somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অতঃপর আমরা সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলাম…

০৮ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[ প্রিয় পাঠক, এটি একটি গল্প ]

এক
“খা খা যত পারস খায়া ল, আইজকা না খাইলে আর কবে খাইবি?” এলাকাবাসীকে মিষ্টি খাওয়ানোর ভার পড়েছে যাদের ওপর, আজগর মিয়া তাদের একজন, মহাসমারোহে মিষ্টি খাইয়ে চলেছে সে; খাদকের দলটিতে আবাল বৃদ্ধ বণিতা তিনটি শ্রেণীই রয়েছে। এর আগে এতো সুখের দিন কবে এসেছে চেষ্টা করেও মনে করতে পারেনা আজগর মিয়া, এবং মনে করতে না পেরে সুখী হয়ে ওঠে; কৃতজ্ঞতাও বোধ করে, এই সুখ তাকে যারা দিতে পেরেছে, সেই মহান “রয়েল বেঙ্গল কমান্ডো” বাহিনীর প্রতি- এদের মতো করে কে কবে কোথায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে? কাল রাতে এলাকায় এসেছিলো বাহিনীটির একটি উপদল; এসেছিলো যেনো সন্ত্রাসীদের মৃত্যুদূত হয়ে; দূতিয়ালীর এ কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছে তারা দুজন সন্ত্রাসীর ক্ষেত্রে, বাকিগুলো এলাকা ছেড়ে পালিয়ে আপাতত মৃত্যুকে এড়াতে পেরেছে।

এলাকা তাই এখন সন্ত্রাসীশূন্য- এই বোধটিই পুনঃ পুনঃ উত্তেজিত করে তোলে জনগণকে; একটির পর একটি রসগোল্লা গিলে তারা পুলক লাভের চেষ্টা করতে থাকে, বেশিরভাগই লাভও করে, এতো তীব্রভাবে যে বিছানাতেও ওটি তারা কখনো পায়নি; আজগর মিয়া তাদের একজন।

দুই
আজগরের ছোটো ভাই, আকবর মিয়া যার নাম, পড়াশোনা করে ঢাকার কলেজে, ছুটিতে বেড়াতে এসেছে মফস্বলটিতে, বড় ভাইয়ের বাড়ি; তখন সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুচ্ছে, এই সময় আজগর মিয়া বাড়ি ফেরে, এবং চিৎকার করে ওঠে, “এত বেলা কইরা ঘুম থাইকা উঠছস? খবর তো কিছুই রাখসনা, এইদিকে সবডিরে মাইরা সাফা কইরা লাইছে!”

“কী হইছে?”

“আরে কাইলকা রাত্রে আরবিসি আইছিলো মহল্লায়, লম্বু নাসির আর মেন্টাল বাবু শ্যাষ, বাকিডি কই লৌড়ায়া পলাইছে হিসাব নাই! মহল্লায় এখন পুরা শান্তি আর শান্তি!”

“কী বলেন এইসব? ক্রসফায়ার?”

“আরে কিয়ের করসফায়ার? ঐগুলি একটু কইতে হয় আরকি। ধইরা ডাইরেক গুল্লি। লাশ আইন্না ফালায়া রাখছে ঈদগাহ মাঠে, সকালে নাজিম মাস্টার প্রত্থম দেখছে, দেইখা তার কী লাফানি! আমরা জিগাইতাছি আর জিগাইতাছি, হে খালি কয়, খাড়াও একটু লাফায়া লই! দুই মিনিট ধইরা লাফায়া হেরপরে আসল ঘটনা কইছে।”

“তা এইটা যে আরবিসি-ই ঘটাইছে কিভাবে বুঝলেন?”

“ক্যান কাইল রাইতেই তো অরা আইছিলো, আমরা সেই সময় জলিলের দোকানে বইয়া চা খাইতেছি। এহনো যায়নাই কিন্তু, টিভি আইবো পত্রিকা আইবো, ঐগুলিরে ইন্টারভু দিতে হইবোনা?”

“ভাইজান আপনি কি জানেন যে এইগুলা ঠিক না?”

“কী ঠিক না?” ছোটো ভাইয়ের কথা বুঝতে পারেনা আজগর মিয়া; কিংবা হয়তো বুঝতে পারে, অথচ বুঝতে পারেনা।

“সন্ত্রাসীরা অন্যায় কাজ করেছে ঠিক কথা, কিন্তু এদেরকে সাজা দেয়ার জন্য তো আইন আছে, নাকি? হইতে পারে আইনে অনেক ফাঁকফোঁকর আছে, তাইলে তো সেই ফাঁকগুলিরেই আগে বন্ধ করন দরকার, তাইনা? তা না কইরা নির্বিচারে মাইরা ফেলতেছে, এইটা কোনো কথা হইলো?”

“তোগো লয়া এই এক সমস্যা- দুই পাতা বই পইড়া নিজেরে মনে করস কুন বাপের ব্যাডা। আরে ছাগল শোন, সন্ত্রাসী মারতে লাগবো দুই মিনিট, আর তোগো ঐসব আইন ঠিক করতে লাগবো কয় যুগ?”

