somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অদ্বৈত

০১ লা মে, ২০২০ দুপুর ১২:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১...
"আপনার যখন এতই ছেলের শখ, তখন আপনাকে একটা ওষুধ দিব,সেটি যদি রাণীমা খান,তার যমজ ছেলে হবে।তবে ওষুধটা শুধু এ শর্তে দিব যে একটি ছেলে রেখে, অন্যটি আপনি আমাকে দিবেন।
রাজার মনে হল শর্ত অনেক কঠিন, তবে তার রাজি না হয়ে উপায় নেই...."

শাপলা আগ্রহ নিয়ে লালবিহারী দে'র বাংলার উপকথা থেকে "নিখুঁত মানুষ" গল্প পড়ছে। সোহাগের বিরক্ত লাগছে, মাথা দপদপ করছে। বোন আগ্রহ করে পড়ছে, আর গল্পটাও প্রায় শেষ।তাই কিছু বলছে না।

শাপলা গল্প শেষ করে জিজ্ঞেস করলো,"ভাইয়া, তোমার জ্বর কমেছে?"
"তোর গলায়তো অষুধ মিশানো নেই যে তোর পড়া শুনে জ্বর কমে যাবে!যা ভাগ, খুব বিরক্ত করছিস।"
শাপলা ভাইয়ের কপালে হাত রাখলো, গায়ে অনেক জ্বর।
"আমি চা বানিয়ে দেই, আদা চা খেলে জ্বর কমে।"
"দরকার নেই, দুর হ। দরজা বন্ধ করে দিয়ে যা।চোখে লাগে।"

শাপলার আর কোন কাজ নেই। মাকে ভাইয়ার জ্বরের খবর দেয়া উচিত। সে কোনভাবেই মায়ের সামনে যাবে না। আজকে স্কুলের ফাইনাল পরিক্ষার রেজাল্ট দিবে, ওর ধারণা ও সব বিষয়ে ফেল করবে। ও যে কম পড়ে তা না, ভাইয়ার প্রায় দ্বিগুণ পড়ে। কিন্তু কিছুই মনে রাখতে পারে না। ওর ধারণা, আল্লাহ ওর ব্রেইন পুরোটা ভাইয়াকে দিয়ে দিয়েছেন। ভাইয়া প্রতিক্লাসে ফার্স্ট হয়, ফাইভে, এইটে স্কলারশিপ পায়; ওর পরের ক্লাসে উঠাই দাইসাই! ভাইয়া এবার মেট্রিক দিয়েছে, অবশ্যই স্টার-উস্টার পেয়ে হুলস্থুল করবে। আর ও এইটের ফাইনাল পরিক্ষায়ই পাস করতে পারবে না!

শাপলা ভেবেছিল ভাইয়ার সাথে গল্প করে স্কুলের সময়টা পার করে দিবে। অবশ্য মা কিছু বলতেও পারবে না। ভাইয়া অসুস্থ, ও ভাইয়ার সেবা করছে। কিন্তু ভাইয়া কেমন জানি, কারও সাথে মিশে না। সারাদিন ঘরে বসে পড়াশোনা করবে, নয়তো ঘুমাবে। দুনিয়ার কোন কিছুর দিকে খেয়াল নেই। এখন যে বোম্বেতে শাহরুখ খান নামে এক নায়ক বিরাট অভিনয় করে, ভাইয়া জানে না। ভাইয়া আত্মভোলাও, দিন দিন এই রোগ বেড়েও যাচ্ছে!
সেদিন খাবার টেবিলে কেউ খাচ্ছিল না।
আম্মু নিজেও খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। সব খাবারে লবণ বেশি, অথচ ভাইয়া গপগপিয়ে খেয়ে যাচ্ছে।আশ্চর্য না!

