বাংলাদেশে ‘র' কার্যক্রম তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান আমল হতে ক্রিয়াশীল হলেও তখন তা ছিল আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে। কিন্তু '৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের পর যখন ইন্দিরা গান্ধীর প্রত্যক্ষ নির্দেশে 'র' বাংলাদেশে তার কর্মকাণ্ড শুরু করে তখন তা ভিন্নরূপ পরিগ্রহ করে। কিন্তু 'আদেশ প্রদানের' পরপরই এক তুড়ি মেরে আজন্ম সংগ্রামী একটি জাতিকে হীনবল করা যায় না বা গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে বর্তমান সভ্য বিশ্বে হিটলারের ‘গেস্টাপো' কায়দায় কোনো দেশকে সরাসরি দখলে রেখে লণ্ডভন্ডও করা সম্ভব নয়। গুপ্তচরবৃত্তির বিস্তৃতি বা ধরণ-ধারণ সম্পর্কে আমরা সাধারণত ভাবি যে, ‘জেমস্ বন্ড' বা 'মাসুদ রানা'র মতো কিছু স্পাই বা অপারেটিভ কোন দুর্ধর্ষ কাজে নিয়োজিত রয়েছে যারা শত্রু দেশের তথ্য, খবরা-খবর পাচার করছে কিংবা সামরিক ব্যাপারে নজরদারি করছে। কোনো কোনো সময় অবশ্য কিছু ধ্বংসাত্মক কাজ-কর্মে বিদেশী গুপ্তচরদের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে আমরা পত্র-পত্রিকায় খবর পাই। কিন্তু আধুনিক গুপ্তচরবৃত্তি অত্যন্ত ব্যাপক পরিসরে পরিচালিত হয়। এর প্রকৃত ধরণ ও ঘটনা সংঘটনের সময় বোঝা বা জানা না গেলেও পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তা সীমিত পরিসরে হলেও আলোর মুখ দেখে। আজ থেকে পঁচিশ বছর পূর্বে সিকিম নিয়ে 'র'-এর গৃহীত গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ তখন নেহাতই সিকিমের গণতান্ত্রিক আন্দোলন মনে হলেও এবং ভারত সরকার তার সম্পৃক্ততার কথা তখন অস্বীকার করলেও এখন নিজেরাই তা প্রকাশ করছে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ শত্রু দেশের মানব-মানবীর একান্ত ব্যক্তিগত গোপনীয় বিষয়টিকেও গুপ্তচরবৃত্তির আওতায় নিয়ন্ত্রণের দাবি করে থাকেন। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, পারিবারিক এমনকি মানবাধিকারের সীমানা পর্যন্ত গুপ্তচরবৃত্তি পরিচালিত হয়ে থাকে। শুধুমাত্র স্পাই বা অপারেটিভের মাধ্যমে কোনো দেশে কোনো গুপ্তচর সংস্থার পক্ষে এককভাবে গুপ্তচরবৃত্তি পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন হয় টার্গেট দেশে একদল এজেন্ট, তাঁবেদার বুদ্ধিজীবী, আমলা, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, এমনকি কলগার্ল। গণতান্ত্রিক দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অর্থাৎ এক কথায় মুক্ত পরিবেশে গুপ্তচরবৃত্তি ও তার থাবা বিস্তার করা অত্যন্ত সহজ কিন্তু পরিকল্পতি উপায়ে সেখানে অনেক কিছু অনুধাবন করা গেলেও সরাসরি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। আসলে গুপ্তচরবৃত্তিতে আজ যা মিথ্যা, কাল তা সত্য' কিন্তু ততদিনে 'Operation is over'। এখন পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনার মাধ্যমে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করা যেতে পারে।
(ক) বাংলাদেশে গুপ্তচরবৃত্তি চালানো সহজ কেন ?
