বিকেলের এই সময়টাতে নদীর পাশে এভাবে বসে থাকতে আমার অসম্ভব ভাল লাগে; যা
কিছুদিন আগেও বিরক্তিকর মনে হত। আমি বসে আছি, দাদু ধান ক্ষেতের আগাছা
পরিষ্কার করছেন। এই নদীর নাম ব্রক্ষপুত্র, বৎসরের একটা সময় পানি শুকিয়ে
যায়। তখন নদীতে গ্রামের মানুষজন ধান লাগায়। কি সুন্দর দেখাচ্ছে আমাকে,
পড়ন্ত বিকেলের এই রোদে। রোদের মধ্যে একধরনের কোমলতা লক্ষ্য করা যায়, অন্য
সময়ের মত তীব্রতা নয়। কি আজব আমি এখন কঠিন; কিন্তু সুন্দর সুন্দর কিছু
বাংলা শব্দ বলতে পারি। উচ্চারন করতে কোন সমস্যা হয় না, কিন্তু জায়গা মতো
শব্দগুলো ব্যাবহার করতে পারি না। যেমন দিনের শেষের এই সময়টাকে দাদু পড়ন্ত
বিকেল বলেন। বিকেল প্রায় শেষ হয়ে এলে দাদু এটাকে পড়ন্ত বলেন, অর্থাৎ কোন
কিছু শেষ হয়ে এলে তার সাথে পড়ন্ত বলা যায়। 'পড়ন্ত বিকেল' 'অপরুপ
প্রকৃতি' এই ধরনের শব্দগুলো নাকি কবি সাহিত্যিকরা বেশি ব্যাবহার করেন।
তাই আমি মাঝে মাঝে নিজেকে কবি কবি ভেবে এই শব্দ গুলো ব্যাবহার করি। যেমন
ওই দিন রাতে খাওয়ার সময় আমার ভাত প্রায় শেষ পর্যায়ে, তখন আম্মুকে বললাম-
আম্মু খাওয়ার এই পড়ন্ত পর্যায়ে আমার প্লেটে খানিকটা ভাত দিয়ে প্লেটটাকে
ভরন্ত করে দাও। এই ধরনের অনেক সাহিত্যিক সাহিত্যিক বাক্য এখন আমি বলতে
পারি। সবাই আমার এই বাক্যগুলো শুনে হাসলেও দাদু একদমই হাসে না। দাদু
ক্ষেতে কাজ করে আর আমাকে নতুন নতুন শব্দ শেখায়। কানাডাতে থাকাকালীন-
বিকেল বেলা এভাবে বসে থাকার মত কোন জায়গা ছিল না, দাদুর মতো গল্প বলার
কেউ ছিল না। আমার মনে হয় বাংলাদেশে এসে ভালই হয়েছে। আর যাব না কানাডায়।
দাদু ছাড়া আমার এখনো ভাল কোন বন্ধু নেই। কিছুদিন পর সুমন নামক একটা ছেলের
সাথে পরিচয় হল আমার। আমার চেয়ে খানিকটা লম্বা উজ্জল বর্ণের একটা ছেলে।
প্রথম দিনেই অনেক্ষন কথা হলো। সত্যি বলতে ওই দিনের কথা-বার্তায়ই ছেলেটিকে
ভাল লেগে যায় আমার। দাদু বলল সুমনকে আমার বন্ধু বানিয়ে নিতে। আমরা এর পর
একসাথে খেলাধুলা করতে লাগলাম। বিকেলে এখন আমি আর সুমন নদীর পাশে বসে
থাকি। সুমনও আমার দাদুর মত ভাল কাজ করতে পারে। আমাদের পাশেই ওদের ক্ষেত।
ধান লাগানো থেকে শুরু করে আগাছা পরিষ্কার, ধান কাটা সব একাই করে ও।
সুমনের একটা ব্যাপার আমার খুবই ভাল লাগে- উচ্চারন। ও "ভাইয়া" বলতে পারে
না; বলে "বাইয়া"। "আজকে" না বলে- বলে "আইজ্জা"। আমি ওকে আমার থেকে ইংরেজী
শিখতে বলি কিন্তু ও বলে -আগে বাংলা তো বালা কইরা শিহি'। সুমন থেকে আমি
অনেক কিছু শিখেছি। আমরা দুজনে মিলে মাঝে মাঝে ঘুরতে যাই, মাছ ধরতে যাই। ও
ভাল মাছ ধরতে পারে, আমিও পারি কিন্তু আমার হাত থেকে কেন জানি মাঝে মাঝে
মাছগুলো চলে যায়। ওর হাতে যাদুকরী একধরনের শক্তি আছে, একটা মাছকে কোন
ভাবে ধরতে পারলে ওর হাত থেকে ছুটে যাওয়ার আর কোন সম্ভাবনা নেই। শুধু মাছ
ধরা নয় আমি এখন অনেক কিছুই পারি। ধান লাগানো, ধান কাটা, নৌকা চালানো,
সাতার, বড় গাছের উপর থেকে লাফ দিয়ে নদীতে পরা, কলাগাছ কেটে নৌকা বানানো,
সাইকেল চালানো সবই পারি; সুমন শিখিয়েছে। এজন্য সুমনকে আমার অনেক ভাল
লাগে, মনে হয় আমরা বড় হয়েও এরকম মাছ ধরব, একসাথে ঘুরে বেড়াব। সুমন অনেক
সুন্দর গান গাইতে পারে, আমরা নৌকা চালাই আর সুমন গান গায়। আমি আর সুমন