শাপলা কিছুতেই মায়ের সামনে পরবে না।সামনে পরলেই হয়তো মা বলবেন,"আজকে না তোমার ফাইনাল পরিক্ষার রেজাল্ট। চল, আমিও তোমার সাথে স্কুলে যাই।"
মা কখনো পড়াশোনার খোজ নেয় না। তবে ফাইনাল পরিক্ষার রেজাল্ট আনতে স্কুলে যান। আসার সময় রাস্তায় মেরে মেরে নিয়ে আসেন। এখন অবশ্য শাপলা বড় হয়েছে, রাস্তায় মেরে মেরে নিয়ে আসলে ওর খুব লজ্জা লাগবে!

২...
শাপলা নোটিশ বোর্ডের দিকে এগিয়ে যেতেই ছেলের দল হাসাহাসি শুরু করলো, মেয়েগুলো কানে কানে কথা বলতে লাগলো। ওর পা জমে গেল, মনে হল পা মেঝেতে শেকড় ছেড়ে দিয়েছে। ও প্রায় টেনে টেনে এগিয়ে গেল।

ও যা ভেবেছিল তা না। ও ফেল করেছে, তাও মাত্র দুই বিষয়ে গণিত আর পরিবেশ পরিচিত সমাজ। শাপলা কিছুটা আনন্দিত হল। সমাজ ওর এমনেই কিছু মনে থাকে না। কোন ব্যাটা, কোন বেটি কবে জন্মেছে, যুদ্ধ করেছে, মারা গেছে, বিয়ে করেছে, তার কয়টা ছেলে মেয়ে, তাদের নাম মুখস্থ করে কি লাভ? নানা দেশের সভ্যতার বর্ণনা মুখস্থ করলেই বা লাভ কি? শাপলা ভেবে পায় না।
অংক আরও ভয়ানক! আচ্ছা, পিথাগোরাসের কি দরকার ছিল উপপাদ্য আবিষ্কার করার? বাগানের আকার আয়তাকার, বর্গাকার যাইহোক তাতে রাস্তার ক্ষেত্রফল বের করা লাগবে কেন? আর মানসাঙ্কের তো হাজারটা সূত্র!কোথায় কোনটা লাগবে ও এখনো শিখতে পারেনি।

শাপলার আনন্দ বেশিক্ষণ টিকল না। গ্রামে ও ছাড়া সবাই পাস করেছে। মা নিশ্চয়ই এটা ভালোভাবে নিবেন না।
শাপলা হেড ম্যাডামের রুমের দিকে হাটতে লাগলো। ম্যাডাম তাকে ডেকেছেন। হেড ম্যাডামকে নিয়ে একটা কথা চালু আছে, ম্যাডাম ভ্যাম্পায়ারের মত রক্ত চুষতে পারেন। তিনি ভ্যাম্পায়ার থেকেও অনেক এগিয়ে, তিনি দুর থেকেই এই কাজ পারেন। উনার ভারন্ত শরীর এই কথার উজ্জ্বল প্রমাণ। উনার সামনে দাড়ালেই নাকি গা ঝিমঝিম করে!

"ম্যাডাম, আসবো?"
"এই মেয়ে, এই খানে কি? কি চাই? আমার কাছে কি?বাসায় যাও। গিয়ে পড়তে বস।"
এটা ম্যাডামের মুদ্রাদোষ।
"ম্যাডাম, আসবো?" এই প্রশ্ন করলে তিনি সবাইকে একই কথা বলেন।
তিনি নিজে ডেকে নিজেই ভুলে যাবেন এত বোকা ম্যাডাম না। শাপলা নিশ্চিত ও এবছর কোন পরিক্ষায় কত পেয়েছে, ম্যাডামের মুখস্থ! ম্যাডাম হয়তো ওগুলো বলে খুব বকাঝকা দিবেন।

শাপলা দাঁড়িয়ে রইল।
"এই শাপলা, এই শাপলা ভিতরে আয়।দরজায় দাঁড়িয়ে আছিস কেন?"
আশ্চর্য!ম্যাডামের গলায় কোন রাগ নেই, এতএত আদর মাখানো। শাপলা একচুল নড়লো না, দাঁড়িয়ে রইল।

