somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ নাবিলা কাহিনী ৩ - নিভৃত সঙ্গী (প্রথম পর্ব)

০৬ ই মে, ২০১৯ বিকাল ৩:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সন্ধ্যার সময় একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে এসেছি। বেশী লোকজন পছন্দ নয় দেখে, ভীড় বাঁচিয়ে বেশ খানিকটা দূরে যেয়ে বসে আছি। একটু দূরেই দেখি প্রায় উলটো দিকে বসে একটা মেয়ে গভীর আগ্রহ নিয়ে আচার খাচ্ছে। আচার খাওয়া নিয়ে আমার কোন সমস্যা নেই, বরং বেশ বড় একটা আচারের প্যাকেট যেই গতিতে মেয়েটা শেষ করল সেটা দেখে আমি প্রায় মুগ্ধ! কিন্তু তারপর মেয়েটা যা করল সেটা দেখে আমি একেবারে তাজ্জব বনে গেলাম, এটা কি ভাবে সম্ভব? সম্ভবত এতক্ষন তেঁতুলেরই আচারই খাচ্ছিল আর পাশের টেবিলের উপর মুখ থেকে বের করে বিচিগুলি রেখে দিচ্ছিল। এবার আচার খাওয়া শেষ হতেই, হাতের প্যাকেটটা টেবিলের পাশে নিয়ে ধরতেই তেঁতুলের বিচিগুলি যেন, ঠিক সেই রকমই মনে হলো আমার কাছে, লাফ দিয়ে দিয়ে টেবিল উপর থেকে প্যাকেটের ভিতরে একটা একটা করে ঢুকে গেল! কি অসম্ভব ব্যাপার! কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫টা তেঁতুলের বিচির একই কান্ড নিজের চোখে দেখে আমি নিতান্তই হতভম্ব! এটা কিভাবে সম্ভব! হ্যালুছিনেশন? অসম্ভব! মনোবিজ্ঞানের ছাত্র আমি, তাছাড়া আমি নিজেই এখন এই বিষয়ের উপর ছাত্রদের পড়াই! কিন্তু তেঁতুলের বিচিগুলির এই অদ্ভুত কর্মকান্ড কিভাবে ব্যাখ্যা করব আমি? আমাকে পুরোপুরি হতম্ভব অবস্থায় রেখে মেয়েটা উঠে চলে গেল। এই ঘটনার কোনরকম লজিক্যাল রিজনিং আমার মাথায়ই আসল না। মেয়েটাকে অনুসরণ করার সুতীব্র ইচ্ছাটা কোনভাবেই দমাতে না পেরে আমিও পিছু পিছু যাওয়া শুরু করলাম। এবার কি দেখব কে জানে......


এক
ভীড়ের মধ্যে মেয়েটাকে যেন হারিয়েই ফেললাম আমি। সিড়ি দিয়ে দোতলায় উঠার পর এত এত মেয়েদের মধ্যে কোথায় যে গেল? আঁতিপাঁতি করে সব জায়গায় খুঁজছি আমি। কোথাও না পেয়ে হতাশ হয়ে রুম থেকে বের হয়ে বারান্দায় যেয়ে দাড়াতেই মেয়েটাকে আবার দেখলাম। বারান্দার একদম শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আকাশের, না আসলে মনে হলো, চাঁদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা অন্যদিকে তাকিয়ে আছে দেখে মাঝের দুরত্বটা আরও কমিয়ে ফেললাম, প্রায় ৩০ গজ এর মতো দূরে দাঁড়িয়ে আছি।

হঠাৎই মনে হলো শুনলামঃ
-আমার পিছনে পিছনে ঘুরছেন কেন?
বেশ অবাক হলাম আমি। আশেপাশে এই মেয়ে ছাড়া আর কেউই নেই। এত দুরত্ব থেকে এই মেয়ে কথা বললে এত স্পষ্ট শোনার তো কথা নয়। ভুল শুনলাম নাকি?
-হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি? আমার পিছনে লেগেছেন কেন?
তাকিয়ে দেখি মেয়েটা এখনও আগের মতোই চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। একদম অন্যদিকে তাকিয়ে দিব্যি আমার সাথে এইভাবে কথা বলছে, না আমারই শ্রুতিভ্রম হচ্ছে বুঝলাম না। এইভাবে কথা বলা তো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার, মিথের কাছাকাছি। এইভাবে কথা বলার প্রকৃয়াকে বলে টেলিপ্যাথি, কিন্তু এই মেয়ের সাথে আমার কোনই পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া নেই। একতরফা এভাবে যোগাযোগ করার জন্য প্রচন্ড ক্ষমতার দরকার হয়, মেয়েটা কি এইভাবে যোগাযোগ করে সেটাই প্রমাণ করতে চাইছে? আমাকে ভয় দেখাতে চাইছে? আমি আবারও চুপ করে থাকলাম, আগে নিশ্চিত হই ঘটনা কি!