এ উপমহাদেশে মূলত পাকিস্তান ভারতের প্রধানতম বৈরী দেশ। তাই স্বভাবতঃই
পাকিস্তানে ব্যাপকমাত্রায় গুপ্তচরবৃত্তি চালানোই ভারতের জন্য স্বাভাবিক । কিন্তু পাকিস্তানের জনগণ অন্তত ভারতের 'সদিচ্ছা' সম্পর্কে একমত। তাদের দেশ সামরিক, বেসামরিক যে ধরনের সরকার দ্বারাই পরিচালিত হোক না কেন, পাকিস্তান জানে তার মূল শত্রু কে এবং কেন, কিভাবে 'র' তাদের দেশে কোন কোন পর্যায়ে আঘাত হানতে পারে? পাকিস্তানের গুপ্তচর প্রতিষ্ঠান, বেসামরিক আমলা, সামরিক বাহিনী, প্রচার যন্ত্র- সকল ক্ষেত্রে একটি সুসমন্বিত, দীর্ঘদিনের চর্চায় অভিজ্ঞতাসঞ্জাত পেশাদারী মনোভাব গড়ে উঠেছে। দ্বিতীয়তঃ পাকিস্তানও কৌশলগত গুপ্তচরবৃত্তি পরিচালনায় সক্ষম। তৃতীয়তঃ তাদের জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তি ও তার দুর্বলতা চিহ্নিত। ফলে ভারতীয় বা যেকোন ইন্টেলিজেন্স তৎপরতা সাফল্যের সাথে মোকাবিলার ক্ষমতা তাদের আছে। কিন্তু বিপরীতে বাংলাদেশে জাতীয় নিরাপত্তার যে মৌলিক ভিত্তি জাতীয় ঐকমত্য তা রাজনৈতিক আদর্শের দ্বান্দ্বিকতায় ধোঁয়াটে, সর্বোপরি অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে অনগ্রসরতার জন্য আমাদের দেশে HIS ৺ এর তৎপরতা নির্বিঘ্নে প্রবহমান থাকা স্বাভাবিক। দ্বিতীয়তঃ আমাদের কোনো সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা নীতি নেই এবং কার পক্ষে কোন্ পর্যায়ে, কিভাবে, কখন আঘাত আসতে পারে সে ব্যাপারে আমরা এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাপক নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারিনি। তৃতীয়তঃ পাকিস্তানের গুপ্তচর প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত সুসংগঠিত ও আক্রমণাত্মক। এছাড়া 'র'-এর লক্ষ্য পাকিস্তানে যেখানে মূলত সামরিক বিষয়াদিতে সীমাবদ্ধ, সেখানে আমাদের দেশে সামরিক ক্ষেত্রটি গৌণ। বরং অনায়াসে যখন সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক পর্যায়ে কিছু প্রভাব বিস্তার করলে বা হুজুগে বাংলাদেশীদের চাবি দিয়ে দম দেয়া পুতুলের মত ছেড়ে দিলেই কার্যসিদ্ধি হয়, সেখানে ভারত সঙ্গতকারণেই সামরিক বিষয়াদির চেয়ে অন্যান্য খাতেই নজর দিয়েছে বেশী। কারণ সামরিক পর্যায়ের আগ্রাসী ভীতি প্রদর্শন বা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যাওয়া ভারতের সমর শক্তির জন্য 'Split of the military power' হিসেবে পরিগণিত হবে। চতুর্থতঃ আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বাঙালি, যাদের ভাষাগত, নৃতত্ত্বগত, সংস্কৃতিগত পরিমণ্ডলে ভারতের পশ্চিম বাংলার সাথে প্রচুর সাযুজ্য রয়েছে। আমরা এখনো বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে পশ্চিম বাংলার সাহিত্যিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবীদের ওপর নির্ভর করে থাকি। প্রচার মাধ্যমে আমাদের কারিগরী পশ্চাৎপদতা যা মূলত অর্থনৈতিক কারণে দুরতিক্রম্য, সেখানে বিশাল ভারতীয় প্রচার সাম্রাজ্য আমাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে এটাই স্বাভাবিক। এছাড়া সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আধুনিকতার মাদকতা আমাদের তরুণ- যুবকদের কাছে কাম্য হলেও আমরা সুস্থ সাংস্কৃতিক অবয়ব দান করতে পারিনি । ফলে ওই সুযোগটি গ্রহণ করেছে পশ্চিমবঙ্গীয় আদলের সংস্কৃতি চর্চা ও বোম্বের উলঙ্গ দেহ সর্বস্ব স্যাটেলাইট কালচার। পঞ্চমতঃ পাকিস্তানের মতো দেশে জনগণের মাঝে প্রচার যন্ত্রের কল্যাণে বেসিক কিছু ‘নিরাপত্তা' ও 'কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স' চেতনা ক্রিয়াশীল যা আমাদের এখানে নেই। ষষ্ঠতঃ গুপ্তচরবৃত্তির সকল শাখা-প্রশাখাকে সর্বদা পল্লবিত
