somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জন্মান্তর (উপন্যাস: পর্ব-এক)

০৩ রা জুলাই, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২০১৬ সালে ‘জন্মান্তর’ উপন্যাসটি ‘সাইমুম’ নামে ধর্মকারী ব্লগে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং ২০১৭ সালে ইস্টিশন ব্লগে ই-বুক প্রকাশিত হয়। উভয় ক্ষেত্রেই আমি ছদ্মনাম ‘উজান কৌরাগ’ ব্যবহার করেছিলাম। উপন্যাসটি নিজের ব্লগে সংরক্ষণ রাখতে এবার স্ব-নামেই আত্মপ্রকাশ করছি। পুনরায় সম্পাদনায় উপন্যাসের কিছু জায়গা সংশোধন করা হয়েছে।



উৎসর্গ

মুক্তমনা অগ্রজ এবং অনুজপ্রতিম কলমযোদ্ধাদেরকে- যারা সত্য প্রকাশের জন্য, মানুষকে যুক্তিবাদী এবং বিজ্ঞানমুখী করার জন্য, সমাজের ধর্মীয় কু-সংস্কার দূর করে এক সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করে কলমযুদ্ধ চালানোর কারণে কেউ রাষ্ট্র কর্তৃক বিদেশে নির্বাসিত হয়েছেন, কেউ কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন, কেউবা ইসলামী মৌলবাদীদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন-

কবি দাউদ হায়দার

তসলিমা নাসরিন

শাহাজাহান বাচ্চু

সামসুজ্জোহা মানিক

অভিজিৎ রায়

অনন্ত বিজয় দাস

রাজিব হায়দার

নিলয় নীল

ওয়াশিকুর রহমান বাবু

জুলহাস মান্নান

এবং

মাহবুব তনয়





শোক

ধর্মীয় উন্মাদনা-হানাহানির এই যুগে মুক্তচিন্তায়-বিজ্ঞানে-যুক্তিতে পিছিয়ে থাকা কু-সংস্কারাচ্ছন্ন জনগোষ্ঠীকে আলোর পথ দেখানো এবং মুক্তচিন্তার প্রসারের জন্য ধর্মগ্রন্থের মিথ্যা কল্পকাহিনীতে ভরা অন্ধকার দিকগুলো বিজ্ঞান ও যুক্তির মাধ্যমে উন্মোচন করা যেমনি প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন এসব লেখালেখি প্রচারের মাধ্যমেরও। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে বাংলা ভাষায় তেমন মাধ্যম খুবই কম। এর কারণ এই যে অধিকাংশ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ ও কণ্টকাকীর্ণ পথে হাঁটতে চায় না, মানুষ সমাজের বাঁধা রাস্তায় নিরাপদে চলতে চায়।

আবার অনেক নাস্তিক আছেন যারা অ্যাসাইলাম নিয়ে বিদেশে গেছেন, সেখানে গিয়ে নানান আন্তর্জাতিক সেমিনারে বক্তব্য দিয়ে বেড়াচ্ছেন, নিজের নামে ব্লগ খুলে আত্মপ্রচারে মেতেছেন, অন্য মুক্তমনাদের প্রতি ঈর্ষাবাণ ছুড়ছেন। নিজেদের মধ্যে বিভেদের দেয়াল তুলে ভাবছেন, ‘মুই কী হনুরে’! আমাকে দেখ, আমাকে জানো, আমার লেখা পড়, মুক্তচিন্তায় আমি-ই এগিয়ে; এই হামবড়া ভাবটি যে ঈর্ষাকাতর-আত্মলোভী ধার্মিক মন আর উদার-উন্মুক্ত নাস্তিক মনের ব্যবধান অনেকটাই ঘুচিয়ে দিয়েছে সেই ব্যাপারে তারা অসচেতন। মোট জনসংখ্যার বিচারে এমনিতেই মুক্তমনা নাস্তিকদের সংখ্যা কম, সুতরাং এখন বিভেদের সময় নয়, নয় আত্মম্ভরিতার সময়; এখন সময় সকল মুক্তমনাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার, অন্ধকারে পড়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে আলোর পথ দেখানোর, তাদের অন্তরে বিজ্ঞান-চেতনা ঢুকিয়ে দেবার। আফসোস, অনেক ক্ষেত্রেই সেটা হচ্ছে না; অধিকাংশ বাঙালি মুক্তমনা নাস্তিক হলেও, এমনকি প্রবাসে গেলেও সে তার ফেলে যাওয়া সমাজের প্রথাগত চিন্তার বৃত্ত থেকে বেরোতে পারছে না।

এই জায়গায় ব্যতিক্রম ছিলেন মাহমুদুন নবী (ছদ্ম নাম)। প্রবাসে বসেও নিজে লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে ধর্মকারীর মতো একটি মুক্তচিন্তার প্রদীপ তিনি জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, কোনো আত্মরম্ভিতা তার মধ্যে ছিল না। চাইলে ছেড়ে যাওয়া বাংলাদেশ এবং সমাজের কু-সংস্কারাচ্ছন্ন মানুষকে নিয়ে না ভেবে আর পাঁচজন প্রবাসীর মতো আরামে-সুখে-স্বাচ্ছন্দে জীবন পার করতে পারতেন, কিন্তু তা চাননি তিনি। প্রবাসে বসেই তার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে চেয়েছিলেন নিজ জন্মভূমির মানুষকে আলোকিত করতে, বিশ্ববীক্ষা-মানবিক দীক্ষা দিতে। বাঙালিদের মধ্যে তধাকথিত জনপ্রিয় বা বিখ্যাত মানুষ অনেক জন্মে, যারা অন্ধকারের সাথে পা মিলিয়ে পথ চলে; কিন্তু অন্ধকার তাড়ানোর মতো মানুষ খুব বেশি জন্মে না। অন্ধকার তাড়িয়ে আলোকিত সমাজ গড়ার লক্ষেই বিদেশে থেকেও গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে মাহমুদুন নবী একাই চালাতেন ‘ধর্মকারী ব্লগ, যা সারা বিশ্বের বাঙালি মুক্তমনাদের জন্য একটি আদর্শ প্ল্যাটফর্ম। দূর্ভাগ্য আমাদের, ২০১৭ সালের ১৯ মে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

আমার কাছে তিনি ‘মাহমুদুন নবী’ আর ‘ধর্ম পচারক’ নামেই পরিচিত ছিলেন। ২০১৬ সালে এই উপন্যাসটি ধর্মকারী ব্লগে ‘সাইমুম’ নামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়, আমি নিজেও ‘উজান কৌরাগ’ ছদ্মনাম ব্যবহার করেছিলাম। নবী ভাই কখনো জানতে চাননি যে উজান কৌরাগ নামের আড়ালের মানুষটি কে, তেমনি আমিও জানতে চাইনি তার আসল পরিচয়। শুধু জানতাম তিনি ইয়োরোপ প্রবাসী। এভাবেই আমাদের কথা হয়েছে অনেকদিন।

উপন্যাসটি নিয়ে তিনি খুব উচ্ছ্বসিত ছিলেন, প্রত্যেকটা পর্ব খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে পড়তেন, বানান সংশোধন করতেন, তথ্যগত কোনো ভুল বা অসংঙ্গতি থাকলে ঠিক করে নিতেন। লেখালেখির ক্ষেত্রে আমি খুব খুঁতখুঁতে স্বভাবের, বারবার ঘষামাজা করার পরও মনে হয়, আরেকবার ঘষামাজা করা উচিত। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসের ২০ তারিখের মধ্যে চূড়ান্ত সম্পাদিত পাণ্ডুলিপি নবী ভাইকে দেবার কথা ছিল ই-বুক প্রকাশ করার জন্য, দিতে পারি নি। আরো একবার সম্পাদনা করার জন্য বলেছিলাম মে মাসের ১০ তারিখের মধ্যে দেব, তাও দিইনি। কিছু জায়গায় পুনরায় চোখ বুলানোর জন্য আরো দিন দশেক সময় চেয়েছিলাম। ভাই বললেন, ‘কোনো তাড়া নেই। আপনি সময় নিন, কাজটা যথাসম্ভব নিখুঁত হওয়া দরকার।’

শেষ পর্যন্তু যখন পাণ্ডুলিপি পাঠাই, তখন আর তার কোনো সাড়া নেই। পরে অন্যদের কাছ থেকে জেনেছি- তিনি আর সাড়া দেবেন না কোনোদিন!

