
৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে নবী মুহাম্মাদের জন্মগ্রহণের পূর্বে মক্কার পার্শ্ববর্তী ইয়েমেনের শাসক ছিলেন আবরাহা। আল্লাহ তাকে দিয়েছিলেন একচ্ছত্র ক্ষমতা ও শক্তি। মক্কা নগরীতে অবস্থিত কাবা শরীফের ধর্মীয় ভাবগম্ভীর্য ও পবিত্রতায় মুগ্ধ হয়ে মানুষ যখন দলে দলে কাবা ঘরের দিকে আসতে থাকে তখন ইয়েমেনের রাজা আবরাহা ঈর্ষা'ণিত হয়ে কাবা ঘর ধ্বং'স (নাউজুবিল্লাহ) করার পরিকল্পনা করেন। এই ঘটনার কথা আল্লাহ পবিত্র কোরআনে সূরা আল ফীলে বর্ণনা করেছেন। ইতিহাসে এসেছে: ইয়েমেনের শাসক জুনাওয়াস নাজরানের খ্রিস্টানদের ওপর নৃশংস নির্যাতন করতেন যাতে তারা খ্রিস্ট ধর্ম ত্যাগ করে। সেখানকার একজন খ্রিস্টান নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে গিয়ে রোমে এসে সেখানকার তৎকালীন সম্রাটের কাছে ঘটনা তুলে ধরে। রোমের খ্রিস্টান সম্রাট আবিসিনিয়ার রাজা নাজ্জাশির কাছে এক চিঠি পাঠিয়ে নির্যাতনের প্রতিশোধ নেয়ার নির্দেশ দেন। নাজ্জাশি ৭০ হাজার সেনার এক বিশাল বাহিনী ইয়েমেনে পাঠান আরিয়াত নামক এক সেনাপতির নেতৃত্বে। আবরাহাও ছিল এই বাহিনীর অন্যতম সেনা-কমান্ডার। যুদ্ধে জুনাওয়াস হেরে যায় এবং আরিয়াত হন ইয়েমেনের শাসক। কিছুকাল পর আবরাহা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে আরিয়াতকে হত্যা করে নিজেই ইয়েমেনের শাসক হয়। এ খবর নাজ্জাশির কাছে গেলে তিনি আবরাহাকে দমনের সিদ্ধান্ত নেন। এ খবর পেয়ে আবরাহা দ্রুত আনুগত্য স্বীকার করে এবং নাজ্জাশিও তাকে ক্ষমা করে ওই পদে বহাল রাখেন। এ অবস্থায় আবরাহা নিজেকে খ্রিস্ট ধর্মের মহান খাদেম বা সেবক হিসেবে তুলে ধরার জন্য ইয়েমেনে অসাধারণ সুন্দর ও বড় ধরনের একটি গির্জা নির্মাণ করে। আবরাহা কাবা ঘরের দিকে না গিয়ে এই গির্জায় এসে ইবাদত বা উপাসনা করতে আরবদের প্রতি আহ্বান জানানোর সিদ্ধান্ত নেয় এবং এ গির্জাকেই হজের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় যাতে জনগণ এখানে এসে এই গির্জার চারদিকেই প্রদক্ষিণ করে। এই লক্ষ্যে আবরাহা আরব দেশে অনেক প্রচারক পাঠায়।কিন্তু বাদ সাধল, সারা পৃথিবীর মানুষ। হজ পালনের জন্য তাদের ধর্মীয় পিতা ইব্রাহীম আ:-এর তৈরি ঘর কাবা থেকে কোনোক্রমেই সানার কাবায় যাচ্ছিল না। এতেই একসময় ক্ষেপে যায় দোর্দণ্ড প্রতাপশালী আবরাহা! সিদ্ধান্ত নেয় ইব্রাহীম আ:-এর কাবা ভেঙে ফেলতে হবে! সিদ্ধান্ত মোতাবেক সৈন্য-সামন্ত নিয়ে কাবা অভিমুখে রওয়ানা হয় সে। সাথে ৯-১৩টি শক্তিশালী হাতি। পথিমধ্যে প্রভাবশালী কুরাইশ বংশের নেতা আবদুল মোত্তালিব (রাসূল সা:-এর দাদা) আবরাহার পথরোধ করে দাঁড়ালেন। সে সময় আব্দুল মুত্তালিব ছিলেন ম’ক্কার সবচেয়ে বড় সর্দার। তিনি বলেন, “আবরাহার সাথে