-মাতৃভাষাও ভুলে গেছেন নাকি? আমার পিছনে পিছনে ঘুরছেন কেন?
নিজের অজান্তেই উত্তর দিয়ে ফেললামঃ
-আমি আপনার পিছনে ঘুরছি না। সামনা সামনি কথা বলতে চাইছি।
-কেন?
-আমি একটা ঘটনার ব্যাখ্যা জানতে চাই।
-আমার পিছনে এইভাবে ঘুরে বেড়ালে একটা না আরও অনেক কিছুরই ব্যাখ্যা জানতে চাইবেন। প্রশ্ন করতে করতে অতিষ্ট করে ফেলবেন।

সহসাই বাস্তবে ফিরে আসলাম আমি। কি করছি আমি এসব? কেউ দেখলে নির্ঘাত পাগল মনে করবে আমাকে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে একা একা কথা বলছি। চরম হাস্যকর ব্যাপার। সোজা হেঁটে মেয়ের সামনে মাত্র একহাত দূরত্বে যখন দাড়ালাম, মেয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। প্রখর অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। মুহুর্তেই মনে হলো আমার মাথার ভিতরে যা আছে সবই পড়া শুরু করল। বাধা দেয়ার চেস্টা করলাম। কোনই লাভ হলো না। কোন এক অজানা শক্তি যেন আমাকে পুরোপুরি স্থবির করে রাখলো।
নিজের উপর যখন নিয়ন্ত্রন ফিরে পেলাম তখন আমি বেশ অবাকই হলাম।
-আপনি কে? এই ধরনের কাজগুলি কি আপনি যখন ইচ্ছে তখনই করতে পারেন?
-আপনি ইচ্ছা করে শুধু আমার কাছেই কেন আপনার ক্ষমতা বারবার প্রর্দশন করছেন?

মেয়ের রহস্যময় হাসি দেখে আমি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠলাম। ভার্সিটিতে এইসব ঘটনার প্রচুর থিওরি পড়েছি কিন্তু বাস্তবে নিজের চোখে প্রথম এইসব ঘটনা দেখলাম। প্যারা সাইকোলজি আমার অত্যাধিক প্রিয় সাবজেক্ট। এরচেয়ে ভালো স্পেসিমেন্ট আমি কোথায় পাবো? এই মেয়েকে কোনভাবেই চোখের আড়াল হতে দিব না আমি। এর কাছ থেকে অনেক, অনেককিছু জানতে চাই আমি।

-কারন এই বিষয়েই আপনার আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।
মেয়ের কাছ থেকে শোনা এই কথাটা আমার ঠিক বিশ্বাস হলো না। এর মধ্যে কোন একটা কিন্তু আছে। তবে কোন কিন্তুই আমাকে এখন নিরাশ করতে পারবে না। হাসি মুখে আমি এই মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললামঃ
-জী, ঠিকই বলেছেন। আপনার ব্যাপারে আমি এখন সত্যই প্রচন্ড আগ্রহ পাচ্ছি। আমি কোনভাবেই আপনার পিছু ছাড়ছি না। দেখি আপনি আমাকে কিভাবে তাড়িয়ে দেন?

অবাক হয়ে আমি দেখলাম মেয়েটা প্রশয়ের হাসি মুখে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সাহস বেড়ে গেল আমার।
-আমার নাম আবির। আমি আপনার সাথে পরিচিত হতে চাই। আর তারপর অবশ্যই কয়েকটা জিনিসের ব্যাখ্যা জানতে চাই।


দুই
মেয়েটার নাম অধরা, অধরা আফরিন। চির চেনা এই ধরা'তে সে যেন অধরা হিসেবেই থাকতে চায়!

