভাব ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের পাশ্ববর্তী ৭টি রাজ্য ( Seven Sister) তখন হতে আজ পর্যন্ত কাশ্মীরের পরপরই সবচেয়ে বেশী গোলযোগপূর্ণ অঞ্চল। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী সরকারের আধিপত্য একটি ঐতিহাসিক সত্য। বাংলাদেশ হতে পাকিস্তানীদের জোড়পূর্বক বহিষ্কার ভারতীয় সরকারের মনে যথেষ্ট ভীতি সঞ্চার করে।

তাই আবির্ভূত বাংলাদেশ যাতে নিজের হাতে গড়া 'ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে' পরিণত না হয় সেজন্য ইন্দিরা গান্ধী যে 'র'-এর মাধ্যমে যথেষ্ট ব্যবস্থা নিবেন তাতে আর আশ্চর্য কি? তাই দেখা যায় গত ২৯/৫/৯৩ তারিখে ভারত সফর শেষে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যখন কলকাতা দমদম বিমানবন্দরে যাত্রা বিরতি করেছিলেন তখন তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে ইচ্ছুক কোনো পশ্চিমবঙ্গীয় সাংবাদিককে তাঁর সাথে দেখা করতে দেয়া হয়নি। রিপোর্ট মতে 'র' কর্মকর্তারা চাননি বেগম জিয়ার ইমেজ পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীদের প্রভাবিত করুক। তাই সাক্ষাৎকার গ্রহণেচ্ছু সাংবাদিকদের জানিয়ে দেয়া হয় যে, বেগম জিয়া সাক্ষাৎকার দিতে রাজী নন; যা ছিল মিথ্যা। এ ঘটনা কি প্রমাণ করে না যে, ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশকে ভয় পায়।
তাদের ভয় হয়-না জানি কখন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরাও 'দিল্লী হটাও' আন্দোলন শুরু করে। আজ যারা ইন্দিরা গান্ধীকে স্মরণ না করার জন্য বাংলাদেশীদের 'বেঈমান' বলেন বা ভারত সরকারকে পরম মিত্র ভাবেন, তাদের এ কথাটি জানা থাকা ভাল যে, ভারত তাদের কখনোই বন্ধুর মর্যাদা দেয় না বরং 'বলির পাঠা' বা 'টয়লেট পেপার' হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।
এখন এখানে দেখা যাচ্ছে যে, ভারত বাংলাদেশকে সব দিক দিয়েই একটি দুর্বল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে একটি দেশ সরাসরি দখল না করেও 'Under tight control'-এ রাখা সম্ভব। অবশ্য গণতন্ত্রের মহান (!) আদর্শের কথা বলে 'সিকিম' দেশটিকে যে ভারত কব্জা করেনি তা নয়। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাপারে তাদের পলিসি 'সরাসরি সংঘাতমূলক' পর্যায়ের না হয়ে 'অন্তঃমুখী পরোক্ষ সংঘাতসূচক' পর্যায়ের বলে দাবি করা যেতে পারে।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আমরা রাজনীতি বহির্ভূত নিছক জ্ঞানচর্চা বা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই জেনে আসছি। অন্তত আমাদের দেশের বিদগ্ধ বুদ্ধিজীবীগণ পশ্চিমবঙ্গীয় কোনো বই, পত্র-পত্রিকা আমদানি নিষিদ্ধ করলে 'জ্ঞানের অঙ্গনে প্রতিবন্ধকতা কাম্য নয়' বলে তৎক্ষণাৎ বিবৃতি প্রদান করেন।

কিন্তু এটাও সবাই জানেন যে, পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীদের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও আমাদের বড় বড় সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের কোনো বই-এমনকি কোনো সাহিত্য পত্রিকাও উল্লেখযোগ্য হারে ওখানে যায় না বা ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার নেয়ার অনুমতি দেয় না। এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওখানকার কেউ উদ্যোগ নিলেও সে উদ্যোগ প্রতিহত করা হয়। কিন্তু কেন
?

