somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ধর্মোন্মাদদের কল্পিত বাস্তবতা: "দি ম্যাট্রিক্স" এবং নীল বড়ি

২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাংলাদেশ ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিদের কবলে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধম্যের কল্যানে এই ধর্মোন্মাদনা দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, কদিন আগে সাতক্ষীরায় একদল ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গি ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডের আগে জঙ্গিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করে তৌহিদি জনতা নামের একপাল ধর্মোন্মাদকে জড়ো করে। এরপর শামীমকে দফায় দফায় পেটানো হয়। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেও তাঁকে পেটানো হয়। এরপর তাঁকে টেনেহিঁচড়ে হাসপাতালের বাইরে নিয়ে গিয়ে আরও এক দফা পিটিয়ে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর জঙ্গিরা শামীমের লাশের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে বর্বর উল্লাসে মেতে ওঠে।

ধর্মোন্মাদদের নেতৃত্ব দেওয়া ফজলুল হক আমিনীকে র‌্যাব আটক করে। আটকের পর সাংবাদিকেরা যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করে, তিনি অপরাধী কি না, তখন জঙ্গি জানায়, রাষ্ট্রীয় আইনে তিনি অপরাধী, তবে আল্লাহর আইনে নয়। তাঁকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, হত্যাকাণ্ডের জন্য অনুশোচনা হয় কি না, তখন মুচকি হেসে জঙ্গি জানায়, তার অনুশোচনা নেই।

ফেসবুকে এই জঙ্গির আটকের খবরে বাংলাদেশের অসংখ্য ধর্মোন্মাদ মুসলমান এই হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করেছে। অনেকে ধর্মীয় রেফারেন্স টেনে হত্যাকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে। গত দুই বছরে ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিগোষ্ঠী এবং জামাত মিলে বাংলাদেশে নতুন এক সহিংস সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশে ধর্মোন্মাদরা ধর্মকে আর ধর্মবিশ্বাসের জায়গায় রাখেনি, একে কল্পিত বাস্তবতায় রূপান্তর করেছে। সেই কল্পিত জগতে তারা কখনো ফেরেশতার সাথে কথা বলে, কখনো কতলের নির্দেশনা লাভ করে। বিপজ্জনক বিষয় হলো, কল্পিত জগতের বিশ্বাস বাস্তবে এসে ভয়াবহ রূপ নেয়। এর সবচেয়ে নির্মম শিকার হয় সমাজের অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষগুলো। গার্মেন্টস শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাস কিংবা ভিন্নমতাবলম্বী ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রতিপত্তি নেই বলে তাঁরা ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিদের সহজ শিকারে পরিণত হয়। সংখ্যালঘু ও ভিন্নধর্মের মানুষকে পিটিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলে ধর্মোন্মাদরা শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করে ও ধর্মের নামে হত্যাকাণ্ডের মত অপরাধ করেও পুণ্য অর্জন করে।

ধর্মোন্মাদদের কল্পিত জগতের সাথে কয়েক দশক আগের জনপ্রিয় সিনেমা "দ্য ম্যাট্রিক্স" এর কাহিনীর মিল আছে। সিনেমার গল্পটি ছিল কম্পিউটারে তৈরি করা সিমুলেশন দিয়ে মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ করার ঘটনা নিয়ে। গল্পে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের হাতে চলে গেছে; মানুষের মস্তিষ্ককে কম্পিউটার সিমুলেশনের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে মানুষ সিমুলেশন দিয়ে তৈরি করা কৃত্রিম জগতকেই বাস্তব পৃথিবী বলে বিশ্বাস করে। মানুষ এমন এক মিথ্যা বাস্তবতায় বাস করে যার আসলে কোন অস্তিত্বই নেই।

সিনেমার প্রধান চরিত্র নিও দিনের বেলায় প্রোগ্রামার আর রাতে হ্যাকার। সে ধারনা করে যে, পৃথিবীর মধ্যে কোথাও একটা বড় গণ্ডগোল আছে। কিন্তু সেটা যে ঠিক কী বা কোথায় সেটা বুঝতে পারে না। সমাধান খুঁজতে গিয়ে নিও "ম্যাট্রিক্স" নামের এক ধারণার অনুসন্ধান শুরু করে। তার পরিচয় হয় মরফিয়াসের সাথে। সেও হ্যাকার, কিন্তু সে আবার প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতা। মরফিয়াস তাকে জানায় পৃথিবী সম্পর্কে মানুষ যেটা জানে সেখানে খুব বড় মিথ্যা লুকিয়ে আছে।

মরফিয়াস নিওকে একটি নীল ও একটি লাল - দুটি বড়ি দেখিয়ে বলে, বড়ি দুটি তাকে দুটি ভিন্ন পথে নিয়ে যাবে। নীল বড়িটি খেলে সে নিজের পরিচিত জীবনে ফিরে যাবে এবং অন্য সবার মতো এতদিনের জানা পৃথিবীকে বাস্তব বলে বিশ্বাস করবে। আর লাল বড়িটি খেলে সে জানতে পারবে বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ, সেই সত্য যত অস্বস্তিকর বা ভয়াবহ হোক না কেন। নিও লাল বড়িটি বেছে নেয়। এরপর সে আবিষ্কার করে, এতদিন যে পৃথিবীকে সে বাস্তব বলে জেনে এসেছে, তা আসলে "ম্যাট্রিক্স" নামের কম্পিউটার সিমুলেশন।