ম্যাডাম এগিয়ে এলেন। শাপলার চুলে বিলি কেটে দিলেন। চোখের পানি মুছে, কপালে চুমু দিয়ে বললেন,"তুইতো বিরাট গাধারে!কাদিস কেন? পড়াশোনা নাই, সারাদিন হইচই, ক্লাসে মনোযোগ নাই, সারাদিন আউট বই পড়িস, আমি দেখেছি লাইব্রেরির সব আউট বই তুই একাই পড়িস!তুই ফেল করবি না তো কে করবে?আচ্ছা, যা হবার হয়েছে। সামনের বছর মনোযোগ দিয়ে পড়বি, আমার কাছে প্রতিদিন এক ঘন্টা অংক করবি!ঠিক আছে।"
শাপলা মাথা নাড়ালো। হেড ম্যাডাম ওর হাতে পাঁচটা লজেন্স গুজে দিলেন।
"তুইতো খুব বাঁচা বেচে গেছিস, তোর মা আসে নাই। তোকে সারা পথ মেরে মেরে বাসায় নিয়ে যেত।মনে রাখিস, সবাই বড় হয়ে গাড়ি চড়বে তুই কাটবি ঘোড়ার ঘাস! যা, বাসায় গিয়ে পড়তে বসবি।"
হেড ম্যাডামকে এখন আর ভ্যাম্পায়ারের মত লাগছে না!

শাপলার খুব কান্না পাচ্ছে। কাঁদলে ওর গাল লাল হয়ে যায়, ঠোঁট কাপে।এভাবে তো আর রাস্তা দিয়ে হাটা যায় না। ও স্টিল ব্রিজের পথটা দিয়ে হাটা দিল।ব্রিজের উপর একদল ছেলে বসে থাকে। এরা সবসময় এখানে বসে থাকে, কখন পড়ে কে জানে? স্কুলেও যায় না। তবুও পাস করে।
এই ছেলেগুলো ওকে দেখে প্রতিদিন শিশ বাজায়, হেরে গলায় গান ধরে....
"এই পথে যখন আমি যাই
মাঝে মাঝে একটা মেয়ে দেখতে পাই
আলতা রাঙা পায় আবার নূপুর পরেছে
একটা বুরকা পরা মেয়ে পাগল করেছে...."
আজকে ছেলেগুলো শিশ বাজায়নি, গানও ধরেনি। শাপলার নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল। ওরাও নিশ্চয়ই জেনে গিয়েছে, সে পরিক্ষায় ফেল করেছে! আর যাইহোক, ফেল করা মেয়েদের নিশ্চয়ই ভালোবাসা যায় না।

শাপলা আর কোনদিন জানতেও পারবে না, ছেলেগুলো আসলে এই অতিরূপবতী মেয়েটিকে কাঁদতে দেখে অবাক হয়েছিল। প্রেমিকদের কাছে পাস-ফেল মূল বিষয় না।

৩...
শাপলা বাসায় গেল না। দাদার কাপড়ের দোকানে বসে রইল। দোকান লোকজনে ভরা। শাপলা হাসফাস করছে।
সাঈদ মেম্বর নাতনীর দিকে না তাকিয়েই বলবেন,"কিরে, বাসায় যাইতি না।তোর না আইজকা পরিক্ষার রেজাল!"
শাপলা দাদা ভাইকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলো।
"নিশ্চয়ই ফেল করছস। সারাদিন আউট বই নিয়া বইসা থাহস ফেল করবি না কি করবি!যা, বাসায় যা। তর মা জিজ্ঞেস করলে কইবি, আমি জানি না। দাদা জানে।"
"আমি মিথ্যা বলতে পারবো না।"
সাঈদ মেম্বর মন খারাপ করলেন। মানুষ সত্য বলে না, কেবল পাগল ছাড়া। আর সারা দুনিয়া চলছে মিথ্যার উপর, এর এই মেয়ে সামান্য মিথ্যা বলতে পারবে না।এই সাদাসিধা মেয়েটাকে নিয়ে তিনি কি করবেন ভেবে পান না। দুনিয়ায় সাধাসিধা মানুষের ভাত নাই।