আমি নিজেই এই মেয়ের প্রেমে পড়লাম, না আমাকে ওর প্রেমে পড়তে বাধ্য করা হলো সেটা আমি নিশ্চিত নই। তবে মেয়েটার মাঝে যেন চুম্বকের মতো আকর্ষন ক্ষমতা আছে। তারচেয়েও বড় কথা অধরা সমস্ত যুক্তি কিংবা তর্কের উর্দ্ধে থাকা একটা ব্যক্তিত্ব। জ্বলজ্যান্ত একটা মানুষের মাঝেই পুঁথিগত বিদ্যার সবকিছু এক জায়গায় পেয়ে আমিও মহাখুশি।

পরিচয়ের ঠিক একমাসের মাথায় ওকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিলাম। অধরা হাসিমুখে বললঃ
-একটু দেরী হয়ে গেল না? আমি তো আগেই আশা করেছিলাম?
সাথে সাথেই আমি বুঝলাম আমাদের সম্পর্কের মাঝে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়।

দেখতে দেখতে প্রায় বিয়ের পর পাঁচমাস হুট করেই পার হয়ে গেল। বিয়ের পর ওর আচরন বেশিরভাগ সময়ই স্বাভাবিক থাকে তবে কিছু বিষয়ে ও খুবই রির্সাভ। বিশেষ করে কিছু অস্বাভাবিক ক্ষমতার উৎস সম্পর্কে সহজে কিছু আমাকে জানাতে চায় না, যতটুকু ওর ইচ্ছে ঠিক ততটুকু বলে। কোন কিছু জানতে চাওয়ার পর উত্তর না দিলে কেন যেন আমি আর দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করতাম না। আমার জীবনযাত্রায়ও ব্যাপক পরিবর্তন হলো। এটা যে কোন এক বিশেষ কারনে সেটা আমি ভালোভাবেই টের পেতাম। তবে আসল ব্যাপার হলো বৈবাহিক জীবনে আমি খুবই সুখী। আমার যা যা প্রয়োজন সেটা মুখ ফুটে চাইবার আগেই পেয়ে যেতাম। প্রত্যেক রাতেই ঘুমানোর সময় আমি অবাক হতাম। বিছানায় আমাকে বেশ জোরে জড়িয়ে ধরে অধরা ঘুমাত আর আমাকে বলত ওকে শক্ত করে সারারাত জড়িয়ে ধরে রাখার জন্য। মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে বাথরুম যেয়ে ফিরতে দেরী হলেই অদ্ভুত একটা আওয়াজ শুনতে পেতাম আর বিছানার কাছে এসে দেখতাম অধরা প্রচন্ড ছটফট করছে………


তিন
-আবির, তুমি আমার কাছে কেন এসেছ?
প্রায় আধা ঘন্টা ধরে একটা বড় ডায়েরীর মধ্যে লেখা পুরো কাহিনীটার এই পর্যন্ত পড়ার পর নাবিলা এই প্রথম প্রশ্ন করল। আবির ওর খুবই প্রিয় একজন ছাত্র, রেজাল্টও ভালো। ফাইনাল ইয়ারে থিসিসও নাবিলা আন্ডারেই করেছে। আবিরকে নাবিলা বেশ ভালো করেই চেনে। শুধুই অধরা মেয়েটাকে নিয়ে গল্প শোনানোর জন্য নিশ্চয়ই আবির ওর কাছে আসে নি। আসল ঘটনা কি সেটা জানা দরকার।
-ম্যাডাম, অধরা খুব অসুস্থ। গত পনেরদিন ধরে ওকে প্রায় বিছানাতেই শুয়ে থাকতে হচ্ছে।
-তুমি ওর মেডিক্যাল ট্রীটমেন্ট করাও!
-গত এক সপ্তাহ ধরে অধরা'র প্রায় সব ধরনের মেডিক্যাল ডায়াগোনাইসিস করা হয়েছে। আমার বড় মামা ঢাকার নামকরা একজন নিউরোলজিস্ট। তার সাজেশন মতো সব জায়গায় দেখেয়েছি। সব জায়গায় একই রির্পোট। কোন ফিজিক্যাল সমস্যা নেই। অথচ আমি ঠিকই জানি ও দিন দিন আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কিন্তু এটা কোন স্বাভাবিক অসুস্থতা নয়।
-কিভাবে এতটাই নিশ্চিত হলে আবির?
-বিয়ের পর আমাকে ও বেশ কয়েকবারই বলেছে, কেউ একজন ওকে হুট করেই নিয়ে যেতে আসবে, এর আগে ও মাঝে মাঝে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়বে। এরপরই ও উধাও হয়ে যাবে, তখন ওকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ঐ সময়টাতে অধরা একা একা পারবে না ওর চলে যাওয়া ঠেকাতে। সেজন্য ইচ্ছে করেই আমাকে ওর জীবনের সাথে জড়িয়েছে। She asks me repeatedly to help her, but I assume the help she requested is beyond my knowledge.