আমরা স্বাভাবিক দৃষ্টিতে এর বাণিজ্যিক, নিদেন পক্ষে প্রতিযোগিতার দিকটি উল্লেখ করে থাকি। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত রহস্য হচ্ছে যে, ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার ভালভাবেই জানে, বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রসর সাহিত্য-সংস্কৃতি চেতনা যদি কোনো ভাবে একবার পশ্চিমবঙ্গে আসন গেড়ে বসে তখন অখণ্ড বাঙালীত্বের সুপ্ত অহংকারটি ধীরে ধীরে পশ্চিমবাংলার জনগণের মাঝে ছড়িয়ে যেতে পারে। ক্রম ক্ষয়শীল কলকাতার 'সাহিত্য' ঢাকার উজ্জ্বল চিন্তাশৈলীর দ্বারা পরাজিত হলে স্বতন্ত্র বাংলাদেশ সৃষ্টির স্বতন্ত্র দেদীপ্যমান শিখাটি যে পশ্চিমবঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তি স্থাপন করবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? এখানেই ভারতের আসল ভয় এবং সে জন্যই 'র'-এর সাংস্কৃতিক বিশেষজ্ঞরা 'রাষ্ট্রিক পরাধীনতা দৃষ্টিগ্রাহ্য কিন্তু কৃষ্টিক পরাধীনতা ধরাছোঁয়ার ও দৃষ্টির উর্ধ্বে ' ধারণাটিকে নিজ দেশে প্রতিহত করে বাংলাদেশে রফতানী করেছে। এদিকে রণকৌশলগত দিক থেকে হাজারো সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও ভারত সরাসরি কখনোই বাংলাদেশ দখল বা আক্রমণ করার পরিকল্পনা প্রণয়নে ইচ্ছুক নয়। এখানে তাদের মূল আগ্রহ ও বৈরীতার গতিবিধি অনেকটা ধোঁয়াটে যা আমাদের প্রায়শই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলে দেয়।

যেমন '৯১-এর নির্বাচনের পর ২রা মার্চ ১৯৯১ তারিখে কলকাতার 'আনন্দবাজার পত্রিকা'য় উল্লেখ করা হয়, 'নিষ্ঠুর বাস্তবকে মানিতে হইলে বাংলাদেশের জনসাধারণের বরং উচিত হইবে ভারতের সহিত মিলিত হইবার দাবি উত্থাপন করা।' তবে বাংলাদেশ যে একটি 'বোমা' বিশেষ তাও উঠে এসেছে একই কলামে, বলা হয়েছে 'সহস্র সমস্যার জটিলতাসহ বাংলাদেশের ভারতভুক্তি দিল্লীও স্বীকার করিতে ভয় পাইবে। যেসব সমস্যা বাংলাদেশকে নিয়ত পীড়ন করিয়া চলিয়াছে, বাড়িতে বাড়িতে তাহার উচ্চতা নতুন এক হিমালয় তুল্য হইয়া উঠিয়াছে । দুর্বল অর্থনীতির এত সাধ্য নাই যে, সেই প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিবে । ভারতের আন্তরিক সহায়তা ছাড়া বাংলাদেশ চলিতে পারিত না, ভবিষ্যতেও চলিতে পারিবে না।' এখানে অনেকেই ‘আনন্দবাজারের’ উক্ত মন্তব্যকে নিছক বেসরকারি পর্যায়ের একটি মন্তব্য বলে উল্লেখ করতে পারেন। কিন্তু তাদের এধরনের মনোভাব সবসময়ই একইরকম ছিল, এখনো আছে। তাই '৯১-এর নির্বাচনের সময় আনন্দবাজার গোষ্ঠীর অপর একটি সাপ্তাহিক 'সানন্দা'র সম্পাদিকা অপর্ণা সেন নির্বাচন তদারক করতে বাংলাদেশে এসে বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ না করে তড়িঘড়ি করে ছুটে গেছেন 'ভাবী প্রধানমন্ত্রী' শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাতের জন্য। এক্ষেত্রে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, তিনিই কি নির্বাচনের মাত্র দু'দিন পর অমন একটি রচনা পাঠককূলকে উপহার দিয়েছিলেন?
এদিকে বাংলাদেশকে যে চিরকালই 'অর্থনীতির সমস্যা সঙ্কুল নদী' পাড়ি দিতে হবে একথাটি খালেদা জিয়া সরকারের আমলে প্রযোজ্য ছিল না। তখন বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উজ্জ্বল প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছিল। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করলেই এধারণার স্বপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যাবে।



(ক) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন উপাচার্য ডঃ এমাজউদ্দিন আহমদ-উল্লেখ করেছিলেন,, ‘দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা গর্ব করার মতন। এখন প্রয়োজন বিদেশী বিনিয়োগের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুষ্ঠু পরিবেশ; ৫-৭ বছর দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে ২০০০ সাল নাগাদ আমরা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারবো

(খ) সে সময় বিশ্ব ব্যাংক বেগম জিয়ার অর্থনৈতিক কর্মসূচির প্রশংসা করে। এব্যাপারে ঢাকাস্থ বিশ্ব ব্যাংক প্রধান মিঃ ক্রিস্টোফার উইলোবি ৫/৪/৯৩ তারিখে ঢাকায় বলেন, 'বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ম্যাক্রো ও মাইক্রো উভয় পর্যায়েই অগ্রগতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিও ভালভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। জাতীয় উৎপাদনের পরিমাণ তুলনামূলক বেড়েছে। গ্রামাঞ্চলে বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় (শতকরা ১৮ ভাগ) গ্রামাঞ্চলেও উন্নতির লক্ষণ সূচিত হচ্ছে।


(গ) ২১/১/৯৪ তারিখে লন্ডনে অনুষ্ঠিত ব্রিটিশ-বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্সের উদ্যোগে আয়োজিত এক সভায় 'ব্যাংক অব ইংল্যান্ড'-এর গভর্ণর এডি জর্জ তৎকালীন অর্থমন্ত্রী জনাব সাইফুর রহমানকে বলেন, 'আপনারা যেভাবে ৪.৭ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতিকে ১.৩ শতাংশে নামিয়ে এনেছেন তা আমরা বৃটেনে পারিনি’১১।

(ঘ) ২৫/৫/৯৪ তারিখের ‘ওয়াশিংটন টাইমস' উল্লেখ করে যে, 'বেগম খালেদা জিয়ার সংস্কারপন্থী সরকারের অধীনে বাংলাদেশ একটি দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যুগে প্রবেশ করেছে এবং নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগমুখী বাজার অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে’ ।

(ঙ) 'বার্ষিক উন্নয়ন খাতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ হতে ৩৫.৮% ভাগ মঞ্জুর করা এবং বিভিন্ন খাতে ব্যাপক কর হ্রাস প্রস্তাবের কারণে নতুন বাজেট সকল মহলের প্রশংসা অর্জন করেছে। এতদিন যাবত দেখে এসেছি যে 'বাজেট' মানেই আতঙ্ক । জিনিসপত্রের দাম বাড়া। কিন্তু গত বছরে বিএনপি সরকারের কোনো শত্রুও নিশ্চয় বলতে পারবে না যে, জিনিসপত্রের (নিত্যপ্রয়োজনীয়) দাম সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে

(চ) স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এক বিদেশী সাংবাদিক মন্তব্য করেছিলেন, প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদবিহীন ও নিত্য প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ তার বিশৃংখল প্রশাসনযন্ত্র নিয়ে এক অন্তঃহীন অন্ধকার গহ্বরের দিকে ধাবিত হবে। কিন্তু বড় পুকুরিয়ার কয়লা, মধ্যপাড়ার কঠিন শিলা ও 'এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্থিতিশীল প্রশাসন'১৪ নিয়ে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ডঃ হুমায়ুন আহমদের কন্ঠে সেসময় এ দেশের ভবিষ্যত সম্পর্কে শোনা যায় 'আমি এ দেশের অত্যন্ত উজ্জ্বল ভবিষ্যত টের পাচ্ছি। একটি জাতির অগ্রগতির জন্যে প্রতিটি মানুষের মধ্যে জাতীয় অহংকারবোধ কাজ করতে হবে। এটি আছে আমাদের মধ্যে। বিজয় দিবসে এখন লাখ লাখ লোকের ঢল নামে। বাঙালী মানেই নিষ্কর্মা। এদের দিয়ে কিছু হবে না- এ জাতীয় কমন উক্তি এখন অনেক কমে এসেছে। এক সময় ধান-চালের দাম কমানোর জন্য আন্দোলন হত এখন ধানচালের দাম মাত্রাতিরিক্ত হারে কমে আসায় দাম বাড়ানোর জন্যে তাদের প্রতিবাদ করতে হয়। শীতকালে রাস্তায় বেরুলে আগে প্রচুর নেংটা ছেলেমেয়ে চোখে পড়ত। লক্ষণীয় হারে এখন আর তা চোখে পড়ে না। এখন বাংলাদেশের তৈরী গার্মেন্টস সামগ্রী বিদেশে যায়। এখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের বিদেশে যাবার ব্যবস্থা হয়েছে এবং তারা দেশকে কিভাবে সার্ভ করছে তা বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সির রিজার্ভ দেখেই টের পাওয়া যায়। যে কোনো তৃতীয় বিশ্বের মাথা খারাপ হয়ে যাবে এই রিজার্ভ দেখে। আমার বিশ্বাস, জাপান আজকে যে অবস্থানে আছে একদিন বাংলাদেশও সেই অবস্থানে গিয়ে দাঁড়াবে। জাপানের চাষের জমি আমাদের চেয়ে কম। তাদের খনিজ সম্পদ নেই, আমাদের আছে। তারা ভাত-মাছ খায়, আমরাও ভাত-মাছ খাই। তারাও খাটো, আমরাও খাটো। তারা পরিশ্রমী, আমরাও পরিশ্রমী। তারা বুদ্ধিমান, বাঙালিও বুদ্ধিমান। সুতরাং আমরা তাদের অবস্থানে কেন যাব না? অবশ্যই যাব’

