
আজ ভয়াল না্ইন ইলেভেন। আজ থেকে ১৯ বছর আগে ২০০১ সালের এ দিনে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে আত্মঘাতী বিমান হামলা চালায় জঙ্গি গোষ্ঠী আল কায়েদা।পৃথিবীর আর সব দেশের মানুষের মতো মার্কিনিরাও ধারণা করতে পারেনি যে প্রবল প্রতাপশালী সামরিক শক্তিধর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বেষ্টনীকে এড়িয়ে দেশটির ইতিহাসের জঘন্যতম হামলা হতে পারে তা-ও যেসব স্থান নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে দেওয়ার কথা, সেসব স্থানে। যে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো ৭৮টি দেশের সর্বমোট প্রায় তিন হাজার নিরীহ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছিলেন। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকও ছিলেন। হামলার এই দিনটি সারা বিশ্বে ‘নাইন-ইলেভেন’ নামে পরিচিত। নাইন ইলেভেনের ঘটনা পাল্টে দেয় বিশ্ব রাজনীতি। এর প্রভাব পড়ে সারা বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে। যুক্তরাষ্ট্র ওই হামলার জন্য আল কায়েদা জঙ্গিদের দায়ী করে পরে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে হামলার ঘোষণা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ জাতির উদ্দেশে ভাষণে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, হয় আমাদের পক্ষে থাকতে হবে, না হলে বিপক্ষে। এ ঘটনার জেরেই ওই বছরের অক্টোবরে আফগানিস্তানে হামলা চালানো হয়। পরে নাই২০০৪ সালে হামলা চালানো হয় ইরাকেও। ইরাক ও আফগানিস্তানে অভিযান চালাতে গিয়ে প্রাণ হারায় ৭ হাজার মার্কিন সেনা। লাখো মানুষের মৃত্যু এবং গৃহহারা হওয়ার ঘটনায় বদলে যায় বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপট। আফগানিস্তান ও ইরাকে এখনো মার্কিন দখলদারিত্ব চলমান রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আজ যে দুর্দশা তার জন্য অনেকেই নাইন ইলেভেনকে দায়ী করেন। হামলার মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত আল কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে ২০১১ সালের ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে গোপন অভিযান চালিয়ে হত্যা করে মার্কিন নেভি সিল। নাইন-ইলেভেনের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি রোষানলের শিকার হয়েছে মুসলমানরা। তাদের প্রতি সবসময় অভিযোগের তীর ছোঁড়া হয়েছে। যদিও এর পেছনে শক্তিশালী কোনো যুক্তি এখনো উপস্থাপন করা হয়নি। যদিও আজ অবধি জানা যায়নি এ হামলার ঘটনার প্রকৃত রহস্য। ফলে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি কী ছিল নাইন-ইলেভেনের উদ্দেশ্য। আর এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আক্রমণকারীরা আমেরিকাকে কী বার্তাই বা দিতে চেয়েছিল। ঘটনার তিন বছর পর মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনী হামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ফাঁকি দিয়ে কীভাবে এই হামলা হলো তার আজও কোনো সদুত্তর মেলেনি। ইরানের দাবি, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে হামলা চালানোর লক্ষ্যে গোয়েন্দা কারসাজি করে এই নাটক সাজানো হয়েছে। নাইন-ইলেভেনের ১৯ বছর পূর্ণ হলো আজ।
নাইন ইলেভেনের স্মৃতি শুধু মার্কিনিদের, তা নয় আরো ৭৮টি দেশের নাগরিকদেরও, যাদের দেশের মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল সেই ভয়াল হামলায়। 
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। এদিন জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার সঙ্গে জড়িত ১৯ জঙ্গি চারটি বিমান ছিনতাই করে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি স্থানে। সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট-১১; বোস্টন থেকে উড়ে এসে হামলে পড়ে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর ভবনটিতে। জানা যায়, হামলা চালানোর আগে সকাল ৮টা ১৯ মিনিটে একজন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট সতর্ক করেন, তাঁদের উড়োজাহাজ ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েছে। তিনি জানান, ককপিট থেকে কোনো উত্তর আসছে না এবং ছিনতাইকারীদের কাছে বিস্ফোরক রয়েছে। এ ছাড়া জানানো হয়, এক যাত্রীসহ দুজন অ্যাটেনডেন্টকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। পরে জানা যায়, হামলার শিকার হওয়া ওই যাত্রীর নাম ড্যানিয়েল লেউইন। তিনি ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। ধারণা করা হয়, তিনি ছিনতাইকারীদের কাছ থেকে উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং নাইন-ইলেভেনের হামলায় তিনিই প্রথম ভুক্তভোগী। এ হামলার বিষয়টি ঠিকমতো বুঝতে না বুঝতেই ১৭ মিনিট পর ৯টা ৩ মিনিটে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দক্ষিণ ভবনে আছড়ে পড়ে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট-১৭৫। সেটিও বোস্টন থেকে উড়ে এসে হামলা চালায়। পরে জানা যায়, উড়োজাহাজটি ছিনতাইয়ের পরই একজন অ্যাটেনডেন্ট ইউনাইটেড এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছে এবং দুজন পাইলটই নিহত হয়েছেন। তবে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়েও শেষরক্ষা হয়নি কারো।