শাপলা আগে সোহাগের ঘরের দিকে গেল। কোনভাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত মায়ের সামনে না পড়লেই হবে। সন্ধ্যায় বাবা, দাদা সবাই আসবে। তখন মা নিশ্চয়ই আর মারতে পারবে না। ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগামী বছর আর আউট বই পড়বে না, মনোযোগ দিয়ে অংক করবে, অংক দেখে দেখে করে রাখবে না।ভাইয়া সুস্থ থাকলে অবশ্য ঝামেলা হত না, ভাইয়া একাই ওকে বাচাতে পারতো। মা ভাইয়ার কথা শোনে!
ভাইয়া ইদানীং আত্মভোলা,আজ যে ওর রেজাল্ট নিশ্চয়ই ভুলে আছে। আর ভাইয়ার এত জ্বর! ওকে দোষও দেয়া যাচ্ছে না।

সোহাগের ঘরের দরজা বন্ধ।
শাপলা অনেকবার ডাকলো,"ভাইয়া, এই ভাইয়া।তোমার জ্বর কমেছে?দরজাটা খোল।"
ও দরজায় টোকা দিল না। পাছে মা শুনতে পায়।
আর ডাকার মানে হয় না, ভাইয়া হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে।

শাপলা বাবাকে কল দিল।
"হ্যালো, বাবা।"
"মা'রে আমি একটু ব্যস্ত, একটু পর কল দে।"
"বাবা, আমার আমার পরিক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে।"
"ও আচ্ছা, এটা নিয়ে পরে কথা বলি। আমি একটু ব্যস্ত,আমি অফিসের মিটিংয়ে।"
"বাবা, আমি ফেল করেছি। আম্মু,,,,"
শাপলা কথা শেষ করতে পারলো না, ছাত্তার খান কল কেটে দিলেন।

৪....
সোহাগ দরজা খুলেনি। জ্বর বোধহয় বেড়েছে। শাপলা আরও দু'একবার ভাইয়ের দরজায় কড়া নাড়লো, নিজে নিজে চা বানিয়ে খেল,একটু পড়াশোনা করার চেষ্টা করলো, মনোযোগ দিতে পারলো না, তিনতলার ছাদে ফুলের গাছগুলোতে পানি দিলো; যদিও দুপুরে গাছে পানি দিতে হয় না। ওর করার কিছুই নেই। যেভাবেই হোক মায়ের সামনে পরা যাবে না।

মমতাজ বেগম মেয়ের ছটফটে ভাব কিছুটা বুঝতে পারলেন। মেয়ের ঘরে আসতেই মেয়েটা আঁতকে উঠল। শাপলা চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। যতদিন দিন যাচ্ছে মেয়েটা তত সুন্দরী হচ্ছে।উনি ভয় পান, অত সুন্দর ভাল না। আল্লাহ নিখুঁত সৌন্দর্যের আয়ু কমিয়ে দেন, কোন না কোন খুত দিয়ে দেন!