কিন্তু বাংলাদেশ যে জাপানের অবস্থানে 'অবশ্যই' যাবে এ পরিস্থিতি কি 'র' অনুসৃত পলিসি-র সাথে খাপ খায়? তাও ছিটে-ফোটা উন্নতি সহ্য করা যায় যদি ভারতকে স্ট্রাটেজিক সুবিধা প্রদানকারী একটি অনুগত দল ক্ষমতায় থাকে। একটি জাতীয়তাবাদী সরকারের হাত দিয়ে উন্নতি হবে, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা হবে আর উন্নত বাংলাদেশের বিপরীতে ভারতীয় ‘সাত কন্যা' (সাতটি রাষ্ট্র) ও অন্যান্য প্রদেশে যে আত্ম অহংবোধ জেগে উঠবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? এছাড়া 'ভারতের পরাশক্তি হওয়ার ইচ্ছে আছে' বলে যখন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে তখন পশ্চিমে শক্তিশালী পাকিস্তান ও পূর্বে আরেকটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র (যেখানে উভয়েই চীনের পরম মিত্র) নিয়ে এ অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্য ভারতের অনুকূলে থাকে কি করে?


ভারতের প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী বল্লভ ভাই প্যাটেল বলেছিলেন, 'আজ হোক কাল হোক আমরা আবার একাত্ম হবো এবং বৃহৎ ভারতের প্রতি আনুগত্য দেখাবো।' শ্ৰী প্যাটেলের উক্তি অনুযায়ী সরাসরি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা আছে বলে মনে হতে পারে বা আমাদের দুর্বল হতে হতে সিকিমের মতো আরেক 'লেন্দুপ দোর্জি'কে ক্ষমতায় এনে ভারতের সাথে পার্লামেন্টে আইন পাস করে মিশে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকতে পারে । কিন্তু শ্রী প্যাটেলের মত একজন চরম উগ্র ব্যক্তি যখন উপরোক্ত মন্তব্য করেছিলেন তখন বিশ্ব পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু বর্তমানে ভারত ভালভাবেই জানে যে, সরাসরি কোনো দেশ দখল করা সম্ভব নয় এবং বাংলাদেশও সিকিমের মতো খুঁটো জগন্নাথ' নয়। তাই তাদের একমাত্র বিকল্প হচ্ছে আধুনিক গুপ্তচরবৃত্তি পরিচালনার মাধ্যমে নেপাল বা সোভিয়েত রাশিয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা১৬।
এদিকে ভারত আজ পর্যন্ত যে মনোভাব দেখিয়ে আসছে, তা কি বন্ধুসুলভ ? বিভিন্ন পর্যায়ে গৃহীত পদক্ষেপ ও বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য ভারতীয় নীতি নির্ধারকদের আর্য অহংকারে অহংকারীর পরিচয়ে পরিচিত করে তোলে। হিটলার আর্যত্বের বড়াই করতেন সকলকে বলে-কয়ে, কিন্তু ভারতীয় নেতারা সেই কাজটিই করেন বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের সুচতুর কূটনীতির ছদ্মাবরণে । এমনকি তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করছিলেন তখন 'বোস্টন হোটেলে কোনো কৃষ্ণাঙ্গ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নরসীমার সেবায় রাখা হয়নি’। বাংলাদেশে সার্ক সম্মেলনে যখন নরসীমা আসেন তখনও নিজ বাবুর্চি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। যদিও এটি তার ব্যক্তিগত ব্যাপার কিন্তু আর্য-ব্রাহ্মণ প্রধানমন্ত্রী যে জাতপাতের ছুতোনাতা ছাড়তে পারেননি, এসব ঘটনায় তাই স্পষ্ট হয়ে যায়। এও এক ধরনের অহংবোধ, সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তি।

