somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছয় ইঞ্চি লম্বা কঙ্কালটি মানুষের নাকি এলিয়েনের? এক দশকের এটাকামা রহস্য উম্মোচিত!

২৪ শে ডিসেম্বর, ২০১৪ রাত ১২:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আজ থেকে প্রায় এগারো বছর আগে, ১৯ শে অক্টোবর ২০০৩ এ, অস্কার মুনজ নামের এক লোক চিলির ‘এটাকামা’ মরুভূমিতে খুঁজে পায় সাদা কাপড়ে মোড়া ছয় ইঞ্চি লম্বা, বল পয়েন্ট কলমের সমান, একটি আস্ত কঙ্কাল (সূত্র: Daily Mail)। কঙ্কালটি দেখতে অবিকল মানুষের মত, তবে মাথাটা দেহের অনুপাতে বেশ বড় এবং সামনের দিকে ঝোঁকা। মাথার খুলি মানুষের চেয়ে প্রায় তিনগুন বড় এবং উপরের দিকে স্ফিত। চোয়ালের হার এবং অক্ষিকোটরের গঠনও বেশ অস্বাভাবিক (সংযুক্ত ছবিগুলো দেখুন)। কঙ্কালটি দেখতে আসলেই অনেকটা কাল্পনিক 'এলিয়েনের' মতোই। মিডিয়ার বদৌলতে চারদিকে খবরটি ছড়িয়ে পড়ল যে এলিয়েনের কঙ্কাল আবিস্কৃত হয়েছে! আর এই তথাকথিত এলিয়েন কঙ্কালটি 'এটাকামা' (Atacama) নামে পরিচিতি পেয়ে গেল। তবে, আসলেই কি কঙ্কালটি এলিয়েনের?

আবিস্কারের দশ বছর পর কঙ্কালটি উন্মুক্ত করা হয় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য। পৃথিবীর বিখ্যাত স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালের একদল বিজ্ঞানী ছয় মাস ধরে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষা চালায় এটাকামা কঙ্কালটির উপর। গোটা কঙ্কালটিকে তারা এক্স-রে এবং সিটিস্ক্যান করে। বুকের পাঁজর থেকে হাঁড় নিয়ে ডিএনএ টেস্ট করে। বিশেষজ্ঞ দল কঙ্কালটির বাহ্যিক অবয়ব পুন্খানুপুন্খ ভাবে নিরীক্ষণ করে। বিশেষজ্ঞ দলটির নেতৃত্ব দেন বিশিষ্ট চিকিসক ড. স্টেফেন গ্রীর। মলিকিউলার বায়লোজি এক্সপার্ট প্রফেসর ড. গ্যারি নোলান করেন ডিএনএ এবং জেনেটিক এনালাইসিস, আর রেডিওলোজি এবং অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ ড. লেচম্যান করেন এক্স-রে এবং সিটিস্ক্যান এনালাইসিস। গবেষণার পুরো রিপোর্টি পাওয়া যাবে এই লিঙ্কে ।

প্রথমেই বিজ্ঞানীরা যেটা দেখেন সেটা হলো কঙ্কালটি আসল না নকল। তারা বুকের পাজরেরে অস্থিতে অস্থিমজ্জার প্রমান পান এবং সিটিস্ক্যানে পরিস্কার ভাবে হাঁড় এর বৈশিষ্ঠ যাচাই করেন। সিটিস্ক্যানে তারা কঙ্কালটির বক্ষ্যকোটরে ফুসফুস এবং হৃদপিন্ডও দেখতে পান। তারা বুঝতে পারেন, গোটা কঙ্কালটিই কোনো না কোনো ভাবে মমিতে পরিনত হয়েছে। এভাবে, শুরুতেই তারা নিশ্চিত করেন যে কঙ্কালটি নকল নয়, আসল।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল যে কঙ্কালটি হয়ত অপরিণত গর্ভপাতে নষ্ট হওয়া মানব শিশু বা ফিটাস (Aborted foetus) যা কোনো কারণে মমিতে পরিনত হয়েছে; অথবা কঙ্কালটি কোনো শিম্পাঞ্জি বা বানরের; অথবা এলিয়েনেরও হতে পারে! একটা অপরিপূর্ণ মানব শিশু বা ফিটাস এর কঙ্কাল এর দৈর্ঘ্য ছয় ইঞ্চি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