"শাপলা, আজ তোমার পরিক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে না?"
শাপলা মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মেঝেতে কাটাকুটি করতে লাগলো।
মমতাজ বেগম চোখমুখ শক্ত করে ফেললেন। গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন,"কি ব্যাপার কথা বল। চুপ করে আছ কেন?"
"মা, আমি ফেল করেছি।"
শাপলার বুক থেকে বোঝাটা নেমে গেল। মিথ্যের বোঝা!
মমতাজ বেগম মেয়ের গালে কষে চড় দিলেন।
"সারাদিন আজেবাজে বই নিয়ে বসে থাকো, পাস করবে কিভাবে?
মনে রাখবে সুন্দর চেহারা দেখে মানুষ নিয়ে যায়, রাখে না। তোমার মত গাধা মেয়েকে বিয়ে দিবো কিভাবে? কে বিয়ে করবে?"
"মা, আমি......"
শাপলা কথা শেষ করতে পারল না। মমতাজ বেগম মেয়ের গালে আরেকটা চড় দিলেন।
"তোমার লজ্জা আছে? বাবা এত পড়াশোনা করা, মা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, ভাই ক্লাসে ফার্স্ট হয় আর তুমি পাসই করতে পার না! এগুলা বলা যায় আত্মীয়-স্বজনকে? ফেল করার কথা বলতে লজ্জা লাগে না!"
"তোমাকে আর শুনতে হবে না, আমি ফেল করেছি।"
"কিভাবে? তোমার মাথা তো ফাকা, ব্রেন নেই।আর তুমি তো মারাও যাচ্ছ না!আমাকে বারবার শুনতে হবে, শাপলা ফেল করেছে! যাও বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দাও। তবেই অসম্মান থেকে রক্ষা, এসব আর ভালো লাগে না!"

মমতাজ বেগম ছেলের ঘরের দিকে হাটছেন। এ বাড়ির সবকিছু অন্যরকম। ছেলের অনেক জ্বর, ছেলে কিছুতেই মুখফুটে বলবে না।
ধুপ করে শব্দ হল!
উনি পেছনে তাকিয়ে দেখলেন, শাপলা হাত-পা ছড়িয়ে মাটিতে পরে আছে।মাথাটা ফেড়ে দু'ভাগ, মগজ প্রায় সারা উঠোনে ছড়িয়ে পরেছে!

৫...
সবকিছু আগের মতই চলছে। কেবল সাঈদ মেম্বার সবকিছু ছেড়েছুড়ে দিলেন। ব্যবসা, মেম্বরি সব ছেড়ে দিলেন। একা-একা বাড়ির বারান্দায় বসে থাকেন,কাউকে সহ্য করতে পারেন না। ছেলেকে আলাদা করে দিয়ে বাড়ির মাঝখানে বিশাল দেয়াল তুলে দিলেন। গত দুই বছর শাপলাদের বাড়ি আসেননি। অথচ তিনি মাঝরাতে ফিরলেও এ বাড়ি আসতেন। নাতনিকে ডাকতেন, হাতে গুজে দিতেন বাদাম, তিলের নাড়ু, বার-ভাজা, বাসি পুড়ি,সিংগারা, একটা তেতুলের গোল্লা আরও কত কি!

ছাত্তার খান চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করছেন। তিনি কখনো ছেলের কল কেটে দেন না,ব্যস্ততা দেখান না, ছেলে যাই বলতে চায় তিনি শোনেন। একবার ভূল করেছেন, আর করতে চান না।
উনার ব্যবসাও ফুলে ফেপে বাড়ছে। তিনি ঢাকা থেকে শেরপুর বাস চালু করেছেন, শাপলা পরিবহন।

মমতাজ বেগম আগের মতই আছেন। সংসারে সবাই এলেমেলো হলে চলে না, কাউকে না কাউকে সব শক্ত হাতে ধরে রাখতে হয়। তিনি আগের মত তাই করছেন।
তবে তিনি ইদানীং খুব চিন্তিত। মেট্রিকে শেরপুর জেলায় ফার্স্ট হওয়া ছেলে নাকি কলেজে পরিক্ষায় পাস করতে পারছে না। ছেলে বাবার কাছে প্রচুর টাকা নেয়, তিনি সন্দেহ করেছেন সে মেয়ের পাল্লায় পরেছে।
দেখা গেল, তা না। ছেলে প্রচুর বই কিনে, সবই আউট বই! তিনি ছেলেকে ডেকে পাঠিয়েছেন। এখনই সামাল না দিলে, পরে সামলাতে পারবেন না।