হায় নবী ভাই! এই সময়ে আপনার মতো মুক্তচিন্তার মশালধারী মানুষের ভীষণ প্রয়োজন।



নিবেদন

জন্মান্তর’র মতো একটি উপন্যাস লেখা কেবল আমার জন্যই নয়, পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তের যে-কোনো ভাষার লেখকের জন্যই একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। কেননা পৃথিবীতে এখন প্রায় ১৬০ কোটি মুসলমান, এদের অস্তিত্ব এবং প্রভাব কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। ইসলামের আবির্ভাব, দর্শন, বিশ্বব্যাপী বিস্তার; সর্বোপরি ইসলামের ইতিহাসের প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে গেলে, এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের বিশ্বাসের মর্মমূলে আঘাত লাগবেই। কিন্তু একথাও সত্য যে কেউ আঘাত পাবে বলে ইতিহাস তো আর বদলানো সম্ভব নয়, আবার প্রকৃত ইতিহাস ধামাচাপা দেওয়াটাও অনুচিত। যদিও সর্বকালেই ইতিহাস বদলে অন্যায়কে ন্যায়ের আসনে প্রতিষ্ঠা করার একটা মরিয়া প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়, বিশেষত বাঙালী সমাজে।

মুসলমানরা যেখানে তাদের ধর্ম এবং ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে যৎকিঞ্চিৎ সমালোচনাই সহ্য করতে পারে না, সেখানে রূঢ়-কঠিন সত্য যে তারা সহ্য করবে না সে বিষয়ে কোনো সংশয় নেই। ফলে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে বসে যে কেউ ইসলাম সম্পর্কে সত্য কথা লিখলে তার প্রাপ্তির ঝুড়িতে বিপুল সংখ্যক মুসলমানের ঘৃণা জুটবে, মানসিক নিপীড়ন সইতে হবে, এমনকি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত বা খুন হবার হবার সম্ভবনাও প্রবল। আর অতীত অভিজ্ঞতায় জানি যে বাংলাদেশে বসে ইসলামের বিরুদ্ধে লেখা আর বিষাক্ত কিং কোবরা নিয়ে খেলা করা একই কথা!

তারপরও আমি ‘জন্মান্তর’ কেন লিখলাম? লিখলাম বিবেকের তাড়নায়; গত চৌদ্দশো বছর ধরে আল্লাহ ও ইসলামের নামে মানবজাতির ওপর মুসলমানদের অমানবিক নির্যাতন-নিপীড়ন, হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে। জানি এতে করে নিজের জীবনে সংকট এবং সংঘাত ডেকে আনলাম, জীবন বিপন্ন করলাম; কিন্তু উপন্যাসটি লিখতে পেরে আমি দারুণ মানসিক শান্তি পাচ্ছি। একদা বর্বর মুসলমানরা ভারতবর্ষ তছনছ করে ফেলেছিল; খুন-ধর্ষণ তো বটেই ধ্বংস করেছিল ভারতবর্ষের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্পকলা, শিক্ষাব্যবস্থা ইত্যদি। যারা মুসলমানদের এই নির্মম বর্বরতার শিকার হয়েছিলেন তারা আমাদেরই পূর্বসুরি, পূর্বসুরির ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করা তো উত্তরসুরির নৈতিক দায়িত্ব, খুব সামান্য হলেও আমি সেই দায়িত্বটি পালন করতে চেয়েছি। তাছাড়া এই ধর্মটি যেভাবে মানবসভ্যতার ক্ষতি করেছে এবং এখনো করছে, যেভাবে মানুষের জীবনযাপনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে; তা থেকে পরিত্রানের উপায় ধর্মটিকে নির্বাসনে পাঠানো। আর তার জন্য প্রয়োজন মানুষকে সচেতন করা, খুঁচিয়ে মানুষের ঘুমন্ত বোধকে জাগানো; আমি সেই কাজটিই করতে চেয়েছি, আর কাজটি শেষ করতে পেরে সত্যিই আমি দারুণ শান্তি পাচ্ছি।

একজন লেখকের জীবনে অগনিত পাঠকের গালভরা প্রশংসা, তুমুল জনপ্রিয়তা, লক্ষ লক্ষ টাকা রয়্যালিটি, দেশি-বিদেশী রাশভারী পদক; এসবের চেয়ে এই মানসিক শান্তিটুকুর মূল্য অনেক বেশি এবং প্রয়োজনীয়; লেখক হিসেবে আমি অন্তত তাই মনে করি। সত্যকে পাশ কাটিয়ে, সমাজের নানান জাতি-গোষ্ঠী এবং শ্রেণির অন্ধ বিশ্বাসে আঘাত না দিয়ে, তাদের মন যুগিয়ে লিখে লেখক হিসেবে যেমনি দ্রুত নাম করা যায়, তেমনি প্রচলিত স্রোতে জীবনটা ভাসিয়ে সবরকম ভাবে উপভোগও করা যায়; চাইলে হয়তো আমিও তা পারতাম, কিন্তু তাহলে নিজের কাছে আমি কোনোদিনই মানুষ হয়ে উঠতাম না। এখন হয়তো অনেকেই আমাকে ঘৃণা করবে, গালমন্দ করবে, কেউ কেউ অমানুষও বলতে পারে; তাতে আমার কিছু যায়-আসে না, কেননা আমি তো নিজের কাছে মানুষ হতে পেরেছি, অকপটভাবে সত্য বলার জন্য নিজেকে ভালবাসতে পেরেছি। নিজের কাছে নিজে মানুষ হওয়া এবং নিজেকে নিজে ভালবাসতে পারাই এই মানবজীবনে আমার শ্রেষ্ঠ অর্জন। এই অর্জনটুকু সারাজীবন ধরে রাখতে চাই, এই অর্জনটুকু নিয়েই বাকি জীবন বাঁচতে চাই।

২০১৭ সালে উপন্যাসটি ‘সাইমুম’ নামে আমার ‘উজান কৌরাগ’ ছদ্মনামে ই-বুক প্রকাশিত হয় ইস্টিশন ব্লগে এবং ২০১৬ সালে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ধর্মকারী ব্লগে, সে-সময় যে-সকল পাঠক আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

মুক্তচিন্তার জয় হোক, মানবতার জয় হোক।



মিশু মিলন



***********************************************

এক



ঘর-বাড়ি এবং গাছপালা মাথায় সাদা পাগড়ি পরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে; ভিন্ন ভিন্ন বয়সের কয়েকজন মানুষ মাথায় সাদা পাগড়ি পরে হাঁটছে; একটা গাধা আর দুটো রোমশ ভেড়ার পিঠে সাদা কাপড় আর মাথায় সাদা টুপি, সবুজ ঘাস খুঁজছে ওরা, কিন্তু ঘাস পাবার উপায় নেই, তাবৎ ঘাস যে সাদা চাদরাবৃত! আসলে পাগড়ি, টুপি, কাপড় কিংবা চাদর নয়; ধবধবে সাদা তুষাররাশি! পাহাড়, গাছপালা, পাহাড়ের কোলঘেঁষা ঘর-বাড়ি, মানুষ, গাধা এবং ভেড়া সকলের ওপরই নিরন্তর বর্ষিত হচ্ছে মিহি দানার সাদা তুষার; আর তুষারাবৃত পথে হাঁটছি আমি, আমার গায়ে-মাথায়ও তুষার পড়ছে, ঠান্ডায় নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে, কিন্তু দারুণ উপভোগ করছি এই শুভ্র-শীতল পরিবেশ। পাহাড় বেয়ে, রাশি রাশি তুষার মাড়িয়ে আমি ক্রমশ ওপর দিকে উঠছি; যতো ওপরে উঠছি ততো ঠান্ডা উপভোগ করছি। চারিদিকে সুনসান নীরবতা, উত্তরে হাওয়ায় ভেসে নিঃশব্দ আদরের মতো ঝরে পড়ছে তুষার। আর তারই মধ্যে বেজে ওঠে বেতাল-বেমানান দড়াম দড়াম শব্দ! প্রথমে দড়াম দড়াম, তারপর সাথে সঙ্গত দেয় পোঁ পোঁ, এরপর টুং টাং!

অচৈতন্যকাল পেরোলেও আমার অর্ধচৈতন্যজুড়ে রয়েছে বিস্তীর্ণ তুষারাবৃত জনপদ। শব্দ ক্রমশ কাছে আসতে থাকে, টুংটাং শব্দটা আর নেই, শ্রবণেন্দ্রিয়ে শুধু দড়াম দড়াম আর পোঁ পোঁ শব্দ। কিন্তু জোরালো শব্দের দাপটে অধচৈতন্য থেকেও আমার পতন হয় চৈতন্যে, তুষারাবৃত পাহাড়ী জনপদ থেকে আমি ধপাস করে গড়িয়ে পড়ি সমতলে; তাও কোনো সবুজ জনপদের খোলা প্রান্তরে নয়, কংক্রিটের আবর্জনাময় ঢাকা শহরে, অনুভব করি যে আমি শুয়ে আছি বাঁ-দিকে কাত হয়ে আমার রোজকার বিছানায় কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে; আর চোখ খুলে দেখি পর্দার ফাঁক গলে রাস্তার লাইটের সরু একফালি আলো অন্ধকার ঠেলে রেখার মতো আমার গায়ের ওপর দিয়ে মশারি ফুঁড়ে বুকশেলফে পড়েছে! কোথায় সেই মিহি দানার শুভ্র-শীতল তুষার, কোথায় তুষারাবৃত ঘর-বাড়ি আর কোথায়ই-বা শরীর কাঁপানো উত্তরে শীতল বাতাস? মশারির মধ্যে তীব্র গরমে আমার গায়ের পাতলা গেঞ্জি ভিজে লেপটে রয়েছে শরীরের সাথে, মাথার বাঁ-দিকের চুল ভেজা, গলা-ঘাড়ে প্যাচপেচে ঘাম, কপালে-মুখে ঘাম, ঘামে বালিশ ভিজে চপচপ করছে; অথচ একটু আগেই আমি কিনা তীব্র শীত উপভোগ করতে করতে সাদা তুষাররাশির ভেতর দিয়ে হাঁটছিলাম! স্বপ্নের কী ছিরিছাঁদ!