রাখার জন্যে যে অনুগত শ্রেণীর প্রয়োজন হয় তা বাংলাদেশে একটু বেশি পরিমাণেই সহজলভ্য। কারণ উপমহাদেশ বিভক্তির প্রায় সাথে সাথেই তদানীন্তন পূর্বপাকিস্তানীরা পশ্চিম পাকিস্তানীদের শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে মনে মনে আলাদা জাতিসত্তার ভিত্তি রচনা শুরু করে। এর মাঝে স্বয়ং 'কায়েদে আজমের' একটি উক্তিকে কেন্দ্র করে যে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়, তখন হতে জনগণ পাকিস্তান বিরোধী হয়ে ওঠে। এভাবে ধীর ধীরে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' ও সর্বশেষে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিস্তৃত পরিসরে সকল পর্যায়ের নেতা, মুক্তিযোদ্ধা, সামরিক বাহিনীর সদস্য, আমলাদের মধ্যে একটি সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে উঠেছিল ভারতের পক্ষে। সবচেয়ে যে ব্যাপারটি গ্রাউন্ড ওয়ার্ক-এর জন্য সুবিধাজনক ছিল, তা হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় সাহায্য-সহায়তার মাধ্যমে ভারতের ব্যাপক ভূমিকা পালন। যার সূত্র ধরে পরবর্তীতে স্বাধীনতার পর পর ভারতীয় আদর্শের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং পর্যায়ক্রমে এর লালন-পালন ও বয়োঃসন্ধিকালে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের অবিসম্বাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে গড়া সংগঠন আ'লীগ স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল কৃতিত্বের দাবিদার, দলীয় নীতি-আদর্শ ও রাজনীতি চর্চায় মধ্যপন্থী এবং সংগ্রামী হিসেবে সামগ্রিকভাবে অবশ্যই ভারতীয় তাঁবেদারির বোঝা বহন করে না। শেখ মুজিবের মতো একজন বড় মাপের নেতা ব্যক্তিগতভাবে কখনোই সরাসরি বা পরোক্ষে ভারতের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করেছেন এমন কথা বলা সত্যের অপলাপ মাত্র। তাঁর শাসনামলে পর্যন্ত যখন সকল পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও তাঁর পরিবারের অনেক সদস্যকে দুর্নীতি, তাঁবেদারির দোষে দুষ্ট হতে দেখা গেছে তখনও শেখ মুজিব ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতির বাইরে ছিলেন। কিন্তু একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, তাঁর শাসনামলেই বাংলাদেশ সর্বক্ষেত্রে, সবচেয়ে বেশিমাত্রায় চক্রান্তের শিকার হয়েছে এবং তার দলের এক ব্যাপক 'অতি বিপ্লবী' অংশ ভারতের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে। এখানে সার্বিকভাবে সংগঠন হিসেবে বা আওয়ামী লীগ সমর্থনকারী সাধারণ জনগণ হয়তো সহজ, সরলভাবেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির ক্রমধারায় আওয়ামী লীগের সকল কর্মকাণ্ডকে নিষ্কলুষ মনে করে। কিন্তু বিশেষ কিছু কারণে ও ঘটনা পরম্পরায় ভারতের নিয়ন্ত্রণে ‘পুতুলের নাচের ইতিকথা'র কথা মনে পড়ে যায় ।
একথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বাধীনতা আন্দোলন ও যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগের একটি অংশের সাথেই 'র'- এর ব্যক্তিগত পর্যায়ের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। এ সংক্রান্ত কিছু দালিলিক প্রমাণাদি ভারতীয় সাংবাদিক 'আশোকা রায়না' রচিত ইনসাইড 'র' বইটিতে পাওয়া যায়। উক্ত বইয়ের 'অপারেশন বাংলাদেশ' অধ্যায়ের 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' শিরোনামের অংশে বলা হয়েছে-
"বাংলাদেশ অপারেশনে যুক্ত হবার জন্য ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর একটি পরিস্কার সারসংক্ষেপ প্রকাশ করতে হলে একজনকে অবশ্যই ১৯৬৮ সালে 'র'- এর জন্ম সালের পরপর ঘটে যাওয়া