সোহাগ উনার সামনে বসে আছে। লম্বা চুল,দাড়ি, বোঝাই যাচ্ছে অনেক দিন এগুলা কাটে না। মমতাজ বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন, অগোছালো ছেলে দেখতেও ভালো লাগে, সোহাগ ওর দাদীর মত বেশ কালো তবে চোখেমুখে একরাশ মায়া। সোহাগ আঙুলের খাজে আঙুল রেখে, মেঝের দিকে তাকিয়ে পা আড়াআড়িভাবে রেখে বিছানার কোণে বসে আছে। এই বসাটাও পরিচিত, ওর দাদীও এভাবে বসতেন। তখন একশ কথা বলেও উনার মুখ থেকে একটা কথাও বের করা যেত না।
ছেলেটা ছফিনা বিবির কোন স্বভাবই ছাড়েনি!

মমতাজ বেগম ছেলের দিকে এগিয়ে এলেন, চুলে বিলি কেটে পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে কথা শুরু করলেন।
:কি হয়েছে, বাবা? তুমি ঠিক মত ক্লাসে যাও না, পড়াশোনা কর না।এমন করলে হবে? তুমি কত ভালো ছাত্র! রেজাল্ট খারাপ হলে, মানুষ কি বলবে?
সোহাগ কিছুই বলে না। পা দোলাতে থাকে।
:আমার কথা শুনতে পাচ্ছ, সোহাগ? বাবা, কথা বল।
:মানুষ কি বলবে তাতে তোমার কিছু আসে যায়, মা?তুমিতো ঠিকই সেজেগুজে মানুষের বাসায় বেড়াতে যাও, গিয়ে গয়নাগাটি, আব্বা-দাদার বাজে স্বভাব নিয়ে আলোচনা কর, অন্যের স্বামীকে নিয়ে আলোচনা কর।তোমার তো কোন সমস্যা হয় না, তুমি তো সুখেই থাকো।

সোহাগ ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। মমতাজ বেগম ছেলেকে চিৎকার করে ডাকেন, সে দাঁড়ায় না, পেছনেও ফিরে না। তিনি সোহাগের পেছনে পেছনে আসেন, সোহাগ নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। মায়ের ডাকে সাড়া দেয় না।

রাতে মমতাজ বেগম স্বামীর কাছের ছেলের স্পর্ধার বিচার দেন। ছাত্তার খান কিছুই বলেন না। বাড়ির উঠোনে শিউলি গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানেন। তিনি খেয়াল করেননি রাতে শিউলি ফুল ঘ্রাণ ছড়ায়, চারপাশে জোনাকি জমে, মায়াময় পরিবেশ তৈরি হয়। শাপলা আগে বলতো, কখনো দেখার সময় হয়নি!

৬...
সোহাগ পরদিনই ঢাকা ফিরে গেল। এইচএসসি পরিক্ষার আগে আর বাড়ি আসেনি। বাবার কাছ থেকে আর বেশি টাকা নেয়নি। নিয়মিত ক্লাস করেছে, প্রাইভেটে গিয়েছে। মমতাজ বেগম ওর বন্ধুদের কাছে খোজ খবর নিচ্ছেন নিয়মিত।

ছাত্তার খানও ছেলের খবর নিয়মিত নিতেন। ছেলের আচরণে আমূল পরিবর্তন হয়েছে, ছেলে ক্লাসে প্রাইভেটে ঠিকই যায় তবে একদৃষ্টে কোন একদিকে তাকিয়ে থাকে। মেসে খবর নিয়ে দেখেছেন, ছেলে সারাদিন রুমের দরজা বন্ধ করে থাকে। গত কয়েক মাসে ছেলে একটা বইয়ো কিনে নাই, অথচ এই ছেলে মেট্রিকে অংক পরিক্ষার আগের রাতেও মুখের উপর "ক্রাচের কর্নেল" বইটা ধরে ছিল। তিনি যেই বললেন,"আব্বা, কাল পরিক্ষা অংক কর। নইলে রেস্ট নাও।"
ছেলে বলেছিল,"বাবা, আমি বিশ্রামই তো নিচ্ছি।"
ছেলেটা উনার বাবার মত, ঝালমুড়ির কাগজটাও আগ্রহ নিয়ে পড়ে। সেই ছেলে আর বই পড়ে না। এটা অসম্ভব!