যু’দ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই। এটা আল্লাহর ঘর। তিনি চাইলে তাঁর ঘর রক্ষা করবেন।” তিনিআবরাহাকে সতর্ক করলেন । তাকে বললেন, এমন বিপজ্জনক কাজ থেকে বিরত থাকতে। কিন্তু ক্ষমতার দাপটে উন্মত্ত আবরাহাকে থামানো গেল না। তবে যাত্রাপথে কিছুটা বিঘ্ন ঘটাল হাতিগুলো। হাতিগুলোর দৃষ্টি সীমানার মধ্যে পবিত্র কাবা শরিফ আসার পর তারা আর অগ্রসর হতে চাইছিল না। তাই তারা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। চতুর আবরাহা হাতিগুলোর অভিপ্রায় বুঝতে পেরে ওগুলোর মুখ ঘুরিয়ে অন্যমুখী করল। তারপর তাদের খাওয়াল ভালো ভালো খাবার। উপরন্তু কিছু খাবার কাবামুখী পথে ও কাবা প্রাঙ্গণেও জমা করে রাখল।

আল্লাহ তার প্রতি বিশ্বাসী বান্দাদের জন্য শিক্ষণীয় কিছু একটা দেখানোর জন্য হাতিগুলোকে সেই রক্ষিত খাবারগুলোর প্রতি অনুরক্ত হওয়ার পথে আর বাদ সাধলেন না। তাই খাদ্যলোভী হাতিগুলো এবার জোর কদমেই এগোতে থাকল কাবার দিকে। মক্কার বিশ্বাসী কিন্তু দুর্বল মানুষগুলো দু-হাত তুলে ফরিয়াদ জানালেন আসমান ও জমিনের মালিক আল্লাহর কাছে। বললেন, ‘ইয়া রাব্বুল আল-আমীন! একমাত্র তুমিই পার এই দানবের হাত থেকে আমাদের প্রাণপ্রিয় কাবা ঘরটিকে রক্ষা করতে।’ ধৈর্যশীল আল্লাহ তাঁর ধৈর্যকে আর প্রলম্বিত করলেন না। তাঁরই সৃষ্ট সর্ববৃহৎ স্থলপ্রাণী হাতির সমন্বয়ে গঠিত ও বিবিধ সমরাস্ত্র সজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি পাঠালেন তাঁর অতি ক্ষুদ্র প্রাণী ‘আবাবিল’ পাখিকে। কুরআনে পাখিটি বোঝাতে "তইরন আবাবিল" শব্দগুচ্ছটি ব্যবহৃত হয়েছে এবং বাংলায় শব্দগুচ্ছটি অনুবাদ করা হয়েছে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি হিসেবে। অস্ত্র হিসেবে তাদের সাথে দিলেন প্রতি পাখির হাতে-পায়ে বহনযোগ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পোড়ামাটির তৈরি শক্ত ঢিল। ঝাঁকে ঝাঁকে তারা উড়ে এলো বৃহদাকার হাতি ও সুসজ্জিত সেই বাহিনীর হামলা প্রতিরোধে, দু’হাতে ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র দু’টি ঢিল নিয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গবাদি পশুর খাদ্য, গমের ভুসি তুল্য বস্তুতে পরিণত হলো শক্তিশালী সেই বাহিনী ও হাতিগুলো। অতঃপর বাতাসে উড়তে লাগল সেই ভুসি! হাতিতে বসা আবরাহার নেতৃত্বাধীন বিশাল সেনাদল যখন কাবাঘরকে ধ্বংস করে দিতে চারদিক থেকে ছুটে আসছিল তখনই সাগরের দিক থেকে এসে হাজির হয় ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। তাদের সবার সঙ্গে ছিল তিনটি করে ছোট্ট ঢিল বা কঙ্কর। আবরাহার বাহিনীর ওপর এসব ঢিল ছোঁড়া হয় বৃষ্টির মত। যখন আব্রাহার হ’স্তী বাহিনী ম’সজিদুল হা’রাম শরীফের কাছাকাছি পৌছান তখন আল্লাহ হাজার