তবে কঙ্কালটির এক্স-রে রিপোর্ট অনুযায়ী ওটা কোনো ফিটাসের কঙ্কাল হতে পারে না। কঙ্কালটির অস্থি এবং অস্থিসন্ধি সম্পূর্ণ ভাবে সুগঠিত এবং পরিপক্ক (Matured), এবং সেই সাথে নিচের পাটিতে দাঁতও রয়েছে! গর্ভাবস্থায় একটা মানব শিশুর হাঁটু (Knee joint) থাকে তরুনাস্থি দিয়ে গঠিত। ভূমিষ্ঠ হওয়ার ৬-৭ বছর পর এই তরুনাস্থি শক্ত (Calcified) অস্থিতে পরিনত হয়। এক্স-রে’তে দেখা এটাকামার হাঠুর গঠন সম্পূর্ণ ভাবে মিলে যায় ৬ থেকে ৮ বছরের মানুষের হাঠুর গঠনের সাথে। অর্থাত এটাকামা কোনোভাবেই ফিটাস (গর্ভের শিশু) ছিল না। সে ছিল হেঁটে-চলে বেড়ানো ৬ থেকে ৮ বছরের কোনো মানুষ (অথবা এলিয়েন?) যার উচ্চতা ছিল মাত্র ৬ ইঞ্চি! আর বিজ্ঞানীদের বিস্ময় এখানেই। কেননা, ৬ ইঞ্চি উচ্চতা নিয়ে কোনো মানুষ বাঁচতে পারে না।

তাহলে কি এটাকামা ডোয়ারফিজম (Dwarfism) বা প্রোজেরিয়া (Progeria) সিন্ড্রম জাতীয় কোনো রোগে ভুগছিল? এটাকামার উপরে করা রেডিওলোজির রিপোর্টের ভিত্তিতে এ বিষয়ের এক্সপার্ট ড. লেচম্যান বলেন যে এটাকামার ডোয়ারফিজম অথবা প্রোজেরিয়া সিনড্রমে ভোগার সম্ভবনা নেই বললেই চলে। কেননা, এ সমস্ত রোগে যে আনুষঙ্গিক শরীরক অস্বাভাবিকতা থাকার কথা তা এটাকামার এক্স-রে এবং সিটিস্ক্যানে অনুপস্থিত। উপরন্তু, যে জেনেটিক মিউটেশন এর কারণে এসব রোগ হয়ে থাকে সে ধরনের কোনো জেনেটিক মিউটেশন এটাকামার ডিএনএ বা জিন এনালাইসিস এ পাওয়া যাইনি। এছাড়া চিকিত্সা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ডোয়ারফিজম রোগে ভোগা সবচেয়ে ছোটো যে মানুষটির সন্ধান পাওয়া যায় তার উচ্চতা ছিল ১ ফুট ৮ ইঞ্চি। অতএব, সব দিক বিচার করে বিজ্ঞানীগণ মনে করেন এটাকামা হয়ত অন্য কোন জেনেটিক মিউটেশন জনিত রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

এক্স-রে তে দেখা যায়, এটাকামার পাঁজর এর হাড়ের সংখ্যা মাত্র দশ জোড়া; যেখানে মানুষের থাকে ১২ জোড়া। তবে কিছু বিরল ক্ষেত্রে ১০ বা ১১ জোড়াও থাকতে পারে,- কিন্তু সে ক্ষেত্রে অন্যকোন অস্থি বিকৃতি থাকার কথা না। এটাকামার পাঁজর এর হাড়ের অস্বাভাবিকতার সাথে রয়েছে মস্তিস্কের হারের অস্বাভাবিকতাও। এটাকামার কপাল থেকে খুলির শীর্ষ পর্যন্ত উচ্চতা একজন মানুষের থেকে ৩ গুন বেশি। এটাকামার হাত পা এবং দেহের অন্যান্য অংশের গঠন স্বাভাবিক মানুষের মত হলেও মস্তিষ্কের গঠন একেবারেই মানুষের সাথে বিসাদৃশ্য! কেন এমন তার উত্তর আপাতত বিজ্ঞানীদের জানা নেই!