“কিন্তু একটা ব্যাপার ভাইবা দেখেন- খালি সন্ত্রাসীই যে মরতাছে তা না কিন্তু, অনেক নিরপরাধ মানুষও মরছে এই পর্যন্ত। তাদের কথাটা একবার ভাইবা দেখেন।”

"কেডা কইছে তোরে এইগুলা? ধুর ধুর সব ফালতু কথা। ঠিকাছে হইতে পারে দুই-এক জাগায় এইরকম হইছে। একটা সন্ত্রাসীরে মারতে গিয়া দুইটা নিরীহ মানুষ মরলে কী আর করার আছে? শোন বড় কিছুর লাইগা একটু ছাড় দিতে হয়না, অ্যাঁ? এই যে দেখ এলাকাবাসী কী ফূর্তি করতাছে, আইজকা বিকালে নাকি আনন্দ মিছিলও বাইরাইবো। এই আনন্দডা তোরা দেখসনা ক্যান? এই যে কত্তডি দিন আমরা খালি দোয়া করছি এইসব সন্ত্রাসীর হাত থাইকা মুক্তির লাইগা, আমগো দোয়া কামে লাগছে, বুঝছস? ঠিক লাইনে চিন্তা কর বুঝতারবি।”

ঠিক লাইনে চিন্তা করে বুঝতে পারে আকবর মিয়া- বড় ভাইকে কিছু বোঝাতে যাওয়া বৃথা; এধরনের ঘটনা সে অনেক শুনেছে, কাজেই সে জানে শুধু মফস্বল বা গ্রামের সরলরাই নয়, মেগাসিটির জটিলরাও অনেকেই এরকম বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের পক্ষে মুক্ত এবং উচ্চকন্ঠ; এদের বিরুদ্ধে বলে উল্টো তাকেই ঘৃণা-অবজ্ঞার স্বীকার হতে হয়েছে নানা জায়গায়, এমনকি বন্ধু মহলেও।

সে তাই, আরো অনেকের মতোই, ভেতরে ভেতরে পুড়তে থাকে।

তিন
আনন্দ মিছিল শেষ হতে হতে সন্ধ্যে হয়ে যায়, আজগর মিয়া বাড়ি ফিরে দেখে তার স্ত্রী উদভ্রান্তের মতো বাড়ির উঠোনে বসে আছে। আজগর মিয়া তাড়াতাড়ি তাকে ধরে জিজ্ঞেস করে, “কী হইছে তোমার? শইল খারাপ লাগে?” আমেনার চার মাস চলছে।

“নিয়া গেছে। আকবররে নিয়া গেছে।”

বুকটা ধ্বক করে ওঠে আজগরের, “কে নিয়া গেছে? কী হইছে সব খুইল্যা কইতাছোনা ক্যান?” দারুণ আতংকে বউকে দারুণভাবে ঝাঁকাতে থাকে সে।

“সন্ধ্যার একটু আগে কালা জামা কতগুলা লোক আইয়া আকবররে নিয়া চইলা গেছে, হে যাইতে চায়নাই, মাটিতে ছ্যাচড়াইতে ছ্যাচড়াইতে নিয়া গেছে। আমি ঠেকাইতে চাইছিলাম, ধাক্কা দিয়া ফালায়া দিছে। কত চিল্লাইছি তোমাগো নাম ধইরা, তোমরা তো সবডি মিছিলে।”

আজ সারাদিন চমৎকার কেটেছে আজগর মিয়ার, এতো চমৎকার দিন সে বহুদিন কাটায়নি, এতো অবিশ্বাস্যরকম আকস্মিকভাবে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়াটা তাই সে ঠিক সহ্য করতে পারেনা; একটি অনুভূতি থেকে চরম বিপরীতমুখী আরেকটি অনুভূতিতে সে এতো দ্রুত প্রবেশ করে যে তার শরীর এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেনা, ফলে হড়হড় করে বাড়ির উঠোনে সে বমি করে।

খানিক আগের আনন্দমিছিলে খাওয়া মিষ্টিগুলো আজগর মিয়ার আর হজম করা হয়না, ওগুলো তার পাকস্থলী থেকে বেরিয়ে এসে উঠোনে পড়ে থাকে।

চার
“স্যার আমার ভাই এইখানে থাকেনা স্যার, পলায়া যাওয়া সন্ত্রাসীগো সে চিনেইনা, বিশ্বাস করেন স্যার। আপনে আমগো মা বাপ স্যার।”

“তোমার ভাইয়ের নাম আকবর তো?”

