অনেক বছর আগে অচেনা এই শহরটাতে খুব একা লাগত। বন্ধু ছিলো হাতেগোণা দু একজন। তখন নিঃসঙ্গতাকে জীবনের অভিশাপ মনে হতো। এখন আমার চারপাশে শ-খানেক বন্ধু। অথচ ইদানিং আমি পুরনো বন্ধু 'নিঃসঙ্গতা'কে খুঁজে ফিরছি! বোহেমিয়ান জীবন আমার খুব পছন্দের। কিন্তু অনেক না পাওয়ার মতো 'বোহেমিয়ান' জীবনটা আমার পাওয়া হলো কই! কলেজে থাকতে শখে গিটার কিনেছিলাম শিখবো বলে, বাবার ভয়ে শেষে খাটের নিচে ওই গিটারের জায়গা হয়েছিল। জীবনের প্রথম ভালো লাগা মানবীর দেয়া চিঠিটার উত্তর দিতে ও সাহসে কুলোয় নি। পরে কোন এক হাদারামের সাথে মানবীর চিঠি চালাচালির খবর শুনে আমার বন্ধুরা আমাকে সার্টিফিকেট দিয়েছিল, 'তুই একটা গাধা'! আমি প্রতিবাদ করিনি।
ঘুরাঘুরি আমার খুব প্রিয়। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া ঘুরে বাংলাদেশটাকে, দেশের মানুষগুলোকে দেখার খুব ইচ্ছে ছিল আমার। কোথাও ঘুরতে গেলে বাবার জবাবদিহীতা এড়াতে দিনে গিয়ে দিনে বাসায় ফিরতে হতো। জবাবদিহীতা আমার কখনো সহ্য হতো না, এখনো না। শিকল দিয়ে কাউকেই বেঁধে রাখা হয় না। তারপরেও সব মানুষই কোন-না-কোনো সময় অনুভব করে তার হাতে-পায়ে কঠিন শিকল। শিকল ভাঙতে গিয়ে সংসার বিরাগী গভীর রাতে গৃহত্যাগ করে। ভাবে, মুক্তি পাওয়া গেল। দশতলা বাড়ির ছাদ থেকে গৃহী মানুষ লাফিয়ে পড়ে ফুটপাতে। এরা ক্ষণিকের জন্য শিকল ভাঙার তৃপ্তি পায়। আমি গৃহত্যাগ করেছি সেই কবে, দীর্ঘ আট বছর। শিকল থেকে মুক্ত হতে পেরেছি কই! ব্যস্ততা আমার পিছু ছাড়ছে না।
নওরিনের সাথে কথা বলি না প্রায় দুই মাস হয়ে গেলো।ওর কথা বলতে ইচ্ছে করে কিনা জানি না। আমি মাঝে মাঝে পুরনো অভ্যেসবশত ফোনটা তুলে পরিচিত নাম্বারটাতে ডায়াল করে ফেলি, আবার লাইন কেটে দিই। মনে মনে বলি নো ইমোশনস, 'আই হ্যাভ টু বি ক্রুয়েল অনলি টু বি কাইন্ড'! ওকে সাফ সাফ বলে দিয়েছিলাম সারাক্ষণ তোমার প্যানপ্যানানি ভালো লাগে না, তুমি অন্য কোন সুপুরুষকে খুঁজে নাও, আমাকে একা করে দাও! ব্যস, এইটুকুই সব শেষ। আমার এমন আচরণ খুবই অস্বাভাবিক লাগছে? লাগুক অস্বাভাবিক। মানুষকে সবসময় স্বাভাবিক লাগবে এটা কোন কাজের কথা না। প্রাণী হিসেবে মানুষ চরম অস্বাভাবিক। সে স্বাভাবিকের ভঙ্গি করে পৃথিবীতে বাস করে।
আমেরিকাতে 'Hobo' সম্প্রদায় বলে একটা গোষ্ঠি আছে। এরা ইচ্ছে করে সব ঠিকানা নষ্ট করে ঠিকানাবিহীন মানুষে পরিণত হয়েছে। এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঠিকানাবিহীন থাকার আলাদা মজা আছে। ঠিকানাবিহীন হতে পারব না জানি! অন্তত কিছুদিনের জন্য আমি একা হতে চাই, খুব একা! কিন্তু কিভাবে? এই শহরটাতে আমার অনেক বন্ধু হয়ে গেছে। অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যেখানেই যাই প্রায়ই কোন-না-কোন পরিচিত মুখ সামনে পড়ে যায়। চারপাশে এতো চেনা মুখ দেখতে ইদানিং কেন জানি ভালো লাগছে না! অন্জন দত্তের একটা গান খুব শুনছি। ক্লান্ত আমি, শ্রান্ত আমি, আমায় একটু একা থাকতে দাও! বেশ কিছুদিন ধরে চেনা শহরের বাইরে কোথাও চলে যাবার চিন্তা করছি। সাত পাঁচ ভেবে যাওয়া হচ্ছে না। একাকীত্বের স্বাদ নিতে, বাসা বদলে বন্ধুদের কাছ থেকে অনেক দুরে চলে যেতে খুব চেয়েছি, পারলাম কই! সাময়িক হলেও ইমোশনের কাছে হার মানতে হলো।
ইদানিং আমার কি হয়েছে আমি নিজেই বুঝতে পারছি না। কিচ্ছু ভাল লাগে না। বন্ধুরা বলে বিয়ে করে ফেল, তাইলে এই অসুখ সেরে যাবে। অসহ্য! এইজন্যই চাচ্ছি দূরে কোথাও চলে যেতে। দেশে গিয়ে কোনরকম পালিয়ে এসেছি। মা আমার বিয়ে বিয়ে করে মাথা ঝালাপালা করে ফেলছে। মাকে বলি এসব বিয়ে বন্ধনে জড়াতে পারব না। মন চায় না হৃদয় জড়াতে কারো চিরঋণে! মা অবশ্য রবীন্দ্রনাথ বুঝে না। রবীন্দ্রনাথের একটা লাইন মনে আছে? 'মন চায় হৃদয় জড়াতে কারো চিরঋণে' মাঝেখানে শুধু আমি একটা 'না' বসিয়ে দিয়েছি।
অনেকক্ষণ ধরে আকাশটাকে দেখছি। এই শহরে অনেক না থাকার মাঝে এই একটা জিনিস আছে। আকাশ দেখতে পারার পূর্ণ স্বাধীনতা! আমি নিশ্চিত বৃষ্টি আজ ঘন জাল ঝড়াবে এই শহরে। পুরো শহর জুড়ে চাদর টেনেছে মেঘেরা! তছনছ করে দেবে লুটতরাজের হল্লা তুলে। নিশ্চুপ এই রাতে, ছায়া ছায়া এই ঘরে, একা আমি জানালার এপাশে বসে ঝুম বৃষ্টির অপেক্ষা করছি। এইতো এলো বুঝি! সাঁই সাঁই বাতাসে ভেজা গন্ধ পাচ্ছি, উলঙ্গ গাছ নাইতে নামছে, সুখের বসনে। জানালার পর্দাগুলো পতপত করে উড়ছে। অবশেষে প্রতিক্ষিত বৃষ্টি এলো, আকাশ ভেঙ্গে। সমস্ত শহর যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ঝম ঝম ঝরছে। এ যেন আমি ঝরছি, নির্মমরুপে ঝরছে আমার নিঃসঙ্গ হওয়ার স্বাধীনতা!
'আই হ্যাভ টু বি ক্রুয়েল অনলি টু বি কাইন্ড'> লাইনটি শেক্সপিয়রের।
ডিসক্লেইমার: এই শহরে ঝম ঝম বৃষ্টি হতে কখনো দেখিনি, শহর ভেসে যাবে তো দুরের কথা! এটা আমার কল্পনা মাত্র। একটা বইয়ে পড়েছি যেকোন ইচ্ছে নাকি কল্পনা শক্তি দিয়ে জয় করা স্বম্ভব। মাঝে মাঝে আমি চেষ্টা করি। কল্পনা দিয়ে নিজের মতো করে সবকিছু সাজিয়ে নিই, আবার ভাল না লাগলে ভেঙ্গেও দিই। আজ এই রাতে ঝম ঝম বৃষ্টি দেখতে খুব ইচ্ছে হচ্ছিল।
আলোচিত ব্লগ
রাজনীতি নাকি ক্ষমতানীতি