অবশ্য স্বপ্নের আর কী দোষ, দোষ তো আমার মনের, আমার অদ্ভুতুরে কল্পনাশক্তির! অতিরিক্ত গরম পড়লে মশারির কুঠুরির মধ্যে শোবার পর এই অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে মনটাকে সরানোর জন্য ঘামতে ঘামতে কল্পনা করতে থাকি যে আমি আদতেও এই গরম সমতলে নেই, আমি আছি হিমালয়ের পাদদেশের কোনো পাহাড়ি জনপদে, যেখানে-অবিরাম তুষার পড়ে, ঠান্ডা বাতাস হাড় কাঁপায়, আর আপনা-আপনিই পাওয়া যায় মেঘের নিবিড় স্পর্শ! এমন অবাস্তব কল্পনা করতে করতেই একসময় ঘুমিয়ে পড়ি আমি, তীব্র গরমে আমার ঘুমানোর এ এক মস্ত মহৌষুধ! গ্রীষ্ম কী ভাদ্রের অসহনীয় গরমের দুপুরেও আমি ইউটিউবে বৃষ্টির শব্দ ছেড়ে দিয়ে ঘামতে ঘামতে পড়ি কিংবা কাজকর্ম করি আর ভাবি- আহা, কী বৃষ্টি, কী শীতল বৃষ্টি!

ঘুমানোর আগে জেগে জেগে অমন অতি কাল্পনিক স্বপ্ন দেখছিলাম বলেই হয়তো সেই শান্তিময় টুকরো টুকরো ছবিগুলো ঘুমের মধ্যেও স্বপ্ন হয়ে এসেছে!

স্বপ্নটা অলীক হলেও শব্দটা কিন্তু বাস্তব সত্য, যেন শান্তিময় সমতল কিংবা পাহাড়ি প্রকৃতিতে হঠাৎ আবির্ভূত হওয়া কালবৈশাখী! না, এ কালবৈশাখী নয়; সাইমুম, মরুভূমির সাইমুম ঢুকে পড়েছে জল-জঙ্গলের দেশে! বালিশে কান পাতলে শব্দটা আরো তীব্রভাবে আঘাত করে শ্রবণেন্দ্রিয়ে; বীভৎস দড়াম দড়াম, পোঁ পোঁ আর টুংটাং শব্দের সঙ্গে মানুষের চিৎকারও স্পষ্ট কানে আসে। শব্দের উৎস এবং উপলক্ষ্য আমার কাছে পরিষ্কার। ভীষণ বিরক্তিকর আর আপত্তিকর হলেও শান্তিময় ঘুমের মাঝে এই শব্দের সাইমুম বাধ্য হয়েই মেনে নিতে হয় আমাকে, আমার মতো আরো অনেককে। অন্ধকারে হাতরে মোবাইলটা হাতে নিয়ে সুইচ অন করে দেখি আড়াইটা বাজে, গরম আর শব্দের তীব্রতায় বিছানায় উঠে বসি। ফ্যানের বাতাস অর্ধেকটাই আটকে দেয় মশারি। মশারি খুলে রাখলে গায়ে বেশ বাতাস লাগে, এমন চটচটে ঘাম হয় না শরীরে। কিন্তু সে উপায় নেই; মা-মেয়ে, খালা-ফুফু, দাদী-নানী-নাতনি ইত্যাদি নিয়ে শরীরে হামলে পড়ে লেডি মশার দল। লেডি না ছাই, হতচ্ছাড়ীর দল! হতচ্ছাড়ীর ঝাড় তোদের ডিম নিষেক, বংশগতি ঠিক রাখার জন্য থ্রিওনিন নামক অ্যামাইনো এসিড দরকার যা স্তন্যপায়ী প্রাণির রক্তে বিদ্যমান; বেশ ভাল কথা, তা বলে তোরা রাতের বেলা জোট পাকিয়ে কামড়াতে আসবি, মানুষকে ঘুমোতে দিবি নে! হতচ্ছাড়ীর ঝাড় তোদের তো সকাল আটটায় ক্লাস ধরতে হয় না, তোরা কী করে বুঝবি গরমে সারারাত না ঘুমিয়ে সকাল আটটায় ক্লাসে যাওয়ার কষ্ট! ও রাতে গরমে ঘুমাতে পারি না, এ রাতে যাও-বা একটু ঘুমাই আজ থেকে তারও পোয়া বারো; শুরু হলো মাঝরাত্তিরে শব্দ দূষণ! মশারিটা উচু করে চটজলদি বিছানা থেকে নিচে নামি। চটজলদি না নেমে কী উপায় আছে? হতচ্ছাড়ীর দল পররাষ্ট্রনীতিতে তুখোর, আমেরিকার সম পর্যায়ের, মুহূর্তেই মশারির ভেতরে সেঁধিয়ে পড়তে পারে!

বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। উহ, সাইমুম, শব্দের সাইমুম! বাপরে বাপ, কী শব্দ! কী বাজায় ওরা? তিনতলার বারান্দা থেকে গলিতে তাকাতেই মূর্তিমান ছয়জন শব্দদৈত্যগুলোকে দেখতে পাই রাস্তার লাইটের আলোয়; যারা বংশপরম্পরায় মস্তিষ্কের কোষে বহন করছে সাইমুম, বুকে ধারণ ও লালন করছে সাইমুম! দুজনের হাতে দুটো জলের জার, তারা বাঁ-হাতে জারের গলার কাছটায় ধরে ডানহাতের চ্যালাকাঠ দিয়ে দুদ্দাড় পেটাচ্ছে; দুজনের হাতে দুটো ছোট ভুভুজেলা, অল্প বিরতি দিয়ে তারা বাজাচ্ছে; বাকি দুজনের মধ্যে যার হাতে সরু লাঠি সে লাইটপোস্টে বারি মারছে, অন্যজন শুধু সাথে গলা মিলাচ্ছে, ‘সেহেরি খাওনের সময় অইচে, উইঠ্যা পড়েন’! ছয়জনের মধ্যে চারজন আমার মুখচেনা; আমাদের ব্লকের নয়, ডি ব্লকে কয়েকটা টিনশেড বাড়ি আছে, ওখানেই থাকে ওরা। তিনজনের উদোম শরীর, পরনে লুঙ্গি; দু’জনের গায়ে জামা, পরনে হাফপ্যান্ট; একজনের গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি, পরনে হাফপ্যান্ট। ওরা অনর্গল শব্দ আর চিৎকার করতে করতে এগিয়ে যায় গলির আরেক মাথার দিকে, তীরের ফলার মতো শব্দ আঘাত হানে আমার মস্তিষ্কে। শব্দের সাইমুমে আমার শ্রবণানুভূতি আহত, আমি বিরক্ত-ক্ষুব্ধ; আমার দৃষ্টি শরের মতো বিদ্ধ হয় জাগনদার দলের পিঠে, আচমকাই আমার মুখ থেকে উচ্চারিত হয়, ‘অসভ্য বর্বরের দল!’

রাত আড়াইটা বাজে; এটা মধ্যযুগ নয়, ঊনবিংশ কিংবা বিংশ শতাব্দীও নয় যে এমন বীভৎস শব্দ সৃষ্টি করে সেহেরি খাওয়ার জন্য মানুষকে জাগিয়ে দিতে হবে। প্রত্যেকটা বাড়িতে ঘড়ি-মোবাইল আছে; তাতে এলার্ম দিয়ে রাখা যায়। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে ‘জাগনদার’ শব্দটা বড্ড সেকেলে; জাগনদারদের কাজটা অনেকের কাছে ভীষণ বিরক্তিকর আর অভদ্রচিতও বটে। যখন বাড়িতে বাড়িতে ঘড়ি-মোবাইল ছিল না, তখন হয়তো ধার্মিক মুসলমানদের জাগাতে এর প্রয়োজন ছিল। তখন জীবনও আজকের মতো এতোটা গতিময় এবং জটিল ছিল না; সকাল পাঁচটা-ছয়টায় ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়ো করে প্রস্তুত হয়ে মানুষকে ছুটতে হতো না যানজট পাড়ি দিয়ে অফিস কিংবা ক্লাসের উদ্দেশ্যে।