“জ্বি স্যার।“

“দেখো আমাদের কাছে খবর আছে- তোমার ভাইয়ের সাথে এখানকার সন্ত্রাসী মাসুদের সখ্য আছে। মাসুদও আমাদের হিটলিস্টে আছে, ওকে খতম না করে আমরা যাচ্ছিনা। এইজন্য তোমার ভাইকে এনেছি যাতে মাসুদের আস্তানায় আমাদের নিয়ে যেতে পারে।”

“স্যার স্যার আপনেগো কোনোখানে ভুল হইছে স্যার, আমার ভাই ভালা স্যার, হে এইগুলার কিছু জানেনা।”

“ঐ মিয়া একটা কথা জেনে রাখো- আরবিসি কখনো ভুল করেনা। কেনো জানো? কারণ আরবিসি যেটা করে সেটাই ঠিক। হতে পারে আমরা যেই আকবরকে খুঁজছি সে এই আকবর নয়। তো? একটা সন্ত্রাসী মারতে গিয়ে দশটা নিরীহ মানুষ মরতেই পারে, তাতে আরবিসির কিছুই করার নেই। এইটুক ত্যাগ স্বীকার করবেনা, আর আইনশৃঙ্খলার উন্নতি চাইবে, এটা কেমন কথা? তোমরাই না বিকেলে আনন্দমিছিল করলে?”

“স্যার আমি কিছু বুঝিনা স্যার আমি শুধু আমার ভাইরে ফিরত চাই।”

“তোমার ভাইকে কাল সকালে এসে নিয়ে যেও। আজ রাতে ওকে নিয়ে অপারেশনে বেরোবো, মাসুদের আস্তানাটা ও আমাদের চিনিয়ে দেবে। ব্যস এটুকুই। আর কিছু না। হেহ হেহ হেহ। এখন চলে যাও বিরক্ত কোরোনা।”

“স্যার স্যার...”

“অই শুয়োরের বাচ্চা চোপ! আর একটা শব্দ করবি তো তোর নামও লিস্টে উঠামু!”

“স্যার স্যার...”

“আরে এ তো মহা ডিস্টার্ব শুরু করলো কাজের সময়! বুঝছি তোরে বাইন্দা না পিটাইলে তুই থামবিনা।”

পাঁচ
রাতের আঁধারে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিধ্বস্ত বিকারগ্রস্ত আজগর মিয়া দুটো ব্যাপার নিয়ে ভীষণ চিন্তায় পড়ে যায়-
১. কাল ভোরে ঈদগাহ মাঠেই আকবরের লাশটি পাওয়া যাবে তো? নাকি আবার অন্য কোথাও খুঁজতে হবে? ওখানে পাওয়া গেলে তো ভালো, নাহলে এই অসুস্থ শরীরে আবার সারা শহর খুঁজে দেখাটা খুব কষ্টের হবে।
২. আমেনাকে যে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিলো, এতে তার অনাগত সন্তানটির কোনো ক্ষতি হলো না তো?
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ৯:০১
২৭টি মন্তব্য ২৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Miles to go before I sleep

লিখেছেন ঋণাত্মক শূণ্য, ১৭ ই জানুয়ারি, ২০২২ রাত ১০:২৮

কবিতা আমার তেমন একটা পছন্দ না। খুব বেছে খুটে গোটা দশেক কবিতার কথা আমি বলতে পারি যা আমি টুকটাক পছন্দ করি।



ব্লগে কবিতা দেখলে কেমন যেন লাগে। আমি সাধারণত কবিতার পোষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

কখন, কিভাবে বুঝবেন আপনি ছোটলোক?

লিখেছেন ফারহানা শারমিন, ১৮ ই জানুয়ারি, ২০২২ রাত ১২:৩৬


মোশাররফ করিমের একটা নাটকের ডায়ালগ আমার খুব মনে ধরেছে , সেটা হচ্ছে গরিব ধনী হয় কিন্তু ছোটলোক কোনদিন বড়লোক হয় না। ধরেন আপনার জন্ম এক হতদরিদ্র পরিবারে।দু এক জায়গায় ছোটলোক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যবহারে বংশের পরিচয় আর মন্তব্যে ব্লগারের

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ১৮ ই জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ১০:০৬

'১৩ সালে সামহোয়্যার ইন ব্লগের সাথে পরিচয়। তখন অবশ্য সক্রিয় ছিলাম না। '১৫ সাল থেকে '১৬ পর্যন্ত সক্রিয় ছিলাম। এরপর থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলাম। গত বছর একেবারেই নিষ্ক্রিয়।

তো এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

রোহিঙ্গা সংকট সমাধান হবে কবে?

লিখেছেন হাবিব , ১৮ ই জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ১০:২৮



আরসা প্রধানের ভাই বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছে। ঠিকানা দিয়েছে চট্টগ্রামের কোন এক এলাকার। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিনামূল্যে গ্যাস সিলিন্ডার দেয়া হয়েছে যাতে তারা কাঠ কেটে বন ধ্বংস না করে। অথচ... ...বাকিটুকু পড়ুন

এগিয়ে চলেছে বেয়াদবির কালচার!

লিখেছেন ঋণাত্মক শূণ্য, ১৮ ই জানুয়ারি, ২০২২ দুপুর ১:৩১

একটা সময় ছিলো, যখন প্রচুর মুভি দেখতাম। মুভি দেখা প্রথম শুরু হয়েছিলো মূলত ইংরেজী শেখার নাম করে। ২০১৪ এর দিকে এসে পরিচয় ঘটে একটা টিভি সিরিজ The Big Bang Theory... ...বাকিটুকু পড়ুন

×