নাবিলা আবিরের শেষ কথাটা শুনে নড়েচড়ে বসল। এতক্ষন পর আসল জায়গায় এসেছে আবির। আবিরকে প্রয়োজনীয় বাকি সবকিছু দ্রুতই খুলে বলতে বলল নাবিলা। বিশেষ করে সেই একজনের কথা, যার আসার কথা অধরা আগেই বলে রেখেছিল…….


চার
নাবিলার চেম্বারে অধরাকে আবির নিয়ে আসল ঠিক দুইদিন পরে। সাধারণত নাবিলা পেশেন্টের সাথে একাই সেশন করে, তবে আজকে ইচ্ছে করেই আবিরকে ওর সাথে রাখল।

পৃথিবীতে কেউ কেউ আসে একেবারেই অনন্য কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে। এরা নিজেদের দৃঢ়তা, জন্মগত কিংবা অর্জিত সহজাত গুনগুলি নিয়ে আশেপাশের সবকিছুই কিভাবে কিভাবে যেন নিজের মতো করে তৈরী করে অথবা পরিবর্তন করে নেয় খুব দ্রুতই। কিন্তু অধরার ব্যাপারটা একেবারেই ভিন্ন। তের বছর বয়সের সময় মাত্র একটা ঘটনা ওর জীবনের সবকিছু খুব দ্রুতই পালটে দেয়। বদলে যায় চেনা জানা প্রায় সব কিছুই!

প্রায় আধা ঘন্টা অধরার সাথে প্রথম সেশনে কথা বলার পর নাবিলা আজকের সেশনে ব্রেক দিল। ব্রেক টাইমে হাতের পেশেন্ট ফাইলটা খুলে গুরুত্বপূর্ণ যে তথ্যগুলি ও লিখে রেখেছিল সেগুলি আবার পড়ল-

অধরাঃ বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান হবার জন্য অধরা'র মাঝে “সিংগেল চাইল্ড সিনড্রোম” এর প্রভাব বিদ্যমান। কিন্তু অধরা এই সিনড্রোমের বিহেবিরিয়াল প্যার্টানের তুলনায় রিয়াক্ট করে অনেক বেশি। অনুভূতিও খুবই তীব্র, তার সাথে ইন্টুইশন পাওয়ারও মারাত্মক। ইএসপি পরীক্ষা করেও নাবিলা হতবাক, অস্বাভাবিক, প্রায় ১২০ উপরে স্কোর। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রনের অস্বাভাবিক ক্ষমতা আছে। আরও অদ্ভুত কিছু ব্যাপার আছে সেটা আবির বুঝতেই পারেনি।

নাবিলা সিদ্ধান্ত নিল অধরার সাথে একা একটা সেশন করা দরকার। বিশেষ করে যে বিষয়গুলি নিয়ে অধরা কিছু বলতে চায় না সেটা ওর জানতেই হবে। পরের সেশনে শুধুই অধরাকে একা দেখা করতে বলল নাবিলা।


