জীবনী বা জীবন আলেখ্য লেখা আমার উদ্দেশ্য নয়। তাছাড়া আমি এমন কোন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ত্বও নই যে আমার জীবনী মানুষ আগ্রহ ভরে পড়বে। আমি খুবই সাধারণ একজন। আরো সহজ করে বললে বলা যায়, আমি এমন একজন যে বাংলাদেশের নব্বই শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। আর বাকি দশ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব যারা করেন, তারা অসাধারণের মধ্যে পড়ে যান। সুতরাং আমি যাদের প্রতিনিধিত্ব করি, আমার লেখায় তাদের ছবিই প্রতিফলিত হবে।
আমি যে দাবি করছি আমি বাংলাদেশের নব্বই শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছি, আমাকে চেনেন এমন অনেকেই আমার এই দাবিকে মেনে নিতে চাইবেননা। তারা হয়তো আমার বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থােেনর ভিত্তি্বতে আমার দাবি করা 'নব্বই' সংখ্যাটাকে কমিয়ে চলি্লশ কিংবা পঞ্চাশ-এর মধ্যে নিয়ে আসতে চাইবেন। কিন্তু আমি তাদের সে দাবিকে মোটেও যুক্তিযুক্ত মনে করিনা। আমি কখনোই নিজেকে তাদের দলে ফেলি না, যারা একেবারে প্রান্তিক আর্থ-সমাজিক অবস্থান থেকে সমাজে উচ্চবৃত্তে ওঠে এসে নিজের অতীতকে অসী্বকার করেন। আমার বর্তমান অবস্থান যা-ই হউক, আমার শৈশব, কৈশোর, অমার ছেলেবেলা সর্বোপরি আমার জীবনের বেশীটা সময় যে ভাবে, যে আর্থ-সামাজিক অবস্থায় ঁেকটেছে, আমি সব সময় নিজেকে তাদের প্রতিনিধি বলেই মনে করি। আর এটাই আমার গৌরব।
আমি মধ্যবয়সী এক প্রাণবন্ত যুবক। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ূ যদি সত্তুর হয়, তকে আমি সবে মধ্যাহ্নের ত্যাজদ্বীপ্ত সূর্য। দেখার এবং শেখার বেশীটাই এখনো রয়ে গেছে। তবু যতটা দেখেছি, শুনেছি, প্রত্যক্ষ তরেছি এক জীবনে তা মোটেও কম নয়। তাছাড়া আমার দাবী করন নব্বই শতাংশের প্রতিনিধি হয়েও নিজেকে একটুখানি আলাদা মনে করি। কারণ, শৈশব থেকে যৌবন, এই সময়ে আমার জীবনে এবং চারপাশে ঘটে যাওয়া সবকিছু যদি সবার মত প্রচলিত সমীকরণে ফেলে হিসাব মিলিয়ে ফেলতে পারতাম, তবে হয়তো নিজেকে আর পৃথক ভাবতে হতনা। আমি জীবনকে, জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলোকে একটু আলাদা করে, ভিন্ন সমীকরণে হিসাব করেছি। প্রচলিত সহজ সমীকরণে ফেলে জীবনের হিসাব মেলাতে পারিনি। তাই আমি আলাদা।
জন্ম দিয়েই একজন মানুষের পথ চলা শুরু হয় জীবনের পথে, যার সমাপ্তি মৃতু্যতে। জন্মের পরে মানুষ যেমন তার জন্মের সেই মহেন্দ্রক্ষণ এবং তার পরে পথপরিক্রমায় ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে বিষদ জানতে এবং জানাতে পারে, মৃতু্যর পরের কোন কিছু সম্পকেই তেমন পারেনা। তাই জন্মটা খুবই গুরুত্ত্বপূর্ণ এবং স্বরণীয় ও বটে। এই গুরুত্ত্বপূর্ণ এবং স্বরণীয় অধ্যায়টা কেমন ছিল, সেটা প্রত্যেক মানুষের কাছেই কৌতুহলের। বাংলাদেশের নব্বই শতাংশ মানুষের মত আমারও জন্মের সেই গুরুত্ত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পর্কে তেমন কোন ধারণা নেই। আমার কবে জন্ম, সেই দিনটা কেমন ছিল, মেঘলা না রোদেলা সে সম্পর্কে আমার মা-বাবা বা অন্য কেউ-ই কোন সুন্দর বর্ণনা দিতে পারেননা। তাই জন্ম আমার কাছে এক অচেনা তেপান্তর, যাকে দূর থেকে আবছা অন্ধকার বলে মনে হয়।
আমার জন্মদিন সম্পর্কে আমার তেমন কোন কৌতুহল ছিলনা। যেমন নেই বাংলাদেশের ওই নব্বই শতাংশ মানুষের। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠা পর্যন্ত কোনদিন এ সম্পর্কে কাউকে জিজ্ঞাসা করিনি। কিন্তু একটি ঘটনা আমার সেই অচেনা তেপান্তর সম্পর্কে কৌতুহলি করে তোলে। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষেও উচ্ছ্বল প্রাণবন্ত তরুণ। আশে পাশের সব কিছুই রঙ্গির আর স্বপ্নময়। পড়ালেখা আর বন্ধুদের সাথে আড্ডায় সময়গুলো কেমন দ্রুত, বেহিসাবে কেটে যাচ্ছিল। উচ্ছ্বল আনন্দের সেই দিনগুলোতে আমরা বন্ধুরা মিলে বছরের বিশেষ বিশেষ দিনগুলো খুব মজা করে কাটাতাম। বিশেষ করে আমাদের কারো জন্মদিনে আমরা অফুরন্ত আনন্দ করতাম। এরই ধারাবাহিকতায় একদিন আমার বন্ধুরা আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল আমার জন্মদিন কবে। আমি বল্লাম, জানি না। আমার উত্তরে সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল। আমিও তাদের সাথে হেসেছিলাম। কিন্তু হাসি যখন থামল, তখন নিজেকে ভীনগ্রহের কোন প্রাণী বলে মনে হতে লাগল। আমার বন্ধুদের সবাই তাদের জন্মদিন এবং মায়ের কাছ থেকে শুনা জন্মদিনের অনেক মজার মজার গল্প জানে, শুধু আমি জানি না। সেদিনই আমার প্রথম মনে হল আমি আমার জীবনের খুব সুন্দর এবং মজার একটা অধ্যায় জানি না। জন্মদিন যে একটা মজার এবং সেই সাথে গুরুত্ত্বপূর্ণ, সেটাই আমার জানাছিলনা। জন্মদিন সম্পর্কে আমার অজ্ঞতায় বন্ধুদের কাছে আমি হাসির পাত্র হয়ে গেলাম। এনিয়ে বন্ধুরা কি কি মন্তব্য করেছিল, সে গুলো এখানে উল্লেখ করতে ইচ্ছে হচ্ছেনা। কিন্তু আমার বন্ধুরা আমাকে জন্মদিনের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করেনি। পরের বছর বৈশাখের প্রথম দিনে আমাকে অবাক করে দিয়ে সবাই আমাকে জন্মদিনের উইস করল। সেদিনের পর অজানা অতীতটা জানার নেশা আমাকে ভীষণ ভাবে পেয়ে বসল। পরের ছুটিতে বাড়িতে এসেই মাকে প্রথমবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম আমার জন্মদিন কবে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