গোয়েন্দা কার্যাদির পর্যালোচনা করতে হবে। কিন্তু ততদিনে ভারতীয় এজেন্টরা পূর্ব পাকিস্তানে 'মুজিবপন্থী' একটি অংশের সাথে যোগাযোগ সাধন করেছে। আগরতলায় ১৯৬২-৬৩ সালে ভারতীয় এজেন্ট ও ‘মুজিব পন্থীদের' মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পরবর্তী গৃহীত কার্যক্রম সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।” এরপর 'র'- এর কার্যক্রম বৃদ্ধি উপাধ্যায়ে উল্লেখ করা হয় যে,“পূর্ব পাকিস্তানে একটি গোপন সংস্থা গড়ে তোলার কাজ তরান্বিত করার মাধ্যমে 'শত গুপ্তচরের' বছর শুরু হয়। ... কর্নেল মেননের অবিরাম ভ্রমণ ও যোগাযোগের জন্য সীমান্তব্যাপী 'র'-এর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র খোলা হয় এবং কর্নেল মেননের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের ভিতরের প্রতিরোধ আন্দোলনকারীদের নিবিড় যোগাযোগ ঐ সমস্ত তরুণ, অবিশ্রান্ত ও উৎসর্গীকৃত যোদ্ধাদের মনোবল দারুণভাবে বৃদ্ধি করে। এ সমস্ত ভ্রমণ 'স্থানীয় কেন্দ্র প্রধান নির্বাচনে বিশেষ কাজে লাগে । এ সমস্ত 'কেন্দ্র প্রধানদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কর্নেল এম এ জি ওসমানীর নেতৃত্বাধীন মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর শফিউল্লাহ ও আব্দুল কাদের সিদ্দিকী, যিনি 'বাঘা সিদ্দিকী' ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন এবং তিনি পরবর্তীতে 'মুক্তিবাহিনী' ও 'র' এজেন্টদের মধ্যে যোগাযোগকারী রূপে আবির্ভূত হন।
মুজিব বন্দী-তাজউদ্দীন কলিকাতায় আশ্রয় প্রার্থী' অংশে বলা হচ্ছে-
“তাজউদ্দীন ও আরো কয়েকজন নেতৃস্থানীয় নেতা 'র' এজেন্টের সাথে সারারাত ভ্রমণ করে মুজিবনগরে এসে পৌঁছেন .... তাজউদ্দীনের সাথে অন্য যারা ছিলেন তারা হলেন জনাব নজরুল ইসলাম, মোশতাক আহমদ, সামাদ আজাদ এবং চারজন ছাত্রনেতা ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক ও সিরাজুল আলম খান।”
পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে 'উচ্চ পর্যায়ের সমন্বয় সাধনের' জন্য 'র', আইবি ও তিন বাহিনীর মিলিত ডিরেক্টরেট অব ইন্টেলিজেন্স-এর প্রতিনিধি সমন্বয়ে 'সংযুক্ত গোয়েন্দা কমিটি' গঠিত হয়। বেসামরিক পর্যায়ে যুদ্ধ প্রস্তুতি ও তার প্রয়োগে নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটি সেক্রেটারিয়েট কমিটি গঠিত হয়। প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, অর্থ ও পররাষ্ট্র সচিব সমন্বয়ে এ সচিব পর্যায়ের কমিটি কাজ আরম্ভ করে এবং 'র' প্রধান কাও সদস্য সচিব হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হন। এছাড়া 'রাজনৈতিক প্রতিনিধি জনাব ডিপি ধর যিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কমিটির সভাপতি ছিলেন, তাঁকে যুদ্ধ সম্বন্ধীয় পরিষদে অন্তর্ভূক্ত করা হয়
ডিপি ধর ও আরএন কাও পরবর্তী পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে প্রভাবান্বিত করে তাদের পূর্ব পরিচিত আওয়ামী লীগ যুব শাখার সংগঠন ও নেতৃত্ব সম্পর্কে খুঁটিনাটি খোঁজ খবর নিয়ে মুজিব বাহিনী' গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। মুজিব বাহিনী গঠনের উদ্দেশ্য ছিল কাও ও আরো ব্যাপক অর্থে 'র'-এর আয়ত্তে একটি সম্পূর্ণ পৃথক Regimented বাহিনী গড়ে তোলা, যারা যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে 'র'-এর পরিকল্পনানুযায়ী কাজ করতে পারবে। মেজর জেনারেল উবানকে মুজিব বাহিনী গঠন ও প্রশিক্ষণের
দায়িত্ব দেয়া হয়। জেনারেল উবানের ভাষ্যমতে,