এই রাত আড়াইটার সময় সবার ঘুম ভাঙানোর কোনো মানে হয় না, কেননা সবাই রোজা থাকে না। শিশুরা রোজা থাকে না, বেশিরভাগ বাল্য-কৈশোরের ছেলেমেয়েরা রোজা থাকে না, অনেক অতিবৃদ্ধ কিংবা অসুস্থ মানুষও রোজা থাকে না, অনেকে এমনিতেই রোজা থাকে না, এছাড়া অন্যান্য ধর্মের কিংবা ভিন্ন মতাদর্শের মানুষও রোজা থাকে না। অবশ্য অন্যান্য ধর্মের কিংবা ভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে এদেশের অধিকাংশ সংখ্যাগুরু মুসলমান গণনার মধ্যেই ধরে না; তাদেরকে দয়া-দাক্ষিণ্য আর করুণার পাত্র ভাবে! সংখ্যালঘু সম্প্রদায় অথবা আলাদা মতাদর্শী মানুষকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে পীড়ন না করে কিংবা তাদেরকে বিরক্ত না করে কীভাবে একসাথে পাশাপাশি চলতে হয় তা এদেশের অধিকাংশ সংখ্যাগুরু মুসলমানই জানে না। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যাতে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষের আচরণে আঘাতপ্রাপ্ত না হয়, তাদের সংকট কিংবা অসুবিধার জায়গা চি‎হ্নিত এবং তার সমাধান যে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়েরই করা উচিত সেই সহবত এদেশের বেশিরভাগ মুসলমানের নেই। এরা পথে-ঘাটে হাঁটে-চলে, অফিস-আদালত করে, খেলাধুলা-শরীরচর্চা করে, শরীয়ত বিরোধী হলেও অনেকে গান-বাজনা করে, সাহিত্যচর্চা করে; কিন্তু অধিকাংশেরই বুকের মধ্যে সর্বক্ষণ থাকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বা ভিন্ন মতাদর্শী মানুষের প্রতি এদের কথাবার্তা, আচার-আচরণের মাধ্যমে প্রায়শই প্রকাশ পায়। তাতে সংখ্যালঘু বা ভিন্ন মতাদর্শী মানুষের হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়ে তারা মানসিক যন্ত্রণায় ছটফট করলেও বেশিরভাগ মুসলমান-ই কেউ প্রকাশ্যে কেউবা নীরবে বিপুল আনন্দ অনুভব করে!

জাগনদার দলটি আমাদের গলি থেকে অন্য গলিতে প্রবেশ করায় শব্দের দাপট কিছুটা কমে। বাথরুমে গিয়ে প্রসাব সেরে গায়ের ভেজা গেঞ্জিটা খুলে ফেলি, ট্যাপ ছেড়ে হাত-মুখ, গলা-ঘাড়-বুক ধুয়ে ফ্যানের নিচে এসে দাঁড়াই, গামছা দিয়ে মুছতে থাকি গা-মুখের জল। খাটের পায়ার কাছে রাখা ওয়ার্টার্ পট হাতে নিয়ে কয়েক ঢোক জল পান করি আর সঙ্গে সঙ্গেই নৈঃশব্দে শব্দচাপাতির আঘাত হানে মসজিদের মাইক-‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। সম্মানিত রোজাদার ভাই ও বোনেরা, এখন রাত দুইটা বেজে চল্লিশ মিনিট, এখন রাত দুইটা বেজে চল্লিশ মিনিট, সেহেরি খাওয়ার শেষ সময় তিনটা আটত্রিশ মিনিট, সেহেরি খাওয়ার শেষ সময় তিনটা আটত্রিশ মিনিট। সেহেরি খাওয়ার সময় হয়েছে, সেহেরি খাওয়ার সময় হয়েছে, আপনারা উঠুন, সেহেরি খেয়ে নিন।’

সালাম বাদে বাকিটুকু এভাবে আরো দু-বার বলার পর কিছু দোয়া-দরুদ পড়ে, অতি আবেগে আল্লাহ প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে একটা ইসলামী গানও গায়, তারপর শব্দচাপাতি শান্ত হয়। হাতের গামছাখানা বারান্দার তারে মেলে দিয়ে আমি পুনরায় ঘরে এসে ফ্যানের নিচে দাঁড়াই; মশারির বাইরে বেশ বাতাস লাগে গায়ে, কিন্তু হতচ্ছাড়ী মশাগুলোর জন্য এই বাতাসটুকু উপভোগ করার উপায় নেই। এরই মধ্যে পায়ে দু-বার হুল ফুটিয়েছে। আমার আবার অ্যালার্জির সমস্যা আছে, মশার কামড়ে খুব চুলকায় আর চুলকালে সে জায়গাটা লালচে চাকাকৃতি হয়ে যায়। মানুষ নাকি আশরাফুল মাকলুকাত, আল্লাহ’র সৃষ্টির সেরা জীব; তো সেই সৃষ্টির সেরা জীবকে সৃষ্টির নগন্য এক জীব দ্বারা কামড় খাওয়ানোর কোনো মানে হয়! আল্লাহ নাকি খুব দয়ালু, তাহলে তিনি স্তন্যপায়ী প্রাণিদের মশার কামড়ের কষ্ট না দিয়ে স্ত্রী মশার ডিম নিষেকের জন্য রক্তের বদলে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা করতে পারতেন না! না, বাইরে থাকলে আরো কামড়াবে, আমি আবার মশারির ভেতর প্রবেশ করি। বালিশের ঘামে ভেজা পাশটা উল্টে দিয়ে মাথা রাখি। ম্যাজিক মশারি নামে এক প্রকার পাতলা মশারি বেরিয়েছে, ফ্যানের বাতাস নাকি আটকায় না, একটা কিনতে হবে দেখছি।

দরজার নিচ দিয়ে ডাইনিংয়ের আলো দেখতে পাই, রান্নাঘর থেকেও শব্দ ভেসে আসে কানে; তার মানে মা উঠে সেহেরি তৈরি করছেন। আর কিছুক্ষণ পরই উঠবে অন্যরা; মানে-বাবা, দাদী আর ছোট আপু। দোতলা থেকে আসবে চাচা-চাচী আর দুই চাচাতো বোন; বাড়িতে থাকলে চাচাতো ভাইও আসতো, কিন্তু সে বাড়িতে নেই, দিন পনের আগে চিল্লায় গেছে। চারতলা থেকে আসবে মেজো ফুফু-ফুফা, ফুফাতো বোন; ফুফাতো ভাইটা আবার কানাডায় থাকে। রোজার প্রথম দিন সবার জন্য সেহেরি এবং ইফতারের বিশেষ আয়োজন আমাদের বাসাতেই করা হয়, এটা আমার বাবার নির্দেশ। অবশ্য সকলের প্রতি নির্দেশ হলেও চাচার প্রতি বাবার অনুরোধ বা আবদার বলাই ভাল। কারণ বয়সে দশ বছরের বড় হলেও বাবা চাচাকে নির্দেশ দিতে পারেন না, বরং চাচাই বাবাকে নির্দেশ দেন। সবার সঙ্গে বাবা কঠোর এবং ব্যক্তিত্বপূর্ণ আচরণ করেন, এমনকি মেজো ফুফাকেও ধমকান; কিন্তু এই বাবাই আবার চাচার সামনে কেমন যেন অপরাধী বালকের মতো আচরণ করেন। সেই হিসেবে বলা যায় দাদীর পরে চাচাই আমাদের বাড়ির অভিভাবক, সবাই তাকে মান্য করে, ভয় করে; কেবল আমি ছাড়া। চাচার ভাষায় আমি কুলাঙ্গার নাস্তিক, বংশের কলঙ্ক, বেতমিজ, গুনাহগার!

আবার শব্দচাপাতি আঘাত হানে শ্রবণেন্দ্রিয়ে, ‘সেহেরির আর মাত্র চল্লিশ মিনিট বাকি আছে, সেহেরির আর মাত্র চল্লিশ মিনিট বাকি আছে, আপনারা উঠুন, সেহেরি খেয়ে নিন। সেহেরির আর মাত্র চল্লিশ মিনিট বাকি আছে, সেহেরির আর মাত্র চল্লিশ মিনিট বাকি আছে, আপনারা উঠুন, সেহেরি খেয়ে নিন।’

এরই মধ্যে আবার আমার গলা ঘেমে গেছে, কী অসহনীয় গরম! এই গরমে ঘুম ভাঙলে আমার আর সহজে ঘুম আসতে চায় না। অনেকে এই ভীষণ গরমেও শোয়া মাত্রই ঘুমাতে পারে, আমি পারি না। আমার বন্ধু জাহিদের কথাই বলি, ওকে বোধহয় আটত্রিশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রোদে ফেলে রাখলেও শোয়া মাত্রই ঘুমাতে পারবে; তাবৎ মশার গুষ্টি ওকে ঘিরে কীর্তন কিংবা সাম্বা ডান্স করলেও ওর ঘুমের কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না! আমি ওভাবে ঘুমাতে পারি না, ভাল ঘুমের জন্য একটু আরামদায়ক পরিবেশ দরকার হয় আমার।

এ বছর মার্চ আর এপ্রিলের শুরুর দিকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে ঢাকাসহ সারাদেশে, তারপর থেকে চলছে খরা। ঢাকা শহর যেন জ্বলছে, বাতাসে আগুনের আঁচ! ঢাকার আকাশের ওপর দিয়ে লোভ দেখাতে দেখাতে মেঘ ভেসে যায় উত্তর-পূর্বদিকে; সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর প্রভৃতি জেলায় প্রচুর ঝড়-বৃষ্টি হয়; দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতেও ঝড়-বৃষ্টি হয়; সারাদেশে বজ্রপাতে প্রায় একশো মানুষ মারা গেছে। অথচ ঢাকায় ঝড়-বৃষ্টি তো দূরের কথা, বাতাসে গাছের পাতাটাও যেন নড়ে না! দিনের পর দিন, রাতের পর রাত গরমে সিদ্ধ হচ্ছে মানুষ। আমার চাচীর বড়বোন থাকেন সিলেটে, গতকাল বিকেলেও নাকি তিনি ফোন করে চাচীকে ঝড়-বৃষ্টির শব্দ শুনিয়ে বলেছেন, ‘ঢাকা হলো দোজখখানা, গুনাহগারে ভরে গেছে ঢাকা শহর, এই জন্যই আল্লাহ বৃষ্টি দেয় না, গরমে কষ্ট দেয় ঢাকার মানুষরে!’