তবে ধর্মোন্মাদদের ক্ষেত্রে বিষয়টা ম্যাট্রিক্স এর গল্পের উল্টো। নিও যন্ত্রের তৈরি মিথ্যা বাস্তবতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করে। ধর্মোন্মাদরা নিজেদের অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং বিকৃত ধারণা দিয়ে কল্পিত বাস্তবতায় নিজেদের বন্দি করে। এটা করতে গেলে তারা আবার অনেক সময় সিআইএ, আইএসআই বা ডিপ স্টেটের পৃষ্ঠপোষকতায় পায়। তবে ধর্মোন্মাদনার বীজ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভেতরেই সুপ্ত থাকে; স্বার্থান্বেষী শক্তিগুলো সেই বীজকে বড় করে এবং নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে।

উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানে লস্কর-ই-তৈয়বার মতো জঙ্গি সংগঠনের কথা বলা যায়। পাকিস্তানের জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে শিশু-কিশোরদের এমন ধর্মীয় উন্মাদনায় দীক্ষিত করা হতো যে তাদের বিশ্বাস করানো হতো, কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদে নামলে শত্রুর গুলি তাদের শরীরে লাগবে না; কেবল যাদের বিশ্বাসে ফাঁক আছে, তারাই গুলি খেয়ে মারা যাবে। এই বিশ্বাস শিশু-কিশোরদের মনে এমনভাবে গেঁথে দেওয়া হতো, যাতে তারা মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে সিআইএ বা আইএসআইয়ের পরিচালিত জিহাদে অংশ নিতে পারে।

এই মগজধোলাইয়ের মাত্রা সব জায়গায় এক নয়। কোথাও তা চরম এবং স্পষ্ট, কোথাও মৃদু এবং অস্পষ্ট। সৌদি আরবে যে অভিবাসী শ্রমিক সুইটি আখতার বা নজরুল ইসলামের মাথায় তলোয়ারের কোপ বসায়, যে সৌদি বিচারক অনৈতিক বা অশ্লীল কাজের অভিযোগে শরিয়া আইনের নামে শিরশ্ছেদের রায় দেয়, যে ধর্মোন্মাদরা দীপু চন্দ্র দাস বা ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে বা পুড়িয়ে হত্যা করে, আর যারা এই ধর্মোন্মাদনাকে সমর্থন করে, তারা সবাই ম্যাট্রিক্স এর নীল বড়ি খাওয়া লোকের মতো। এরা কৃত্রিম বাস্তবতার মধ্যে আটকে আছে যেখানে নিজেদের বিশ্বাসকেই তারা পরম সত্য বলে মনে করে।

সিনেমার গল্পে নিও ঘোষণা করে, সে মানবজাতিকে এমন পৃথিবীর সন্ধান দেবে, যেখানে যন্ত্রের তৈরি মিথ্যা বাস্তবতা থাকবে না। কিন্তু পৃথিবীতে সবসময় এমন নায়কের দেখা মেলে না যারা একাই সমাজের ত্রাণকর্তা হয়ে হাজির হয়ে বড় সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারেন। বাস্তবের ম্যাট্রিক্স ভাঙতে প্রয়োজন বহু যুক্তিবাদী মানুষের, যারা নৈতিকতা, যুক্তিশীলতা ও মানবিকতার শক্তিতে ধর্মোন্মাদদের নির্মিত মিথ্যা বাস্তবতার ভিত্তিমূলে আঘাত হানবে এবং তাদের কল্পিত মিথ্যার জগৎকে ভেঙে দেবে।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:৩৩
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

উচ্চবংশীয় ছাগল!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০৯



এককালে কেবল ঘড়িতেই বাজতো টিক টিক- টিক টিক;
বারবেলায় এসে দেখছি টিক টিক বলে কিছু নেই আর ঠিক ঠিক!
বরং 'টিকটক'- এ আকণ্ঠ বুদ হয়ে আছে আবালবৃদ্ধবনিতা!
মানুষের লম্ফঝম্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডাইভারসিটি ভিসা লটারি আবার চালুর নির্দেশ আদালতের

লিখেছেন শিমুল মামুন, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৬



যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৭ অর্থবছরের ডাইভারসিটি ইমিগ্র্যান্ট ভিসা (ডিভি লটারি) লটারির নিবন্ধন আবার চালু করতে ট্রাম্প প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন একটি ফেডারেল আদালত। আগামী ১ নভেম্বরের মধ্যে আবেদন গ্রহণ শুরু করতে এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

“‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’: ঘোষণার পর রাষ্ট্র কতটা বদলায়?”

লিখেছেন raselabe, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৪

রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি পরিকল্পনা তখনই কার্যকর রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে রূপ নেয়, যখন তা ব্যক্তিগত ঘোষণা থেকে বেরিয়ে সুস্পষ্ট নীতি, নির্দিষ্ট দায়িত্ব, বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা এবং পরিমাপযোগ্য জনকল্যাণের লক্ষ্যে পরিণত হয়।

এখানে নেতৃত্বের প্রথম... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোন কিছুর অস্তীত্ব বিহীন মহাশূন্যে অস্তিত্বের প্রক্রিয়া কি ছিল?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৭



কোন কিছুর অস্তীত্ব বিহীন মহাশূন্যে অস্তিত্বের প্রক্রিয়া হলো উদ্ভব। কারণ সৃষ্টি বা তৈরী কারক না থাকা। তাতে কী উদ্ভব হবে এটা অনিদৃষ্ট। কারণ এটা নিদৃষ্ট করার কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মক্কা থেকে বদর: মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ভূরাজনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৫


মুসলিম বিশ্বে ঐক্যের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। অন্তত চুক্তিগুলোর নাম শুনলে তেমনটাই মনে হয়। মক্কা ও বদর। মুসলিম ইতিহাসের দুটি পরিচিত নাম। নাম শুনে মনে হতে পারে, বহুদিনের বিভেদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×