"The RAW created "Mujib Bahini'-a special force during liberation war. Mujib Bahini was trained at the Headquarters of ARC (Aviation Research Centre : RAW's special outfit) at Chakrata near Dehradun, (UP). The force was headed by Sirajul Alam Khan, Tofail Ahmed, Abdur Razzak and Late Fazlul Haque Moni. After liberation, most members of this force joined JRB and JSD
এ বাহিনী পরিচালনায় 'কাও' ছিলেন উবানের বিশেষ উপদেষ্টা। এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর 'মুজিব বাহিনী'র সদস্যদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিয়োগের মাধ্যমে 'রক্ষী বাহিনী' গঠন করা হয়। এক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে জেনারেল উবানের সম্পৃক্ততা তার ভাষ্য মতে ফুটে উঠেছে এভাবে,
“একদিন প্রধানমন্ত্রীর (ইন্দিরা গান্ধীর মুখ্য সচিব পিএন হাকসার আমার নামে একটি বার্তা পাঠালেন। বার্তায় বলা হয় যে, শেখ মুজিবুর রহমানের অনরোধে প্রধানমন্ত্রী আমাকে শেখ-এর ব্যক্তিগত উপদেষ্টা হিসেবে ঢাকায় পাঠাতে সম্মত হয়েছেন। শেখ একটি নতুন বাহিনী গঠনের চিন্তা- [-ভাবনা করছিলেন, যাতে তার মুক্তিবাহিনীর দেশপ্রেমিক অংশ এবং মুজিব বাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়""।
এই নতুন বাহিনীটি ছিল বাংলাদেশের সকল আওয়ামী লীগ বিরোধীদের স্তব্ধ করায় ত্রাস সৃষ্টিকারী রক্ষীবাহিনী। আজ আর কাউকে বুঝিয়ে বলতে হবে না যে, রক্ষীবাহিনী ছিল 'RAW'-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ও প্রশিক্ষণে পরিচালিত হিটলারের 'Brown Shirts'- এর True Copy এবং এ বাহিনীতে 'র'-এর ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট ছাড়া ভিন্ন কাউকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। অন্যদিকে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে অস্থায়ী প্রবাসী সরকারের ভারতপন্থী অংশের সম্মতিক্রমে ও ‘র’-এর ড্রাফট অনুযায়ী গোপন সাত দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তিটির সাতটি শর্ত একটি স্বাধীন দেশের জন্য এতটাই অবমাননাকর যে ভাবতেও অবাক লাগে, কিভাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ চুক্তি সম্পাদনে সায় দিয়েছিলেন? অবশ্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর মূর্ছা যান । গোপন সাত দফার আওতায়ই আমাদের সেনাবাহিনীর দফা রফা করে, 'আভ্যন্তরীণ আইন শৃংখলা রক্ষার জন্য মুক্তি বাহিনীকে কেন্দ্র করে একটি প্যারামিলিশিয়া বাহিনী গঠন করা হবে' বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ৯ এবং 'ওই লিখিত সমঝোতাই হচ্ছে বাংলাদেশ রক্ষী বাহিনীর উৎস ' ।
এখানে স্বাধীনতা যুদ্ধের বেশ ক' বছর পূর্বের কিছু কথা বলা বোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র' এবং সিআইএ'র ভূমিকা” নামক বইটিতে
লেখক জনাব মাসুদুল হক উল্লেখ করেছেন
“১৯৬২ সালে পাকিস্তানের গোয়েন্দা দপ্তর (IB) জানতে পারে যে, কলকাতার ভবানীপুরের একটি বাড়িতে যা ছিল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার অপারেশনাল দপ্তর সেখানে 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ' নামে একটি গোপন সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। এটির উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা। চিত্তরঞ্জন সুতার ও কালিদাস বৈদ্য এই গোপন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে ঐ দুই ব্যক্তিই তথাকথিত 'বঙ্গভূমির' প্রবক্তা। এখানে উল্লেখ্য যে, উক্ত দু' ব্যক্তিই ছিলেন আওয়ামী লীগের নির্বাচিত এমপি। মূলত : তারা 'র'-এর এজেন্ট হিসেবেই আওয়ামী লীগে প্রবিষ্ট হয়েছিলেন এবং আওয়ামী লীগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের এক পর্যায়ে ঐ দু'জনসহ মোট তিনজন সংখ্যালঘু আওয়ামী লীগ নেতা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বাংলাদেশকে ভারতের অংশ করে রাখার প্রস্তাব রাখেন” 1