এই কথাগুলো সন্ধ্যায় চাচী আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে মাকে বলছিলেন, অর্থাৎ আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া যে আমিও একজন গুনাহগার এবং এই অনাবৃষ্টির জন্য আমিও দায়ী। আমি শুধু চাচীকে বলি, ‘চাচী এই যে হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুরসহ নানা জেলায় বজ্রপাতে মানুষ মারা গেছে, এর জন্য দায়ী কে?’

‘কে আবার, তারা নিজেরাই দায়ী; নিশ্চয় তারা গুনাহগার! আল্লাহ বজ্রপাতের মাধ্যমে গুণাহগারকে শাস্তি দেন।’

‘তাইলে তো তিনি এই শাস্তি ঢাকার গুনাহগারদের ওপরও দিতে পারেন!’

এই যে আমার চাচী বললেন যে ‘আল্লাহ্ বজ্রপাতের মাধ্যমে গুণাহগারকে শাস্তি দেন’; এ কিন্তু তার নিজের ভাষ্য নয়, কোরান-হাদিসের ভাষ্য। কোরানে আল্লাহ বলেছে-‘বজ্রনির্ঘোষ ও ফেরেশতারা সভয়ে তাঁর মহিমাকীর্তন করে। আর তিনি বজ্রপাত করেন এবং যাকে ইচ্ছে তা দিয়ে আঘাত করেন। তবু তারা আল্লাহ’র সম্বন্ধে তর্ক করে! আর তিনি তো মহাশক্তিশালী।’ (আল কোরান; সুরা-রা’দ, আয়াত-১৩)।

অথচ কী আশ্চর্য! আমাদের ইসলামী রাষ্ট্রের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবছর বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে! এতো রীতিমতো খোদার ওপর খোদগারি, কোরান অবমাননা!

মনে পড়ে স্কুলের কথা, বৈশাখের এক দুপুরে ধর্ম ক্লাসের সময় প্রচণ্ড বজ্রপাত আর বৃষ্টি শুরু হলে হুজুর স্যার বজ্রপাত সম্পর্কে কোরানের এই কথাগুলোই বলেছিলেন। অথচ তার আগেই বিজ্ঞান ক্লাসে আমরা জেনেছিলাম যে মেঘের উপরিভাগে থাকে ধনাত্মক আয়ন আর নিন্মভাগে থাকে ঋনাত্মক আয়ন। এই ধনাত্মক আয়ন এবং ঋনাত্মক আয়ন একে অপরকে আকর্ষন করে, যখনই একে অপরের সংস্পর্শে আসে তখনই আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়। আবার নানা পদার্থ থেকে ভূ-পৃষ্ঠেও সৃষ্টি হয় ধনাত্মক আয়ন। ফলে ভূ-পৃষ্ঠের অনেকটা কাছাকাছি চলে এলে মেঘের নিন্মভাগের ঋনাত্মক আয়ন আর ভূ-পৃষ্ঠের ধনাত্মক আয়ন একে অপরকে আকর্ষন করে, আর যখন সংস্পর্শে আসে তখন মেঘের ইলেকট্রনগুলো ভূ-পৃষ্ঠে পতিত হয়, ইলেকট্রনগুলো ভূ-পৃষ্ঠে পতিত হওয়ার সময় প্রচুর শক্তি নির্গত হয়, এই শক্তিরই কিছু অংশ আলোক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়; যাকে আমরা বজ্রপাত বলি।

বিজ্ঞান ক্লাসে বিজ্ঞান স্যারের কথা আর ধর্ম ক্লাসে হুজুর স্যারের কথা শুনে আমি তো রীতিমতো ধন্দে পড়ে গিয়েছিলাম। বাসায় এসে চাচার কাছে জিজ্ঞেস করলে চাচা বলেছিলেন-‘হুজুর যেটা বলেছে সেটাই সঠিক। হুজুরের কথা মন থেকে বিশ্বাস করবা। আর বিজ্ঞান স্যার যা বলেছে তা মুখস্ত করে পরীক্ষার খাতায় লিখবা, কিন্তু বিশ্বাস করবা না।’ আমিও এমন বেকুব যে দীর্ঘদিন তাই-ই বিশ্বাস করেছি!

আমাদের স্কুল-কলেজে এই বিপরীতমুখী দ্বৈতশিক্ষাই দেওয়া হয়। যেমন আরেকটি বিষয়-চারুকলা; ইসলামে ছবি আঁকা নিষিদ্ধ, কিন্তু ইসলাম অবমাননা করে চারুকলাকে পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। কিছুদিন আগে এক মজার ঘটনা ঘটেছে, আমাদের পরিবারে তো মজার ঘটনার কোনো অন্ত নেই! আমার চাচাতো বোন ছোটটা হিজাব পরে একটা আর্টস্কুলে আর্ট শিখতে যায়, বাধ্য হয়ে যায় স্কুলের পরীক্ষায় ভাল ফল পাবার জন্য। তো চাচী ওকে শিখিয়ে দেয় স্যারকে বলতে যে স্যার যেন ওকে মানুষের মুখ আঁকা না শেখায়। আমার নাবালিকা বোনটি স্যারকে এই কথা বলার পর স্যার কারণ জিজ্ঞাসা করলে ও জানায় যে, ‘মানুষের মুখ আঁকা হারাম!’ শুনে স্যার ওকে বলে, ‘তাহলে তোমার ছবি আঁকা শেখার দরকার নেই, লেখাপড়াও শেখার দরকার নেই। তুমি বাড়িতে বসে সংসারের কাজকর্ম শেখো।’ বন্ধুদের সামনে স্যার এই কথা বলায় আমার ক্লাস সিক্স পড়ুয়া বোনটি অপমানিত বোধ করে মনে কষ্ট পেয়ে বাড়িতে এসে কান্না জুড়ে দেয়।

স্কুলের পাঠ্যসূচীতে ধর্ম শিক্ষার কী প্রয়োজন? কোনো প্রয়োজন নেই, ধর্ম শিক্ষা বিজ্ঞানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং শিক্ষার্থীদেরকে বিভ্রান্ত করে। এই বিভ্রান্তি নিয়েই শিক্ষার্থীরা বড় হয়, যে কারণে অধিকাংশ লোকই বাকি জীবনে আর এই বিভ্রান্তির জাল থেকে বেরোতে পারে না; ফলে এরা ধর্ম পালন করে, আবার বেশরিয়তি কাজও করে।

ঘুমের রেশ কেটে যাওয়ায় আমার আর ঘুম আসে না, তবে স্বস্তি এই যে কাল ক্লাস নেই, একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠলেও কোনো অসুবিধা হবে না। বাবার গলা শুনতে পাই ডাইনিংয়ে, মায়ের উদ্দেশে কিছু একটা বলেন। মুহূর্ত কয়েক নীরবতার পরই আঙুলের টোকা পড়ে আমার রুমের দরজায়। আমি জানতাম শব্দ হবে, এবং শব্দটা কে করছে তাও জানি- বাবা। আমি মশারি থেকে বেরিয়ে লাইট জ্বালি চোখে আলোটা সওয়ানোর জন্য, নইলে অন্ধকারে দরজা খুলে দিতেই ডাইনিংয়ের লাইটের আলোর প্রভাবে আমার চোখ-মুখ কুঁচকে যাবে, আর কুঁচকানো চোখ-মুখ দেখে বাবা হয়তো ভাববেন যে আমাকে ঘুম থেকে ডাকার জন্যই আমি বিরক্ত হয়ে চোখ-মুখ কুঁচকে তার দিকে তাকিয়েছি। কিন্তু আমি চাই না বাবা এই ভুলটা বুঝুন, তাই লাইট জ্বালিয়ে চোখে আলো সইয়ে তারপর আমি দরজা খুলি। দরজার সামনে দাঁড়ানো বাবা; মাথায় সাদা টুপি, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, পরনে সাদা-কালো চেক লুঙ্গি। একটু কোনাকুনিভাবে দাঁড়ানোয় বাবার বামগালের কাঁচা-পাকা দাড়িতে আর অনাবৃত ত্বকে, এবং কপালের বামদিকে চকচক করে লাইটের আলো; ঘুম থেকে সদ্য জেগে মুখ ধোয়ার কারণে বেশ সজীব লাগে বাবাকে। এমনিতেও বাবা সুদর্শন, পাঁচফুট দশ ইঞ্চি লম্বা, টকটকে ফর্সা গায়ের রঙ, এখনো মাথাভরা কাঁচা-পাকা চুল। সুদর্শন বলেই নাকি মায়ের চেয়ে তেরো বছরের বড় হওয়া সত্বেও মা বাবাকে পছন্দ করেন, বিয়েতে রাজি হন।

