ﺑﺴﻢ اﷲ اﻟﺮ ﲪﻦ اﻟﺮ ﺣﻴﻢ
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউই ইবাদত পাওয়ার যোগ্য নয় এবং মুহাম্মদ ﷺ আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর তাআলার শান্তি এবং রহমত রাসূল এবং তার পরিবার, তার সাহাবীদের এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাদের যারা অনুসরণ করবে তাদের উপর অর্পিত হোক।
আজ ২১ সফর ১৪৩১ হিজরী। এর ঠিক পরের মাসটিই হচ্ছে রবি-ওল-আওয়াল মাস। রবি-ওল-আওয়াল মাসের ১২ তারিখকে আমাদের দেশে তথা উপমহাদেশে ঈদে মিলাদুন্নবী হিসেবে উদযাপন করা হয়। এই উদযাপনকে ঘিরে অনেক অনুষ্ঠান, আলোচনা, সভা-সেমিনার, মিলাদ, মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তারা রাসূল ﷺ এর সুন্নাত অনুসরণ করার কথা বলে ঐতিহাসিক টাইপের ভাষণ দিয়ে থাকেন। এই অনুষ্ঠান গুলোর আয়োজকবৃন্দ অশেষ সওয়াবের আশায় বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে এগুলো আয়োজন করে থাকেন।
এখন প্রশ্ন হলো, এই যে মিলাদুন্নবী উদযাপন করা হচ্ছে অভিনব কায়দায়, এর কি কোন কোরআন বা সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক কোন দলীল-প্রমাণ আছে? নেই। তাহলে কেন এভাবে উদযাপন করা হচ্ছে? কারণ, ইসলামী জ্ঞানের অভাব অথবা জানলেও নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ, বাপ-দাদারা একই কাজ করতেন তাই আমরাও করি, অমুক মুরুব্বী বা অমুক মাওলানা বা অমুক আলেম বলেছেন, একটা বিপুল জনগোষ্ঠী একই কাজ করছে তাই আমরাও করি প্রভৃতি। দ্বীন ইসলামের মধ্যে নতুন নিয়মের উন্মেষ ঘটানো হয়েছে। আর দ্বীন ইসলামের মধ্যে এই সব নতুন পন্থা, পদ্ধতী তথা রীতি-নীতিকে আমরা বিদআত বলে অভিহিত করতে পারি।
রাসূল ﷺ জুম্মাহ’র খুতবাতে আল্লাহর প্রশংসা করার পর বলতেন,
“আল্লাহ যাকে হিদায়াত দান করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্য কোন পথ প্রদর্শনকারী নেই। নিশ্চয়ই সর্বাধিক সত্যবাণী হচ্ছে আল্লাহ তাআলার কিতাবের বাণী। আর সর্বোত্তম পথ হলো মুহাম্মদ ﷺ কর্তৃক প্রদর্শিত পথ। আর মন্দ বিষয়গুলো হলো (দ্বীনের মধ্যে) নবসৃষ্ট আমল বা কাজ। প্রত্যেক নবসৃষ্ট আমলই বিদআত। প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টতাই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে”। (মুসলিম ও নাসাঈ)
রাসূল ﷺ বলেনঃ
“যে ব্যক্তি আমাদের পক্ষ থেকে স্বীকৃত নয় এমন কোন আমল করল, তা প্রত্যাখ্যাত হবে”। (মুসলিম)
রাসূল ﷺ বলেনঃ
“আমি তোমাদের যা কিছু করতে বলেছি সেই সব ব্যতীত আর কোন কিছুই তোমাদের জান্নাতের নিকটবর্তী করবে না, এবং যে সকল বিষয়ে সতর্ক করেছি সেগুলো ব্যতীত কোন কিছুই তোমাদের জাহান্নামের নিকটবর্তী করবে না”। (মুসনাদে আস শাফেয়ীই এবং অন্যান্য)
মিলাদুন্নবী উদযাপনের এই অভিনব পন্থা রাসূল ﷺ আমাদের শিখান নি বা এভাবে উদযাপন করার কথা বলেও যান নি। আমরা যা করছি, তা একটি সুস্পষ্ট বিদআত আর বিদআতের গন্তব্যস্থল জাহান্নাম।
এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, আমরা কি তাহলে মিলাদুন্নবী এভাবে উদযাপন করব না? উত্তর হবে, না করব না। কারণ এটি একটি বিদআত। আচ্ছা মিলাদুন্নবী উদযাপনের কোন বৈধ উপায় কি তাহলে নেই? উত্তর হচ্ছে, আছে!