পাঁচ
ঠিক চারদিন পরে সন্ধ্যার সময় নাবিলা শুধুই অধরাকে নিয়ে দ্বিতীয় সেশনে বসল।
-অধরা, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, তুমি অনেক কিছুই আবিরকে বল নি। আবিরকে তোমার কাছে রাখার কারন আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আবির তোমাকে কিভাবে সাহায্য করবে যদি ও সবকিছু ভালোভাবে না জানে?
-আমি আবিরকে নিয়ে ভয় পাচ্ছি। এটা আবিরের পারস্পেশন লেভেলের বাইরে। ও সেটা কিছুটা বুঝার পর যখন আপনার কথা বলল, আমি সাথে সাথেই রাজি হয়েছি। কারন এটা আবিরের একা সামলানো সম্ভব না।
-আমি চাই, যে কথাগুলি গতকালকে আবিরের সামনে বল নি, সেই সবগুলি আজকে আমাকে বলবে।
-আমার পক্ষে সবকথা বলা সম্ভব না। আমি এর আগেও কয়েকবার চেস্টা করেছি, কিন্তু বলতে পারি নি। আসল সত্য হলো, আমার স্মৃতি থেকে সেই ঘটনাটা একদম লুকিয়ে ফেলা হয়েছে।

নাবিলা কিছুক্ষন একদৃষ্টিতে অধরা'র দিকে তাকিয়ে থেকে বললঃ
-তুমি কি এই ব্যাপারে নিশ্চিত?
-জী, আমি নিজেও অনেকবার চেস্টা করেছি। কিন্তু ঠিক বিশেষ একটা মুহুর্তে যাবার পর আমি আর কিছুই মনে করতে পারি না।
-অধরা, সবচেয়ে প্রথম আমি তোমার টেলিপ্যাথিক ক্ষমতা নিয়ে একটা পরীক্ষা করতে চাই!
-তুমি কি আমার রিসেপশনিস্ট কে চেন? আগে কোথাও ওকে দেখছ কিংবা পরিচয় হয়েছে?
-জী না। আমি এখন পর্যন্ত ওর সাথে কোন কথা বলি নি।
-তুমি আমার চেম্বারের বাইরে বসা রিসেপশনিস্টকে জানাও যে আমি ওকে একটা কাজের জন্য খুঁজছি।

নাবিলা কিছুটা অস্বস্তিতে পরে গেল যখন সত্য সত্যই ওর রিসেপশনিস্ট দুইমিনিটের মাথায় ওর সামনে এসে হাজির হয়ে জানতে চাইল কিজন্য ওকে খুঁজছে নাবিলা। দুইকাপ চা দিতে বলে ওকে চলে যেতে বলল নাবিলা।

টেলিপ্যাথিক ক্ষমতা তিন ধরনের হয়। ফিজিক্যাল, ইমোশনাল এবং মেন্টাল টেলিপ্যাথি। অধরা মেন্টাল টেলিপ্যাথিক ক্ষমতার অধিকারী, কিন্তু নাবিলা জানে এটা প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার! অধরা'র অস্বাভাবিক ইএসপি'র সাথে নিশ্চয়ই এর কোন যোগসূত্র আছে।

-আমি চাই তুমি তোমার মত করে যতটুকু মনে আছে সেটা আগে বল। বাকি যা থাকবে সেটা বের করে আনার দায়িত্ব আমার। তবে কোন সন্দেহপূর্ণ কিছু আমাকে বলবে না। I want to know the absolute truth! Is it clear to you?
-জী, ম্যাডাম। আমি কি শুধু ডায়েরীতে না লেখা সেই ঘটনাটাই প্রথমে বলতে চেস্টা করব?
-হ্যাঁ। তোমার লাইফ স্টোরী যেটা আবির লিখে আমাকে দিয়েছে সেটা তো কারেক্ট, তাইনা?
-জী, ম্যাডাম। আমার যা যা মনে আছে সবই ওকে দিয়ে নোট করিয়েছি। আমার মনে হয়েছিল সেগুলি একদিন কাজে লাগবে।
-ভবিষ্যতে তোমার ট্রীটমেন্টের কাজে লাগবে দেখে তোমার প্রতিটা সেশন আমি রেকর্ড করছি। তোমার নিশ্চয় কোন আপত্তি নেই?
-জী না ম্যাডাম। আমি তাহলে বলা শুরু করছি…….

আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। গরমের ছুটিতে বাবা মার সাথে গ্রামে নানা বাড়িতে ঘুরতে গেছি। বেশ বড় ছুটি। বাবা পাঁচদিন পর আমাকে আর মাকে রেখে ঢাকায় চলে এসেছে। আমরা ফিরব আরও কমপক্ষে বিশ বা পঁচিশ দিন পর। নানা বাড়ির আশেপাশে থেকে সমবয়সী অনেকগুলি বান্ধবী আর খেলার সাথী জুটে গেল। প্রায় সারাদিনই এদের সাথে ঘুরে বেড়াতাম। এদের মধ্যে জুই নামে একটা মেয়ের সাথে খুব ভাব হয়ে গেল। ওকে নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতাম। দুইজনের মধ্যে ভাব খুব বেশি। সকালবেলা নাস্তা করেই জুই আমার কাছে চলে আসত।

এখানে আসার প্রায় পনের দিন পরের কথা। বিকাল বেলা জুই এর সাথে লালদহ নামের একটা নদীর পারে ঘুরতে এসেছি। লাল মাটির পাড়। শান্ত আর স্নিগ্ধ টলটলে নদীর পানি। সাঁতার কাটতে জানতাম না দেখে আগে পানিতে নামতে ভয় পেতাম। এবার এসে সাঁতার শিখে ফেলেছি। দুপুরে এই নদীতেই এসে গোছল করে গেছি। এখন আবার এসেছি এখানে ঘুরতে।

নদীর পাড় ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে অনেকদূর চলে এসেছি। আশে পাশে তেমন একটা বাড়িঘর নেই। গল্প করতে করতে খেয়ালও করি নি। তবে ভয়ের কিছুই নেই। খুব বনেদী পরিবার আমাদের। আমার নানা'কে সবাই একনামে চেনে। কাউকে বললেই বাসায় পৌছে দেবে। হঠাৎ দেখি মাটির একটা দোতলা বাড়ি। জুই বলল, এটা নাকি পরিত্যক্ত মন্দির। এখন আর ব্যবহার করা হয় না। আগে কখনও মাটির মন্দির দেখি নি, তাই খুব দেখতে ইচ্ছে করল। জুইকে সাথে নিয়ে মন্দিরের সদর দরজার সামনে এসে দাড়ালাম। কেন যেন প্রচন্ড আকর্ষন লাগছে ভিতরে যাবার জন্য। ভাঙ্গা কাঠের দরজা, কোনরকমে ঝুলে আছে। দুইজন মিলে একসাথেই ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। ঢুকেই একটু দূরে ভেঙ্গে পড়া মন্দিরের বেদীটা দেখতে পেলাম। বেদীটার সামনে যেয়ে দাঁড়াতেই মনে হলো কে যেন আমাকে ডাকছে। অথচ চারপাশে কেউ নেই। অবাক হয়ে জুই'কে জিজ্ঞেস করলাম ও ডেকেছে নাকি, কিন্তু জুই না বলল। আবার শুনলাম। এবার মনে হলো বাম দিকে একটা ঘর আছে আর সেখানে কেউ যেন আমার অপেক্ষায় বসে আছে। হঠাৎ করে আমার কি হলো আমি জানি না, ছুটে আমি বাম দিকের সেই ঘরের দিকে চলে গেলাম। এরপর আমার আর কিছু মনে নেই।


আমার জ্ঞান ফেরে নানার বাসায়। স্বাভাবিক হবার পর যা জানলাম সেটা হচ্ছে জুই নাকি আমার সাথে মন্দিরের ভিতরে ঢুকেই নি। আমি একাই ঢুকেছিলাম আর ফিরতে দেরী হচ্ছিল দেখে, জুই মন্দিরের ভিতরে যেয়ে দেখে আমি অজ্ঞান হয়ে মন্দিরের ভিতরে বেদীর সামনে পড়ে আছি। ও বাইরে এসে চিৎকার করে লোকজন ডেকে আমাকে নানাবাড়ি নিয়ে আসে। জুই এর সাথে আমি পরে কথা বলেছি। ও আমাকে কসম কেটে বলেছে যে, ও ভিতরে ঢুকেই নি। জুই এর কথা বলার ধরন দেখে তখন আমার মনে হয়েছিল, ও সত্যই বলেছে। কিন্তু আমার এখন কেন যেন মনে হয়, জুই এর স্মৃতি থেকেও ঐ নির্দিষ্ট অংশটা মুছে দিয়ে কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছিল।

এতটুকু বলার পর অধরা হঠাৎ করেই চুপ হয়ে গেল। কথা বলার চেস্টা করছে কিন্তু কিছুই উচ্চারণ করতে পারছে না।
-কি হলো? থেমে গেলে কেন অধরা? এরপরে ঠিক কবে তুমি প্রথম বুঝতে পারলে যে……….