এখানে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো পরে জনাব হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বাংলাদেশ সরকারকে বিষয়টি অবহিত করলেও তাদের বিরূদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এবং জনাব চৌধুরীর মতে, 'তারা-কিছু সংখ্যালঘু নেতা চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে সিকিম বানাতে’। বাংলাদেশকে ভারতের সাথে যোগদানের মত গুরুতর অভিযোগের পর চিত্তরঞ্জন গংদের বিরূদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় এটিই কি প্রমাণিত হয় না যে, আ'লীগের ইনার সার্কেলে এমন কিছু গোপনীয় ব্যাপার আছে যা ভারত ও 'র'-এর বিরুদ্ধে এ্যাকশন নিতে তাদের রাশ টেনে ধরে বা তারা সরাসরি 'র'-এর এজেন্টদের জেনে শুনে আস্কারা দেন হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অথবা তারা বুঝেও না বোঝার ভান করেন।
আসলে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন আওয়ামী লীগ নেতাদের ভারতে বিতর্কিত অবস্থান, বিলাস-ব্যসনে মত্ততা ও আরো অনেক স্থলন (অবশ্যই সকলে নয়) 'র'-কে ঐসব নেতাদের ভবিষ্যৎ ও তাৎক্ষণিক ইচ্ছানুযায়ী ব্যবহারের চমৎকার সুযোগ করে দেয়। ইন্টেলিজেন্সে যাকে বলে 'Hook up' সে পদ্ধতিতে বিভিন্ন নেতা-কর্মীদের অবস্থা ও অবস্থান অনুযায়ী ব্ল্যাকমেইল করার পরিপূর্ণ প্রমাণ হস্তগত করা হয় এবং ঐ ট্রাম্প কার্ডগুলো দেখিয়ে তাদের ইতোপূর্বে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে । এভাবে ধারাবাহিকভাবে ভারতীয় একটি অংশের 'র' কন্টাক্টদের সাথে দহরম-মহরমের ফলেই স্বয়ং ভারতীয়রাই স্বীকার করেছে যে, 'RAW Operations Continue in Bangladesh where the agency maintains a substantial presence'১৩ অর্থাৎ, বাংলাদেশে 'র' অপারেশন অব্যাহত রয়েছে এবং এদেশে 'র' লক্ষ্যণীয়ভাবে উপস্থিতি বজায় রেখেছে!
এদিকে আওয়ামী বলয়েই কেবল বিদেশী এজেন্টের কর্মতৎপরতা জেঁকে বসেছে আর বাকী দলগুলোয় কোন এজেন্ট নেই এরূপ একটি সন্দেহ বা প্রশ্ন সকলের মনে উদয় হওয়া স্বাভাবিক । উত্তরে বলা যায় যে, আওয়ামী বলয় ছাড়া অন্যান্য দলে বা সংগঠনে এজেন্ট যে একেবারে নেই তা নয়, তবে আওয়ামী বলয়ে যেভাবে এজেন্টরা প্রভাব
বিস্তারকারী পর্যায়ে চলাফেরা করে তা অন্য কোন সংগঠনে ততটা আগ্রাসী নয়। এর অন্তর্নিহিত কারণ হলো ভারত সরকার ও আওয়ামী বলয়ের আদর্শিক একাত্মতা বা সাযুজ্যতা। যেমন ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে। ইন্দিরা গান্ধী ৬ ডিসেম্বর '৭১ তারিখে ভারতীয় পার্লামেন্টের যৌথ হাউসের সভায় বলেন,
“মাননীয় সদস্যগণ, আপনারা জেনে খুশী হবেন যে, বাংলাদেশের নেতৃবর্গ ইতিমধ্যে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং এই প্রেক্ষিতেই তাদের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তারা যে আদর্শগুলি রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসাবে অনুসরণ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে পত্র লিখেছেন তার কপি আপনাদের টেবিলে দেয়া হল।"
“তাই ভারতীয় সংবিধানের চার মূলনীতিতে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ হচ্ছে ভারতপন্থী বা প্রো-ইন্ডিয়ান দলগুলোর মধ্যে 'র'-এর নিকট সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য” ।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