এই বৈধ পন্থাটির অস্তিত্ব রাসূল ﷺ এর সময় প্রচলন ছিল কিন্তু এই বিদআতী মিলাদুন্নবী উদযাপনের পন্থার কোনই অস্তিত্ব সে সময় ছিল না।
এই দুইটি উদযাপনের মধ্যে দুইটি বড় পার্থক্য রয়েছে।
১) এই বৈধ উদযাপনটি হচ্ছে একটি ইবাদত এবং সকল মুসলিমই এর সাথে একমত। ( বিপরীত দিকে বিদআতী উদযাপনটির সাথে তুলনা করলে আমরা পাই, যা কোন ইবাদতের অংশ নয় এবং সকল মুসলিম এর সাথে একমত নয়)
২) এই বৈধ উদযাপনটি আসে প্রতি সপ্তাহে একবার আর তাদের বিদআতী উদযাপনটি আসে বছরে একবার
আমি দলীল বা প্রমাণ বিহীন কোন কথা বলছি না। আমার কথার দলীল হচ্ছে নিন্মোক্ত হাদীসটি,
আবু কাতাদা আল আনসারী হতে বর্ণিত, একবার এক ব্যক্তি এসে আল্লাহর রাসূল কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কেন সোমবার দিন রোজা রাখেন? তিনি বললেন, “এটি হচ্ছে সেই দিন যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এইদিন আমাকে প্রথম নবুওয়াতের দায়িত্ব দেওয়া হয় বা এই দিন আমাকে প্রথম ওহী দেওয়া হয়”। (সহীহ মুসলিম)
এই কথাগুলোর মানে কি?
রাসূল ﷺ বলেছেন, তুমি কেন আমাকে এটি জিজ্ঞেস করছ যেখানে এই দিন আল্লাহ তাআলা আমাকে জীবন দান করেছেন এবং আমার নিকট কুরআন নাযিল করেছেন? যে মহান আল্লাহ তাআলা আমকে জীবন দান করেছেন এবং আমাকে ওহী দিয়েছেন আমি তাঁর কৃতজ্ঞতা স্বরুপ সোমবার দিন রোজা রাখি।
এই রোজাটি ঠিক আশুরার রোজার মত। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজাটি মুসলমানদের জন্য ফরজ ছিল।
একটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, যখন রাসূল ﷺ মদীনায় হিজরত করলেন তখন তিনি লক্ষ্য করলেন ইহুদীরা আশুরার দিনে রোজা পালন করে। তিনি তাদের এর কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। তারা বললো, এই দিন আল্লাহ মুসা ؑ এবং তার জাতিকে ফিরাউন এবং তার সৈন্য বাহিনীর হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। তাই আমরা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরুপ এই রোজা রাখি।
আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, “তোমাদের চেয়ে আমাদের এই রোজা রাখার অধিকার বেশী”। এরপর তিনি এই রোজা রাখতেন এবং অন্যান্যদের এই রোজা রাখতে নির্দেশ দিলেন আর এই রোজা রাখাটা এই আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মুসলমানদের উপর ফরজ ছিল,
“রোজার মাস (এমন একটি মাস) যাতে কোরআন নাযিল করা হয়েছে, আর এই কোরআন (হচ্ছে) মানব জাতির জন্যে পথের দিশা, সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন, (মানুষের জন্য হক বাতিলের) পার্থক্যকারী” (সূরা বাকারাঃ ১৮৫)
পরবর্তীতে আশুরার রোজা রাখাটি আর ফরজ রইল না বরং এটি একটি সুন্নাহ হয়ে গেল।
এটি স্পষ্টত যে, আল্লাহর রাসূল ﷺ মুসা ؑ কে ফিরাউনের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরুপ ইহুদীদের সাথে সাথে তিনিও রোজা রাখতেন। কাজেই, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর দরজা আমাদের জন্যও খোলা রয়ে গিয়েছে। আমরা সোমবার দিন আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরুপ রোজা রাখব কারণ এই দিন আল্লাহর রাসূল ﷺ জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তার প্রতি প্রথম ওহী নাযিল হয়েছিল।
এখন আমার প্রশ্ন হল, যারা মিলাদুন্নবী উদযাপন করে তারা কি সোমবার দিন রোজা রাখে?