কোথাও একটা সমস্যা হয়েছে। ছাত্তার খান বুঝতে পারছেন না। উনার বাবা সাঈদ মেম্বর হয়তো পারতেন, তিনি অভিমান করে আছেন। এ বাড়ির কারও সাথে কথা বলেন না। দেখলেই রেগে যান, প্রেসার বেড়ে যায়। তার সাথে আলোচনা করা যায় না।
তিনি মমতাজ বেগমের সাথে এনিয়ে কথা বলেছেন। ওর মা গুরুত্ব দেয়নি। ছেলের পরিক্ষা, এখন আউট বই পড়ে না। এটা ভালো দিক, সে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করছে।

পরিক্ষা শেষে সোহাগ বাড়ি ফিরে এল। আগের মত উচ্ছ্বাস নেই। আগের বাড়ি এসেই মাকে জড়িয়ে চুমু খায়নি, বাবা বাবা করে তোলপাড় করেনি, বাবার আড়তে চলে যায়নি।
এসেই ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। মমতাজ বেগম বিরক্ত হয়েছেন,রাগারাগি করেছেন। ছাত্তার খান কিছুই বলেননি।
সেতারের সূতো কেটে গিয়েছে, নতুন সূতো লাগানো আর লাগিয়ে আগের মত সুর পাওয়া বেশ কষ্টের!

সোহাগ নিজের ঘর থেকে খুব বের হয় না। খাবার টেবিলেও আসে না, ওর খাবার ঘরে দিয়ে আসতে হয়। বেশিরভাগ খাবার ও খায় না। মমতাজ প্রতিনিয়ত অভিযোগ করেন, ওর ঘর থেকে সিগারেটের গন্ধ আসে,কেমন অন্যরকম গন্ধ। ছাত্তার খান কিছু বলেন না, আর ছেলের মাকে বলা হয় না, ছেলে গাজা খায়!

আজকে সোহাগের এইচএসসি রেজাল্টের দিন। ছাত্তার খান, মমতাজ বেগম একটু বেশিই উত্তেজিত। মমতাজ বেগম ছাত্তার খানকে মিষ্টি নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি আসতে বলে দেন।
ছাত্তার খান একগাদা মিষ্টি কিনে দ্রুত বাড়ি ফিরেন। নাতির আজকে রেজাল্ট এই খুশিতে সাঈদ মেম্বর এ বাড়ি আসেন। সবাই সোহাগের ঘরের দিকে যায়।
সোহাগ ঘরে নেই।

বাড়ির পাশে ঝাকবাধা জাম্বুরা গাছটার নিচে তাকে পাওয়া যায়। এদিকটায় কেউ অত আসে না। এদিকে লেবুগাছের ঘন জঙ্গল, গাছের ডালে বড় বড় লেবু ঝুলে আছে। নির্জন ঝোপে টুনটুনির বাসা। ঝোপের আড়ালে মাটিতে পা ছড়িয়ে সোহাগ বসে আছে। টুনটুনি এই অতিথিকে সহ্য করতে পারছে না, ডাকাডাকি করে একবার এডাল, আরেকবার ওডালে যাচ্ছে। ওর সাথে যোগ দিয়েছে দুটো বুলবুলি।
শাপলা পরিক্ষায় ফেল করলে এখানে এসে লুকিয়ে থাকতো!
বাবা,মা, দাদা সবাই ওর কাছে আসে। ও সিগারেট টানছে, টানতেই থাকে, ফেলে দেয় না।