এবার দেখা যাক, ভারতীয় বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশে ভারতের আচরণ নিয়ে কিরূপ মন্তব্য করেছিলেন। 'আনন্দ বাজার' পত্রিকার ১১/১১/৮৮ সংখ্যায় সমর বিশারদ রবি রিখি কোনো রাখ-ঢাক না করেই মন্তব্য করেন,'শেখ মুজিবর রহমান যখন নিহত হন, তখন ইন্দিরা গান্ধী প্রথমে ঠিক করেছিলেন হস্তক্ষেপ করবেন। এজন্য সেনাবাহিনীর তিনটি ডিভিশনকে সতর্কও করে দেয়া হল, কিন্তু শেষে সরকার গড়িমসি করলেন এবং সুযোগ পেরিয়ে গেল। ফলে, হল কি? কিছুই না, বাংলাদেশকে আমাদের শিবিরে রাখার সুযোগ আমরা হাতছাড়া করলাম। সোভিয়েত ইউনিয়ন যে যুক্তিতে পোল্যান্ড ও আফগানিস্তানে এবং আমেরিকা নিকারাগুয়া ও গ্রানাডায় সেনা নামিয়েছিল, সেই যুক্তিতে ভারতও বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করলে তা অসঙ্গত হত না।'

এখন এই যদি ভারতীয়দের মনোভাব হয় তখন সবদিকে যে আক্রমণ (পরোক্ষ, প্রত্যক্ষ) চলবে তাতে আর দ্বিধা কি? এবং এসব বৈরিতার মধ্যে গুপ্তচর সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতা হবে অতি অবশ্যই প্রধানতম উপায় ।যারা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নিছক বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছু খুঁজে পান না ও এ সূত্র ধরে ভারত কেন বাংলাদেশে গুপ্তচরবৃত্তি বা খবরদারি করবে বলেন, তাদের জন্য গুপ্তচরবৃত্তির কিছু সাধারণ সূত্র উল্লেখ করা যায়। গুপ্তচরবৃত্তি পরিচালনা করার কোন নির্দিষ্ট ক্ষেত্র নেই। বন্ধুভাবাপন্ন দেশেও গুপ্তচরবৃত্তি পরিচালনা করা হয়। মূলত এর উদ্দেশ্য হলো সবদিকে চোখ-কান খোলা রেখে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে আসা। আজ একটি দেশে বন্ধুভাবাপন্ন সরকার ক্ষমতায় আছে, কিন্তু কাল যে কোনো কারণে তা নাও থাকতে পারে- যা গুপ্তচরবৃত্তি পরিচালনাকারী দেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। তাই ভারত-রাশিয়া মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার পরও রাশিয়া ও ভারত উভয়ে উভয় দেশে গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির যেমন কোন প্রকৃত সীমা পরিসীমা নেই তেমনি নেই কোনো বিশেষ 'নৈতিকতার' মানদন্ড। সকলের মনেই একটি মৌলিক প্রশ্ন জাগতে পারে, 'গুপ্তচর কেন?' এক্ষেত্রে সহজ স্বাভাবিক উত্তর হচ্ছে-'টিকে থাকার জন্য।'
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Laptop Stand কেন দরকার?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৪ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৯

Laptop Stand কেন দরকার? | Digital Fast IT থেকে স্মার্ট সমাধান



দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ ব্যবহার করলে অনেকেরই একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয়—ল্যাপটপের নিচের অংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। অতিরিক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুবাই কি দুর্নীতিবাজদের গন্তব্য হয়ে উঠেছে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩০

কয়েক বছর আগে, কানাডার বেগম পাড়ার কথা ব্যারিস্টার সুমন ভাই বেশ ফলাও করে প্রকাশ করেছিলেন। বাংলাদেশী দূর্নীতিবাজদের আখড়া হয়ে উঠেছিলো কানাডার ঐ অঞ্চল। আজ পুসিলশের সাবেক প্রধান বেনজির দুবাইয়ে ধরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্ব দ্বীন হাসপাতাল ও বাংলাদেশ ফেসবুক বিচারক

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৫৪



সম্প্রতি আদ্ব দ্বীন হাসপাতালের ঘটনা কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ফেসবুক বিচারকগণ রায় দিয়েছেন “আদ্ব দ্বীন হাসপাতাল লাইসেন্স বাতিল করা যাবে না”।




...বাকিটুকু পড়ুন

ইমিগ্রেশনেই ধরা খেল বিএনপির কূটনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪০


ধরুন আপনার পাশের বাড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো না। দীর্ঘদিনের পুরনো ঝামেলা, কথা বলাবলি বন্ধ, একে অপরকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। এই অবস্থায় পাশের বাড়িতে একটা বৈঠক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আহলে হাদিস সুনিশ্চিত ভাবেই আহলে মোনাফিক ও জাহান্নামী

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৫ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৬:১৫



সূরাঃ ৯ তাওবা, ১০৭ নং আয়াতের অনুবাদ-
১০৭। আর যারা মসজিদ নির্মাণ করেছে ক্ষতি সাধন, কুফুরী ও মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ইতিপূর্বে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×