এ দুই ভয়াবহ হামলার এক ঘণ্টার মধ্যে ৯টা ৩৭ মিনিটে ওয়াশিংটনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর পেন্টাগনে হামলে পড়ে আরো একটি উড়োজাহাজ। ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের ডালাস থেকে উড়ে আসা আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট-৭৭-এর যাত্রীদের জিম্মি ক রে এ হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। ওই বিমানে তখন ছয়জন ক্রুসহ ৫৮ যাত্রী ছিলেন। এ হামলায় সামরিক কর্মকর্তা ও বেসামরিক নাগরিকসহ মোট ১২৫ জন নিহত হন। এ ছাড়া উড়োজাহাজে থাকা পাঁচ জঙ্গিসহ সব যাত্রীই নিহত হন। একের পর এক হামলার মধ্যেই নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের নেওয়ার্ক থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকোর উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট-৯৩ ছিনতাই করে জঙ্গিরা। পরে বিমানটি বিধ্বস্ত হয় পশ্চিম পেনসিলভানিয়ার শ্যাংকসভিল এলাকার একটি মাঠে। এতে বিমানে থাকা ৪৪ জনের সবাই নিহত হন। ধারণা করা হয়, হামলাকারীরা তাঁদের উদ্দেশ্য অনুযায়ী প্লেন হামলাটি চালাতে পারেনি। প্লেন ছিনতাইয়ের পরই যখন ক্রু ও যাত্রীরা নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখনই বিমানটি ইচ্ছাকৃতভাবে বিধ্বস্ত করা হয়। ধারণা করা হয়, নাইন-ইলেভেনের প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিলেন পাকিস্তানে জন্মগ্রহণকারী আল-কায়েদা সংগঠনের সদস্য খালিদ শেখ মোহাম্মদ। তিনি ২০০৩ সালের মার্চে রাওয়ালপিন্ডি থেকে সিআইএ ও আইএসআইয়ের যৌথ অভিযানের সময় গ্রেপ্তার হন। ওসামা বিন লাদেনের সংগঠন আল-কায়েদা এ হামলায় আর্থিক সহায়তা প্রদান করে।
২০১১ সালের ২ মে বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে কমান্ডো অভিযান চালিয়ে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে মার্কিন বাহিনী। 
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এমনই একটি জীবন্ত, ঐতিহাসিক, ভয়াল ও কলঙ্কিত কালো দিন, যা একবিংশ শতাব্দীর নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা, পাশবিকতা ও হোলি খেলার রক্তাক্ত প্রারম্ভ। রহস্যজনক টুইন টাওয়ার হামলার ১৯ বছর পরও এই হামলা কে করেছে, কেন করেছে, কীভাবে করেছে তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের হয়তো চরম অনীহা রয়েছে, অথবা তারা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ৯/১১ কমিশন প্রণীত রিপোর্টে নানা অসংগতি বিদ্যমান থাকায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সততা, নিরপেক্ষতা ও আন্তরিকতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ১১ সেপ্টেম্বর নিয়ে রহস্যের জট পাকানোর কারণ কী? কেনইবা তড়িঘড়ি করে আফগাসিস্তান আক্রমণ করা হয়, এসব জানতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও বৈদেশিক নীতির কৌশলগত ইতহাসে যেতে হবে। নাইন-ইলেভেন কমিশন রিপোর্ট অনুসারে চার ফ্লাইটের ১৯ জন সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী ছিল প্রায় খালি হাতে, কারও হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না। অন্যদিকে প্রত্যেক বিমানের কমপক্ষে একজন পাইলট ছিলেন সামরিক বাহিনীর উচ্চতর কমব্যাট ট্রেনিংপ্রাপ্ত। প্রশ্ন হচ্ছে চার বা পাঁচজন সন্ত্রাসী বিমানের ককপিটে গেল আর কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই বিমানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করল, তা কতটা হাস্যকর আর অযৌক্তিক তা দু-চারজন গেঁয়ো মূর্খ মানুষকে বোঝাতে পারলেও বিবেকবান সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষকে বোঝানো প্রায় অসম্ভব। বিবিসি ও প্রথম সারির কয়েকটা আন্তর্জাতিক নিউজ মিডিয়ার সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্টে দেখা যায়, কমপক্ষে ছয়জন বিভিন্ন দেশে জীবিত এবং তারা এই ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তবে তাদের পাসপোর্ট হারানো গেছে বলে অভিযোগ করেন। এফবিআই প্রধান রবার্ট মুলার ২০০১ সালের ২০ ও ২৭ সেপ্টেম্বর সিএনএন'কে সন্দেহভাজন হাইজ্যাকারদের পরিচয় ও সত্যতা নিয়ে চরম সংশয় প্রকাশ করেছেন।
তাই নাইন ইলেভেন নিয়ে ঘটনার কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা তা ভবিষ্যতের জন্য তোলা রইল।নূর মোহাম্মদ নূরুগণমাধ্যমকর্মীনিউজ চ্যানেল
ফেসবুক [email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৫১