ও সিগারেটে লম্বা করে শেষ টান দিয়ে কথা বলে।
:আমি ফেল করেছি, মা।
মমতাজ বেগম নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না। ছেলের চুলের গোছা টেনে ধরেন।
:কি বলছ এসব? তুমি ফেল করেছ মানে?
:হ্যা, আমি ফেল করেছি। আমিও শাপলা হয়ে গেছি,মা।ব্রেন নাই, সারাদিন পড়ি কিছুই মনে থাকে না! তবে গল্পের বই ভালো লাগে, গল্প মনেও থাকে। একটা গল্প শুনবে।ওহ, তুমিতো আবার গল্পটল্প পছন্দ কর না।
ছাত্তার খান, সাঈদ মেম্বর দ্রুত ওখান থেকে চলে আসেন।

মমতাজ বেগম দাঁড়িয়েই থাকেন। সোহাগ দাঁড়িয়ে মায়ের হাত ধরে, গালে হাত বুলিয়ে আবার কথা বলে।
:মা,তোমাকে আবার অসম্মানের মধ্যে দিয়ে যেতে হল।আমাকেও কি মরে যেতে হবে,মা? আমি পারবো না, শাপলার মত অত সাহস আমার নাই!
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মে, ২০২০ দুপুর ১২:২৩
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হাদীস সংগ্রাহক

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৭ শে মে, ২০২০ দুপুর ১২:২৬



হাদীস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন মুসলমানদের জন্য।
যদিও দুষ্টলোকজন হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা করে থাকেন। তাতে সমাজে বিরুপ প্রভাব ফেলে। ইসলামকে আঁকড়ে ধরতে হয় মহাগ্রন্থ আল কুরআন এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)... ...বাকিটুকু পড়ুন

গুড ওল্ড নাইন্টিজ

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ২৭ শে মে, ২০২০ বিকাল ৪:৪২



আমরা গল্প করছিলাম সাত্তার মিয়ার চায়ের দোকানে বসে। সাত্তার মিয়া জঘন্য চা বানায়। আমার বন্ধু সোবহানের মতে এই চা ঘোড়ার মুতের সমতূল্য। সাত্তার মিয়ার সামনেই এসব আলোচনা করা হয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাহায্যও নাকি আবার বেআইনী হয়? দুনিয়ার ম্যাঁওপ্যাঁও

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৭ শে মে, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:২২



আমি কুইন্স বরোর সীমানার সাথে লাগানো, লংআইল্যান্ডের একটা এলাকায় বেশ কিছু সময় চাকুরী করেছিলাম; এক সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পথে এক সাদা রমনীকে সাহায্য করে, ধন্যবাদের বদলে হুশিয়ারী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি নিয়ে আসলে রাজনীতি করেছে কারা, ছবির জন্য নামাজ পড়িয়েছে কারা

লিখেছেন গুরুভাঈ, ২৭ শে মে, ২০২০ রাত ৮:২৪



ছবি দেখুন। আমাদের যে ছবিটা দেখানোর জন্য এই নামাজের আয়োজন করা হয়েছে আমরা শুধু সেই ছবিটাই দেখেছি এবং অনেকে দ্বিদ্ধানিত আছি এই ভেবে যে হয়ত আসলেই শুকনা জায়গা ছিলোনা বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেমন কাটালাম এবারের ঈদ!

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৭ শে মে, ২০২০ রাত ৯:১৩

(পোস্টটা গতকালের লেখা)

গতকাল পবিত্র ঈদুল ফিতর গত হয়ে গেল! মনের মাঝে আনন্দ বিষাদের বিচিত্র সব অনুভূতি খেলা করে চলছিল সেই সকাল থেকেই। এবারের রোযার মাসটা আল্লাহতা’লার অশেষ রহমতে খুব ভাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×