রাজা কোথায়?
রাজমুকুট আজ জাদুঘরের কাঁচে
রাজদণ্ড ইতিহাসের ধুলোমাখা পৃষ্ঠায়
বহু দেশেই রাজতন্ত্রের সিংহাসন বহু আগেই
নেমে গেছে মানুষের নির্মিত প্রজাতন্ত্রের পথে
তবু আমরা বলি রাজনীতি।
কেন বলি?
শব্দটি এত পরিচিত
যে পরিচয়ের আড়ালে প্রশ্নটি হারিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন
আজকের ডায়েরী- ১৯৮

আজ বৃহঃস্পতিবার, ২রা আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
ইংরেজি ১৭ই সেপ্টেম্বর। গত কয়েকদিন বেশ কয়েকজন ব্লগার সামুর ভালো মন্দ নিয়ে লিখেছেন। তাদের মুল বক্তব্য হলো- সামু গেলো। সামু শেষ। তারা সামুর... ...বাকিটুকু পড়ুন
যে ইতিহাস আমাদের জানতে দেওয়া হয়নি অথবা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে!

আপনি জানেন কী?
ব্রিটিশরা প্রশাসনের সুবিধার জন্য ১৮৩৭ সালে ফারসি ভাষা বাদ দিয়ে আঞ্চলিক ভাষা ও উর্দুকে নিচ তলার দাপ্তরিক কাজে চালু করে।কারণ মুঘল আমল থেকেই প্রচলিত প্রশাসনিক কর্মীদের কাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
শরাব পিনে দে.....

মির্জা গালিব সম্পর্কে একটি গল্প চালু আছে। একদিন তিনি মসজিদে বসে মদ্যপান করছিলেন। তখন মুসল্লিরা তাকে বাধা দিয়ে বললেন "মসজিদ আল্লাহর ঘর, মদ্যপানের জায়গা নয়।" তখন মির্জা গালিব তাঁর বিখ্যাত... ...বাকিটুকু পড়ুন
বালছাল মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী!
প্রথম পাতায় ব্যান ব্লগারের একটি পোস্টে ব্লগার রাজীব নূর মন্তব্য করে বলেছেন - “ওদের কে ‘বালছাল’ লিখতে দেন। বিনোদন নষ্ট করবেন না।”
বাহ! কী চমৎকার গণতান্ত্রিক দর্শন! এতদিন জানতাম দেশে তথ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।