হাজার আবাবিল পাখি প্রেরণ করেন। পাখিগুলো আল্লাহর নি’র্দেশে পায়ের তালুতে ২ টি ও মুখের মধ্যে ১ টি করে পাথর নিয়ে আব্রাহার হাতি বা’হিনীর উপর নি’ক্ষে’প করতে থাকে এবং তাদের পুরোপুরি ধ্বং’স করে দেয়। হযরত ইবনে আব্বাসের বর্ণনা মতে, ‘যার ওপরই পাথর কণা পড়তো তার সারা গায়ে ভীষণ চুলকানি শুরু হতো এবং চুলকাতে চুলকাতে চামড়া ছিঁ’ড়ে গো’শ’ত ঝরে পড়তে থাকতো। গো’শ’ত ও র’ক্ত পানির মতো ঝরে পড়তো এবং হা’ড় বেরিয়ে পড়তো। আবরাহার অবস্থাও এই রকম হয়ে পড়ে।ফলে ওই বাহিনী চর্বিত খড়ের মত জমিনে কূপোকাত হয়। আবরাহা নিজেও এসব খোদায়ি ঢিলের আঘাতে আহত হয় এবং ইয়েমেনে পালিয়ে যায়। ইয়েমেনেই সে মারা যায়। ্এভাবেই রক্ষা পেল পবিত্র কাবা ঘর। আর তার কিছু দিন (পঞ্চাশ/পঞ্চান্ন দিন ) পরই এই পৃথিবীতে সুখ ও শান্তির প্রতীক হিসেবে আগমন ঘটল আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ-সা: এর। পৃথিবীর মানুষগুলোর জন্য শেষ নবী হিসেবে। এটি কোনো মানুষ্য রচিত গল্প-কাহিনী নয়। নয় কোনো মতলববাজ ঐতিহাসিকের বর্ণনা। এ বর্ণনা স্বয়ং আমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর। যিনি তা করেছেন পবিত্র সুরা-১০৫; আল-ফিলের মাধ্যমে। যেখানে কোনো এক ইস্যুতে নিরাশ রাসূল-সা:কে তিনি সান্ত্বনা-সাহস দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি কি দেখনি তোমার প্রতিপালক কাবাঘর ধ্বংস করতে আসা হাতিওয়ালাদের সাথে কী আচরণ করেছিলেন? তিনি কি তাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেননি? তিনি তাদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবিল-পাখি। যারা সেই হাতিওয়ালাদের ওপর পোড়ামাটির পাথর নিক্ষেপ করেছিল। অতঃপর তিনি সেই হাতিওয়ালাদের পরিণত করেছিলেন ভক্ষিত ভুসির ন্যায়।’ জালিম ও খোদাদ্রোহী শক্তিগুলো যত বড় অস্ত্র-শক্তি আর লোকবলের অধিকারীই হোক না কেন মহান আল্লাহর অশেষ শক্তির কাছে তারা যে অসহায় ও অক্ষম এবং খোদাদ্রোহিতা ও খোদার বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিণামে নির্মূল হয়ে যেতে হবে- এই সতর্ক-বার্তা তুলে ধরে সুরা ফিল। সে যুগের সবচেয়ে বড় ও ভয়ানক সামরিক যান ছিল হাতি। অথচ ছোট্ট পাখি ও ঢিল দিয়েই মহান আল্লাহ হাতি-সজ্জিত ক্ষমতা মদমত্ত ওই খোদাদ্রোহী শক্তিকে নির্মূল করেছেন!
সূত্রঃ সুরা আল ফীল। যারা আল্লাহর অস্তিত্ব/ক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান তাদের জন্য উৎসর্গীকৃত...........
সম্পাদনায়ঃ
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
ব্রেকিং নিউজ২৪.কম
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মার্চ, ২০২১ রাত ১২:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