বাবা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘হাত-মুখ ধুয়ে এসো, আমাদের সঙ্গে সেহেরি খাও; এবার থেকে রোজা রাখো, আল্লাহ’র পথে এসো।’

আগে বাবা আমাকে তুই করে বলতেন, আমিও বাবাকে আব্বা আর মাকে আম্মা বলে ডাকতাম। গত চার বছর ধরে তাদেরকে বাবা-মা বলে ডাকি। আমি জানি বাবা শব্দটি ফারসি; বরং আব্বা শব্দটিই আরবি বা ফারসি নয়, আরামাইক শব্দ। ছোটবেলা থেকেই আমাদেরকে আব্বা-আম্মা, চাচা-চাচী, নানা-নানি, পানি ইত্যাদি শব্দগুলো শেখানো হয়। বাবা-মা, কাকা-কাকি, জ্যাঠা-জেঠিমা, দিদি, জল এসব নাকি হিন্দুয়ানী শব্দ; এসব শব্দ মুখে বলা বা লেখা নাকি গুনাহ! শব্দের প্রতি তাদের ঘৃণা দেখে আমি ইচ্ছে করেই বাবা, মা, জল এই শব্দগুলো ব্যবহার করতে শুরু করি। পুরো পরিবারের সঙ্গে আমার বিশ্বাসের দ্বন্দ্বে শুরুও তখন থেকেই। তখন থেকেই বাবা-মা’র সঙ্গে আমার মানসিক দূরত্ব বেড়ে যায়, আর বাবা আমাকে তুই’র পরিবর্তে তুমি করে বলতে শুরু করেন। মা অবশ্য এখনো আমার সঙ্গে তুই করেই কথা বলেন। বাবার আর আমার মাঝখানে একটা প্রাচীর গড়ে উঠেছে; ধর্মের প্রাচীর, বিশ্বাসের প্রাচীর। আমার চাচা নিপুণ হাতে আমাদের পিতা-পুত্রের মাঝখানের এই প্রাচীরটা আরো উঁচু করেছেন, প্রাচীরের ওপরে কাঁটাতার স্থাপন করেছেন এবং এখন তা যত্নের সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ করছেন তিনি।

আমি বাবার আলো-ছায়াময় মুখের দিকে তাকাই। মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং টেবিলে কোনো একটা খাবারের বাটি রেখে বাবার মাথার পাশ দিয়ে একবার আমার দিকে তাকিয়ে পুনরায় রান্নাঘরে চলে গেলে বাবা মমতা মাখানো কণ্ঠে আবার বলেন, ‘যাও, হাত-মুখ ধুয়ে এসো, আমার কথাটা রাখো।’

বাবার এই মমতা মাখানো শব্দগুলোর যে অন্তর্গত দ্যোতনা আমার কানে বাজে তা ব্যথা হয়ে আছড়ে পড়ে আমার হৃদয়ে, অপরাধীর মতো চোখ নামিয়ে নিই বাবার চোখ থেকে, যদিও জানি আমি অপরাধী নই। আমাকে একইভাবে নিরুত্তর দেখে এবার বাবা আমার ডান হাতটা তার দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে বলেন, ‘বাবা হিসেবে সবসময় আমি তোমার ভাল চাই, আমার অনুরোধটা রাখো, আমাকে একটু শান্তি দাও।’

বাবার মুখনিশ্রিত প্রতিটি শব্দের গায়ে জড়ানো অনুরোধ, আকুতি, আবদার আর অসহায়ত্ব! বাবা কখনোই এভাবে কথা বলেন না আমার সঙ্গে, এমন কী দাদী এবং চাচার সামনেও তাকে এতোটা অসহায় অবস্থায় দেখিনি কখনো; বাবা যেন অসহায়ত্বের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছেন! বাবার কণ্ঠস্বর শুনে আমার বুক ভেঙে যায়, আমি কি কেঁদে ফেলবো? আমি বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার বাম হাত তার ডান হাতের ওপর রাখি, ‘তোমাকে আর মাকে শান্তি দিতে পারলে আমার চেয়ে সুখী কেউ হবে না বাবা।’

‘শুধু আমার এই অনুরোধটা রাখো, তাহলেই তোমার মা আর আমি শান্তি পাব।’

আমাদের চার হাত এক জায়গায়, আমি আমার দুই হাতের মধ্যে বাবার ডান হাতটা আরেকটু শক্ত করে ধরে বলি, ‘আমাকে ক্ষমা করো বাবা। তুমি আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দাও, তোমাদের সম্মান বাঁচাতে আমাকে মেরে ফেলো, আমি হাসিমুখে সব মেনে নেব, তবু এই অনুরোধটি আমাকে কোরো না। আমি তোমাদের জন্য আমার জীবন দিতেও রাজি আছি, কিন্তু ধর্মের জন্য আমি আমার শিক্ষা এবং জ্ঞান অস্বীকার করতে পারবো না, আমার সত্তাকে অপমান করতে পারবো না। আমি হয়তো তোমাদের যোগ্য সন্তান নই, কোনোদিন হতেও পারবো না; কিন্তু তোমাদের প্রতি আমার ভালবাসার কোনো কমতি নেই, কোনোদিন কমবেও না।’

বাবার পিছনে এসে দাঁড়ান মা, মায়ের চোখ ছলছল করে। বাবা সহজে কাঁদেন না, কিন্তু আমি জানি তার হৃদয় কাঁদে আমার মতো একটা গুনাহগার জন্ম দেবার অপরাধে, পরকালে আমার দোজখ গমনের কথা চিন্তা করে।

বাবা তার অসহায় দুটো চোখ আমার চোখ থেকে নামিয়ে নেন, আমি তার হাতের শিথিলতা অনুভব করে বুঝতে পারি তিনি আমার সামনে থেকে সরে পড়তে চান। অথচ তার হাত ছাড়তে ইচ্ছে করে না আমার, অনেকদিন বাবার এমন নিবিড় স্পর্শ আমি পাইনি; ইচ্ছে করে বাবাকে জড়িয়ে ধরি! কিন্তু বাবা তার বাম হাত সরিয়ে নেন, আমার হাতের মধ্যে তার শিথিল ডান হাত। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমি আমার হাত শিথিল করি, বাবা তার ডান হাতটিও সরিয়ে নেন। আমি তাকিয়ে থাকি তার অসহায় মুখের দিকে, বাবা তার চোখ-মুখের এই অসহায়ত্ব কিছুক্ষণ পরই লুকোতে চাইবেন, অন্যরা আসার আগে হয়তো লুকিয়েও ফেলবেন, কিন্তু আমি জানি তার ভেতরটা বেশ কয়েকদিন যন্ত্রণায় কাতরাবে। কতোবার বলেছি যে, ‘বাবা, পৃথিবীটা মায়ার সংসার, কিন্তু মায়া-মমতারও তো একটা সীমা থাকা দরকার, আমার ইহকালের সুখশান্তি নিয়ে তোমরা চিন্তা করো ঠিক আছে, তা বলে আমার পরকাল নিয়েও তোমরা দুঃশ্চিন্তা করবে! আমার পরকালের ভাবনাটা আমার ওপরই ছেড়ে দাও।’

কিন্তু লাভ হয়নি কোনো, বাবা-মা আমাকে এতোটাই ভালবাসেন যে তারা আমার পরকাল নিয়েও সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন থাকেন।

মা আবার রান্নাঘরে ঢোকেন। বাবা আমার সামনে থেকে চলে যেতে উদ্যত হতেই বলি, ‘বাবা, আমি জানি আমার জন্য তোমরা ভীষণ অসুখী; কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই যদি যার যার বিশ্বাসের জায়গাটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখি, তাহলে আমাদের প্রত্যেকের জীবনই সুন্দর হবে। আমরা সবাই সুখী হবো।’

বাবা কিছুই বলেন না, আমার দিকে তাকানও না, নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ান। কয়েক পা পথ মাত্র, অথচ আমার মনে হয় এই কয়েক পা পথ অতিক্রম করতেই তিনি ভীষণ ক্লান্ত।