উৎসর্গঃ
ব্লগে যিনি আমাকে বোনাই ডেকে আত্মীয়তার বন্ধনে ইতিমধ্যেই বেঁধে ফেলেছেন, সেই প্রিয় আরোগ্য ভাইকে। অল্প কিছুদিন আগে উনি আমাকে উৎর্সগ করে একটা গল্প দিয়েছিলেন। সেখানেই কথা দিয়ে এসেছিলাম আমি এর প্রতিদান দেব। উনার পছন্দের টপিক নিয়েই লিখেছি। এমনকি এই গল্পের নায়িকার নামও আরোগ্য ভাইয়ের কাছ থেকে ধার করা। জানি না কেমন লিখতে পারছি! দ্বিতীয় পর্বও লেখা শেষ। মূল্যায়নের দায়ভার যথারীতি আমার সম্মানিত পাঠকদের কাছেই রেখে গেলাম।

এই সিরিজের আগের পর্ব যারা পড়তে চানঃ
১। গল্পঃ নাবিলা কাহিনী ১ - পরিণয়!
২। গল্পঃ নাবিলা কাহিনী ২ - হৃদয়ে রঙধনু!


সবাইকে ধন্যবাদ ও শুভ কামনা রইল।
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত @ নীল আকাশ, মে, ২০১৯

সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মে, ২০১৯ বিকাল ৪:৪৪
২৩টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২২

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৫ শে জুন, ২০১৯ রাত ৮:২২



রবীন্দ্রনাথের গান গুলো আমাকে শান্তি দেয়, আনন্দ দেয়। দুশ্চিন্তা মুক্ত রাখে। বারবার মুগ্ধ হই। গানের কথা আর সুর অসাধারন। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই এই গানটা শুনলাম-
... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন অর্থাৎ দেশে ফিরছি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৫ শে জুন, ২০১৯ রাত ১০:৩৮



ফ্লাইটের আগে বুকে এক ধরনের শুণ্যতা অনুভব করি, খাবার খাওয়া তো দুরে থাকুক পানিও খেতে পারি না, মনে হয় এটিই আমার জীবনের প্রথম ফ্লাইট! এই হয়তো ফ্লাইট মিস হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম সাধারণ মানুষকে নির্দয় ও বিভক্ত করছে ক্রমেই

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৬ শে জুন, ২০১৯ রাত ১২:৩৫



গত সপ্তাহে, ভারতের ঝাড়খন্ডে এক মুসলিম তরুণকে পিটিয়ে ভয়ংকরভাবে আহত করেছিল কিছু সাধারণ মানুষ; আহত হওয়ার ৪ দিন পর তার মৃত্যু হয়েছে; তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে মটর সাইকেল... ...বাকিটুকু পড়ুন

মনের মানুষ পাইলাম না-রে (গান)

লিখেছেন নাঈম জাহাঙ্গীর নয়ন, ২৬ শে জুন, ২০১৯ রাত ২:৫৫



আমার-
মনের মানুষ-পাইলাম না-রে ঘুরেও আজীবন।।
কতো ঘাটে বাঁধলাম তরী।।
জুটলো না তবু- একটি মন।
মনের মানুষ-পাইলাম না-রে ঘুরেও আজীবন।।

যৌবনের শুরুতেই আমি-করছিলাম যে ভুল,
সারাজীবন চোখের জলে-দিলাম সে মাশুল।।
ভুল মানুষের মিথ্যে প্রেমে।।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের কাশ্মীর ভ্রমণ- ৭; ক্ষণিকের দেখা, তবু মনে গাঁথা

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৬ শে জুন, ২০১৯ সকাল ১০:৪৯

সেদিন সোনামার্গে সারাটা দুপুর চমৎকার কাটলো। পুনরায় ঘোড়ায় চড়ে ফিরে আসার সময় সহিসদের সাথে গল্প করতে করতে ফিরেছি, তাই সময়টা দ্রুত ফুরিয়ে গেছে। ওদের কষ্টের কথা জেনে ব্যথিত হয়েছি। ঘোড়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×