না, তারা সোমবার দিন রোজা রাখে না। কিন্তু তাদের অধিকাংশই প্রতি বছর মিলাদুন্নবী উদযাপন করে! এটা রাসূল ﷺ এর সুন্নাহকে পরিবর্তন করার শামিল নয় কি?
এই ধরণের লোকদের জন্যে, ইহুদীদের উদ্দেশ্য করে নাযিলকৃত এই আয়াতটি একদম মিলে যায়,
“তোমরা কি এ উৎকৃষ্ট জিনিসের সাথে একটি তুচ্ছ জিনিসকে বদলে নিতে চাও?” (সূরা বাকারাঃ ৬১)
সোমবারের রোজা রাখা যে খায়ির(ভালো) সে বিষয়ে সব মুসলিমই একমত তবুও মুসলমানদের মধ্যে অধিকংশই এই দিনের রোজা রাখে না!!
বর্তমানে খুব কম মানুষই আছেন যারা এই দিনে রোজা রাখেন। কিন্তু, তারা কি জানেন এই রোজা রাখার পিছনে প্রধান উদ্দেশ্য কি? না, তারা জানেন না।
কোথায় সেই সকল আলেমগণ যারা মিলাদুন্নবী উদযাপনের পক্ষে কথা বলে থাকেন, তারা কেন মানুষজনকে সোমবারের রোজা রাখার বিষয়টি শিক্ষা দেন না যেখানে মিলাদুন্নবী(আল্লাহর রাসূল ﷺ এর জন্মদিন) উদযাপন করার এটাই বৈধ পন্থা? অবৈধ পন্থায় মিলাদুন্নবী উদাযাপনের পক্ষে কথা বলার চেয়ে তারা কেন লোকজনকে সোমবারের রোজা রাখতে উৎসাহ প্রদান করেন না?
আল্লাহ তাআলা সত্যিই বলেছেন,
“তোমরা কি এ উৎকৃষ্ট জিনিসের সাথে একটি তুচ্ছ জিনিসকে বদলে নিতে চাও?” (সূরা বাকারাঃ ৬১)
রাসূল ﷺ সত্যিই বলেছেন:
“নিশ্চয়ই তোমরা পূর্ববর্তী লোকদের রীতিনীতির পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুকরণ করবে। এমনকি তারা যদি গুইসাপের গর্তে প্রবেশ করে থাকে, তাহলে তোমরাও তা করবে। আমরা বল্লাম, হে আল্লাহর রাসূল! ইহুদী ও খ্রিস্টানদের? তিনি বললেন, তাদের ব্যতীত আর কাদের?” (বুখারী ও মুসলিম)
সুতরাং আমরা ইহুদীদের পদাংক অনুসরণ করছি, তারা খায়িরের(ভালোর) চেয়ে নিকৃষ্ট বিষয়কে পছন্দ করেছিল ঠিক তেমনি আমরা প্রতি বছর মিলাদুন্নবী উদযাপন করাটাকে গ্রহণ করেছি যদিও তার কোন ভিত্তি নেই অন্যদিকে মিলাদুন্নবী উদযাপন করার বৈধ পন্থা হলো সোমবার দিন রোজা রাখা আর এটাই খায়ির(ভালো)। কিন্তু আমরা উৎকৃষ্ট বিষয়টি গ্রহণ না করে ইহুদীদের পদাংক অনুসরণ করে নিকৃষ্ট, ভিত্তিহীন বিষয়টিকে গ্রহণ করেছি।
সোমবার দিন আল্লাহর রাসূল ﷺ জন্ম গ্রহণ করেছেন এবং এই দিন প্রথম তার উপর ওহী নাযিল হয়েছিল এই বিষয়টি মাথায় রেখে আসুন আমরা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরুপ রোজা রাখি আর এটাই বৈধ পন্থা।
আসুন আমরা বিদআত পরিহার করি, কারণ বিদআতের কারণে রাসূল ﷺ এর সুন্নাহ চাপা পড়ে যায়।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের বিদআত থেকে হিফাজত করুন এবং আমরা যেন রাসূল ﷺ এর সহীহ সুন্নাহ অনুসরণ করতে পারি। আমীন।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