বারো বছর আগে বাবার বয়স ছিল আটচল্লিশ বছর, কিন্তু তখন তাকে দেখলে মনে হতো সবে চল্লিশে পা দিয়েছেন; তারপর চাচার প্ররোচনায় যখন থেকে দাড়ি রাখতে শুরু করেন তখন এক ঝটকায় বাবার বয়স যেন বেড়ে যায় দশ বছরেও বেশি! হঠাৎ করেই বাবা যেন বুড়ো হয়ে যান! বাবার বয়স এখন ষাট, সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর বাবা যেন আরো বেশি বুড়ো হয়ে গেছেন। কিন্তু আমি নিশ্চিত জানি এই দাড়িটাই বাবার বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে। দাড়িটা কেটে ফেললেই বাবার বয়স আরো দশ বছর কম মনে হবে, গোঁফহীন দাড়ি বাবার মুখের সঙ্গে একদম মানায়নি। আমার মায়ের থেকে বাবা এমনিতেই তেরো বছরের বড়, দাড়ি রাখার কারণে দু-জনের বয়সের ব্যবধান যেন আরো বেড়ে গেছে। মায়ের সঙ্গে বাবাকে এখন একদমই মানায় না! আমি তো জানি যে ধর্মীয় কারণে বাবা দাড়ি রেখেছেন এবং তা যতো না নিজের ইচ্ছায় তার চেয়েও বেশি চাচার ইচ্ছায়।

আমার দাদাবাড়ির লোকজন মায়ের সঙ্গে বাবার বিয়ের প্রস্তাব উত্থাপন করার পর নানা নাকি বলেছিলেন, ‘ছেলের পরিবার স্বচ্ছল, দেখতে-শুনতে ভাল, সরকারি চাকরি করে; পাত্র হিসেবে উত্তম, তবে ছেলে-মেয়ের বয়সের ব্যবধান তো বেশি, এজন্য কুসুমের মত নেওয়া দরকার, কুসুম রাজি হলে আমার কোনো আপত্তি নেই।’ কুসুম আমার মায়ের ডাকনাম, কাগুজে নাম জাহানারা খাতুন। তো কুসুম তার চেয়ে তেরো বছরের বড় পাত্রের রূপ-বর্ণ দেখে মুগ্ধ হয়ে বিয়েতে রাজি হয়। পনের বছরের কিশোরী কুসুমের সেই প্রিয় পুরুষের রূপের অনেকটাই এখন দাড়ির জঙ্গলে ঢাকা। অবশ্য কুসুমও আর সেই কুসুম নেই, বাবার বাড়ির উদার-সাংস্কৃতিক পরিবেশে খেলাধুলা-ছুটোছুটি করে বড় হওয়া কুসুম শ্বশুরবাড়ির ধর্মান্ধ পরিবেশের সাথে দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে; মাঝের তেত্রিশ বছরে চারটে সন্তানের জন্ম দিলেও টিকে আছে তিনটে, তার নামাজ কখনো কাজা হয় না, বোরকা ছাড়া সে কখনো বাইরে যায় না, ভূমিকম্প হলেও সে বোরকা গায়ে চাপিয়ে তবেই নিচে নামে; এমনকি কুসুম এখন তার বাবার ভুল নিয়েও চুলচেরা বিশ্লেষণ করে, হিন্দু বন্ধু-বান্ধবের সাথে মেলামেশার কারণে তার বাবার আচার-আচরণে নাকি হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি ছিল, ছেলেমেয়েদের সঠিক ধর্মীয় শিক্ষায় মানুষ করেননি, ছোটবেলায় আরবি শিক্ষার পরিবর্তে গানের স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন!

আমার মায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস যে তিনি আরবি ভাষায় কোরান শরীফ পড়তে পারেন না এবং এর জন্য তিনি দায়ী করেন আমার নানাকে। মা কথায় কথায় নানাকে দোষ দিয়ে আমার উদ্দেশে বলেন আমি নাকি নানার স্বভাব পেয়েছি। যদিও নানা আমার মতো নাস্তিক ছিলেন না, আবার পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও পড়তেন না।

আমি নিজের ঘরে এসে চেয়ারে বসি, ডাইনিংয়ের আলো শুয়ে আছে আমার ঘরের মেঝেতে। ছোট আপু আর মা ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজানোয় ব্যস্ত। দাদি উঠে এসেছেন ডাইনিং রুমে, মায়ের উদ্দেশে বলেন, ‘ওরা দেরি করতাছে ক্যান? টের পাইছে তো?’

‘হ, পাইছে। আইবো অহনই, আপনার পোলায় ফোন দিছিলো।’

‘ছোডবউ তো এট্টু আগে আইয়া তোমাগো লগে হাত লাগাইতে পারে, হ্যায় কী বাদশার বিবি নি!’

‘আমরাই পারবো আম্মা, আপনি বসেন।’

‘তোমরা পারবা তা তো জানি, কিন্তু হেতে আইয়া এট্টু হাত লাগাইলে তার হাত ক্ষয় অইবোনি!’

একটু বিরতি দিয়ে দাদি আবার বলেন, ‘অয় কি রোজা রাখবো?’

অয়, মানে আমি। কিছুক্ষণ নীরবতা, শুধু টেবিল আর প্লেটের ঠোকাঠুকির শব্দ। দাদি আবার বলেন, ‘কি কইলাম হুনো নাই, অয় কী রোজা রাখবো?’

‘না।’

‘প্যাটে পোলা এট্টা ধরছো, গুষ্টির মুহে চুলকালি মাখতে, দাদা-পরদাদারে দোজখে টানতে এমন এট্টা পোলাই যথেষ্ট!’

মা নিরুত্তর। এই শুরু হলো গঞ্জনা, সারাবছরই কমবেশি বাবা-মাকে এসব শুনতে হয় বাড়ির মানুষ কিংবা আত্মীয়স্বজনদের কাছে; কিন্তু রোজার মাসে তা বহুগুণ বেড়ে যায়।

সদর দরজা খোলাই ছিল; ফুফু, ফুফা আর ফুফাতো বোন এসে পড়েছে; চাচা-চাচী আর চাচাতো বোনও হয়তো এখনই এসে পড়বে। আমি উঠে গিয়ে আমার ঘরের দরজাটা বন্ধ করে আবার শুয়ে পড়ি, এই ভোরবেলায় আমি আমার বাবা-মাকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ফেলতে চাই না। কেননা চাচা যদি আমাকে নিয়ে কোনো কথা বলে তা আমার সহ্য হবে না। আমি প্রতিবাদ করবো, আর চাচাও তার জায়গায় অনড় থাকবেন এবং পরিস্থিতি আমার বাবা-মায়ের জন্য মোটেও সুখকর হবে না।

চাচার কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। পরপর চেয়ার এবং মেঝের সংঘর্ষের শব্দ হয়। আমি নিশ্চিত কয়েক জোড়া বিরক্তিমাখা চোখের দৃষ্টি এখন আমার ঘরের দরজার ওপর ঘুরছে। চাচা, চাচী কিংবা ফুফু আমার সম্পর্কে খোঁচা মেরে কিছু হয়তো বলতে পারে। ওদের বলায় আমার কিছু যায়-আসে না, কিন্তু আমার খারাপ লাগে বাবা-মায়ের জন্য। ওদের প্রতিটি কথা নিশ্চয় তীরের মতো বিদ্ধ করে বাবা-মায়ের বুক। আমি চাই না ওদের কোনো কথা এখন আমার কানে আসুক, তাই মোবাইলে ওস্তাদ রশিদ খানের রাগ বাগেশ্রী চালিয়ে কানে ইয়ারফোন লাগাই। রশিদ খানের কণ্ঠ ছাপিয়ে কানে আসে মাইকের আপডেট- ‘সেহেরির আর মাত্র ত্রিশ মিনিট বাকি আছে, সেহেরির আর মাত্র ত্রিশ মিনিট বাকি আছে, আপনারা উঠুন, সেহেরি খেয়ে নিন। সেহেরির আর মাত্র ত্রিশ মিনিট বাকি আছে, সেহেরির আর মাত্র ত্রিশ মিনিট বাকি আছে, আপনারা উঠুন, সেহেরি খেয়ে নিন।’

সত্যিই বাবার জন্য এখন আমার খুব খারাপ লাগছে, আমার হাতের ভেতর বাবার আশাহত শিথিল হাতদুটোর স্পর্শ আমি অনুভব করতে পারছি, আমার চোখের সামনে ভাসছে সামনের দিকে ঝুঁকে বাবার নিজের রুমে ফিরে যাবার দৃশ্য। আমি মাঝে মাঝেই ভাবি, বাবা যদি আমার মতো একটা ছেলের বাবা না হয়ে আমার চাচাতো ভাই ফাহাদ অর্থাৎ মোহাম্মদ আবরার ফাহাদের মতো একটা ছেলের বাবা হতেন, তাহলে কি সুখেরই না হতো তার জীবন! আমার জন্য বাবাকে কম অপদস্থ হতে হয় না; বাসায় আত্মীয়স্বজন এলে তারা বাবাকে উপদেশ এবং পরামর্শ দেয় কী উপায়ে আমাকে পথে ফিরিয়ে আনা যায়; পথ মানে ইসলামের পথ, আল্লাহ’র পথ; তারা বাবার সামনে ফাহাদের প্রশংসা করে, আমাদের অন্যান্য আত্মীয়ের ছেলেদের প্রশংসা করে; তারপর তারা বাবার মুখের সামনে বিলম্বিত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘কী আর করবেন, সবই আল্লাহ’র ইচ্ছা, কপালের দোষ।’ বাড়িতে কাছাকাছি বয়সের দুটো ছেলে থাকার এই এক বিপদ, উঠতে-বসতে একজনের সঙ্গে আরেকজনের তুলনা চলে। তার ওপর একজন যদি আমার মতো নাস্তিক হয়, তাহলে তো কথাই নেই; এরা পরকালের দোজখ ইহকালেই দেখিয়ে ছাড়ে, যেমন দেখায় আমাকে!