ভাল বন্ধু হয়েছি এর জন্য আমরা যতটা খুশি এর চেয়ে অনেক বেশী খুশি দাদু।
কারন দাদু আমাকে যা শেখাতে চেয়েছিলেন তার সবই আমি সুমন থেকে শিখে নিয়েছি।
দাদু বলেন তাঁর নাকি দুই নাতি- "আতফান আর সুমন"। ও ইদানীং আমাদের
পরিবারেরই একজন হয়ে উঠেছে। আমরা কোথাও বেড়াতে গেলে সুমন অবশ্যই আমাদের
সাথে যায়। দাদু বললেন আমাদের ঢাকায় নিয়ে যাবেন। আমার বড় কাকা ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার বাসায়ই থাকব আমরা। আমি আর সুমন সব প্রস্তুতি
সেরে আগামী সকালের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। আমরা প্ল্যান করলাম একসাথে
ঘুরব, কাকার বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অনেক
ইচ্ছা সুমনের। পরদিন সকালে আমরা ট্রেনে উঠলাম। ঢাকায় এসে কাকার বাসায়
গেলাম। রাতে একটা দুঃসংবাদ নিয়ে বাসায় ফিরল কাকা। কাকার কথায় যা বুঝলাম-
বাংলাকে রাট্রভাষা করা হয়নি। আমি ভাবতে পারলাম না এত কষ্ট করে যেই ভাষাটা
শিখলাম এটা আর বলা যাবে না! আমি না হয় কদিন যাবৎ বাংলা পাড়ি কিন্তু সুমন?
ও কি সুন্দর গান গায়...ও বাচবে কি করে বাংলা না বলে।
পর দিন বিকেলে কাকাদের বাসার সামনে দিয়ে একটা মিছিল শুরু হল। সুমন সিড়ি
বেয়ে নিচে নেমে গেল, আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই ও দৌড়ে মিছিলে চলে গেল।
কিছুক্ষনের মধ্যেই মানুষের ভিড়ে হারিয়ে গেল সুমন। কখনো ভাবি নি এই হারিয়ে
যাওয়া হবে চির দিনের জন্য হারিয়ে যাওয়া। এর পর সুমনকে অনেক খুঁজেছি,
কোথাও পাই নি। অনেক অপেক্ষা করেছি, সুমন আসেনি।
অনেক বছর কেটে গেল, সুমন আসেনি।
একদিন আমার অফিসে এক বিদেশী সাংবাদিক আসলেন। উনি বাংলাদেশের ভাষা
আন্দোলন নিয়ে একটা ডকুমেন্টারী বানাতে চাচ্ছেন। উনার কাছে নিজের তোলা
কিছু ছবি আছে সেদিনকার সেই মিছিলের। আমি ছবিগুলো দেখতে চাইলে ভদ্রলোক
হাসিমুখে আমার হাতে সবগুলো দিলেন। মিছিলের বেশ কয়েকটা ছবি আছে এখানে।
কয়েকটা গুলিবিদ্ধ লাশের ছবিও আছে। ছবিগুলো দেখছি আমি, হঠাৎ একটা ছবির
দিকে আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেল, বুক চিরে দীর্ঘ একটা শ্বাস বেরুল...সুমন!
আমরা দুজন বৃষ্টিতে ভিজে যেভাবে কাদার মাঝে শুয়ে থাকতাম ঠিক সেভাবে সুমন
রক্তের মাঝে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। আমি আর কথা বলতে পারলাম না।
বাড়ির সবাই আজকে অনেক খুশি। ঈদেও এত আনন্দ হয় না। আমার বড় ছেলের
জার্মানিতে চাকরী হয়েছে। পরিবার সহ জার্মনী চলে যাবে। কিন্তু আমি কোন
ভাবেই রাজি হচ্ছি না, হবও না। বড় ছেলেকে ডেকে বললাম আমি চাই না আমার
নাতীকে দূরে ঠেলে দিতে। হিমন আমার সাথেই থাকবে। আমি ওকে নদীর পাড়ে বসিয়ে
গল্প শোনাব। ও মাছ ধরতে শিখবে, বাংলা গান গাইতে শিখবে, নৌকা চালাতে
শিখবে। ডাক্তার বা ইন্জিনিয়ার নয় সে সুমন হবে, ভাষা সৈনিক মাহমুদুল হক
সুমন। আমার সাত বছর বয়সি নাতি দৌড়ে আমার কোলে আসে। আমাকে বলে "দাদু ভাইয়া
আজকে সুমন দাদুর গল্প বলো" আমি হিমনকে থামিয়ে দিয়ে বলি- উহু এভাবে না;
বলো "দাদু বাইয়া আইজ্জা সুমন দাদুর গপ্পো কও" বলতে গিয়ে আমার স্বর ভারি
হয়ে আসে...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