এটাকামার অস্থি থেকে স্যাম্পল নিয়ে যে ডিএনএ বা জেনেটিক এনালাইসিস করা হয় তাতে দেখা যায় যে মানুষের সাথে এটাকামার জিনগত অমিল রয়েছে শত করা ৯ ভাগ। যেখানে মানুষের সাথে শিম্পাঞ্জির জিনগত অমিল মাত্র শতকরা ৩ ভাগ। উপরন্তু, বানর অথবা শিম্পাঞ্জির সাথে এটাকামার জিনগত মিল খুবই কম। দৈহিক এবং জিনগত অমিলের কারণে বিজ্ঞানীগণ একমত পোষণ করেন যে এটাকামা কোনো বানর অথবা শিম্পাঞ্জির কঙ্কাল নয়। আবার বিজ্ঞানীদের হাতে এ যাবত যে তথ্য আছে তাতে করে তারা শতভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না যে এটাকামা একটি ৬ ইঞ্চি উচ্চতার মানব ছিল। তবে যেটুকু নিশ্চিত হয়ে জানা গেছে তা হলো এটাকামা মানব ফিটাস ছিল না; এটাকামা বানর অথবা শিম্পান্জিও ছিল না।

তাহলে কি এটাকামা কোনো নতুন ধরনের মানুষরুপি প্রাণী (New species) ছিল যারা বসবাস করত ১০০ থেকে ১০০০ বছর পূর্বে এই পৃথিবীতেই। যদি তাই হয়, তাহলে তো আরো এটাকামার মত কঙ্কাল পাওয়ার কথা। বিজ্ঞানীরা আসলে এখন তাই খুঁজছে। তারা যদি আরো কয়েকটি এটাকামার মত কঙ্কাল আবিষ্কার করে তাহলে হয়ত উপরেরে প্রশ্নের উত্তর মিলে যাবে। আর যদি না খুঁজে পায় তাহলে কি ধরে নেয়া হবে যে এটাকামা আসলে ভিন দেশের কোনো এলিয়েনেরই কঙ্কাল? উত্সাহীগণ এই লিঙ্কটিতে এটাকামার উপর একটি সুন্দর ভিডিও দেখতে পারেন।

[ছবি কৃতজ্ঞতা: Sciencemeg.org & siriusdisclosure.com]

খোন্দকার মেহেদী আকরাম
শেফিল্ড,
২৩ ডিসেম্বর ২০১৪
১১টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রম্য: পর্নের সেকাল একাল!

লিখেছেন গেছো দাদা, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৬

গুরুত্বপূর্ণ একটা টপিক নিয়ে অনেকদিন ধরে লিখব লিখব করছিলাম। সময় হচ্ছিল না। আজ এই গভীর রাতে মনে হলো, লিখেই ফেলি। কেন মনে হলো, সে আলাপে আর না যাই। টপিক হলো:... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশভাগ এবং ধর্ম- অধর্ম

লিখেছেন রাজীব নুর, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৪



শীতের শেষে সমস্ত গাছের পাতা ঝরে পড়ে।
তখন পাতা ছাড়া গাছ একদম রুগ্ন মনে হয়। শুকনো পাতা দিয়ে মাটির পথ ঢেকে যায়। সেই পথ দিয়ে কোনো পথিক হেটে গেলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিরো থেকে হিরো (মহাজগৎ সংক্রান্ত) - পর্ব-১

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০




কোন কিছুর অস্তিত্ববিহীন অসীম শূন্যে উদ্ভব ঘটেছে সকল বস্তু ও শক্তি উপাদানের। তাতে কোন স্থান না থাকায় উক্ত বস্তু ও শক্তি উপাদান সমূহ একে অপরের স্থান হয়েছে। সুতরাং... ...বাকিটুকু পড়ুন

শব্দের শক্তি, ভাষার মাধুর্য....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৫২

এমিরেটস, কাতার এয়ার লাইন্স ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট রিক্রুটমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে গ্রুপ ডিসকাশন। গ্রুপ ডিসকাশনের সারমর্ম হচ্ছে—৬-৮ জন কয়েকটি গ্রুপে একটি নির্দিষ্ট টপিক নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে। নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

উচ্চবংশীয় ছাগল!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০৯



এককালে কেবল ঘড়িতেই বাজতো টিক টিক- টিক টিক;
বারবেলায় এসে দেখছি টিক টিক বলে কিছু নেই আর ঠিক ঠিক!
বরং 'টিকটক'- এ আকণ্ঠ বুদ হয়ে আছে আবালবৃদ্ধবনিতা!
মানুষের লম্ফঝম্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

×