বাবা মসজিদে নামাজ পড়তে গেলেও শান্তি নেই, সেখানেও তাকে খুব ভদ্র-মোলায়েম ভাষায় পরিচিতজনদের দ্বারা অপমানিত হতে হয়। আমাদের বাসার পাশেই আলিশান মসজিদ। জুম্মাবারে বাবা, চাচা আর ফাহাদ একসঙ্গে নামাজ পড়তে যায় মসজিদে। যেহেতু বাবা-চাচা বাড়িওয়ালা, তাই মহল্লার অন্যান্য বাড়িওয়ালারাও তাদের চেনে। আর এইসব বাড়িওয়ালারা ভেতরে ভেতরে একজন আরেকজনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী। কার ছেলে-মেয়ে কী করে, তাদের আচার-আচরণ কেমন, ধর্মে-কর্মে মতি আছে কি না, এসব ব্যাপারে জানার অদম্য কৌতুহল তাদের। নামাজ পড়া শেষে মসজিদের সামনে কিছুক্ষণের জন্য ছোট ছোট জটলা হয়, সে-সব জটলায় এই সমস্ত পারিবারিক আলোচনাই হয় বেশি। বাবা আজকাল এসব জটলা এড়িয়ে চলেন, তবু চেনাজানা কেউ যখন সালাম দিয়ে হাত বাড়িয়ে কথা বলতে শুরু করেন তখন আর তাকে উপেক্ষা করতে পারেন না। বাবার হাত ধরে চাচা আর ফাহাদের সামনেই অনেকে বলেন, ‘আপনার ছেলেকে তো মসজিদে দেখি না?’ মহল্লায় আমার দু-একজন স্কুলের সহপাঠী আছে, ওরা কেউ কেউ আমার নাস্তিকতা সম্পর্কে জানে। ওদের মাধ্যমে জেনেছে ওদের বাড়ির মানুষ। তারপর নামাজের পরের জটলায় তা আরো ছড়িয়েছে।

আমাদের পাশের বাসার ইব্রাহিম চাচা কয়েক সপ্তাহ আগে জুম্মার নামাজের পর বাবাকে বলেছেন, ‘আজাদ সাহেব, শুনলাম আপনার পোলা নাকি নামাজ-কালাম পড়ে না, ধর্ম-টর্ম মানে না; এসব তো ভাল কতা না। অয় মনে অয় নাস্তিক বোলোগারগো পাল্লায় পড়ছে, দ্যাহেন ওরে পথে ফিরাইয়া আনতে পারেন কিনা।’

আমি নিশ্চিত জানি ইব্রাহিম চাচা কোনোদিন ব্লগে ঢোকেননি, তিনি ইন্টারনেট ব্যবহার করতে জানেন না। এমনকি মোবাইলে তিনি কল ধরা আর কল করা ছাড়া আর কিছু জানেন বলেও মনে হয় না। অথচ তিনি জানেন যে ব্লগার মানেই নাস্তিক! কতো ধার্মিক, কতো ধর্মান্ধ, কতো মাদ্রাসা পড়ুয়া, কতো ইসলামী জঙ্গি যে ব্লগ ব্যবহার করে তাদের উগ্র আদর্শ প্রচার করে তার কোনো খবরই এরা জানেন না, কেবল জানেন ব্লগার মানেই নাস্তিক!

আমাদের সামনের বাড়ির রহমান চাচা একদিন বাবাকে বলেছেন, ‘একটা মাত্র ছেলে আপনার, অথচ ছেলেটাকে মানুষ করতে পারলেন না আজাদ ভাই। ফাহাদ কতো ভাল ছেলে, নামাজ-কালাম পড়ে, আদব-কায়দা জানে; আপনার ছেলে রাস্তায় দেখা হলে সালাম দেয় না, অথচ দুইজন একই বাড়ির ছেলে।’

সেদিনও চাচা আর ফাহাদ বাবার সঙ্গে ছিল। আমি স্পষ্ট কল্পনা করতে পারি আমার বাবার সেই অসহায়-করুণ মুখ, আমি অনুভব করতে পারি বাবার বুকের ব্যথা। আবার চাচার গর্বিত মুখও আমার অকল্পনীয় নয়। বাবা এখন নামাজ পড়ার পর পারলে যেন পালিয়ে আসেন! আমাদের কোনো আত্মীয়-স্বজনের বিয়ে, জন্মদিন ইত্যাদি অনুষ্ঠানেও বাবা আজকাল যান না। আর আমি তো সেই কবে থেকেই আত্মীয়-স্বজনদের এসব অনুষ্ঠান বর্জন করেছি! এখন সকল প্রকার নিমন্ত্রণ রক্ষা করেন মা আর ছোট আপু। আমি জানি যে বাবার এইসব অনুষ্ঠান উপেক্ষা করার কারণ আমি; আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতজনরা আমার বিষয়ে বাবাকে বিব্রত প্রশ্ন, পরামর্শ, সহমর্মিতা প্রকাশ করবে তাই বাবা এসব অনুষ্ঠান উপেক্ষা করেন। মাকেও এসব পরিস্থির মুখোমুখি হতে হয়, কিন্তু কেউ না গেলে আত্মীয়তা রক্ষা হয় না, তাই বাধ্য হয়েই মাকে যেতে হয়। বাবা-মাকে এই সংকট থেকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় হচ্ছে আমার ধার্মিক হওয়া এবং নামাজ-রোজা রাখা; কিন্তু আমার পক্ষে তা একেবারেই অসম্ভব। তাই এই সংকটের সমাধান বাবা-মাকেই করতে হবে। এই সংকটের একমাত্র সমাধান প্রতিবাদ করে মানুষের মুখ বন্ধ করা, কিন্তু বাবা-মা কখনোই তা করেন না, কোনোদিন করবেনও না; কারণ মানুষের এইসব অন্যায় আচরণই তাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। ফলে বাবা-মাকে বারবার মাথা নিচু করে মানুষের অপমান হজম করতে হয়।



(চলবে….)

সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুলাই, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:২৭
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৪৫ বছরের অপ-উন্নয়ন, ইহা ফিক্স করার মতো বাংগালী নেই

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ বিকাল ৫:০৫



প্রথমে দেখুন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো; উইকিপেডিয়াতে দেখলাম, ১০৩ টি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি আছে; ঢাকা ইউনিভার্সিটি যাঁরা যেই উদ্দেশ্যে করেছেন, নর্থ-সাউথ কি একই উদ্দেশ্যে করা হয়েছে? ষ্টেমফোর্ড ইউনিভার্সিটি কি চট্টগ্রাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ মাতানো ব্লগাররা সবাই কোথায় হারিয়ে গেল ?

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৩৪

ইদানিং সামু ব্লগ ব্লগার ও পোস্ট শূন্যতায় ভুগছে। ব্লগ মাতানো হেভিওয়েট ব্লগাররা কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন।কাজের ব্যস্ততায় নাকি ব্লগিং সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আমি কিছু ব্লগারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ৬৪

লিখেছেন রাজীব নুর, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:২৫



সুরভি বাসায় নাই। সে তার বাবার বাড়ি গিয়েছে।
করোনা ভাইরাস তাকে আটকে রাখতে পারেনি। তবে এবার সে অনেকদিন পর গেছে। প্রায় পাঁচ মাস পর। আমি বলেছি, যতদিন ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ অমঙ্গল প্রদীপ (পাঁচশততম পোস্ট)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ রাত ১১:১৪

প্রদীপের কাজ আলো জ্বালিয়ে রাখা।
কিন্তু টেকনাফের একটি ‘অমঙ্গল প্রদীপ’
ঘরে ঘরে গিয়ে আলো নিভিয়ে আসতো,
নারী শিশুর কান্না তাকে রুখতে পারতো না।

মাত্র বাইশ মাসে দুইশ চৌদ্দটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণপ্রজাতন্ত্রী সোমালিয়া দেশে চাকরি সংকট

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১১ ই আগস্ট, ২০২০ রাত ১২:২০



গণপ্রজাতন্ত্রী সোমালিয়া সরকার মন্ত্রী পরিষদে কতোজান বিসিএস অফিসার আছেন? তাছাড়া সততার সাথে সোমালিয়া সরকার চাইলেও সঠিক ও যোগ্য মন্ত্রীপদে কতোজন বিসিএস অফিসার দিতে পারবেন?

(ক) মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় - একজন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×